করোনার উচ্চ ঝুকিতে দরিদ্র বস্তিবাসী

কারিশমা আমজাদ :চীনের পর করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই। বাংলাদেশে এই প্রকোপ দেরিতে আসলেও করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাড়ছে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যাও। করোনা ভাইরাস সংক্রমন যে কারও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, করোনায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বস্তিগুলোয় ও নিম্নআয়ের মানুষদের ক্ষতি হবে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কত জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা থাকলেও কোন বস্তিতে কত জন আক্রান্ত তার কোনও তথ্য নেই।

 

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্থ দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর-সর্বদিক দিয়ে সংগঠিত এসকল পরিবর্তন বাংলাদেশে, জলবায়ুগত স্থল  পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক অনেক বেশি। বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা, নদীভাঙন, পাহাড়-সংলগ্ন এলাকায় ভূমিধ্বস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, জল-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এসকল জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দূর্যোগে আক্রান্ত হত দরিদ্র মানুষ তুলনামূক উন্নত জীবন যাপনের আশায়  স্থানান্তরিত হয়ে নগর বস্তিতে বসবাস শুরু করে। ধারনা করা হয়, প্রতিবছর ৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নুতুন ভাবে স্থানান্তরিত হয়।

 

বস্তিবাসী ও ভাসমান লোক গণনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী সারাদেশে বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৩৫টি। বস্তিতে বসবাস মানুষের সংখ্যা ২২ লাখ ৩২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৪৪ হাজার পুরুষ, ১০ লাখ ৮৬ হাজার নারী এবং ১ হাজার ৮৫২ জন হিজড়া। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১০ লাখ ৬২ হাজার ২৮৪ জন বস্তিতে বাস করে। ঢাকায় বস্তির সংখ্যা ৩ হাজার ৩৯৪টি। তবে এর মধ্যে ঠিক কতজন জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছে সেই পরিসংখ্যান কোথায় উঠে আসেনি। 

 

মহাখালীতেই বাংলাদেশের দুটি বড় বস্তি রয়েছে, যার একটি কড়াইল বস্তি ও অপরটি সাততলা বস্তি হিসেবে পরিচিত। কড়াইল বস্তিতে বিবিএস-এর ২০১৪ সালের করা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১০ হাজার ২২২টি ঘর বা খানা রয়েছে। এসব খানায় ৩৬ হাজার ৭১৯ জন বাস করেন। কিন্তু স্থানীয় বস্তি উন্নয়ন কমিটির নেতারা বলছেন, এই বস্তিতে ১২ হাজার ঘর রয়েছে। বস্তির লোকসংখ্যা প্রায় আড়াই লাখের মতো।

 

একই অবস্থা মহাখালীর সাততলা বস্তির ক্ষেত্রেও। বিবিএস এর ২০১৪ সালের বস্তি শুমারির তথ্য বলছে, এই বস্তিতে ঘরসংখ্যা ছয় হাজার ৮৪৫টি। এসব ঘরে চার হাজার ৩৭৩টি পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা ২১ হাজার ৮৬৯। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এই বস্তিটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন।

 

বস্তিগুলোতে সরু গলি আর ছোট ছোট ঘর। এখানে একটি ছোট্ট ঘরে ৪-৫ জন কখনো বা ৬ থেকে ৮ জন লোক এক সঙ্গে ঘুমায়। তাদের আসা যাওয়ার পথে এক জনের সাথে আরেকজনের শরীর লেগে যায়। সেখানে করোনায় সংক্রমিত হলে একা আলাদা থাকবে কী করে? বস্তি বাসিরা বলছেন, তারা প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালান, কেউবা ভ্যানগাড়ি চালান। কেউ দিন মজুর, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক, ফেরীওয়ালা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক  কেউবা গৃহকর্মী। সকাল হলেই  তারা কাজের সন্ধানে ছোটেন। করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের নির্দিষ্ট কাজ। কাজ না থাকায় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। বাধ্য হয়েই তারা যখন যে কাজ পাচ্ছে তারা সে কাজের তাগিদেই ঘর থেকে বের হচ্ছে হরহামেশা। একদিকে ঘিঞ্জি বসবাসের স্থান ঠিক তেমনি অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবস্থা, করোনা স্বাস্থ্যসুরক্ষায় যেখানে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে থাকার কথা। অন্যদিকে যেখানে বারবার হাত ধোয়ার কথা উঠে আসছে, সেখানে বস্তি এলাকা গুলোতে পানির সরবরাহও অপর্যাপ্ত, এমন কি তাদের মধ্য হাত ধোয়ার ব্যাপারে তেমন একটা সচেতনতা একেবারেই নেই বলেই চলে। এক কথায় ঠাসাঠাসি করেই থাকতে হয় রাজধানীর প্রায় সকল বস্তিগুলোতে। বস্তিতে একই সঙ্গে একাধিক ঘরের বাসিন্দাকে রান্না করতে হয়। কাপড় কাচা, শুকাতে দেওয়া, গোসল টয়লেট সবই ব্যবহার করতে হয় একই স্থানে। সুতরাং করোনা ভাইরাস কোনো এক জনের হলে ছড়াতে পারে দ্রুত। রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাসানটেক বস্তি, কল্যাণপুর পোড়াবস্তি, মিরপুরের বেগুনটিলা বস্তি, বিএনপি বস্তি, শাহজাদপুর ঝিলপাড় ও খালপাড় বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তিসহ সব বস্তিরই একই অবস্থা। করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েতে পারে এসব বস্তিবাসী।

 

বস্তিগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাসিন্দারা নিজেদের মতো করেই চলাফেরা করছেন। দলবদ্ধ হয়ে কোথাও কোথাও তাদের গল্প করতেও দেখা যায়। তবে তা মাস্ক ছাড়াই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে নেই কোন সচেতনতা। এদের মধ্যে থেকে একজন বললেন, এসব শহরের রোগ, আমাদের গ্রামে চলে যাওয়াই ভালো। এরই মধ্যে কেউ কেউ গ্রামে চলেও গেছেন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র বস্তিবাসি এক দিকে যেমন নিজ ভিটামাটিহীন অন্যদিকে এমন করোনা কালীন পরিস্থিতে অনত্র যাবারও কোন জায়গা নেই।

 

ঢাকা শহরে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত মানুষ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ব্যতিত স্থানান্তরিত মানুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য গবেষণায় উঠে এসেছে, তা তুলে ধরা যাকঃ

উন্নত জীবনের সন্ধানেই সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষদের স্থানান্তরের কারন অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ দূর্যোগের পর টিকে থাকার চেষ্টা করে কিন্তু একটা পর্যায়ে টিকে থাকতে পারে না বলেই স্থানান্তরিত হয়।

পরিবেশগত পরিবর্তন স্থানান্তরের জন্য বাধ্যতামূলক নয় সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের জন্যে অপরদিকে হঠাৎ অথবা দীর্ঘকালীন স্থানীয় পরিবেশের পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয় জলবায়ু পরবর্তনে স্থানান্তরিত মানুষ।

সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ প্রাকৃতিক দূর্যোগে পরিবারের কাউকে হারানোর ভয় নেই কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের বেশিভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের বা আত্নীয়স্বজনের মধ্যে কেউ না কেউ নিঁখোজ বা নিহত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত ব্যক্তির তুলনায় সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের শারীরিক সামর্থ বেশি থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের অধিকাংশ স্বাথ্য সমস্যাসমূহঃ পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া, ছোঁয়াচে এবং সংক্রামক রোগ লেগেই থাকে।

জলবায়ু- সম্বন্ধীয় চাপই জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের মানসিক চাপের মুল উপাদান। সেক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের তেমন কোন মানসিক চাপ নেই।

কৃষ মৌসুমে সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ ধান মারায় বা ধান সিদ্ধর কাজে আদি নিবাসে ফিরে যায় কিন্তু নদী ভাঙ্গনের কারনে স্থানান্তরিত মানুষেদের ফিরে যাওয়ার কোন উপায় থাকে না।

পরিবার বা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থা্নান্তরিত হয় সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষদের জীবনে দুর্যোগই স্থানান্তরের নকশা বা পরিকল্পনা তৈরী করতে বাধ্য করে। 

সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষের কিছু অংশ  স্বল্পকালীন  সময়ের জন্য স্থানান্তরিত হয়ে আসে প্রয়োজন সাপেক্ষে। সর্বোচ্চ পরিমান ব্যক্তি স্থানান্তরিত হয় দীর্ঘস্থায়ী ভাবে তবে  সচ্ছলতা  ফিরে আসলেই তারা আদি নিবাসে ফিরে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত মানুষ নারীদের অনেকেরই আদি নিবাসে ফিরে যাওয়ার মানসিকতা থাকলেও নদীভাঙ্গনে যারা সর্বশান্ত হয়ে গেছে তাদের আর ফিরে যাওয়ার জায়গা থাকে না।

সাধারন স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষরা জরুরি সরকারী স্বাস্থ্যসেবা আশা করে নিজ এলাকায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ স্থানান্তরিত স্থানেই স্বাস্থ্য বীমা, সরকারী স্বাস্থ্যসেবা এবং মনোরঁজন ব্যবস্থা সুবিধা পেতে চায়। স্বাস্থ্য ঝুকিতে যে সাধারন স্থানান্তরিত মানুষের তুমনায় যে জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তরিত দরিদ্র মানুষ অনেক বেশি ঝুকিতে একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

 

এক সময় নিরুপায় হয়ে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শহরমুখী হয়েছিল এসব খেটে খাওয়া মানুষ। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রাম ছেড়ে অসংখ্য মানুষ ঢাকায় আসে কাজ পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তায়, অনেকে নাড়ির সম্পর্কে ইতি টেনে চলে আসে রাজধানীতে। কিন্তু আজ করোনা কালীন সময় তাদের আর ফিরে যাবার মত নেই কোন আদি নিবাস। তবে তাদের একটাই কথা, ‘আল্লাহ মরণ কপালে লিখলে মরতে হবে।’ ‘সেল্ফ আইসোলেশন’ এবং ‘হোম কোয়ারান্টিন’ কথা দুটো খুব হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে বস্তিবাসীদের বেলায়৷ একটি কক্ষে গাদাগাদি করে যেখানে অনেক জন থাকে, সেখানে করোনায় সংক্রমিত হলে একা আলাদা থাকবে কী করে? বস্তিকে ঘিরে এখন অবধি কতটা হয়েছে করোনা ভাইরাসের বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা? ঝুঁকি কমাতে সরকারি-বেসরকারিভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি-সাবানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নয়তো তাদের মাধ্যমেই ঘটবে সংক্রমণ। এখনো বস্তিগুলোতে সংক্রামন ছড়িয়ে পড়েছে এমন তথ্য উঠে আসেনি। তবে দিন দিন যে হারে করোনা সনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন না করলে লাশের মিছিল বসে দেখা ছাড়া আমাদের কি কিছু করনীয় থাকবে?

 

লেখক: কারিশমা আমজাদ 

কলাম লেখক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও 

পি এইচ ডি ফেলো, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Email: sristy70@gmail.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.