কিসের সমাধান চান ? সেটা সবাই জানে এবং বুঝে । কিভাবে সমাধান আসবে ? সেখানেই বুঝের অভাব। ক্যানো অভাব ? সহজভাবে বললে বলা যায় রাজনৈতিক সচেতনতা কম । এই বলাতেই অনেকের চোখ চড়কগাছে উঠবে । সবার বলা বা উত্তর হবে নিশ্চয়ই, রাজনীতি কি কেউ কম বুঝে ? দেশে রাজনীতির নামে কি হচ্ছে , না হচ্ছে ? জনগণ সব কিছুই বুঝে, সুতরাং বলাই যায় জনগণ সচেতন । সেখানেই মূল সমস্যা।
বিশ্ব চলেই রাজনীতিতে এবং এমনটাই সঠিক পথ । আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিলো রাজনীতির কারণেই । পূর্ব- পশ্চিমে ছিলো অসমতার রাজনীতি। সেই অসমতাকে সমতায় আনতেই যুদ্ধের ডামাডোলে যেতে হয়েছিলো । অতঃপর লক্ষ প্রাণের বলিদান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ।
তাহলে কি বর্তমানে দেশে যুদ্ধ করতে হবে ? উত্তরটি হচ্ছে না । ৭১ এ ছিলো জাতিগোষ্ঠীর ভেদাভেদের রাজনীতি এবং দুই মুল্লুকের । ভৌগলিকতার একটি বড় প্রশ্নও ছিলো । বর্তমানে এক গোষ্ঠী এবং এক মুল্লুক। রাজনীতি চালাচ্ছেন আমার/আপনার আপনজন । তাই এখানে সমাধানের পথটিও ভিন্ন হতে হবে ।
তাহলে সমাধানের পথটি কি ? তার আগে দেখা প্রয়োজন রাজনীতিটি কি ? বর্তমানের রাজনীতিটি শতভাগ ক্ষমতার রাজনীতির চর্চা হচ্ছে । রাজনীতিতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাতে পেতে হবে, সেটা সঠিক । কেননা ক্ষমতায়ন না হতে পারলে রাজনীতির দর্শনের ফর্মূলার প্রয়োগ করা যায় না । লক্ষ্য করুন, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের দর্শনে চমৎকার এবং ভালো ভালো কথা বলা আছে। জনমানুষের কল্যাণের পদ্ধতিতে সব ভালো ভালো প্রক্রিয়া ও পথ বাতলানো আছে । সেটা বাদ দিয়েও আরো সহজভাবে বোঝার পদ্ধতি হলো নির্বাচনী ইশতেহার ।
সমস্যা হচ্ছে প্রয়োগের ক্ষেত্রটি যখন হাতের মুঠোয় আসে, সেখানেই আপন রাজনৈতিক দর্শনের বলাৎকার বা ধর্ষণ হচ্ছে । স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, রাজনীতিতেই রাজনীতর ধর্ষণ বা বলাৎকার হয় । কেউ স্বীকার করুক আর নাই বা করুক, সেটা আমাদের দেশে বেশ ভালোভাবেই চলছে।
এটা বিশ্বব্যাপী বহু দেশে এমনটা হয় এবং হচ্ছে । আবার বহু শক্তিশালী দেশে সেটা হতেও পারছে না । কেন পারছে না ? সেখানেই সচেতনতার প্রশ্ন আসে। আরো স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, শতভাগ সচেতনতার প্রশ্ন। তাহলে প্রশ্ন চলে আসবে, একটি দেশের শতভাগ মানুষকে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে কি ? তা না হলে তো শতভাগ রাজনৈতিক সচেতনতা আসবে না । উত্তরটি হলো না ।
ক্যানো না । রাষ্ট্রের শতভাগ মানুষকে রাজনীতি করতে হয় না । তবে রাজনীতিতে কি ধর্ষণ বা বলাৎকার হচ্ছে ? সেটা অবশ্যই সচেতনভাবে প্রতিহত করতে হয় । সেই সুযোগটি প্রতিটি রাষ্ট্রের জনমানুষের হাতেই থাকে । হোক সেটা একটি রাজনৈতিক সরকার বা একটি স্বৈরাচারী সরকার । সেখানেই অধিকার আদায় ও বুঝে নেবার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে । কিভাবে ?
আগে বুঝতে হবে সরকার কি ? বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাবো না । কেননা রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় সরকার কি, সেই ব্যাখ্যার আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বর্ণনা করা আর নিজের গালে থাপ্পড় মারা সমান । তবে সহজভাবে বলা যায়, সব প্রশাসন মিলেই সরকার। এবার ভাবুন তো সেই প্রশাসনের দায়িত্বে কে বা কারা ? আমি/ আপনি হয়তো বলবো সরকার দায়িত্বে । না, সেই সব প্রশাসনের দায়িত্বে আমি/ আপনি এবং এই আমি / আপনিই মূলত সরকার। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ালো ?
খুব সহজ । আমি/ আপনি আপন বা ক্ষীণ স্বার্থে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থেকে পাশ কাঁটিয়ে, সরকারে ক্ষমতায়নে থাকা ( যে কোনো সময়ের, বর্তমানে যেন অতি বেশি ) রাজনৈতিক দলকে রাজনীতির ধর্ষণ বা বলাৎকারের সহযোগিতা করছি । কিভাবে করছি ? সেটাও বেশ স্পষ্ট। সরকারের সকল অপকর্ম আমি/ আপনিই করে দিচ্ছি। ওই যে বললাম, দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে পাশ কাঁটিয়ে, নিজে আপাতত ভালো থাকতে, নিজের ক্ষুদ্র গন্ডিকে ভালো রাখতেই করছি । তাহলে প্রশ্ন চলে আসে, ক্যানো বেশিরভাগই এমনটা করছে ? সেখানেই উত্তরটি নিহিত আছে এবং সেটাই রাজনৈতিক সচেতনতা। আরো সহজভাবে বললে বলা যায়, আপন স্বার্থপরতার চেয়েও বড় বিষয় হলো আমি/ আপনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন নই ।
উপরে লিখেছি এর সমাধানের জন্য যুদ্ধ করা লাগবে না । তাহলে কিভাবে সম্ভব ? উদহারণটি দেবার আগে একটি কথা বলা প্রয়োজন, সেটা হলো, ভূমিষ্ঠ হবার পূর্বেই মায়ের পেটে থাকা কালীনই একটি শিশু রাজনীতির গ্যাড়াকলে থাকে এবং জন্ম হবার সাথে সাথেই রাজনীতির মাঠে চলে আসে । কেননা সকল কিছুই চলে রাজনীতি দিয়ে। রাজনীতির বাহিরে কেউ না । সুতরাং রাজনীতির সাথে স্ব-শরীরে জড়িয়ে না থাকলেও, শিশুকাল থেকেই রাজনীতি সচেতন থাকতে হবে । হতে হবে সেটা পরিবার, স্কূল, কলেজ সহ সর্বত্রই। আবার বলছি সর্বত্রই রাজনীতি দিয়ে চলে । কেবলমাত্র রাজনীতি সচেতন হলেই অপরাজনীতিকে প্রতিহত করা যায়, নতুবা নয় । আমাদের দূর্বলতা হলো আমরা ভাবি আমরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। সত্যি বলতে আমরা রাজনীতির কল্যাণে অপকর্মটি যখন নিজের পাতে চলে আসে, কেবলমাত্র সেটাই বুঝি, সচেতন নই ।
একটি উদাহরণ দেই, বঙ্গবন্ধু স্কুলের কতগুলো ছাত্রকে নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাস্তা আঁটকিয়ে স্কুলের জন্য দাবী দাওয়া পেশ করেছিলেন, স্কুলের ছাত্র থাকা কালিন ( বঙ্গবন্ধুর আত্মকাহিনী বই থেকে নেওয়া)। লক্ষ্য করুন, যে সকল ছাত্ররা সেদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে একত্রিত হয়ে সোহরাওয়ার্দীর পথ রুখে দিয়েছিলেন, তারা সবাই কি স্ব-শরীরে রাজনীতিতে ছিলেন পরবর্তীতে ? উত্তরটি হলো না । তবে তারা সবাই যেভাবেই বা যার দ্বারাই হোক রাজনীতি সচেতন ছিলেন । সে কারণেই সে কাজটি করতে পেরেছিলেন।
আরো একটি সাম্প্রতিককালের উদাহরণ দেই । গত বছর স্কুলের ছাত্ররা সড়ক আন্দোলন করলেন। যা একটি রাজনীতি সচেতনতার বলিষ্ঠ উদহারণ । সেই আন্দোলনে জনমানুষেরা সত্যিই সমাধান দেখতে পেলেন । সবার মুখেই প্রশংসা ছিলো , হ্যাঁ সঠিক । তাহলে এবার ভাবুন তো, সমাধান কাদের হাতে ?
উপরের দুটি উদাহরণ আমাদের পরিচালনায় নিযুক্ত রাজনীতিকরা বরাবরই সামনে নিয়ে আসেন। আবার সেই তবে/ কিন্তু/ যদি/ হয়তো/ নতুবা/ এবং ইত্যাদি দিয়ে জনমানুষের মগজে ঘোল লাগিয়ে দেন । আমরা জনমানুষেরা সেই ঘোলেই থাকি এবং আপন ক্ষুদ্র স্বার্থকেই বড় করে দেখি এবং রাজনীতির অপকর্মকে সমর্থন করে নিজেদের বিলিয়ে দেই । যা বর্তমানের রাজনীতিকদের মনের চাওয়া এবং আমরাই পূর্ণ করে দেই । এবার ভাবুন তো আমি/ আপনি সত্যিই কি রাজনৈতিক সচেতন ?

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

