আমার নিজস্ব বুঝা ও ধারণা থেকে বলছি, কেউ স্বীকার করুন আর নাই বা করুন, মাননীয় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বর্তমানে একমাত্র নেত্রী, যিনি চোখ উল্টাতে পারদর্শী । হোক সেটা নিজস্ব দল কিংবা আন্তর্জাতিক দেশ । বিষয়টি যতটা কঠিন, আমি ঠিক ততটাই সহজভাবে বললাম । তবে গত কয়েকবছরের কিছু বিষয় একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখুন, আমার কথার সত্যতা নিশ্চিত খুঁজে পাবেন ।
মূল কথায় আসি । হর্ষ বর্ধন শ্রীংলা ভারতের ৩৩ তম পররাষ্ট্র সচিবের গত কয়েকদিন পূর্বেই বাংলাদেশে বিনা প্রটোকলে হঠাৎ আগমন। এই ভদ্রলোক এই সরকারের ক্ষমতাকালেই এই দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন । তখনকার সময়ে তার কূটনৈতিক হাতের ছাপ সমন্ধে না বললেও চলবে। কেননা উনার সেই সময়কার দাপটের কারণেই বিনা ভোটের সরকার এই দেশের ক্ষমতায়ন হয়েছিলো । পুরনো কাসুন্দি আর ঘাটবো না, তবে সেই সময়ের ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার এবং আমাদের সাবেক স্বৈরাচার এরশাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের কথাও স্মরণে আছে নিশ্চয়ই। স্মরণে আছে নিশ্চয়ই লোডেট রিভলবারের কাহিনীও । এরশাদ কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না বলেই হয়তো আমরা তাঁর মুখ থেকে সত্য কথাটি সেই সময়ে শুনতে পেরেছিলাম এবং প্রকাশ পেয়েছিলো ক্ষমতায়নে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ। তা’নাহলে আমরা সেই ক্রিয়াকলাপ সমন্ধে জানতেই পারতাম না ।
জনাব শ্রীংলা সাহেবের ফেরত যাবার পরে বুঝা গেলো মাননীয় শেখ হাসিনার চোখ উল্টোনর বিষয়টি । লক্ষ্য করুন যে, এই সরকারকে আমরা ভারতের আর্শীবাদের সরকার বলেই জানি এবং সত্য। কেননা এবারের ক্ষমতায়নের সেই প্রথম থেকেই ভারত এই সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে, ক্ষমতায় বসাতে। সেটা সেই ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই । তার প্রমাণ সাবেক ভারতীয় বাঙালি মাননীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির লেখা বইয়ের ভিতরেই আছে। সাবেক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেনা প্রধানকে, ম উ আহমেদকে নিয়ে লেখার অংশটিই প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। যে অংশটি বাংলাদেশের জাতীয় পত্র- পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিলো। পরবর্তীতে আরো নগ্নহস্তের প্রভাব ছিলো, এটা বলাই বাহুল্য।
এবার আসুন চোখ উল্টানোর বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি । শ্রীংলা সাহেব এই দেশে রাষ্ট্রদুত থাকাকালিন যেখানেই যেতেন, যাই করতেন, সেই সময়ে প্রায় প্রতিদিনকার পত্রিকায় উনার বড় বড় ছবি সহ খবর থাকতোই । এবার তিনি এসেছিলেন আরো বড় কর্মকর্তা হয়ে। স্বাভাবিকভাবেই উনার খবরা- খবর আরো বড় বড় হেডলাইন হয়ে পত্রিকায় আসার কথা ছিলো । কিন্তু না। সেরকম কিছুই হয়নি । উল্টো যে খবর দেখলাম, ৯০ ঘন্টার সফরে উনি তিন তিনবার চেষ্টা করে অবশেষে কর্ম দিবসের শেষ বেলায় রাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন, বেশ এইটুকুই মাত্র।
লক্ষ্য করুন, হঠাৎ তার আগমনে কি বার্তা থাকে ? নিশ্চয়ই বড় কোনো বিষয়, এটা বুঝতে তো আর কূটনৈতিক বিষয়ে জ্ঞানীজন হতে হয় না। সেই না জানা বিশেষ বিষয়কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সত্যি বলতে কোনো পাত্তাই দেননি, ইহাই শতভাগ সত্য এবং প্রকাশিত। আরো লক্ষ্য করুন, দেশের পত্রিকায় শ্রীংলা সাহেবের সফর নিয়ে কোনো প্রকার মাতামাতি ছিলো না। এমনকি তার আসা- যাওয়া বা সাক্ষাৎ নিয়ে কোনো খবরই প্রকাশ হয়নি । কেন হয়নি সেটা বুঝিয়ে বলার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই । সহজ বাংলায় উপর থেকে হতে দেওয়া হয়নি এবং উপর মহলের এটাই ছিলো হুকুম বলেই মনে করি ।
উল্টো দিকে ভারতের পত্রিকাগুলো একটু ঘেঁটে দেখলে তার উল্টো রথ দেখা যায় । বড় দেশ, দাদা দেশ, মান রক্ষা বলতে তো একটি কথা থেকেই যায়। ওই যে ৯০ ঘন্টার সফর বললাম। সেটা ছিলো মূলত তাঁর আসা- যাওয়া, বিমানে উঠা- নামা সব মিলিয়ে। সেই সব কিছুকে হিসেবে নিয়ে, ভারতের পত্রিকাগুলো বড় বড় খবর ছেপেছে ( ইন্টারনেটের কল্যাণে ভারতের পত্রিকাগুলো দেখার সৌভাগ্য হয়েছে), শ্রীংলার ৯০ ঘন্টার বাংলাদেশ সফর । ভারতের পত্রিকাগুলোর ভাবখানা এমন যে, শ্রীংলার সফর স্বয়ং বাংলাদেশের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং শতভাগ মূল্যায়ীত হয়েছে । বাস্তবতার সাথে যার কোনোই মিল নেই ।
আসুন একটু দেখার চেষ্টা করি, শ্রীংলা সাহেব হঠাৎ কেন বিমানে চেপে উড়ে বাংলাদেশে আসার এত প্রয়োজন অনুভব করলেন । বিস্তারিত লিখতে গেলে লেখা হবে অনেক বড় । ছোট্ট করে বলার চেষ্টা থাকবে। আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, চীন সরকার বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারেজে বাঁদ নির্মানে শতকোটি ডলারের চুক্তি করেছে। এই বাঁদ নির্মান হলে কি হবে ? শুকনো মরসুমে তিস্তায় পানি থাকবে আর বর্ষা মরসুমে পানি আঁটকিয়ে রাখা যাবে, ফলে বন্যার প্রকোপ কমে যাবে, বেশ এইটুকুই। যা হবে আমাদের দেশের জন্য মহা কল্যাণকর। ওই যে এইটুকুই বললাম, সেটা কেবলমাত্র এইটুকুই নয়। এটা হবে মহা বিষয় । যদি এমনটা হয় ( এমনটা বললাম জেনে বুঝেই, কেননা ভারত এখন পিছনে লেগেছে, যেন না হয়, তবে আমি নিশ্চিত শেখ হাসিনা করবেই ), ভারত যে তিস্তা নিয়ে খেলা খেলছে, সেটার সলিলসমাধি এখানেই হয়ে যাবে। আগামীতে যদি গঙ্গায় ( বাংলাদেশে যমুনায়) এমন কিছুর জন্যেও চীন এগিয়ে আসে, তাহলে ভারতের জন্য বাংলাদেশকে নিয়ে খেলার সব অস্ত্রই শেষ হয়ে যাবে, নিশ্চিত। চীন তিস্তায় সফল হলে গঙ্গায়ও হাত বাড়াবে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, কারণটি ভূ-রাজনীতি। ভারতের মূল মাথা ব্যথা এখানেই ধরেছে ।
ওই যে ভূ-রাজনীতির কথা বললাম, সেটা ছোট্ট করে একটু বললে বলা যায়, ভারতের প্রায় সব পড়শীদেশগুলোর সাথে চলছে বৈরীতা ( প্রায় বললাম কারণ বাংলাদেশ এখনও বাঁকি আছে ) । পাকিস্তান চীনতো আছেই, ইদানিং নতুন কাবাবের হাড্ডি হয়ে এসেছে নেপাল। নেপাল কেন পাড়ছে তার পিছনেও চীনের হাত। বার্মাতো চীনের অঙ্গরাজ্যেই বলা যায়। ভুটানের কথা আপাতত পাশেই রাখলাম, তবে ভুটান আবার ধর্মের দিক দিয়ে চীনের দিকেই বেশি ঝুঁকে । এখন বাংলাদেশে যদি চীন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কিছু করতে পারে, তা হবে চীনের জন্য ষোলকলা পূর্ণ । ঠিক সেই কাজটিই চীন সুচতুরতার সাথে করে যাচ্ছে এবং সফল হবে বলেই মনে হচ্ছে ।
আবার আসি একটু চোখ উল্টানোর বিষয়ে । আমাদের এবারকার সরকার আরো নিখুঁতভাবে বললে বলা যায়, মাননীয় শেখ হাসিনা ভারতকে নিজের দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সব দিয়ে দিয়েছেন বলে আমরা বেশ বকাঝকা করি । হ্যাঁ কথা সত্য, আমাদের সরকার সত্যি সত্যি ভারতকে অনেক বেশি দিয়েছে, বিনিময়ে তেমন কিছুই পায়নি । আমি বেশ কয়েকটি লেখায় এই দেওয়া- নেওয়া নিয়ে নিজস্ব মতামত লিখেছিলাম। সেই আঙ্গিকেই আবার একই কথা লিখছি, আমার ধারণা শেখ হাসিনা বেশি দিয়ে হলেও ভারতের সাথে সব বিষয়ে একটি সমাধানে আসতে চেয়েছিলেন। এখানে একটি বিষয় বলতেই হয় । ভূগোলের কারণে আমরা ভারতের সাথে বেশ দুর্বল। আবার আমাদের স্বাধীনতায় ভারতের সহযোগিতার হাত ( অবশ্যই ভারতীয় স্বার্থ জড়িত) । সব মিলিয়ে একটা বড় সমস্যা অবশ্যই। ধারণা করি সবদিক বিবেচনায় নিয়েই শেখ হাসিনা বেশি দিয়ে হলেও একটা পথ খুঁজেছিলেন সমাধানের।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল যত কথাই বলুক, কেউ কিন্তু সমাধান এনে দিতে পারেনি, ইহাই শতভাগ সত্য। বলা যত সহজ করা তত সহজ নয়। ঠিক সেই করাটিই শেখ হাসিনা করতে চেয়েছিলেন, বেশি দিয়ে হলেও এবং বলা যায় কিছুটা সফল হয়েছেনও বটে । আমাদের দেশের একটি শতভাগ মানচিত্রের রেখা টানা গেছে। সমুদ্রের সীমানা নির্ধারণ করা গেছে । বাঁকি ছিলো তিস্তা সহ ৫৩ নদীর জলের সমাধান । এখানেই ভারতের গড়িমসির কারণেই শেখ হাসিনা চোখ উল্টাতে দেশের স্বার্থেই বাধ্য হয়েছে বলে মনে করি।
লক্ষ্য করুন, চোখটি উল্টাতে শেখ হাসিনা বাধ্য হয়েছেন অবশ্যই। প্রশ্ন হলো, এই চোখ উল্টাতে আমাদের দেশের কয়জন নেতা পারতেন ? প্রশ্নটি করলাম, উত্তরটি আপনারাই খুঁজে দেখুন। আমার ধারণা বলে, বর্তমানে আমাদের দেশে একজনও নেই। আমি মনে করি ভারতের সাথে চোখ উল্টাতে শেখ হাসিনা সঠিক সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করেছেন । চীনকে সাথে নিয়েছেন। কেননা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় কেউ পাশে না থাকলে কোনো কিছুই সম্ভব নয় । ভূ-রাজনীতির কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তো একেবারেই অসম্ভব।
লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে। তবে একটি কথা চীন সমন্ধে বলা বিশেষ প্রয়োজন। চীন বিশ্বের এমন একটি দেশ, ওরা জাত ব্যবসায়ী দেশ । ওরা যতটুকু দেয় তারচেয়েও বেশি নিতে পারদর্শী বটে । ওরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝে না । সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, চীনকে সাথে নিয়ে যাই করুন, কাগজে- কলমে কোনো ফাঁকফোকর রেখে করবেন না, তাহলেই সফল হতে পারবেন, নতুবা নতুন বিপদ সামনে আসবে । সুতরাং প্রথম থেকেই সাবধান থাকুন ।
আর একটি কথা, মাননীয় শেখ হাসিনা সমন্ধে বলতে চাচ্ছিলাম, দলের ভিতরে চোখ উল্টানো, এটা ইদানিং বেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তবে অন্য কোনো লেখায় উদাহরণ দিয়েই লিখবো। লেখার শেষে বলছি, যে যত তাত্ত্বিক কথাই বলেন না কেন, আমাদের মতন ছোট্ট দেশ, এত ঘণজনবসতির দেশ, এত ঝামেলার দেশ, বিশ্বের বড় বড় সফল নেতারাও সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন না বলেই শতভাগ বিশ্বাস করি।
সেই দিক থেকে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মোটের উপর খারাপ নয় । এই সরকার যেভাবেই বর্তমানে ক্ষমতায় আছে, সামনে আরো বেশ অনেকদিন হাতে সময় আছে। শুধু প্রত্যাশা থাকবে, আন্তর্জাতিক বড় বড় সমস্যার একটি পথ বের করে, সামনের দিনগুলোতে দেশের ভিতরে রাজনীতি চর্চার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিছ পা হবেন না । কঠিন সিদ্ধান্ত আপনি নিতে পারেন বলেই দেখতে পাই, সুতরাং আগামীতে গণতন্ত্রের জন্য হাত বাড়িয়ে দিবেন বলে সাধারণ জনগণ হিসেবে বিশ্বাস রাখতে চাই এবং দেখতে চাই।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

