কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে, দংশেনি যারে । আপনাদের ধ্বংস হয়নি এবং কামনাও করি না তবে বারবার এমন কর্ম করলে ধ্বংস হতে বেশি সময় নিবে না । ব্যক্তি সমালোচনা হয়ে যাবে, তারপরেও বলতেই হয়, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আবার গণ বাহিনীও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যেমন অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, আবার স্বাধীন দেশেও গণ বাহিনীর হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। কাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন দেশে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন ? অস্ত্র যোগাতে গিয়ে থানা- পুলিশ দখলে নেমেছিলেন। পরবর্তীতে সেই অস্ত্র দিয়ে কাদের হত্যা করেছিলেন ?
পুরানো ঢাকায় আমার জন্ম হলেও টাঙ্গাইল আমার গ্রামের বাড়ি। গণবাহিনীর একটা বিশাল অংশের রমরমা ভাব ছিলো সেই সময়ে টাঙ্গাইলে। সুতরাং গণবাহিনীর কর্মকা সমন্ধে বেশ ভালোই ওয়াকিবহাল আছি। সেই গণ বাহিনী থেকে এক সময়ে সাচ্চা আওয়ামী লীগার হয়ে উঠলেন । বেশ, তাতে আপত্তি নেই কারো । আওয়ামী লীগ থেকে মন্ত্রী, তাতেও কারো আপত্তি নেই । তবে মন্ত্রীর চেয়ারে বসেও সরকারের সিদ্ধান্তের বিপরীতে শ্রমিক ভাইদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন । লেলিয়ে বললাম, শ্রমিকের চেয়েও গুণ্ডা বাহিনীর প্রতাপ বেশি ছিলো বলেই লোকে বলে । এখন মন্ত্রীত্ব নেই, তো- নেই কাজ তো খই ভাজ ।
বলছিলাম সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের কথা । জামুকা ( জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল )-এ এই সাবেক মন্ত্রী বাহাদুর প্রস্তাবনা এনেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সাবেক সেক্টর কমান্ডার, সাবেক প্রেসিডেন্ট, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বীর উত্তম খেতাব বাতিলের জন্য।
বাহ্, বেশ বেশ, ঘটনা ছড়ালো পুরো দেশ
মন্ত্রী বাহাদুর করতে চান শেষ
বিএনপি নামক দলটির অবশেষ ।
এ কাজের ফলাফল, ভবিষ্যতে উল্টো রথে গড়াবে জল
খান সাহেবেরা আওয়ামীকে করে ছাড়বেই ফিকে ( অনুজ্জ্বল) ।
ছড়ায় ছড়ায় কথাগুলো বললাম। তবে বাস্তবতা হলো দেশের এত সমস্যা থাকতেও খান সাহেবদের মগজে এমন কর্ম কেন গিজগিজ করে ? নাকি এই সব খান সাহেবদের দ্বারা সরকার নিজেই হাডুডু খেলে ? বাজারে শোনা যায়, আল- জাজিরা এখন সরকারের ঘুম হারাম করে দিয়েছে । সুতরাং নতুন কিছু আনো, যা নিয়ে দেশের জনমানুষেরা ব্যতিব্যস্ত থাকে, আল- জাজিরার অ্যান্টিবায়োটিক যেন গ্রহণ না করে ।
এটাই যদি সরকারের কৌশলের পদ্ধতি হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হয়, শুধু ইট দিয়ে দেয়াল হয় না । সেখানে সিমেন্ট- বালি- জল লাগে । এমন কৌশল দিয়ে ইটের স্তুপ হবে তবে দেয়াল মোটেও নয় । আল- জাজিরার ক্লিপ থেকে সব কনটেক্সটকে যতদিন লাইন বাই লাইন ব্যাখ্যা না দিবেন, ততদিন জনমন বা জনমত বা জনমাথা থেকে আল- জাজিরার ভুত নামাতে পারবেন না । সুতরাং আল- জাজিরার বিপরীতে দেয়াল তৈরি করতে হলে, সিমেন্ট- বালু ( তথ্যের যুক্তি ) দিয়েই দেয়াল গড়তে হবে । শাহজাহান খানদের দিয়ে ফলাফল হবে শূণ্য ( লিখে রাখুন ) ।
কি আশ্চর্য! ডয়েচে ভেলের খালেদ মুহিদ্দিনের ( আশা করি নামটি সঠিক লিখেছি ) সঞ্চালনার একটি প্রোগ্রামে শাহজাহান খান বললেন, জিয়া রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেননি এবং চ্যালেঞ্জ করলেন । খালেদ মুহিদ্দিন শাহজাহান খানের উত্তরে ৭১ এ প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন সাহেবের একটি বেতার ভাসন ( ১১ এপ্রিল) থেকে উদ্বৃত্ত করে ৭১ এর বাংলাদেশ দলিল থেকে প্রমাণ দেখালেন যে জনাব তাজ উদ্দিন সাহেব সেই সময়ের মেজর জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের সাহসী ভূমিকাকে ইতিহাসের পাতায় ” স্ট্যালিনগ্রাডের পাশে স্থান পাবে” বলে উল্লেখ করেছেন। এমন প্রমাণ হাজির করার পরেও শাহজাহান খানরা বড় গলায় কথা বলতেই থাকেন ।
জনাব শাহজাহান খানকে প্রশ্ন করা যাবে কি , বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়া সহ অনেকেই যখন বলেন বঙ্গবন্ধু রনাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না । তখন আপনাদের কেমন লাগে ? যদিও এমন প্রশ্ন তুলা কেবলমাত্র অপরিপক্কতার প্রমাণ নয়, সাথে বলা যায় এগুলো রাজনৈতিক স্ট্যান্ড এবং স্রেফ বাতুলতা ছাড়া ভিন্ন কিছুই নয়।
জনাব শাহজাহান খান, প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন সাহেব কি রনাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন ? এমন প্রশ্নও কি আপনারা আপনাদের নিজেদের সুবিধে মতন কখনো তুলবেন ? জিয়া সেক্টর কমান্ডার ছিলেন স্বীকার করলেন, ভালো কথা । একটু জানাবেন কি, সেক্টর কমান্ডারের কাজ কি ? বন্দুক হাতে মাঠে যুদ্ধ করা ? নাকি যুদ্বের প্ল্যান বা কৌশল নির্ধারণ করা ? যদিও ইতিহাস বলে জিয়া সরাসরি যুদ্ধের মাঠে ছিলেন । জনাব শাহজাহান খান আসলে আপনাদের মূল উদ্দেশ্য কি ?
জনাব শাহজাহান খান, আপনি কি বলতে চান বঙ্গবন্ধু না বুঝে এবং না জেনে জিয়াকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেছিলো ? একবার ভেবে দেখবেন আপনারা বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে প্রদান করা খেতাব ফিরিয়ে নিতে চেয়ে, উল্টো বঙ্গবন্ধুকেই অপমান করছেন কিনা ? আপনি গণ বাহিনীর রক্তাক্ত হাত নিয়ে এখন বড় আওয়ামী লীগার হতে পারেন , তবে বঙ্গবন্ধুকে অপমান করার অধিকার কোথা থেকে পেলেন ? আমিতো মনে করি সাচ্চা আওয়ামীদের এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত ।
ভারতে অনেকের লেখা বইগুলোতে ৭১ এর বাংলাদেশ- পাকিস্তান যুদ্ধকে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ বলে লেখে এমন কি ভারতের অনেক দলিলপত্রেও এমন লেখা আছে । ভারতে অনেকেই বক্তৃতা- বিবৃতিতে বলে ৭১ এ ভারত পাকিস্তানকে হারিয়েছিলো । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধতে ভারত সহযোগিতা করেছিলো এটা যেমন শতভাগ সত্য, ঠিক উল্টোভাবে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ বলাটাও শতভাগ অসত্য এবং এটা ভারতের একটি গর্হিত কাজ বলেই মনে করি। লক্ষণীয় যে, আমাদের নিজেদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, রাজনৈতিক কারণে আমরা নিজেরাই যেভাবে একদল আরেকদলের মুক্তিযোদ্ধাদের বিতাড়িত করার লড়াইয়ে নেমেছি, তাতে করে ভবিষ্যতে ভারত তো আপনাদের বচন আর কর্মের দিকে আঙুল উঁচিয়ে জোর গলায় বলবে, সেটা আসলেই ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধ ছিলো । সেই সুযোগটি কিন্তু আপনারা রাজনীতিকরাই তৈরি করে দিচ্ছেন। সামান্য রাজনৈতিক ফয়দা লুটতে গিয়ে, খাল কেটে কুমির আনছেন না তো ? দ্বিতীয়বার ভেবে দেকবেন ।
সবশেষে বলবো, আপনারা রাজনীতিকরাই জনমানুষের সাথে একাট্টা হয়ে এই দেশটি স্বাধীন করেছিলেন। আপনারাই এই দেশের পরিচালনায় ছিলেন- আছেন- থাকবেন , সেটাই আমরা জনগণ চাই । এই দেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তার পিছনে মেহনতি মানুষের সাথে আপনারা রাজনীতিকরাই ছিলেন। আবার যতটুকু হয়নি ( যা আরো হতে পারতো ) সেটার দোষটিও আপনাদের মতন রাজনীতিকদের ঘাড়েই শতভাগ বর্তায় । সুতরাং এই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের পঞ্চাশ বছরে এসে আপনারা রাজনীতিকরা আরো একটু গভীরমন ও হৃদয় দিয়ে ভাবুন। দেশকে ভালোবেসে। আপনাদের শুভবুদ্ধির উদয় হলে এই বাংলাদেশের কল্যাণ নিশ্চিত অনেক বেশি হবে । বিষয়টি ভাবুন, আবার ভাবুন এবং বারবার ভাবুন ।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম

