নাগরিক সমাজ ও গণতন্ত্র

অ্যাডভোকেট আনসার খান :গণতন্ত্রের বিকাশ,বিনির্মাণ এবং শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের উপস্হিতি ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাষ্ট্র,রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষকগণ।

নাগরিক সমাজ হলো, কতকগুলো স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবী সংঘ বা প্রতিষ্ঠান,যা রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য কাজ করে।এদিক থেকে এনজিও,স্বাধীন-নিরপেক্ষ গণমাধ্যমসমূহ,চিন্তক সংগঠন বা থিন্কট্যান্ক গ্রুপ,স্বাধীন-স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ,বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় গ্রুপগুলো নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে,নাগরিক সমাজ বুদ্ধিভিত্তিক ও রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ স্বাধীন বেসরকারি গ্রুপ,সংগঠন বা সংস্হা,য়ারা স্বউদ্যোগে রাষ্ট্র,সমাজ ও জনগণের কল্যাণার্থে কাজ করে থাকে।

নাগরিক সমাজ সরকার,সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো থেকে পৃথক তৃতীয় একটি ধারা হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজে ভূমিকা পালন করে।নাগরিক সমাজ সরকার ও রাষ্ট্রের কার্যক্রম গ্রহণে, সরকারী নীতিনির্ধারণে এবং সরকারী সিদ্বান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বেশ প্রভাবিত করতে সক্ষম বিধায় নাগরিক সমাজকে এতো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

রাষ্ট্র দার্শনিক ডি.টোকভিলের মতে,নাগরিক সমাজ প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক শাসনের বিকেন্দ্রীকরণে খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা পালন করে।রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা নাগরিক সমাজের প্রথম ও সর্বাধিক প্রাথমিক ভূমিকা বলে মনে করা হয়।

আমেরিকান সাংবাদিক ফরিদ জাকারিয়া লিখেছেন,”অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত হতে পারে,এবং তবুও তারা নিয়মিতভাবে তাদের জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। সবচেয়ে খারাপ,নব উত্থিত শাসক শক্তিগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে এবং উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক স্হিতিশীলতার নামে নির্বাহী ক্ষমতা বাড়াতে আইনসভা,বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা অসীম করে তোলে।”-এক্ষেত্রে,নাগরিক সমাজের কাজ হলো সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবারিত ক্ষমতার সীমা নিয়ন্ত্রণ করতে জনগণকে সচেতন করে তোলা,সরকারের স্বৈরতান্ত্রিকতার মনোবৃত্তি রুখে দেওয়া।

তবে,সর্বকালে বা সকল রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্হায় যে নাগরিক সমাজ সমান ভূমিকা রেখেছে বা রাখতে পারছে তাও নয়।দেশ,দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্হা এবং সময়ভেদে নাগরিক সমাজের ভূমিকার ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যায়।

কোনো রাষ্ট্র বা সমাজে কতটুকু বা কী ধরণের ভূমিকা পালন করতে পারবে সেটি কিন্তু নির্ভর করে সেই সমাজের অবস্হা, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি এবং নাগরিক সমাজের কাজ করার সক্ষমতার ওপর।অর্থ্যা, নাগরিক সমাজ কতটুকু শক্তিশালী ও গতিশীল তার ওপর নির্ভর করে নাগরিক সমাজ আদতে কতটুকু স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখতে বা কাজ করতে পারবে।

একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজের উপস্হিতি জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও রাষ্ট্রের অন্তর্গত জনগণের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নাগরিক সমাজ জনগণের ভবিষ্যৎ জীবনের সূখময় কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে, যার সাধারণ উদ্দেশ্য হলো,সকলের জন্য সমান ন্যায় বিচার, সমান অর্থনৈতিক সমতার নীতি ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

 রাষ্ট্র, রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষক এবং গবেষকদের অভিমত হলো,জনগণের ক্ষমতায়ন,ন্যায় বিচারভিত্তিক সমতাপূর্ণ এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উদারনৈতিক গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজেই কেবল জনগণের সম্মান,মানমর্যাদা,সকলের জন্য সমতার নীতি ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়ে থাকে।কারণ,উদারনৈতিক গণতন্ত্রে জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র শাসনে,রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে এবং সিদ্বান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে বলে এসব কার্যক্রমে জনআকাংখার প্রতিফলন ঘটে থাকে।

ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে,উদারনৈতিক গণতন্ত্র কোনোও রাষ্ট্র বা সমাজে আপনাআপনি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।বরং,জনগণের নানা অংশের সক্রিয় প্রচেষ্টা এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়েই উদারনৈতিক গণতন্ত্র বিকশিত ও শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর,এক্ষেত্রে,দেশে-দেশে সর্বসময়ে,সর্বকালে নাগরিক সমাজের অগ্রণী ভূমিকা প্রতীয়মান হয়েছে।

নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো নানাবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণার্থে সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে বলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে উদারনৈতিক গণতন্ত্র বিকশিত ও সংরক্ষিত হতে দেখা যায়।এভাবে নাগরিক সমাজ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা,অধিকারসমূহের হালনাগাদকরণ এবং তার সুরক্ষার জন্য নিয়ত কাজ করে থাকে।

নাগরিক সমাজ সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্হায় প্রাণস্পন্দন সৃষ্টি করে তার কাজের মাধ্যমে।রাষ্ট্র ও সমাজে জনকল্যাণধর্মী সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাধ্য করতে,জনগণকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করে নাগরিক সমাজ সংশ্লিষ্ট সংস্হাগুলো।

জনগণের মঙ্গলের জন্য এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের জন্য রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছ, জবাবদিহি, উত্তরদায়ক এবং দায়িত্বশীল হতে হয় এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্র হলো এধরনের শাসন ব্যবস্হা।তাই একটি উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাধ্য করতে নানামুখী ভূমিকা পালন করে নাগরিক সমাজ। বিশেষকরে,জনগণকে সচেতন,মোবিলাইজ ও সংঘবদ্ধ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করে থাকে নাগরিক সমাজ।

রাজনৈতিক ব্যবস্হায় সংস্কার এবং জনগণের কল্যাণধর্মী,পছন্দসই এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্হা প্রবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত যেকোনো কার্যক্রমে নাগরিক সমাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।অর্থ্যা নাগরিক সমাজকে বলা যেতে পারে মূখ্য খেলোয়াড়।কারণ দেশে-দেশে গণতন্ত্রের বিনির্মাণের ও শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

আইনের সুরক্ষা,শাসনে-প্রশাসনে জনঅংশগ্রহণের বিষয়টির নিশ্চিতের সুরক্ষা,কল্যাণকামী এবং জনআকাংখাভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্হার সুরক্ষা,দূর্নীতিমুক্ত ও বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে ন্যায় বিচার নিশ্চিতের সুরক্ষা এবং একই সাথে রাষ্ট্রীয়,প্রশাসনে ও বিচার বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধির কর্মকান্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়মিত মনিটরিং করা,সরকারী সব নীতি ও সিদ্বান্তগুলো সম্পর্কে জনগণকে অবহিত রাখা এবং জনস্বার্থ বিরোধী যেকোনো সিদ্বান্তের প্রতি প্রতিবাদ করা এবং এজন্য জনগণকে মোবিলাইজ করে জনস্বার্থ বিরোধী সকল সিদ্বান্ত বাতিল ও প্রত্যাহারকরণে সরকারকে বাধ্য করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডে নাগরিক সমাজ ওয়াচডগের ন্যায় দায়িত্ব পালন করে থাকে।

এভাবে নাগরিক সমাজ জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার অসীমতাকে নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা ইত্যাদি কার্য করতে গিয়ে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে,”চেক এন্ড ব্যালান্স” নীতি প্রবর্তন ও রক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তির শারীরিক ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা,আইনের শাসনের সুরক্ষা, দূর্নীতি নির্মূলের জন্য কাজ করা এবং ব্যক্তির সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনযাত্রায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা বিধানের সুরক্ষা বজায় রাখার নিমিত্ত নানা ধরণের কর্মকান্ড দ্বারা নাগরিক সমাজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্হার উন্নয়ন ও বিকাশে এবং অন্যদিকে, একনায়কতান্ত্রিক,স্বৈরতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক শাসনের উদ্ভবের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।

রাষ্ট্রীয় সিদ্বান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণের নিশ্চিত পদ্বতি প্রবর্তন ও সুরক্ষার জন্য জনগণকে সচেতন করে তোলা,এজন্য সঠিক ও অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাধ্য করা,শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ নিরাপদ ও বাধামুক্ত করা এবং এজন্য কার্যকর, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্বতি প্রবর্তন করা এবং জনগণকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্হাকে শক্তিশালীকরণে এবং রাষ্ট্র,সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক স্হাপনে অবদান রাখতে কাজ করে থাকে নাগরিক সমাজ।

কার্যকর ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেকোনো ধরণের স্বৈরাচার এবং অগণতান্ত্রিক সরকারকে প্রতিরোধ করতে ভূমিকা রাখে।অর্থ্যা নির্বাচন হলো, গণতন্ত্র বিনির্মাণ,শাসনে জনঅংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং শাসককে জনগণের নিকট জবাবদিহি রাখার প্রধান মাধ্যম এবং একই সাথে জনগণকে ক্ষমতায়িত করার অন্যতম হাতিয়ার।

নাগরিক সমাজ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্হা গড়ে তোলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্হাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে এবং একটি মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ গঠনের জন্য জনগণকে সুশিক্ষিত, সহনশীল, আধুনিক মনোভাবাপন্ন,পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সম্পন্ন সমঝোতার মনোভাব নির্ভর গণতান্ত্রিক চেতনাসমৃদ্ব জনগোষ্ঠী তৈরি করে তোলতে কাজ করে নাগরিক সমাজ।

প্রকৃতপক্ষে, জনগণের অংশগ্রহণমূলক,জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ, উত্তরদায়ক,সুশাসিত, কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্হা প্রবর্তনের মাধ্যমে সকল জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য ও বাসযোগ্য রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে নাগরিক সমাজ।

 

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.