ধর্ষিত মানবতা : নিরব দর্শক জনতা

মোনায়েম খান :কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার হারবাংয়ের জনপ্রতিনিধি মিরানুল ইসলাম। গর্বিত চেয়ারম্যান। সহসা দেশশুদ্ধ তাঁর পরিচিতি পরিব্যাপ্তি ঘটে দুর্বার বেগে। কারন, তিনি অত্যন্ত পৌরুষদীপ্ত একটি কাজ করেছেন, যা অনাগত দিনে পরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা হিসাবে দেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হযে থাকবেন । কাজটি হলো, এক অসহায় মা ও তাঁর যুবতি মেয়েকে কোমড়ে রশি বেঁধে টেনে হিঁচড়ে  পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে লাঠিপেটা করে চেয়ারম্যান তাঁর বীরত্বের জয়গাঁথা স্বগর্বে ইউনিয়নবাসিদের জানিয়ে দিয়েছেন। বাহবা, দে তালি!

এই নিরীহ মা-মেয়ের অপরাধ কি? এত বড় নির্দয়তা কি জন্য? খবরে প্রকাশ, ফুলের মত পবিত্র ,চরিত্রবান চেয়ারম্যান, নির্যাতিত ঐ যুবতি মেয়েকে বিয়ে করতে ছেয়েছিলেন, কিন্তু কন্যা পক্ষ রাজি না হওয়ায় ক্ষমতার দম্ভ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য মা-মেয়ের উপর গরু চুরির অভিযোগ এনে পাকড়াও করেন। তারপর তিনি যা করলেন, তা দেশ ছাড়িয়ে পুরো বিশ্ববিবেকে আঘাত হানে প্রচন্ডভাবে। সহায় সম্বলহীন অবলাদের উপর অত্যাচারের এক নয়া অধ্যায় উম্মোচিত হল। পাঠক, দোহাই, বলেন তো, বাংলাদেশে কোন নারী গরু চুরি করতে কখনও শুনেছেন কি ? অন্তত: আমি শুনিনি।

চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম একজন মুজিব সৈনিক। আওয়ামীলীগের ইউনিয়ন সভাপতি। কাজেই তাঁর ক্ষমতার পরিধি একটু বেশী হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এতটা বর্বরোচিত হবে, তা হয়তো তাঁর আত্মজ পরিবারবর্গও জানতেন না, বলে আমার বিশ্বাস। যদি তাঁর ঘনিষ্টজনের মধ্যে বিন্দু পরিমান বিবেক অবশিষ্ট থাকে, তবে এমন কুর্কমের জন্য নিশ্চয় তাঁরা অনুতপ্ত, অনুশোচনার দু:সহ দাবাগ্নিতে জ্বলছেন। অনিচ্ছা স্বত্বেও মুখ দিয়ে অস্ফুষ্ট বেরিয়ে আসবে দুর্মর ঘৃনার দু/চার শব্দ। নির্ঘাত, মৃতবৎ আত্মাও লাফ দিয়ে উঠবে , এমন হায়ান সুলভ আচরন দেখে।

অসহায় মহিলাদ্বয়ের পৈচাশিক নির্যাতনের দৃশ্য সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে, হাজারও লোক নিন্দাজ্ঞাপনের সুনামী বয়ে নিয়ে এসেছেন। একই সাথে অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের ফাঁসির দাবী করছেন।

উল্লেখ, বিগত ২১আগষ্ট কক্সবাজারের চকরিযা উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের গহরচাঁদা এলাকায় এই অমানবিক হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। জানা যায়, পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্হলে যায় এবং লাঞ্চিত মা-মেয়েকে উদ্ধার করে স্হানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করে। ব্যাস, পুলিশের দায় মুক্তি হয়ে গেল!

“হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলামের নেতৃত্বে তাদের উপর নির্যাতন হয়েছে কি-না “? এমন একটি প্রশ্নের উত্তর হারবাং তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক জনাব আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন আভিযোগ কেউ করেনি, “ আমাদের ফোর্স যখন ঘটনাস্হলে যায় তখন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক লোক উপস্হিত ছিলেন। সেখান থেকে তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে আসাটাই প্রধান্য দিয়েছি”। তিনি আরও বলেন, স্হানীয় একব্যক্তির দায়ের করা গরু চুরির মামলায় তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।

কর্তব্যরত প্রশাসনিক কর্মকর্তার এমন দায়সারা উত্তর পত্রিকায় পড়ে বিস্ময়ে থ’ খেয়ে যাই। আত্মহত্যা করতে উদ্যত হই। মনে প্রশ্ন জাগে, এই সুশিল সমাজের বিদ্বান লোকটি কি অন্য কোন ভুবনে বাস করেন ? নাকি লোকটি অন্ধ ও বধির? গরু চুরির অভিযোগ এনে এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক দুই হতভাগ্য মহিলাকে কোমড়ে রশি বেঁধে সারা গ্রাম প্রদক্ষিন করে শাস্তি দেওয়া কোন আইনের খাতায় লিখা আছে ,আমার জানা নেই। সুহৃদ পাঠকের মধ্যে কারও জানা থাকলে, স্ববিনয় নিবেদন, একটু জানাবেন। জ্ঞানার্জনের জন্য।

চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলামের এই আচরন অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহিলিয়াত যুগের ভয়াবহ বর্বরতার সাথেই একমাত্র তুলনা করা যায় । ভরদুপুরে এমন সঙ্গিন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রমান ছাড়া চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অপারগ। এ কেমন রসিকতা ?

হারবাং এলাকায় নুন্যতম হলেও কয়েক হাজার লোকের বাস। প্রকাশ্য দিবালোকে দু’জন অবলা নারীর সম্ভ্রভ নিয়ে খেলছে এক জনপ্রতিনিধি , অথচ একটি লোকও এগিয়ে এলো না সামান্যতম প্রতিবাদ করতে। আশ্চর্য, ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের বিবেক শংকিত মাত্রায় ঝাঁপ দিয়েছে মহাসাগরের অতলে।

যে লোক গুলো দাঁড়িয়ে তামশা দেখলো তাঁরাই অাবার বিচার চাচ্ছে। এ কেমন বৈপরীত্য, বুঝা মুশকিল। দেশের বর্তমান প্রেক্ষপটে কারও কাছে বিচার চাওয়া আর অরন্যে রোধন করা এক ও অভিন্না। এ জন্য শুধু প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিদেরই দায়ী করা ঠিক নয়। সাধারন মানুষও সে হিস্যার এক ভাগিদার। যেহেতু, দেশের সাধারন নাগরিক নুন্যতম দায়ীত্ব পালনে শুধু অপারগতা প্রকাশ করছেন না, অধিকিন্তু অন্যায় অবিচারের কাছে নি:শর্ত আত্মসমর্পন করে বসে আছে। কাজেই সবলের নিস্পেষনের অপ্রতিরোধ্য গতি শুধু বিস্তৃতি লাভেই করবে, যতক্ষন না সাধারন জনতা ঘুরে দাঁড়াবে, অন্যায়ের বিপরিতে। জানি না সে দিন কত দুরে ?

লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.