দরিদ্র বস্তিবাসীর পানির ব্যবহার

কারিশমা আমজাদ :বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, যা প্রায় ২০মিলিয়নের অধিক জনসংখ্যার একটি শহর। আর এই শহরের বাসিন্দারা বন্যা, সেবার স্বল্প গুণমান, নর্দমা নিষ্কাশন, দূষণযোগ্য নদীভাণ্ডার, অপরিকল্পিত শহুরে উন্নয়ন এবং বিভিন্ন দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়। তাছাড়া এর জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। ঢাকার পানি ও নিষ্কাশনের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের সাথে এই দূর্যোগের মোকাবিলা করেছে।

 

যদিও ঢাকার প্রথম খাবার পানীয় ব্যবস্থাপণা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের অধীন শাসিত শাসক খাজা আব্দুল গণির মাধ্যমে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে চাদনিঘাটের একটি পানি শোধন কেন্দ্র বসানো হয়েছিল।

ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ করলেও ধাকার সব স্থানে এর ব্যবহার এক ভাবে হয় না। সরবরাহ করা পানির ব্যাপক অপচয় করছেন সমাজের বিত্তবানেরা। এতে পানির সংকটে আছেন নিম্নবিত্তরা। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পাচ্ছেন না।

 

২০১৯ সালের জুলাই মাসে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) একটি গবেষণায় পানির ব্যবহারে এই অসমতা উঠে এসেছে, জনপ্রতি প্রতিদিন পানির ব্যবহার হওয়া উচিত ১৫০ লিটার। কিন্তু বস্তি এলাকার বাইরে যাঁরা থাকেন, তাঁরা প্রতিদিন গড়ে ৩১০ লিটার করে পানি ব্যবহার করেন। সবচেয়ে বেশি পানির ব্যবহার হয় গুলশান-বনানী এলাকায়। এসব এলাকার বাসিন্দারা গড়ে ৫০৯ লিটার করে পানি ব্যবহার করেন। আর বস্তির বাসিন্দা বা নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিন মাথাপিছু মাত্র ৮৫ লিটার পানি ব্যবহার করে।

 

গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের আয়ের সঙ্গে পানি ব্যবহারের পারস্পরিক সম্পর্ক। যাঁদের মাথাপিছু আয় ৯ হাজার টাকার বেশি, তাঁরা শৌচাগারে ফ্লাশ ও গোসলের সময় ঝরনা ব্যবহার করেন। যাঁদের মাথাপিছু মাসিক আয় তিন হাজার টাকা করে, তাঁরা বেশি আয়ের লোকদের তুলনায় দৈনিক গড়ে ১০০ লিটার কম পানি ব্যবহার করেন।

 

বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা, নদীভাঙন, পাহাড়-সংলগ্ন এলাকায় ভূমিধ্বস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, জল-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এসকল জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দূর্যোগে আক্রান্ত হত দরিদ্র মানুষ তুলনামূক উন্নত জীবন যাপনের আশায় স্থানান্তরিত হয়ে নগর বস্তিতে বসবাস শুরু করে। ধারনা করা হয়, প্রতিবছর ৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নুতুন ভাবে স্থানান্তরিত হয়।

 

বস্তিগুলোতে সরু গলি আর ছোট ছোট ঘর। এখানে একটি ছোট্ট ঘরে ৪-৫ জন কখনো বা ৬ থেকে ৮ জন লোক এক সঙ্গে ঘুমায়। তাদের আসা যাওয়ার পথে এক জনের সাথে আরেকজনের শরীর লেগে যায়। বস্তিতে একই সঙ্গে একাধিক ঘরের বাসিন্দাকে রান্না করতে হয়। কাপড় কাচা, শুকাতে দেওয়া, গোসল টয়লেট সবই ব্যবহার করতে হয় একই স্থানে সাবাইকে। একদিকে ঘিঞ্জি বসবাসের স্থান ঠিক তেমনি অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবস্থা। বেশিরভাগ বস্তিতে ১০ থেকে ১২ পরিবারের জন্য একটি মাত্র বাথরুম এবং দুটি ল্যাট্রিন রয়েছে। সেই সাথে বস্তি এলাকা গুলোতে পানির সরবরাহও অপর্যাপ্ত।

 

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) -পানির ব্যবহারে অসমতা বিষয়ক গবেশণায় উঠে আসে যে, বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের দিনে গড়ে ১৫০ লিটার পানি ব্যবহার করার কথা। কিন্তু তারা গড়ে প্রতিদিন ৬৫ লিটার পানি কম ব্যবহার করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে পানির সংকটে ভোগে।

 

অথচ উচ্চবিত্তরা যে হারে পানির বিল দেয়, তারাও সেই হারে বিল দেয়। একই হারে বিল দেয় উচ্চ ও নিম্নবিত্তরা কিন্তু নিম্নবিত্তরা চাহিদা অনুযায়ী পানি পায় না আর উচ্চবিত্তরা অপচয় করে।

 

গবেষণায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানির নিম্নমানের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী পানির বাদামি রং, ২৭ শতাংশ অস্বচ্ছ ও ৪৯ শতাংশ ব্যবহারকারী নোংরা পানি পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ওয়াসার পাম্প স্টেশন, বাসাবাড়ির ভূগর্ভস্থ ট্যাংক বা রিজার্ভার ও ছাদের ওপর পানির ট্যাংক থেকে পাঁচটি করে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে।

 

আমরা প্রতিনিয়ত উন্নয়নের জন্য সচেষ্ট। সর্বমুখি উন্নয়নের জন্য দরকারঅর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য শিল্পায়ন খুবই প্রয়োজন। আর এটাই পানিদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হলে পানির চাহিদাও বাড়বে। ঢাকার পানির চাহিদা পূরণ করাটা ভবিষ্যতে হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

লেখক: কারিশমা আমজাদ

কলাম লেখক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও পি এইচ ডি ফেলো, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Email: sristy70@gmail.com

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.