শেয়ার বাজার- ” কোনো পরামর্শ নয়, তবে “

গত বছর আমেরিকায় আমার ছোটোকালের বন্ধু শিবলি করোনার ছোবলে ইহ জগত ত্যাগ করে। সেই বন্ধুর একটি ঘটনা দিয়েই শেয়ার বাজার নিয়ে কিছুটা লেখার প্রয়াশ মাত্র। বন্ধু শিবলি বেশ শান্ত এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ ছিলো। জীবনে কোনোদিন খারাপ কাজের সাথে ছিলো না। এ কথা আমি একা নই  আমাদের সব বন্ধুরা অনায়াসেই স্বীকার করবে।

যাকগে, বন্ধু শিবলি ২০১১ সালে বেশ ভালো পরিমান গচ্ছিত টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে এবং সর্বহারা হয়। অতঃপর বন্ধুটি পাগল প্রায়। শ্যাওড়াপাড়ার পুরাতন রানওয়েতে প্রায় প্রতিদিন  সন্ধ্যাসময় হাঁটতো আর লুঙ্গি তুলে হা- হুঁতশ করতো। আমার বন্ধু মহল আমকে জানিয়েছিলো। অবশেষে আমেরিকায় পাড়ি জমায় এবং করোনায় মর্মান্তিক বিদায় । ( বন্ধু তোর মতন ভালো মানুষ ওপারে নিশ্চয়ই ভালো আছিস, ভালো থাকিস )

আজকের পত্রিকায় একটি হেডলাইন দেখলাম । হঠাৎ সেই প্রয়াত বন্ধুর কথা স্মরণ হলো এবং সে জন্যই সাবধানতা বসত এই লেখা । পত্রিকার হেডলাইনটি ছিলো, ” পুঁজিবাজার যেভাবে আগাচ্ছে, ভবিষ্যত ভালো “ – সালমান এফ রহমান।

পত্রিকার হেডলাইনটির বিষয়ে পরে আসবো। একটু শেয়ার বাজার নিয়ে কিছু বিষয় স্মরণ করা প্রয়োজন।  শেয়ার বাজার কি ? বিনিয়োগ কিভাবে হয় ? কোন কোম্পানি শেয়ার বাজারে থাকে ? কিভাবে থাকে ? কখন, কিভাবে শেয়ার উঠা নামা করে ?  এগুলোর আলোচনায় যাবো না। যারা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন, তারা নিশ্চয়ই সেগুলো অনেক বেশি অবগত আছেন। তবে শেয়ার বাজারের ধসের ইতিহাস একটু দেখা প্রয়োজন মনে হচ্ছে।

শেয়ার বাজারের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯১৯ সালে বিশ্বব্যাপী একটি বিরাট ধস নেমেছিলো। যা আজ অব্দি ” ব্ল্যাক মানডে ” নামে পরিচিত । বিশ্ব বাজার ছেড়ে একটু আমাদের দেশের দিকে নজর দেই ।  ২০১১ সালে আমাদের দেশে শেয়ার বাজারে একটি বিরাট ধস নেমেছিলো।  অবশ্য বিশ্ব বাজারেও এই ধস ছিলো সেই সময়ে । সেই দিক থেকে সঠিক কেননা আমরা বিশ্বের বাহিরে নই । তবে এখানে কিছু তবে, কিন্তু আছে।

কি সেই তবে কিন্তুটি ? ২০১১ সালের আগে আমাদের দেশে শেয়ার বাজারে আকস্মিক কিছু ঘটনার পর্যবক্ষেণ করা প্রয়োজন।  লক্ষণীয় যে, ২০০৯ সালেই দেশের শেয়ার বাজার মারাত্মক উর্ধ্বমুখীতে ধাবিত হয়। সেই সময়ে শেয়ার বাজার প্রায় অস্বাভাবিকভাবে ৬০% – ৬২% এ উন্নতী হয় । যা সমগ্র বিশ্ব বাজারে কোথাও এমনটি ঘটেনি । এমন কি ২০১০ সালে সেই একি বাজার আরো ফুলে- ফেঁপে উঠে। ক্রমান্বয়ে ৬৮% ছাড়িয়ে তা’ ৮০% – ৮২% এ উঠে যায়। মানুষ তাদের আপন লালসায় লাগাম টানতে পারেনি এবং ধন- সম্পদ, জমি- জমা সব নিয়ে শেয়ার বাজারে উপস্থিত হয় । অতঃপর যা হবার তাই হয়েছে। ২০১১ সালে সেই ৮২% দরের শেয়ার এক নিমেষেই নেমে আসে ১০% এ। অর্থাৎ গতকাল যে কোম্পানির শেয়ার ১০০ টাকায় খরিদ করার পর পর মূল্য ছিলো ১৮২ টাকা। সেই একি শেয়ারটি এক সন্ধ্যা পরেই বিক্রিয়মূল্য হয়ে গেলো দশ টাকা মাত্র।  সুতরাং আমার বন্ধু শিবলির পাগল হবারই কথা ছিলো । এই শেয়ার বাজারের ধস শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি  হিসেবেও পরিচিত । লক্ষণীয় যে, গত ২০১৯ সালেও দেশের শেয়ার বাজারে একটি অপ্রত্যাশিত ধস নেমেছিলো, যখন কিনা বিশ্ব শেয়ার বাজার একেবারেই শান্ত ছিলো। সেই ঘটনার সময়েও একি সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলো এবং বর্তমানেও আছে।

লক্ষণীয় যে, বর্তমান সরকার সেই সময়ে ক্ষমতায় ছিলো। এমন কি, এই সরকার যখন ৯০ এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরে প্রথম যখন ক্ষমতায়ন হয়, সেই ১৯৯৬ সালেও বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে একটি কৃত্রিম ধস নেমেছিলো। সেই সময়ে বিশ্ব বাজারে কোথাও কোনো নেগেটিভ কিছু ছিলো না । শুনা যায়, সেই সময়ের বাজার থেকে ভারতের মারোওয়ারিরা বাংদেশের শেয়ার বাজারের কাণ্ডারিদের সাথে যোগসাজশে ৩০০০ হাজার কোটি টাকা উধাও করে দেয় । সেই সময়ে ৩০০০ হাজর কোটি টাকা চাট্টিখানি কথা ছিলো না ।

এবার ছোট্ট করে পত্রিকার হেড লাইন নিয়ে দুটি কথা বলা প্রয়োজন।  তার আগে প্রয়াত বিজ্ঞ রাজনীতিক ও মন্ত্রী সুরঞ্জিত বাবুর একটি কথা স্মরণ হলো । যিনি নিজেও এক সময় রেলের কালো বেড়াল নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ২০১১ সালের শেয়ার বাজার নিয়ে একবার বলেছিলেন,  ” শুঁটকির হাটে বেড়াল চকিদার ” । সেই সময়ে তিনি কাদের বেড়াল বলেছিলেন তা ‘তখন বাজারে বেশ ঢাউশভাবে চড়াও হয়েছিলো । লোক মুখে একটি নাম বেশ শোনা যেতো। সেই সময় থেকেই দরবেশ নামটিও বেশ প্রচারে আসে।

এবার পত্রিকায় যে হেডলাইনটি শেয়ার বাজার নিয়ে এসেছে, বেশ পজিটিভ নিউজ। সেই বচনটি কিন্তু সুরঞ্জিত বাবুর সেই শুঁটকির হাটের বেড়ালের বচন। সুতরাং একটি ভালো, সুন্দর, আশান্বিত ও পজিটিভ কথায় সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার বন্ধু শিবলির মতন লুঙ্গি উঠিয়ে দৌড়ানোর মতন পরিস্থিতির স্বীকার হবেন না। ধীরে বন্ধু ধীরে । কথায় বলে সবুরে মেওয়া ফলে ।

মূলত একটি দেশের শেয়ার বাজার যত বড় হবে, সেই দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা তত ভালো বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে আমাদের দেশের শেয়ার বাজার অনেকটা ঘরপোড়া সিঁদুরের মতন কিনা , তাই সাবধানতার বাণী। আমাদের দেশের শেয়ার বাজার আনেকটা ফন্দির বাজার হয়ে উঠে। সেখানেই যত বিপদ ।

ফন্দির মাঝেও একপ্রকার philosophy বা দর্শন থাকে। বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করা Philosophy -র মতন। বড়শিতে এক টুকরো খাবার আঁটকিয়ে দিয়ে পানিতে নাড়াচাড়া করে, অনেকটা লোভ দেখিয়ে মাছকে খাওয়ানোর ফন্দি থাকে। যেই মাছটি সেই খাদ্যের লোভে  পড়েছে, জীবনটি সেখানেই শেষ । এমনভাবে বড়শিতে আঁটকিয়ে যাবে, ফিরে আসার আর পথ থাকে না। শেয়ার বাজার অনেকটাই সেই বড়শির Philosophy- র কাছাকাছি। তা ‘ছাড়া শেয়ার বাজারের পজিটিভ বচনটি এসেছে এমন একজন দরবেশের কাছ থেকে, যা সত্যি ভাববার বিষয় বটে।

দরবেশ বাবাকে আপনি বন্ধমনে বা অন্ধচোখে বিশ্বাস করবেন, নাকি নেড়েচেড়ে ঘেঁটে দেখবেন? সেটা একান্তই আপনার নিজস্ব এবং ব্যক্তিগত বিষয়।  দেশের শেয়ার বাজার বড় থেকে অনেক বড় হউক, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সেটাই চাইবো, তবে স্বাভাবিক পথেই যেনো সেটা হয়। কোনো অস্বাভাবিক পথ এ দেশের জনমানুষ আর বহন করতে পারবে না বলেই দেখতে পাই । আগামীতে যেনো কাউকে শেয়ার বাজার নিয়ে হা- হুঁতশ করতে না হয় । থিংক টুয়াইস।

 

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.