অ্যাডভোকেট আনসার খান :গণতন্ত্র এমন এক সরকার ব্যবস্হা যা রাষ্ট্রের অন্তর্গত প্রতিটি নাগরিকের আশা-আকাঙ্খা ধারণ করে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্হা মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা দিয়ে মানুষের উন্নত জীবন নিশ্চিত করে সকলের জন্য রচনা করে এক বলিষ্ঠ জীবনবোধ।সাম্য,মৈত্রী,সৌভ্রাতৃত্ব,সংযম,সহনশীলতা আর সমস্বার্থের সুষম বন্ধনে প্রতিটি মানুষকে সংগ্রথিত করে গড়ে তোলে নতুন এক সামাজিক ব্যবস্হা। তাই গণতন্ত্র শুধু শাসনব্যবস্থাই নয়,এটি তাৎপর্যপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যময় একটি সমাজব্যবস্থা হিসেবেও সূদুর প্রাচীনকাল থেকেই গণ্য হয়ে আসছে।গণতন্ত্র সম্পর্কে এমন ধারণাই পোষণ করেন গণতন্ত্রে বিশ্বাসীরা।তাদের যুক্তি হলো,গণতন্ত্র মানুষের আশা-আকাঙ্খার পরিপূরক হওয়ার কারণেই এটি সর্বকালের সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেছে।
আড়াই হাজার বছর পূর্বে গ্রীসের নগর রাষ্ট্রে গণতন্ত্র শাসনব্যবস্হা হিসেবে গৃহীত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি পৃথিবীর দেশে-দেশে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করে যাচ্ছে,-অন্যকোনো ব্যবস্হার জন্য এমনটি দেখা যায়নি।ইতিহাস এটি প্রমাণ করে রাষ্ট্রব্যবস্হা উদ্ভবের পর থেকে শাসনব্যবস্হা হিসেবে নানা ধরনের শাসন সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্হাই গ্রহণযোগ্যতাসহ স্হায়িত্ব পায়নি যতটা গণতন্ত্র পেয়েছে।হাজার হাজার বছরধরে টিকে থাকার কারণে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা থাকাস্বত্তেও এটি গণমানুষের নিজস্ব এক শাসন ও সরকারব্যবস্হায় পরিণত হয়েছে।একারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক সরকার হলো,জনগণের জন্য,জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জনগণের সরকার।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে গোটা বিশ্বের ১৬০-টিরও বেশি দেশে এখন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্হা বিদ্যমান আছে। অন্যান্য রাষ্ট্রের জনগণও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছে। কাজেই ভালোমন্দ মিলিয়ে গণতন্ত্রই যে সর্বজনগ্রাহ্য শাসনব্যবস্থা এবং একইসাথে সমাজব্যবস্থাও সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গণতন্ত্রে রয়েছে বহু মত,আর বহুপথ,-যেকারণে মানুষ তার পছন্দ বেছে নেবার সূযোগ পেয়ে থাকে। গণতন্ত্র তাই নন্দিত ও নিন্দিত। তবে নিন্দাসূচকের তুলনায় এর প্রশংসার দিকটাই বেশিমাত্রায় পরিদৃষ্ট হয়।গণতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশের পর থেকেই গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বহুমাত্রিক পুঁজির মালিক, কর্পোরেট বিরোধী আন্দোলন,শক্তিশালী রাষ্ট্র বা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো সকলেই এখন গণতন্ত্রের জন্য সোচ্চার।
ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী,ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিলেও সকলের জন্য কতকগুলো সাধারণ স্বার্থ আছে,-যেকারণে প্রায় সকলধরণের স্বার্থগত মানুষেররা গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। গণতন্ত্রের শাসন কাঠামোতে জনগণের প্রতিনিধিত্বের স্বীকৃতি ও সূযোগ থাকার কারণে শাসন পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ, জনগণের নিকট শাসকবর্গকে দায়িত্বশীল,সংবেদনশীল,দায়বদ্ধ ও জবাবদিহি থাকতে হয়।এব্যবস্হায় আইনের শাসন,ব্যক্তিস্বাধীনতা,মৌলিক মানবাধিকার এবং মিডিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতিসহ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ডি.বি.সিটার নামক ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেন,গণতন্ত্রের মৌল উপাদান হলো,সাম্য,পারস্পরিক শ্রব্ধা,গণসার্বভৌমত্ব,আইনের শাসন ও ব্যক্তির স্বাধীনতাসহ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতার সুবিধা।
এসব সূযোগ ও অধিকার আছে বলেই মূলত গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের সমর্থন ও আগ্রহ ছিলো এবং বিদ্যমান রয়েছে এবং এযাবৎকালে একটি আদর্শ শাসনব্যবস্থা হিসেবে আদৃত হচ্ছে।
কেউ কেউ গণতন্ত্রকে শুধু ভোটদানের অধিকারের মধ্যে সীমিত বলে মনে করেন।কিন্তু আদতে গণতন্ত্র ভোটদানের অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।তবে মানুষের পছন্দের সরকার নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের জন্য অবাধ,ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার অধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম।এই অধিকারের নিশ্চিত ব্যবস্হা না থাকলে বা এটি কোনোভাবে বারিত হলে গণতন্ত্রের অন্যান্য উপাদানগুলো মূলত অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে মনে করেন রাষ্ট্রদার্শনিকগণ।তাই কোনো অজুহাতেই মানুষের পছন্দের সরকার বা প্রতিনিধি বেছে নেবার পন্থা,- ‘স্বাধীন ভোটাধিকার ব্যবস্হা’ বারিত বা খর্ব করা যাবে না। গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ আলোচনায় দেখা যায়,গণতন্ত্র মানুষের জীবনবোধ ও জীবনযাত্রার অংশে পরিণত হয়েছে।এব্যবস্হার মূল বিষয় হলো,মানুষের অধিকার ও সূযোগের সাম্য নিশ্চিত করা। এটি এমন এক ব্যবস্হা যেখানে সবমানুষেরই সমান অধিকার থাকবে,সূযোগও থাকবে সমান,যা রাষ্ট্র নিশ্চিত করে। এখানে একজনের বিকাশ ব্যাহত করবে না অন্যজনের বিকাশকে।রাষ্ট্র ও সমাজে বৈচিত্র্য অবশ্যই থাকবে,কিন্তু বৈষম্য থাকবে না।এদিক থেকে গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক শাসন ও সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি সুস্থ বুদ্বিসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল ব্যবস্হাপনায় তার ইচ্ছে ও পছন্দসই পন্হায় আইনসঙ্গতভাবে মুক্ত মতপ্রকাশের সূযোগ পেয়ে থাকে। অন্যদিকে,রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রের নিকট থেকে সমানভাবে তার ন্যায্য অংশ লাভ করবে,কেউ কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।
প্রকৃতঅর্থে,গণতন্ত্র বিষয়টিকে সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে দেখার সূযোগ নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির এমন কোনো দিক নেই,যেখানে গণতন্ত্রের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায়। তাই গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্রের আবরণে দেখার অবকাশ নেই। কেননা,গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংকীর্ণ অর্থের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেলে সামাজিক জীবনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যাবে, এগুলোকে বোঝা যাবে না।মানুষ অন্যান্য এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে,গণতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত মৌল উপাদানগুলো হলো,-জনগণের সার্বভৌমত্ব,জনগণ তথা শাসিতের সম্মতির উপর সরকার গঠন ও সরকারের টিকে থাকার নীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন,-তবে সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করা,নারী-পুরুষ,শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করা,অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্হা,আইনের শাসন,আইনের চোখে সকলের সমতার নীতি,সরকারের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা,সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার ও সূযোগ ও বহুমতের অধিকার নিশ্চিত করা,সহিষ্ণুতা,বাস্তবমুখীনতা,সহযোগিতা ও সমঝোতার নীতি,রাষ্ট্রীয় আয়ের এবং সম্পদের সুষম বণ্টন,পছন্দসই বিকল্প নির্বাচনের অধিকার ইত্যাদি বহুত্ববাদী উপাদানসমূহ,যা অবশ্যই মেনে চলা কর্তব্য ও দায়িত্ব এবং এগুলো সত্যিকারভাবে প্রয়োগ করা হলে গণতন্ত্র কার্যকর ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।এতে করে গণতন্ত্রের মৌল লক্ষ্য পরিপূরিত হয়।যদি সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত করা যায় তবে মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
গণতন্ত্র একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া,যা দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অর্জন ও বির্নিমাণ করতে হয়।তাই গণতন্ত্র বাইরে থেকে এনে রোপন বা প্রতিস্হাপন করা যায় না। একে উপর থেকে আরোপও করা যায় না। গণতন্ত্র সমাজের ভেতর থেকে ওঠে আসে এবং সমাজের ভেতরেই প্রতিপালিত ও বিকশিত হয়ে থাকে। তাই যতোদিন পর্যন্ত একটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বৃহত্তর পরিসরে জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্হার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছে ও আগ্রহ জাগ্রত না হয়,ততোদিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিনির্মাণ অসম্ভব বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।কেননা,গণতন্ত্রায়ন হলো একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া,-যা জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জনগণের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়েই গণতন্ত্রের ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসা যায়। গণতন্ত্র প্রকৃত অর্থেই নির্ভর করে জনগণের সক্রিয় অংশ গ্রহণের ওপর।
এটি জোর দিয়েই বলা যায়,পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্হায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে,কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্হাধীনে শাসিত দেশগুলোতে জনগণ সক্রিয় হয়ে ওঠেছেন গণতন্ত্রের জন্য।
এটি বলা যায় যে,একুশ শতকে গণতন্ত্র নিছক শাসনব্যবস্হা বা সমাজব্যবস্হাই নয়,গণতন্ত্র এক জীবনবোধে পরিণত হয়েছে।এটি একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।তাই এর বিকাশ রুদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।

