সকাল ৮টা, অফিসের জন্য বের হচ্ছেন লতিফ সাহেব। স্যান্ডেলটা পরতে গিয়েই দেখেন বাম পায়ের স্যান্ডেলের একটা অংশ ছিঁড়ে গেছে। সোমা- বাবা, মনে আছে তো! আমার সেন্টের কথা? লতিফ সাহেব- হ্যাঁ মা, মনে আছে। সোমা- প্রতিদিনই তো মনে করিয়ে দেই! লতিফ সাহেব- আজ আনবো মা। সোমা- আচ্ছা। ভুলে যেও না। মেয়েটা পেছন থেকে কথাগুলো বলেই চলে গেলো। লতিফ সাহেব আবার স্যান্ডেলের দিকে মন দিলেন। কালকে তো মনে হয় ঠিকই ছিলো স্যান্ডেলটা। কিভাবে ছিঁড়ে গেলো? সোমার মা- তুমি কি আজকে বেতন পাবে? লতিফ সাহেব- দেখি। পেলেই তোমার মাসের বাজারটা সাথে নিয়েই ফিরবো। সোমার মা- বাজারের লিস্টটা আছে না? গত পরশুদিন দিয়েছিলাম। লতিফ সাহেব- হুম আছে (বুক পকেটে হাত দিয়ে) ভেবোনা। স্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন লতিফ সাহেব। আজ লাঞ্চের পর বসের কাছে বলে গত মাসের বেতনের টাকাটা নিতেই হবে।
অফিসের সব খরচ সময়মতো হলেও বেতনটা কেন জানি সময় মতো হতে চায়না। রাতে অফিস থেকে বের হয়ে ভাবছে লতিফ সাহেব কি করবেন! আকাশের অবস্থা ভালো না। বাসায় যাবে নাকি মার্কেটে! কদিন যাবতই বলছে সোমা, সেন্টের কথা। বেতন পাচ্ছিলেন না বলেই লতিফ সাহেব কিনতে পারছিলেন না। কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে অবশ্য সেটা বলেননি। বলেছেন মনে থাকেনা। কিন্তু সেটা কি সত্যিই সম্ভব? বাবারা কখনোই সন্তানের শখের কথা ভুলতে পারে? লতিফ সাহেবও এর ব্যাতিক্রম নয়। তিনিও ভুলেননি। তবুও মিথ্যা বলেছেন মেয়েকে। অথচ লতিফ সাহেব সবসময়ই সন্তানদের মিথ্যা কথা না বলতে শিখিয়েছেন। তাহলে নিজেই কেন বললেন? লতিফ সাহেব নিজেই এর পেছনের যুক্তি দাঁড় করান। আসলে বাবা হিসেবে কখনো সন্তানের কাছে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চাননি। এতে সন্তানেরা হীনমন্যতায় ভুগতে পারে। আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেস্টা করেন বৃষ্টি নামবে কিনা! নাহ, মার্কেটেই যাবেন। বাসার বাজার কাল সকালেও করা যেতে পারে। মেয়ের শখটা আগেই পূরণ করা উচিৎ। মার্কেট থেকে বের হয়ে লতিফ সাহেব বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই ঝুম বৃষ্টি নেমে গেলো। মফস্বলের সব ব্যাস্ততা শেষে রাস্তাগুলোও জন-মানবহীন হয়ে গেছে। এমনকি একটা রিক্সার দেখাও পাওয়া যাচ্ছেনা।
না পাওয়া যাক। কষ্ট নেই। মেয়ের সেন্টের শিশিটাতো কেনা হয়েছে, তাতেই খুশি। বাবারা ছেলে মেয়েদের শখ পূরণেই বেশি খুশি হন। লতিফ সাহেবও তাই খুশি মনেই একপাশের পকেটে রাখলেন সেন্টের শিশি যেটা একটু আগেই চারশো টাকা দিয়ে কিনেছেন। অন্য পাশের পকেটে মানিব্যাগে বেতনের বাকি বারো হাজার টাকা। হাতের ছাতাটা মেলে ধরে বৃষ্টির মাঝেই নেমে গেলেন রাস্তায়। সোমার সেন্টের বোতলটায় একটু পর পর হাতের ছোঁয়া লাগছে। মেয়েটা আজ খুব খুশি হবে। খুব একটা আবদার করেনা মেয়েটা। তাই কিছু আবদার করা জিনিসপত্র পেলে মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠে। এর আগে একবার এসএসসি পরিক্ষার সময় হাত ঘড়ি পেয়ে এতো খুশি হয়েছিলো। আজো মনে পড়ে সেই দৃশ্যটা। ভারী বর্ষনে বিদ্যুৎ চলে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তায় এগিয়ে যাচ্ছেন লতিফ সাহেব। হঠাৎই কয়েকটি ছায়ার মতো মানুষ পথ আগলে দাঁড়াতেই চমকে গেলেন লতিফ সাহেব। অন্ধকারে তাদের চেহারা দেখা যাচ্ছেনা।
তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, – ওই ব্যাটা! দাঁড়া বলছি। লতিফ সাহেব বুঝে নিলেন ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। পকেটে মাসের বেতন বারো হাজার টাকার কথা মনে হয়, এই টাকাটাই পরিবারের সারা মাসের খরচ তা মনে হতেই, খুব অসহায় লাগে নিজেকে। নির্জন অন্ধকার রাস্তায় কেউ তাকে বাঁচাতে পারবেনা। অনেক বৃষ্টি। পায়ের গোঁড়ালি অবধি পানি উঠে গেছে রাস্তায়। লতিফ সাহেবকে ওরা ধরে ফেলে। এদের কাছ থেকে বাঁচিয়ে নেওয়ার একটাই উপায়। দৌড়ে পালাতে হবে। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে আগাতে যায় লতিফ সাহেব, কিন্তু বাম পায়ের স্যান্ডেলটার ছেঁড়া অংশটা আরও ছিঁড়ে পা ফসকে আটকে যায়। লতিফ সাহেব ভয়ে নিজের অজান্তেই চিৎকার করতে চায়। তিনি চিৎকার দেয়ার আগেই কেউ একজন পেটে ধাঁরালো চাকুটা ঢুকিয়ে দেয়। প্রচন্ড ব্যথায় কুঁকিয়ে ওঠেন। আরেকজন এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় লতিফ সাহেবকে। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে কেউ। সোমার মা দরজা খুলে দেয়। ভেজা কাপড়ে ঘরে ঢুকে সজল। সজল- বাবা, আসেনি? সোমার মা- না, চলে আসবে এখুনি। তুই কাপড় বদলিয়ে খেয়ে নে৷ কেন যে এতো রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকিস! সজল কথা না বলে চলে যায় নিজের ঘরে। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে। আজ মানিব্যাগটায় অনেক টাকা। সোমা কদিন ধরেই বাবার কাছে সেন্টের জন্য বায়না ধরেছে। বাবা ভুলে যাচ্ছেন কেন, সেটাও সজল আন্দাজ করে। আজকেই সোমাকে টাকা দিয়ে দিবে, যাতে কাল সকালেই সেন্টের শিশিটা কিনে নেয়। কাপড় বদলিয়ে মানিব্যাগটা হাতে নেয় সজল টাকা বের করবে বলে।
এ কি! মানিব্যাগে বাবার ছবি কেন? সারা শরীর কেঁপে ওঠে সজলের। ভয়ে গায়ের লোমকূপগুলো খাড়া হয়ে যায়। মনে পড়ে, ১৫/২০ মিনিট আগে কি ঘটিয়েছে সে আর তার বন্ধুরা! দৌড়ে বের হয়ে যায় সজল। পেছন থেকে মা ডাকে, আবার কই যাচ্ছিস? তোর বাবা এসে ঘরে না পেলে রেগে যাবে কিন্তু!! অনেকটা হাঁপাতে হাঁপাতে সেই জায়গায় এসে দেখে, মাটিতে পড়ে আছে তার বাবার নিথর দেহ। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সজল। বিজলি চমকানো আলোয় দেখে, বৃষ্টির পানিতে তার বাবার রক্ত মিশে কালচে রঙ হয়ে যাচ্ছে। বাবার হাতে ধরে রাখা সেন্টের শিশি।

লেখক- ফায়জুল আরেফীন ।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন মালিহা সালসাবিল ।

