আমিরাতের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রতিক্রিয়া     

অ্যাডভোকেট আনসার খান :আরব বিশ্বের প্রথম, মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ও ইসরাইলের পরে তৃতীয় এবং বিশ্বব্যাপী তেত্রিশতম স্হানে অবস্হান নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত পহেলা আগস্টে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছে। চারটি চুল্লির মধ্যে একটি চুল্লি কার্যক্রম শুরু করেছে এই উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে।

         আমিরাত পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহি মোহাম্মদ ইব্রাহিম আল হামাদী বলেছেন, চুল্লিটির উদ্বোধন-“আমিরাতের জন্য সত্যিই একটি ঐতিহাসিক মূহুর্ত।” আমরা আমাদের জাতির বিদ্যুতের এক-চতুথাংশ সরবরাহ এবং ভবিষ্যতের বিকাশকে নিরাপদ,নির্ভরযোগ্য ও নির্গমন-মুক্ত বিদ্যুতের সাহায্যে আমাদের লক্ষ্য অর্জনের আরও একধাপ এগিয়ে এসেছি,”বলেন তিনি।

          পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনের ফলে নানামুখী বিতর্ক শুরু হয়েছে,প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বলছে আমিরাত পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করতে পারে।ফলে আন্জ্ঞলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্হিতিশীলতা হুমকির মধ্যে পড়বে।
        আমিরাতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র কাতার গেল বছর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশনের নিকট এই বলে অভিযোগ দায়ের করেছিলো যে,বারাকাহ চুল্লি এই অন্জ্ঞলের “শান্তি, স্হিতিশীলতা ও পরিবেশের”জন্য বড় ধরণের হুমকি হয়ে দেখা দিবে।তবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে আমিরাতের জ্বালানীমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান স্পষ্ট করেই বলেছিলেন,আমিরাতের পারমাণবিক কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে,পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনের কোনো ইচ্ছা তাঁর দেশের নেই।
         আমিরাত বলেছে, পরমাণু নিরাপত্তা সুরক্ষা ও পারমাণবিক অ-বিস্তারকে সর্বােচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও উদ্ভিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
         এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা থিন্কট্যান্ক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের পরমাণু পরিচালক টম প্ল্যান্টের মতে,আমিরাতের কর্মসূচীতে সামরিক মাত্রার ঝু্ঁকি খুবই কম আছে। আমেরিকা,জাতিসংঘ,আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্হা আমিরাতের এই কর্মসূচী নিয়ে নেতিবাচক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি এখনঅবধি। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইলও বিরূপ কিছু বলেনি।

         মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরান ইতোমধ্যেই পারমাণবিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে বলে মনে করা হয়।ইসরাইলের অপ্রকাশিত পারমাণবিক অস্ত্রাগার  এবং ইরানের একটি বিতর্কিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প রয়েছে।
      বারাকাহ নামের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো ২০০৯ সালে।দেশটির রাজধানী আবুধাবির পশ্চিমে উপসাগর উপকূলে কাতারের রাজধানী দোহার সন্নিকটে এবং সৌদিআরবের সীমান্তের ৫০ মাইল অদুরে ২২.৪ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার ব্যয়ের বারাকাহ বিদ্যুৎ প্রকল্পটি আমিরাত পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন(ইএনইসি) এবং কোরিয়া বৈদ্যুতিক শক্তি কর্পোরেশন(কেপিসো) এর নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত হচ্ছে।
       “বারাকাহ পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রটি আমিরাতের প্রথম পারমাণবিক চুল্লির মর্যাদা পেয়েছে এবং সফলভাবে শুরু হয়েছে,”বলেছেন আন্তর্জাতিক এটমিক এনার্জি এজেন্সিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি হামাদ আল কাবি।”এটি জাতির জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক, এটি একটি স্বপ্ন, যা জাতির জন্য নতুন রূপে শক্তি সরবরাহ করতে পারবে”যোগ করেন তিনি।
      এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটির কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হলে এটি ৫৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে,যা আমিরাতের মোট বিদ্যুতের চাহিদার পঁচিশ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। বাকী তিনটি চুল্লি কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।”অদুর ভবিষ্যতে বারাকাহ চুল্লিটির সম্পূর্ণ কাজটি আমিরাতের উন্নয়ন ও টেকসইকরণের প্রচেষ্টায় অবদান রাখবে”মন্তব্য করেছেন হামাদ আল কাবি।
        আমিরাতের কর্মকর্তারা আশা করেছেন যে,সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এই চুল্লিটি আন্জ্ঞলিক খেলোয়াড় হিসেবে ইয়েমেন, হর্ণ অব আফ্রিকা এবং লিবিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আমিরাতের শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।    প্রতিযোগিতামূলক দামের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে সাথে, আমিরাত কর্তৃপক্ষ আশা করছে যে,পারমাণবিক কেন্দ্রটি পর্যটন, ব্যাংকিং ও পরিষেবাদির উৎস হিসেবে সাফল্যের সাথে ভূমিকা রাখবে,আমিরাতের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও বিকশিত করবে,যা আমিরাতকে একটি আন্জ্ঞলিক শক্তি হিসেবে অধিষ্ঠিত করবে।
      একজন উপসাগরীয় বিশ্লেষক এএফপিকে বলেছেন, “এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শক্তির অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে,জীবাশ্ম জ্বালানীর ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক আন্জ্ঞলিক নেতা হিসেবে এর ভাবমুর্তি উত্থাপনের লক্ষ্যের একটি অংশ”।
        সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি ক্ষুদ্রদেশ,যা ইতোমধ্যে আন্জ্ঞলিক হেভিওয়েট এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক হাব বা কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে, সেটি দাবি করছে, তেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করার জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্হাপন করা হয়েছে। এর চারটি ইউনিট একসাথে কার্যক্রম শুরু করলে দক্ষিণ কোরিয়ার নকশাকৃত চুল্লিটি দেশের বিদ্যুতের এক-চতুর্থাংশ চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে।
      এই চুল্লির দ্বারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচী বা পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের কোনো উদ্দেশ্য আমিরাতের নেই বলে জানিয়েছে আমিরাত সরকার।আন্জ্ঞলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শক্তি সন্চয়ের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আশংকা প্রকাশ করা হলেও আমিরাত বলছে যে,এই পারমাণবিক কর্মসূচী কেবল জ্বালানী শক্তি উৎপাদনের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হবে,এটি শান্তিপূর্ণ একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক পূনরায় প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি তৈরি করবে না আমিরাত।
        তবে উপসাগরীয় অন্জ্ঞলের ভূ-রাজনৈতিক অবস্হান, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস থেকে যে দ্বন্দ্ব চলমান আছে সেই অবস্হায় এই অন্জ্ঞলে পারমাণবিক অস্ত্র লাভের একটি প্রতিযোগিতা অবশ্যম্ভাবিভাবে বৃদ্ধি পাবে।আমিরাত যতই আশ্বস্ত করুক পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করার উদ্দেশ্য তাদের নেই,কিন্তু হরমুজ প্রণালীর সাথে সম্পর্কিত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নিরসন আমিরাতের শীর্ষ অগ্রাধিকার থাকবে।তাই আন্জ্ঞলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শক্তি সন্চয়ের চেষ্টা আমিরাত করতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
        ইসরাইল ও ইরানের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় পারমাণবিক সক্ষম রাষ্ট্র হওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইন্সটিটিউটের জ্বালানী গবেষণার সহযোগী জিম ক্রেন বলেছেন,”কৌশলগতভাবে,পারমাণবিক শক্তি একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বৃহত্তর চুক্তি, যা অবিচ্ছিন্নতাবাদী নিরপেক্ষতার মতবাদ থেকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য,উত্তর আফ্রিকা ও তার বাইরেও সংঘাতগুলিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের দিকে এগিয়ে চলতে চালিত করবে।”
       এই প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা মনে করেন,মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।”নতুন পারমাণবিক শক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ ও বিকাশের সক্ষমতা সরবরাহ করায় উপসাগরের উত্তেজনাপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ এই অন্জ্ঞলের অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করবে,”বলেন বিশ্লেষক ডরফম্যান।                  আমিরাতের পারমাণবিক চুল্লির উদ্বোধনকে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মাথাব্যথা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকগণ।তাঁদের অনুমান,সৌদিআরব, মিশর,তুরস্ক প্রভৃতি অন্যান্য আরব দেশগুলোও পারমাণবিক শক্তি কার্যক্রম শুরু করতে পারে।অর্থ্যা, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে উত্তাল অন্জ্ঞলে আরও পরমাণু বিস্তার বৃদ্ধি অনিবার্যভাবে ঝুঁকি বাড়িয়ে দিবে,এটি প্রায় নিশ্চিত। ওই অন্জ্ঞলের দেশগুলো তাদের নিজস্ব পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় আরও বেশি পরিমাণে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত হবে।
         ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডনের এনার্জি ইন্সটিটিউটের গবেষক পল ডরফম্যান মনে করেন,আমিরাতের বারাকাহর চারটি পারমাণবিক চুল্লিতে আমিরাতের বিনিয়োগ অস্হিতিশীল উপসাগরীয় অন্জ্ঞলকে আরও অস্হিতিশীল করা,পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং পারমাণবিক বিস্তার হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেছেন যে,”পারমাণবিক বিষয়ে আমিরাতের আগ্রহের প্রকৃতি প্রকৃত দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকতে পারে,যার চুড়ান্ত লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার।”
          পল ডরফম্যান বলেছেন,সৌদিআরব আমিরাতকে অনুসরণ করতে পারে।তাঁর মতে,”সৌদিআরব পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশ এবং সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে।” সৌদিআরবের ডি-ফ্যাক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালের মার্চে আমেরিকান মিডিয়া, সিবিএসের সাথে সাক্ষাতকারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন,”সৌদিআরব কোনোও পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র নিতে চায় না,তবে সন্দেহ নেই যে,ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে,আমরাও যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ইরানকে অনুসরণ করবো।”
        মিসরও একই পথে হাঁটছে।দেশটি কায়রোর পশ্চিমে এল-দাবায়া অন্জ্ঞলে রাশিয়ার সহযোগিতায় চারটি রিএ্যাক্টর সমৃদ্ধ শক্তিকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।এছাড়া তুরস্ক আন্জ্ঞলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তাই এটিও পরমাণু অস্ত্র লাভের চেষ্টা করবে,সেটি স্বাভাবিকই বলা যায়।
      মধ্যপ্রাচ্যে আরও বেশি পারমাণবিক কর্মসূচী চালু করার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।কেননা, মধ্যপ্রাচ্য,হর্ণ অব আফ্রিকা এবং উপসাগরীয় অন্জ্ঞল সামরিক সংঘাতপ্রবণ অন্জ্ঞল। এই অন্জ্ঞলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা,আন্জ্ঞলিক নেতৃত্ব লাভের প্রতিযোগিতা ও সামরিকভাবে শক্তি অর্জনের উচ্চাশা বিদ্যমান আছে।তাই ওখানকার কোনো একটি রাষ্ট্র যখন পারমাণবিক শক্তি অর্জনের দিকে অগ্রসর হয়,তখন প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য রাষ্ট্রগুলোও সেটিকে অনুসরণ করবে,তা-ই স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।
        এইসব দিক বিবেচনায় বিশ্লেষকরা মনে করেন,আমিরাতের পারমাণবিক চুল্লির উদ্বোধন অত্রাঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের প্রতিযোগিতা উস্কে দিবে, এটি প্রায় নিশ্চিত।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.