মোনায়েম খান :ছোটবেলায় মক্তবে যেতে ভয় পেতাম। কারন, কঠোর অনুশাসন। মনেপড়ে, সবক( পড়া )দিতে একটু ব্যতিক্রম হলে রক্ষা নেই, হুজুরের রক্তচক্ষু আর নির্দয় বেত্রাঘাত বর্ষনের মত নেমে আসতো পিঠে। প্রতিবাদ করার কোন নিয়ম তখন ছিল না। অভিবাকরাও কিছু বলতেন না, এইজন্য যে, হুজুরের মার না খেলে সাগরেদ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন, বিদ্য শিক্ষা বা পুন্যলাভ করতে পারবেনা ।পরকালের জন্য কিছু হাসিল করতে হলে হুজুরের লাঠির আঘাত সহ্য করতে হবে, বিনা বাক্যব্যায়ে, অবনতমস্তকে। ইহা ত্বাত্ত্বিক ধর্মশিক্ষার একটি সংবেদনশীল অংশ হিসেবে বিবেচ্য হতো।
তখন, বর্ধিত সামাজিক পরিমন্ডলে এমনও কথা প্রচলিত ছিল যে, হুজুর তাঁর শিক্ষানবিসিদের শরীরের যে অংশে বেত্রাঘাত করে ক্ষত সৃষ্টি করবেন, সেই অংশটুকু কঠিন হাশরের দিনে সবার আগে বেহেস্তে প্রবেশ করবে। কাজেই উস্তাদ যাঁকে যতবেশী বেত্রাঘাত করবেন, তার জন্য ততবেশী খুশির সংবাদ সমাসন্ন । পরকালে বিনা হিসেবে জান্নাত প্রাপ্তির নিষ্কন্টক স্বত্বলাভে উত্তীর্ণ হবে। বেহেস্তবাসী হওয়ার এমন সুবর্ন সুযোগ, কোন খাঁটি মুসলমান অবজ্ঞা বা এড়িয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাতেন না।
এখন পরিস্হিতিতি ভিন্ন। নীতি গর্হিত কিছু ঘটলে মুহুর্তে তাবৎ দুনিয়ায় পরিব্যাপ্তি ঘটে, বিদ্যুৎ বেগে। ইদানীং এমন অনেক চিত্তবিক্ষেপ ভিডিও ফুটেজ সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা যায় যে, মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র ছাত্রীদের উপর শরীরিক নির্যাতনের মাত্রা আদিমযুগের বর্বরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। যা বাস্তবিক অর্থ অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্বিগ্নতা বাড়ছে, সর্বমহলে। বিশেষ করে এই প্রজন্মের বৃটিশ-বাংলাদেশী বংশদ্ভুত মেয়ে ছেলেরা হুজুরদের বর্বরোচিত আচরণ দেখে মারাত্মকভাবে শংকিত। ফলে, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কাছে নেতিবাচক মনোভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
আমরা যাঁরা বাংলাদেশে বড় হয়েছি তাঁদের কাছে ছাত্র ছাত্রী প্রহারের ঐ অমাবিক দৃশ্য গুলো নতুন কিছু নয়। অচেনা অজানা বা অজ্ঞাত থাকার কথা নয় । কারন, ৪০/৫০ বৎসর আগে দেশের মক্তব মাদ্রাসায় শাস্তি বিধান হিসেবে এইভাবে কঠোর নীতি অনুসরন করা হতো। সুধি সমাজে তা গ্রহনযোগ্যও ছিল। কেউ তার বিরুধীতা করলে ইসলামের অবমাননাকারীর মোহর , তাঁর ললাটে এঁটে দেওয়া হতো।
উস্তাদদের একচ্ছত্র আদিপত্য শুধু মাত্র মক্তব মাদ্রাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না । একই সমান্তরাল বিভিন্ন পেশায়, কর্তৃত্ব সংস্কৃতির বিস্তৃতি ছিল চোখে পরার মত । উদাহরণ সরূপ বলা যায়, পরিবহন সংস্হা। বিশেষ করে বাস-ট্রাকের চালকরা (যাঁরা উস্তাদ হিসেবে সম্মানিত ছিলেন ) তাদের সহযোগিদের সাথে খুবই দুর্ব্যবহার করতো। সেবাদানে একটু ত্রুটি হলে অধিনস্তদের প্রতি বেধড়ক লাঠিপেটা চলতো। লক্ষনীয় ব্যাপার, Handle man রা-ই সচরাচর সবছেয়ে বেশী নির্যাতনের শিকার হতো ( তখনকার দিনে লৌহ নির্মিত হ্যান্ডলের মাধ্যমে যান্ত্রিক বাস গুলো Start করা হতো, যিনি এই কাজ করতেন তাঁকে হ্যন্ডলম্যান বলা হতো )। পরিবহন পরিমন্ডলে তখন একটি নিগূঢ় জনশ্রুতি বিরাজমান ছিল যে, উস্তাদের মার ছাড়া সাগরেদ কিছু শিখতে পারবেনা। কাজেই কাজ শিখতে হলে উস্তাদের প্রতি অনুগত্য ও শারীরিক প্রহার, উভয় সমভাবে অনুশীলন করা ও পাঠদানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না ।
সেই ৭২/৭৩ সনে যখন আমার জান্নাতবাসী পিতাজীর সাথে সিলেট বা মৌলভীবাজারের পথে পা বাড়তাম, শেরপুর বাসষ্টেন্ড গুলোতে সাগরেদদের উপর উস্তাদদের নির্দয় অত্যাচার দৃশ্যমান হতো। আশপাশে প্রচুর লোক সমাগমও থাকতো, কিন্তু কেউ ভ্রক্ষেপ করতো না। অবিশ্বাস্য রকমের এক নিরবতা বিরাজ করতো। কারন, ইহা উস্তাদ কর্তৃক সাগরেদকে শিক্ষাদানের একটি পদ্ধতি হিসেবে মনে করা হতো। এবং সমাজে তা গ্রহনযোগ্য ছিল। তাই, শারীরিক নির্যাতন দেখেও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাবাবেগে কোন পরিবর্তন ঘটতো না।
শেরপুর বাসষ্টেন্ড আর ফেরীঘাটকে ঘিরে শৈশব, কৈশোরের কত স্মৃতি জড়িত । জানিনা, এখনও শেরপুরে সাগরেদ পিটানোর সংষ্কৃতি প্রলম্বিত রয়েছে কি-না ? তবে দেশের মাদ্রাসা গুলোতে শাস্তি প্রদানের অজুহাতে নির্যাতনের আদিম চর্চা আজও বিরাজমান ।
অাগে উল্লেখ করেছি,সোস্যাল মিডিয়ায ছাত্র পিটানোর অনেক আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, যা দেখে সাধারন মানুষ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হয়ে পরেছেন। অতি সম্প্রতি আশুলিয়া ও দিনাজপুরের দু’টি মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র পেটানোর বর্বরোচিত মাত্রা দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এই হুজুররা এমন জাহিল আর গোয়ার হন কিভাবে ? আদৌ কি ,ওরা কোন সুশিক্ষা গ্রহন করেছেন ? ওদের মানষিক সুস্থতা খতিয়ে দেখা জরুরী।
খবরে প্রকাশ, চারিত্রিক অধোগতি ও ছাত্র পেটানোর মত সঙ্গিন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন জায়গায় দু’চার জন হুজুর গ্রেফতার হয়েছেন। ভালকথা, যদি আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুষ্ট বিচার হয় । তবে আমার আশংকা আদালতের মাধ্যমে বিচার করে দু’চার জন হুজুরকে শাস্তি দিলে মাদ্রাসার নীতি গর্হিত কঠোর অনুশাসন পরিবর্তন করা যাবে না। কারন, দ্বীনি শিক্ষা লাভের জন্য উস্তাদের প্রহার অতি জরুরী, এমন এক ত্বত্ত্ব কথা ঐশি বানীর মত ইসলামী সমাজে স্বমুলে প্রোথিত রয়েছে। এবং ইহা একটি দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধর্মপ্রান মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য । খোলা দৃষ্টিতে, যা অন্ধবিশ্বাসের সামিল বললে অত্যুধিক হবে না। কাজেই মক্তব মাদ্রাসা থেকে বর্বরোচিত শাস্তির বিধান হ্রাস করতে হলে শিক্ষকদের যেমন পুর্ন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি অভিবাবকদের মধ্যেও সচেতনতাবোধ জাগ্রত করা একান্ত অপরিহার্য । পাশাপাশি, হুজুরের লাঠি পেটা, বেত্রাঘাতে জখম হলে পরকালে পুন্যলাভ হবে, এমন ভ্রান্ত ধারনা সামগ্রিকভাবে পরিত্যাগ করার জন্য সকলের সহযোগিতা জরুরী।
জনশ্রুতি রয়েছে, দ্বীনি শিক্ষা যাঁরা গ্রহন করেন তাঁরা অপেক্ষাকৃত উদার ও সহনশীল হন। মহান আল্লাহের প্রতি অটুট বিশ্বাস, অন্তরে মালিকের ভীতি, তাঁদের চারিত্রিক সৌন্দর্য সম্পুর্ণ সতন্ত্র স্বত্ত্বায সাধারন মানুষের কাছে অনুকরনীয় । কিন্তু ইদানীং সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কিছু পাশাবিক অত্যাচারের ভিডিও ক্লিপ দেখে, ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের যোগ্যতা ও মানষিকতা নিয়ে জনমনে মারাত্মক সন্দিগ্ধতার জন্ম দিয়েছে। তাই দ্বিধা বিভক্তি নয়, সকলের প্রচেষ্টার মাধ্যমে উদ্ভুত পরিস্হিতিতির একটি স্হায়ী সমাধান করা সময়ের দাবী। এবং আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে শেরপুরের বাসষ্টেন্ডের উস্তাদ আর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উস্তাদ একই মানদন্ডে বিবেচ্য নয় ।এ দু’যের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। সর্বক্ষেত্রে ইহা প্রমান করা জরুরী.
লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

