ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা, ঘৃণা তব

একটি বাস্তব গল্প দিয়েই বলি,

 

বহুদিন পূর্বে অষ্ট্রিয়ায় একবার একজন শিক্ষিত শ্রীলঙ্কান ভদ্রলোকের সাথে আমার কথা হয়েছিলো। তিনি হাসিঠাট্টা এবং নানান কথা ছলে আমাকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন, আচ্ছা বলুনতো ভারতের জনমানুষেরা শ্রীলঙ্কানদের চেয়েও বেশি চাউল ( ভাত) খায় কেনো ? উত্তরটা আমি বলতে পারিনি । তবে ভদ্রলোক সহজ ভাষায় বললেন, সহজ হিসেব, ভারতে জনসংখ্যা বেশি, তাই বেশি খায় ।

 

লিখতে বসেছি আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে ইউরোপবাসীদের মতামত, ভাষ্য বা প্রতিক্রিয়া লিখতে। আমেরিকায় নির্বাচন মানেই বিশ্বের সকল দেশের নজর সেখানেই । যদিও অষ্ট্রিয়ায় গত সোমবার একটি  অনাকাঙ্খিত সন্ত্রাসী হামলার কারণে আমেরিকার নির্বাচন পর্যালোচনা  কিছুটা হলেও ব্যাঘাত ঘটেছে। আমেরিকার নির্বাচন বিশ্ব পরিমণ্ডলের জন্য একটি বিশেষত্ব বহন করে, আবার উল্টোদিকে ভাবলে কিছুই না ( ব্যক্তিগত মত) । কেনো কিছুই না ? লক্ষ্য করুন ট্রাম্পের মতন লোকও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয় এবং শাসন করে । সুতরাং বলাই যায়, এত শক্তিশালী একজন প্রেসিডেনট সত্যিই একটি পুতুল মাত্র।  কে ওই চেয়ারে বসলো আর না বসলো তাতে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না বলেই প্রতীয়মান হয় ।

 

যদিও ইউরোপের পত্রিকাগুলো করোনার পাশাপাশি  বর্তমানে ফ্রান্স পত্রিকার শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এদিকে আবার ইউরোপের অষ্ট্রিয়ার রাজধানী শহর ভিয়েনায় সন্ত্রাসী হামলা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ইউরোপ জুড়ে । ভিয়েনা শহরটি সমগ্র বিশ্বের প্রথম শ্রেষ্ঠ শহর বলে গত চার/ পাঁচবছর যাবৎ প্রথম জায়গা দখল করে আছে। কারণটিও বেশ পরিষ্কার।  ভিয়েনা শহরে জনজীবন শতভাগ নিরাপদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা চমৎকার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আকাশছোঁয়া, সমগ্র বিশ্বের জনমানুষের বসবাস এবং দেখার মতন শহর, ভিয়েনা শহর। সত্যি বিশ্বের একটি ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণীয় শহর । সেই শহরে গত সোমবার অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলায় সমগ্র ইউরোপবাসী বেশ মর্মাহত ও বিস্মিত হয়েছে। শতভাগ গণতান্ত্রিক ও নিরাপত্তার শহরকেউ আজ কট্টরবাদীতাদের কল্যাণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হলো ।

 

যাকগে, লেখার বিষয়বস্তু ভেবেছি আমেরিকার নির্বাচন অথচ চোখ এসে ঠেকেছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায়, কেনো ? সেটাই বলছি প্রথম। ভারতে বিখ্যাত বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজারে গতকাল ( ০৩/১১/২০) একটি শিরোনাম এসেছে, ” উইপোকা- বাংলাদেশ অর্থনীতিতে টপকাচ্ছে ভারতকে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্ষণস্থায়ী । প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির তুলনামূলক আলোচনা ।

 

দুই দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা আনন্দবাজার পত্রিকা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কি আলোচনা করছে ? বিশেষত সাম্প্রতিককালে এই দুই দেশের প্রবৃদ্ধি বিষয়ে আইএমএফ এর করা ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে। আইএমএফ এর করা ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে শত প্রশ তুলা যায়। ভারতের পছন্দ না হলে আইএমএফকে ধুয়ে মুছে একাকার করতেই পারে । এমনকি আইএমএফ থেকে ভারতের নেওয়া সকল ঋণ ফেরত নাও দিতে পারে, মোট কথা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছে না ।

 

সমস্যাটি হলো এই প্রতিবেদনের কিছু উল্লিখিত বাক্য ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রামাণীত সত্য হলো, কচু পাতায় জল ধরে না । চুড়ান্ত সত্য হলো, ভারতের সহযোগিতা নিয়েই এই দেশের কোটি জনতা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনেছে। আমরা ভারতে কাছে অবশ্যই কৃতজ্ঞ এবং ভারতের সেই সহযোগিতাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করি । তবে ভারতের কোনো পত্রিকা যখন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে , ” সেই বাংলাদেশ, যাকে ১৯৭১ সালে পাক- শাসনমুক্ত করে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছিলো ভারত ” এই ভাষায় পরিচয় করাবে, তখন ভারতের সেই পত্রিকার চরিত্র ও আচরণে শুধু বিস্মিতই হই না,  হৃদয় থেকে শতবার ঘৃণা প্রকাশ করি ।

 

লক্ষ্য করুন, আমাদের রক্তের বিনিময়ের ” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের পত্রিকা আনন্দবাজার এভাবে বিবেচনা করে । কে লিখেছেন এই প্রতিবেদনটি, সমর বিশ্বাস নামের কোনো এক সাংবাদিক বা কেও।  প্রশ্ন হলো, আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক সাহেব কি এই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমন্ধে কিছুই অবগত নন । তা না হলে এই পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের কি কানে তুলো আর চোখে ঠুলি দেওয়া রয়েছে ?

 

ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ । আমাদের প্রধান প্রতিবেশী।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে  অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করা দেশ। সব কিছু ঠিক আছে এবং আমাদের সম্মান, কৃতজ্ঞা সব ঠিক আছে । মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা একেবারেই ভারতের বিনাস্বার্থে ছিলো এমনটাও তো শতভাগ সত্য নয়, সেটাও ঠিক আছে। তবে ভারতের একটি পত্রিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন অবহেলা আর অপমানিত করে যখন এভাবে প্রকাশ করে, তখন ভাবতেই লজ্জা হয়, ভারত বন্ধুপ্রতিম আমাদের  দেশ ।

 

পত্রিকাটি আবার তাদের ঘৃণিত সেই প্রতিবেদনে উইপোকা লিখে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে কে, কখন বাংলাদেশীদের উইপোকা বলেছিলো । সকলের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, আসামে এনআরসি প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্ বাংলাদেশীদের উইপোকার সাথে তুলনা করেছিলো। অমিত শাহ্ এর বচনটি ছিলো আরো ঘৃণিত ও অন্ধত্বের  বচন । অমিত শাহ্ বলেছিলো, ” উইপোকার মতো বাংলাদেশীরা ভারতে অনুপ্রবেশ করছে এবং ভারতের অর্থনীতির ক্ষতি করছে ” ।

 

লক্ষ্য করুন, সেই সময়ে অমিত শাহ্ এর বচনকে আনন্দবাজার পত্রিকা দুই হাতে তূলে এনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে, পত্রিকায় প্রতিবেদন করে মূলত গোটা বাংলাদেশকেই বোঝানোর প্রয়াস নিয়েছে ।আনন্দবাজার পত্রিকার ভাবখানা এমন যে, যেহেতু অমিত সাহেব বলেছে, এটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়, পত্রিকা শুধু তুলে ধরেছে সুতরাং তাদের দায়িত্বের মধ্যে এটা পরে না ।

 

আনন্দবাজার পত্রিকায় আইএমএফ এর তথ্য দিয়ে ভারতের অর্থনীতি একটি হাতি সম এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি উইপোকা সম বুঝাতে গিয়ে হাতি আর উইপোকা তাদের নিজেদের জায়গাতেই থাকবে বলে বোঝাতে চেয়েছে, ভালো কথা । তবে আনন্দবাজার পত্রিকা অমিত সাহেবের বন্দুকটি নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে গুলি ছুঁড়েছে একটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের প্রতি, যেখানে লাখো মানুষের রক্ত জড়িয়ে আছে । এখানে প্রসঙ্গত সেই শ্রীলঙ্কান ভদ্রলোকের বলা গল্পটিই স্মরণ হলো ।

 

আনন্দবাজার পত্রিকাকে স্মরণ করানোর জন্য বলছি, গত মাস তিনেক আগেও স্বয়ং পাকিস্তান ন্যাশনাল টিভিতেও বাংলাদেশের দিনকে দিন উঠতি অর্থনীতি আর প্রবৃদ্ধি নিয়ে সেই দেশের সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা তাদের সরকারের কাছে প্রার্থনা করেছিলো, অন্তত বাংলাদেশের মতন আমাদেরকে ( পাকিস্তান) অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ কর। তাহলেই দেশবাসী ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবে। সুতরাং আইএমএফ কি বললো না বললো, সেটা নিয়ে বিবেচনায় যাচ্ছি না তবে আনন্দবাজার পত্রিকা প্রতিবেদনের ভাষা আর অবহেলাকে ধিক্কার জানাই।

 

এবার নিজেদের কিছু দূর্বলতা বলেই লেখা শেষ করবো। আনন্দবাজার পত্রিকা ভারতের খ্যাতিমান বিখ্যাত বাংলা পত্রিকা।  আমাদের সমস্যা হলো আমরা আনন্দবাজার পত্রিকাকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেই । এমনকি যে ভাষার জন্য আমরা রক্ত দান করেছি, সেই বাংলা ভাষাকে আনন্দবাজার পত্রিকা যেভাবে লেখে, সেটাকেই আমরা মহাশুদ্ধ ভাবি এবং সেইভাবে লিখে আবার গর্ববোধও করি । অনেক বিখ্যাতজনদের  লেখায় দেখেছি গর্ব করে লিখতে, আমি বানানে এবং ব্যকরণে আনন্দবাজার পত্রিকাকে অনুসরণ করি । উনাদের ভাবখানা এমন যে বাংলাদেশের জাতীয় পত্রিকাগুলো এখনও কাঁচা। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রচার সংখ্যা বেশি, এটাও সহজ হিসেব, সেই শ্রীলঙ্কান ভদ্রলোকে ভাতের গল্পের মতন। তার মানেই এই নয় যে, আনন্দবাজার পত্রিকাই সর্বেসর্বা । আবারো ধিক্কার জানাই বাংলা ভাষাভাষী আনন্দবাজার পত্রিকার এমন প্রতিবেদনকে ।

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.