মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর ভূমিকা

অ্যাডভোকেট আনসার খান :লেবাননভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল হওয়া সত্বেও” হিজবুল্লাহ “মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।এ সংগঠনের ভিত্তি এতোটাই মজবুত ও শক্তিশালী যে,মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো স্হানে সামরিক হামলা বা সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করার মতো সামর্থ্যতা এটির রয়েছে। একারণে আমেরিকা ও তার সমর্থক অনেক দেশ হিজবুল্লাহ সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিলো এবং এখন অবধি এটি সন্ত্রাসী সংগঠন বলে চিহ্নিত হয়ে আছে।

 ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সময়কালে সংঘটিত লেবাননে চলা গৃহযুদ্ধের সময়কালে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সশস্ত্রগ্রুপ লেবাননে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করার প্রতিক্রিয়ায় লেবাননের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বড় ধরণের অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিলো এবং বলা হয় ফিলিস্তিনী এসব সশস্ত্রগ্রুপের মোকাবিলার লক্ষ্যে লেবাননের শিয়াগোষ্ঠীর একটি অংশ ১৯৮৫ সালে হিজবুল্লাহ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আরব রাষ্ট্রগুলোতে তার প্রভাব বিস্তারের সূযোগ দেখে ইরান এবং তার বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) উদীয়মান এই সংগঠনকে ১৯৭৯সালের পর থেকে হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের তহবিল,অস্ত্র, আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং এই সংগঠন ইরানের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে ইরান সারা মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি স্হাপনে সক্ষম হয়েছে।
 লেবাননের শিয়া মুসলিমদের রাজনৈতিক সংগঠন হিজবুল্লাহ একটি জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। এর রয়েছে সুরক্ষা যন্ত্রপাতিসহ সামরিক শাখা,আছে রাজনেতিক সংগঠন শাখা ও সামাজিক সেবা নেটওয়ার্ক। এই সংগঠনের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা এই সংগঠনকে “রাষ্ট্রের ভেতরে একটি রাষ্ট্র “বলে অভিহিত করেছেন এবং এই মর্যাদায় সংগঠনটি চিহ্নিত হয়ে আছে সর্বত্র।
 সিরিয়ার চলমান যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ সময়কালে হিজবুল্লাহ সিরিয়ার আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং এসময় ইসরাইলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।আর এই লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত সামরিক অভিজ্ঞতা ইরান সমর্থিত এই সংগঠনকে বেশি পরিমাণে শক্তিশালী করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।বিশেষ করে সিরিয়ার আসাদ সরকারের সমর্থনে হিজবুল্লাহর যুদ্ধে অংশগ্রহণ হিজবুল্লাহকে ক্রমবর্ধমান কার্যকর সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
হিজবুল্লাহ সংগঠনটি ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরোধী।একারণে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রভাব প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন ও সংগ্রাম করে চলেছে হিজবুল্লাহ সংগঠন।
হিজবুল্লাহ নিজেদেরকে শিয়া প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে এবং ১৯৮৫ সালের ইশতেহারে এই আদর্শ তোলে ধরে লেবানন থেকে সব পশ্চিমা শক্তিকে বহিষ্কার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলো। একই সাথে ইসরাইলি রাষ্ট্র ধ্বংস করার আহবান জানিয়েছিলো।এসময় ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বােচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো সংগঠনটি। প্রকাশিত ও ঘোষিত ইশতেহারে সংগঠনটি ইরান অনুপ্রাণিত ইসলামি শাসন ব্যবস্হার পক্ষেও সমর্থন জানিয়েছিলো, তবে জোর দিয়েছিলো যে,লেবাননের জনগণকে অবশ্যই স্ব-সংকল্পের স্বাধীনতা থাকতে হবে।
হিজবুল্লাহর বর্তমান নেতা হাসান নাসারাল্লাহ হিজবুল্লাহর আদর্শকে দু’টি মূল অক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এগুলো হলো, প্রথমতঃ ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে শাসনের প্রতি বিশ্বাস ও খোমেনীর নেতৃত্বের অনুগমন এবং দ্বিতীয়তঃ ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা।২০১৪সালের ১৫ আগষ্টে এক সাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহ নেতা নাসারাল্লাহ বলেছিলেন,”ইসরাইল একটি ক্যান্সার এবং চুড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এটির অপসারণ করা।” তিনি আরো বলেছিলেন,”ইসরাইল একটি অবৈধ সত্বা এবং এটি এই অন্জ্ঞলের জন্য হুমকি।এটি পুরো অন্জ্ঞলের জন্য একটি নিয়মিত হুমকি।আমরা এই হুমকির সাথে, এক সঙ্গে থাকতে পারি না। তাই চুড়ান্ত লক্ষ্য ইসরাইলের অস্তিত্বের অবসান ঘটাতে হবে।”
উল্লেখ যে,ইসরাইলের হাতে ১৯৯০ সালে হিজবুল্লাহর পূর্বতন নেতা আব্বাস আল-মাসাবি হত্যাকান্ডের পরে দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বর্তমান নেতা সৈয়দ হাসান নাসারাল্লাহ। তাঁর অধীনে রয়েছে দলের সাত সদস্যের শূরা কাউন্সিল এবং পাচঁটি উপ-কাউন্সিল,এগুলো হলো,রাজনৈতিক সমাবেশ,জিহাদ সমাবেশ,সংসদীয় সংসদ,কার্যনির্বাহী সভা এবং বিচারক সংসদ।হাসান নাসারাল্লাহ এসকল সংস্হাগুলোর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে থাকা দলীয় সংগঠন ও এর নেতাকর্মীদের তত্বাবধান,নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকেন।
 দক্ষিণ লেবাননের অংশ বিশেষ, বৈরুত এবং পূর্ব বেকা উপত্যকা অন্জ্ঞল সহ লেবাননের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্জ্ঞলগুলোর বেশির ভাগ অন্জ্ঞল নিয়ন্ত্রণ করছে হিজবুল্লাহ। এই সংগঠনের অধীনে দেশে-বিদেশে কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে বলে জানিয়েছে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ২০১৯ সালের অক্টোবরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,এই সংগঠনের বেশ কটি শাখা রয়েছে বিশ্বের কয়েকটি দেশে।
 হিজবুল্লাহ সংগঠনটি লেবাননভিত্তিক হলেও এটি অভ্যন্তরীণ সীমানা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয় বলে এক ইশতেহারে জানিয়েছে সংগঠনটি।ইশতেহারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সংগঠনের কার্যক্রমগুলো,বিশেষতঃআমেরিকাকে টার্গেট করে পরিচালিত। আমেরিকান হুমকি স্হানীয় বা নির্দিষ্ট কোনো অন্জ্ঞলে সীমাবদ্ধ নয় এবং এরকম হুমকির প্রতি-উত্তর অবশ্যই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়বে।” হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইল ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে।
২০১৮ সালের আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান অস্ত্র গোলাবারুদ ও অর্থ দিয়ে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এসময়কালে ইরান-হিজবুল্লাহকে নগদ সাতশো মিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়েছে বলে দাবি করেছে আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তর। এছাড়াও আইনি ব্যবসা, আন্তর্জাতিক অপরাধী উদ্যোগ ও প্রবাসী লেবানীজদের থেকেও হিজবুল্লাহ কয়েক মিলিয়ন ডলার পেয়ে থাকে বলে ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হিজবুল্লাহ তার সামরিক অভিযানের পাশাপাশি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে লেবাননের রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্হায় অংশীদারিত্ব করার সূযোগ পেয়েছে। যেমন,১৯৯২ সালের পর থেকে লেবাননের পার্লামেন্টে হিজবুল্লাহর সদস্য রয়েছে এবং ২০০৫ সাল থেকে মন্ত্রীসভায়ও দলের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে, দলটি সামাজিক পরিষেবাগুলোর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে,যার মধ্যে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যুব কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এর সবগুলোই শিয়া-অশিয়া লেবানীজদের নিকট থেকে হিজবুল্লাহর জন্য সমর্থন অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে,৩১ শতাংশ খ্রিষ্টান  ও ৯ শতাংশ সুন্নি মুসলমান হিজবুল্লাহ সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত পোষণ করে থাকে।
হিজবুল্লাহ একটি রাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্বেও তার কিন্তু নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। ১৯৮৯ সালে সৌদি আরব ও সিরিয়ার মধ্যস্থতায় তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের পনের বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিলো এবং ঐ চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে সশস্ত্র মিলিশিয়া রাখার অধিকার দেওয়া হয়েছিলো। ২০১৭ সালে দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট  ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর অধীনে দশ হাজার সশস্ত্র মিলিশিয়া রয়েছে, যারা এ্যাক্টিভ এবং কমপক্ষে কুড়ি হাজার রিজার্ভ মিলিশিয়া রয়েছে। হিজবুল্লাহর হাতে ক্ষুদ্রাস্ত্র,ট্যাংক, ড্রোনস এবং অন্যান্য নানা ধরণের লং-রেন্জের রকেটসমূহ মজুত রয়েছে বলে ঐ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে,ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা স্টাডিজ ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রি,জেনারেল আসফ ওরিয়ন বলেছেন, হিজবুল্লাহ -“বেশিরভাগ দেশ যেরকম অস্ত্র ধারণ করে তার চেয়েও বড় একটি অস্ত্রাগার সংরক্ষণ করে থাকে।”
সমালোচকরা বলছেন যে,হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৫৯ প্রস্তাবটি লংঙ্গন করেছে,যা ২০০৪ সালে গৃহীত হয়েছিলো। ঐ প্রস্তাবে লেবাননের সমস্ত মিলিশয়াদির বিলোপ ও নিরস্ত্রীকরণের আহবান জানানো হয়েছিলো। কিন্তু এটি সত্য যে,হিজবুল্লাহর মিলিশিয়াদের নিরস্ত্রীকরণ করা হয়নি বা নিরস্ত্রীকরণ  করা সম্ভব হয়নি।
হিজবুল্লাহর প্রধান শত্রু হলো ইসরাইল এবং ২০০৯ সালের দলের ইশতেহারে ইসরাইলি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিলো। তাই মাঝেমধ্যেই ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে থাকে হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ারা।২০০৬ সালে অবশ্য হিজবুল্লাহ মিলিশিয়া ও ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে এক মাসব্যাপী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো।
এদিকে, আমেরিকা হিজবুল্লাহকে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদী হুমকি হিসেবে দেখে থাকে,তাই এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে আমেরিকা। আমেরিকার মিত্রদেশগুলোও আমেরিকাকে অনুসরণ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,হিজবুল্লাহর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক প্রসারিত হচ্ছে এবং শক্তি সন্চয় করে চলেছে।মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে হিজবুল্লাহ একটি প্রভাবক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।এভাবেই ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহ সংগঠন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক আলোচিত চরিত্র হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্র না হয়েও একটি রাষ্ট্রের ন্যায় নিজস্ব সশস্ত্র মিলিশিয়া সংরক্ষণ করছে।
লেখক:আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.