কাকে নিয়ে লেখা শুরু করবো বুঝতে পারছি না। কারণটি বেশ পরিষ্কার কেননা আমি যে দুইজনের বিষয়টি লিখতে চাচ্ছি, তাদের দুইজনের একজনকেও চিনি না, এমনকি উনাদের জীবনের কর্মকা সমন্ধে তেমন কিছুই জানি না। পরীমনি সমন্ধে যতটুকু জানি, তিনি বাংলা সিনেমা জগতের একজন পরিচিত মুখ বা নায়িকা, বেশ এইটুকুই আমার জানা। এর বেশি নয়। কোনোদিন পরীমনির একটি ছায়াছবি দেখা হয়নি। এমনকি আমি সত্যি অর্থেই জানি না কেমন অভিনেত্রী তিনি। ধারণা করি বাংলা সিনেমার বর্তমান মান যতটুকু আছে সেই মানে নিশ্চয়ই তিনি একজন পরীক্ষিত নায়িকা হবেন। তা’ না হলে তো গ্লামার্স এই চলচ্চিত্রের জগতে এতটা পরিচিত হবার কথা নয়। যতটুকু বুঝি তিনি নিশ্চয়ই বর্তমানে দেশের একজন ওপরের পর্যায়ের নায়িকা।
আবু ত্বাহা মুহাম্মদ আদনান। বেশ চমৎকার নাম। উনি কে বা কি করেন কিংবা কি তাঁর পেশা ? আমি এগুলোর কিছুই জানি না। এমনকি আমি কোনো দিন উনার নামটি পর্যন্ত শুনিনি। গত কয়েকদিন যাবৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছুটা যা জানলাম তা’ হলো তিনি একজন ইসলামীক বক্তা। বেশ এই এতটুকুই আমার জানা। অনেকের লেখায় দেখলাম উনার অনেক বক্তব্য ইউটিউবে আছে বা অনেক পরিচিত ইসলামীক বক্তা হিসেবে। আমি অনেক ইসলামীক বক্তাদের ওয়াজ বা বয়ানের মাধ্যমে চিনি, বিশেষ করে ইউ টিউবের কল্যাণে এবং তারা বেশ পরিচিত সর্বজনীন। নাম আর নাই লিখলাম। তবে সেই সব পরিচিত ইসলামীক বক্তাদের প্রায় সবার মনের মধু মাখানো, রসালো, অসত্য, ভুয়া, ইসলামের সাথে তাদের বচনের অসংগতি নিয়ে অনেকবার লিখেছি। তবে এই ত্বাহা আদনান সমন্ধে যেহেতু জানি না এবং দেখেনি তাই বলতেও পারবো না, কেমন ইসলামীক বক্তা তিনি ? কি থাকে তাঁর বচনে ? কি তিনি অর্জনে বক্তব্য রাখেন ? সত্য বা মিথ্যা বা রাষ্ট্রের জন্য বিপদজনক কিনা? আমি তাও জানি না ।
এমনকি এখন যে উনাকে নিয়ে লিখছি, তার পূর্বেও আমি একটিবারের জন্য উনার ভিডিও দেখার, তাঁর বয়ান শোনার কোনো আগ্রহ পাইনি। কেননা এই লেখার বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকের। তবে হ্যাঁ একটি কথা বলতেই হয়, গত কয়েকদিন ইনবক্সে বেশ অনেকগুলো মেসেজ পেয়েছি, যে মেসেজগুলোর মূল মেসেজ ছিলো, একজন তরুণ ( বয়স কত? জানি না ) এভাবে একটি রাষ্ট্র থেকে গায়েব হয়ে যাবে, সেই বিষয়ে কিছু লেখার । সেই অনুরোধ এবং আপন বিবেকের তাড়নায় এই লেখা । আপন বিবেক এমন গুম হওয়ার বিরুদ্ধে মারাত্মক আঘাত হানে। হোক সে যত বড়ই অন্যায়কারী, টেররিস্ট কিংবা জঙ্গি। কেননা বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আইন আছে এবং সব কিছু সেই আইনের মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবেই। তবেই এই রাষ্ট্র একটি মানবিক রাষ্ট্র হতে পারবে, নতুবা নয় । আমার লড়াইটি সেই মানবিক রাষ্ট্রের জন্যেই। তাই এই তরুণ ইসলামীক বক্তার বক্তব্য শোনাটা আমার জন্য জরুরি কিছুই নয়, এমনকি প্রয়োজনও আছে বলে মনে করি না, এই লেখার জন্য।
আবার ফিরে আসি পরীমনি কাহিনীতে। কাহিনী বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে ঘটে যাওয়া বিষয়টিই প্রতিপাদ্য বিষয়। পরীমনি তিনি যে কারণেই বা যে ভাবেই হউক অথবা যার প্রলোভনেই হউক, সেদিন রাতে তিনি সেই ক্লাবে গিয়েছিলেন। আমি স্পষ্টতই মনে করি, যদি সেই ক্লাবে যাবার অধিকার কারো থাকে সে যেতেই পারে, হউক সে পুরুষ বা মহিলা। আমি স্বজ্ঞানেই কথাটি লিখছি । আমি এটাও অবগত আছি আমাদের কৃষ্টি- কালচার সমন্ধেও। প্রশ্নটি হলো রাষ্ট্রের আইনে সেখানে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা ? যদি না থাকে তাহলে যে কেউ যেতেই পারে, হউক সে পুরুষ বা মহিলা। অনেককেই দেখছি বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ শোরগোল হচ্ছে, এত রাতে মেয়ে ( লক্ষণীয় যে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব ) মানুষ ওখানে কেনো যাবে ? এই প্রশ্নের উত্তর লিখতে গেলে মহা কাব্য লিখতে হবে। আমি সে দিকে যাচ্ছি না। তবে আবার লিখছি, রাষ্ট্র অনুমতি দেয় কিনা ? সেটাই বড় প্রশ্ন। সমাজ বা পরিবার, সেটা সবার আপন বিত্ত বলেই মনে করি। সেই হিসেবটা সবার আপন স্বাধীনতা হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ।
আমাদের সমাজে একটি বিষয় বা ভাবনা বেশ কাজ করে যে, সিনেমা জগতের মানুষ, হউক সে পুরুষ বা মহিলা, সব নষ্ট মানুষ। আর মেয়ে হলে তো ষোলকলা পূর্ণ নষ্ট। অথচ আমরা তাদের কাজ, তাদের অভিনয়, তাদের উপস্থাপনা দেখে থাকি, তাদের চলচিত্র দেখে কখনো কখনো আনন্দিত হই, বেদনায় ব্যাকুল হই, উৎফল্লিত হই আবার নিজেকেও কখনো কখনো সেই স্থানে কল্পনা করি। এই যে ভাবনা বা আবেগগুলো আমাদের মাঝে কাজ করে, তার পিছনের মূল উপসর্গটি হলো শিল্প । অথচ সেই শিল্পটিকে আমরা মূল্যায়নের আগেই একটি বিশেষ উপাধি নষ্ট শব্দটি বসিয় দেই। এটাও একটি বিরাট মনোবিজ্ঞানের বিষয়। ছোট্ট করে বলে শেষ হবার নয় ।
পরীমনির নিজের ভাষ্য তিনি সেই রাতেই থানায় গিয়েছিলেন লিখিত বক্তব্য নিয়ে। থানা জিডি ( জেনারেল ডাইরি ) নিতে অস্বীকার করে তাকে ফিরিয়ে দেয়। পরের কাহিনীতে আর যাচ্ছি না। কেননা সবার তা ইতিমধ্যেই জানা হয়ে গেছে বেশ। অতঃপর তিনদিনের মাথায় পরীমনি নিজের ভেরিফাই পেইজে এবং নিজের ভক্তকুলের প্রভাবটি কাজে লাগাতে বাধ্য হয়েছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন করার, এটা তার নিজের ভাষ্য। তিনি আত্মহত্যা করার মতন মানুষ নন, সেটাও তাকে বারবার বলতে হয়েছে। ভাবুন তাহলে জল কতদূর গড়াতে পারতো ? অবশেষে চারদিন পরে মামলা এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার, যা সত্যি অর্থেই প্রশংসনীয় এবং রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ।
হ্যাঁ রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ। তবে একবার ভাবুন তো, পরীমনি এত পরিচিত মুখ হবার পরেও তাকে আত্মহত্যার কথা শোনাতে হয় ( করবো না ), প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ফেইসবুক ভেরিফাই পেইজের আশ্রয় নিতে হয়, সাংবাদিক সম্মেলন করতে হয়, কিসের জন্য? শ্রেফ একটি জিডির জন্য। যে জিডিটি একজন অতি সাধারণ মানুষের অতি নিম্ন অধিকার হবার কথা। কেননা থানা- পুলিশ অতি সাধারণ জনমানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সবার নিরাপত্তা দিতে সংবিধান অনুযায়ী বাধ্য । অথচ এই জিডি নামক অস্ত্রটি যে কতটা কঠিন এই স্বাধীন বঙ্গভূমিতে, তা’কেবলমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন । এখানে বলতেই হয়, এই জিডি নিয়ে লিখতে গেলেও শত দিস্তা কাগজের প্রয়োজন হবে। নিশ্চয়ই আপনারও সবাই আমার সাথে একমত পোষণ করবেন।
এবার ফিরে আসি ত্বাহা আদনানে। যতটুকু জানলাম গাড়িতে করে চারজন ঢাকার পথে ছিলো। একসাথে চারজন এবং গাড়ি গায়েব। আমি গুম বললাম না কারণ গাড়িতো গুম হবার কথা নয় । গাড়ি বড়জোর খোয়া যাবে, তাই । ত্বাহার স্ত্রী থানায় থানায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক থানা আরেক থানাকে দেখিয়ে দিচ্ছে। সিসি টিভিতে পাওয়া যায় নি বলে করার কিছু নাই। পরীমনির তো একটি বড় পরিচয় ছিলো। ত্বাহার স্ত্রীর তো সেটা নাই। ত্বাহা কতটুকু পরিচিত ছিলো আমি সত্যি অর্থেই জানি না। তবে ত্বাহা আপাতত নিখোঁজ। তার স্ত্রী ছুটে বেড়াচ্ছেন থানা টু থানা।
প্রশ্নটি হলো এই দায়িত্ব কার ? ত্বাহার স্ত্রীর ? নাকি জনমানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ? ত্বাহা যদি রাষ্ট্র বিরোধী বা তার তথাকথিত ইসলামীক বয়ানের রাষ্ট্রের ক্ষতি করে থাকে, তা’হলে তাকে আইনের আঁওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিন, প্রয়োজনে ফাঁসি দিন, যদি আইন অ্যালাও করে ( যদিও আমি ফাঁসি বিরোধী মানুষ) । আইনকে সবার জন্য করুন। এই রাষ্ট্রকে মানবিক রাষ্ট্র করতে চাইলে, ত্বাহাদের গুম করে কিভাবে করবেন ? একবার তাঁর স্ত্রীর জায়গা থেকে বিষয়টি ভাবুন ? তাঁর স্ত্রীর বুকের ব্যাথাটি অনুধাবন করুন, রাষ্ট্রকে বলছি।
লেখার শেষে বলছি, গুম- খুনের অনেক দিবসে ছোট্ট শিশু, বৃদ্ধ পিতা- মাতা, আদুরের বোন, ভাই, আত্মীয়- সজনদের, এই শহরেই দেখেছি প্লাকার্ড হাতে অশ্রুসজল চোখে। ওই মানুষগুলোর বুকের ভাষাটি পড়ুন, তাদের হৃদয়ের শব্দ শুনুন । দেশের কর্তাদের বলছি একবার নিজেদেরকে তাদের স্থানে বসিয়ে দেখুন, দেখুন তো কি দেখতে পান ? কি শুনতে পান ? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার সমীপে বলছি, বুক খালি হওয়ার যাতনা আপনার চেয়ে কে বেশি বুঝবে ? দেশের প্রধান কর্তা হিসেবে আপনার ওপরেই সকল দায়িত্ব বর্তায় । মানবিক রাষ্ট আইনের অপপ্রয়োগে হয় না, সঠিক প্রয়োগের ভিতরেই মানবিক রাষ্ট্র নিহিত থাকে। প্রশ্নটি হলো, এত রক্তের স্বাধীন ভূমি মানবিক রাষ্ট্র হতে কত দূর ?

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

