অনিশ্চয়তায় বাড়ছে অসন্তোষ

ক্ষুধার কাছে আইন, ক্ষোভের কাছে শৃঙ্খলা তুচ্ছ হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত মানুষের মত বেপরোয়া এবং সাহসী আর কেউ হতে পারে না। আর ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় সান্ত্বনার বাণী, সতর্ক বার্তা, ভয় বা হুমকি। কী হবে, কী খাবে আগামীকাল? ঘর ভাড়া বা দোকানের বাকি পরিশোধ করবে কীভাবে? চাকরি থাকবে কিনা, বেতনটা পাবে কিনা, পেলে কত পাবে? আগে বেতন যা পেত তা দিয়েই কোনক্রমে চলা মুশকিল হয়ে যেত, বেতন কমে গেলে বা কেটে নিলে কীভাবে চলবে এই অনিশ্চয়তা গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে বেপরোয়া করে তুলছে। প্রতিদিন রাস্তায় বিক্ষোভ হচ্ছে। পথে নামছে হাজার হাজার শ্রমিক। পুলিশ শ্রমিকদেরকে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করছে, কিছু ক্ষেত্রে লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটছে তবে এখনো বিক্ষোভ বড় কোনো সহিংসতার রূপ নেয়নি। কিন্তু এই পরিস্থিতি কতদিন থাকবে তা বলা মুশকিল। কখনো কখনো শিল্প পুলিশ বলছে কিছু শ্রমিক নেতার উস্কানিতে নাকি শ্রমিকরা রাস্তায় নামছে। কিন্তু এটা বলছে না যে মার্চ মাসের বেতন অনেক কারখানায় পায়নি, এপ্রিল মাসের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। মূল সত্যকে আড়াল করে সমস্যা যে সমাধান করা যায় না তা তো অতীতে প্রমাণিত হয়েছে বারবার। এরপরও সেই একই ধরনের কথা, বিবৃতি দেয়া চলছে। হয়তো দু’এক দিনের মধ্যেই বহুল কথিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করা শুরু হবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যতবার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার হয়েছে তার কোনোবারই ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়নি বা উদ্ঘাটন করা হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল পরবর্তীতে তাদের অনেককেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্নেহ ও সমীহ পেতে দেখা গিয়েছে।

করোনা সারা বিশ্বে মানুষের সম্পর্কের নতুন ধরন তৈরি করে দিচ্ছে। পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলে হাত মেলানো, জড়িয়ে ধরা, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া সহ আদর স্নেহ, ভালবাসার প্রকাশ ঘটানোর জন্য কত ধরনের আচরণ মানুষ করতো যা এখন প্রায় নিষিদ্ধ। আবেগের প্রকাশ আজ আতংকের রূপ নিয়েছে। কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে এই সব স্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতামূলক নির্দেশনার কোনটাই যেন শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

প্রথমে শোনা গেল বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টসের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। গত বছর গার্মেন্টস থেকে রফতানি আয় এসেছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশের বেশি। ফলে এই খাতের বিপর্যয় পুরো রফতানি আয়ে ধস নামিয়ে দেবে এ আশংকা সবার। গার্মেন্টস মালিকরা হিসাব করে বললেন তিন বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে। যদিও অনেকে বলছেন, বাতিল নয় আপাতত স্থগিত হয়েছে। চৌকস মালিক নেতৃবৃন্দ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, রফতানি স্থগিত করা মানে এক অর্থে বাতিল করাই। কিন্তু সাধারণভাবে কয়েকটা প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খেতে থাকলো: যদি ধরেও নেয়া হয় তিন বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে, তাহলে তা মোট রফতানির কত অংশ? এর জন্য চিন্তা হতে পারে কিন্তু দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ার ব্যাপার কি আছে? আবার দুশ্চিন্তাই যদি করতে হয় তাহলে গার্মেন্টস খুলে দেয়ার জন্য এত তড়িঘড়ি করার কারণ কী? সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি এবং যখন পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ তখন এপ্রিলের ৪ তারিখে সারাদেশ থেকে শ্রমিকদেরকে কর্মক্ষেত্রে টেনে আনার কী কারণ?

গার্মেন্টস খুলবে এ ঘোষণা শুনে শ্রমিকরা যে যেভাবে পারে ছুটে এসেছিল তাদের কর্মক্ষেত্রে। কেউ কেউ সন্তান কাঁধে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসেছে, এ খবর প্রচার মাধ্যমে আমরা দেখলাম। শারীরিক কষ্ট, মানসিক উদ্বেগ ছাপিয়ে আর একটি কথা না বললেই হয় না তাহলো শ্রমিকদের ঢাকায়, গাজীপুরে, আশুলিয়ায় আসার খরচ। ১০ লাখ শ্রমিক যদি এসে থাকে এবং জনপ্রতি এক হাজার টাকা যদি আসার জন্য ব্যয় হয়ে থাকে তাহলেও তো ১০০ কোটি টাকা বেরিয়ে গেল এইসব দরিদ্র শ্রমিকদের পকেট থেকে। এবং তারা এসেই শুনল কারখানা খুলছে না, দুই ধাপে ছুটি বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এর পর শুরু হল তাদের অপেক্ষার পালা। শ্রমিকরা মার্চ মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত কাজ করেছিল সেই মজুরির আশায় আর না এলে যদি চাকরি হারায় এই আশঙ্কায় ছুটে এসেছে কর্মক্ষেত্রে। ২৬ মার্চ যখন তারা বাড়ি গিয়েছিল তখন তারা মার্চ মাসের মজুরি পায়নি। ফলে হাতে তেমন কোনো টাকা পয়সা ছিল না। যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় যাতায়াত খরচ বহন করতে গিয়ে ধার দেনা করতে হয়েছে। বাড়িভাড়া বাকি, মুদি দোকানে বাকি এসব পরিশোধ করবে কীভাবে যদি মজুরি না পায়? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এপ্রিল মাসের মজুরি কখন পাবে, কতটুকু পাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। এপ্রিল মাসে যারা অনুপস্থিত ছিল তারা পাবেন মজুরির ৬৫ শতাংশ। যদিও অনুপস্থিতির কারণ সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি কিন্তু মজুরি হারালো শ্রমিকরা। এপ্রিল, মে, জুন মাসের বেতন ভাতা পরিশোধের জন্য সরকার ২ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে গার্মেন্টস মালিকদের এবং তা কার্যকর করা শুরুও হয়েছে। তা সত্ত্বেও মজুরি পরিশোধ নিয়ে চলছে দীর্ঘসূত্রতা।

জানা মতে, মে মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত শ্রমিকরা এপ্রিল মাসের মজুরি পায়নি। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে গাজীপুর, আশুলিয়া- সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনার ৭ হাজার ৬০২ টি শিল্প কারখানার মধ্যে ২ হাজার ১৯০ টি গত মাসের মজুরি পরিশোধ করেছে। বিজিএমইএর ১ হাজার ৮৮২ সদস্য কারখানার মধ্যে মজুরি দিয়েছে ৫৬১ টি। বিকেএমইএর ১ হাজার ১০১ টি সদস্য কারখানার মধ্যে মজুরি দিয়েছে ৫৬১ টি, বিটিএমইএর ৩৮৯ টি সদস্য কারখানার মধ্যে ১২৬ টি বেতন পরিশোধ করেছে। আর বিজিএমইএর ৫৪ এবং বিকেএমইএর ৪২ সদস্য কারখানা এখন পর্যন্ত মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করেনি।

এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই আসছে ঈদ। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ঈদের বোনাস শ্রমিকরা পাবেন ৫০ শতাংশ। শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন এবং মন্ত্রী অনুরোধ জানিয়েছেন শতভাগ বোনাস দেয়ার। মালিকদের পক্ষ থেকে তা কার্যকর করার সম্ভাবনা কম। ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালতে পারে এই বোনাস বিতর্ক। বোনাস কোনো মাসিক হিসাবের বিষয় নয়। সারা বছরের কাজের পরিপ্রেক্ষিতে উৎসবকালীন সময়ে বোনাস দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার অজুহাতে শ্রমিকদের প্রাপ্তির সব হিসাব যেন পাল্টে যাচ্ছে। যদিও শ্রমিকরা যা কিনবে তার সব কিছুরই দাম বাড়ছে। খাদ্য, শিশু খাদ্য, ওষুধ সব কিছুর দাম বাড়ানো হচ্ছে, বাড়িভাড়া বিদ্যুৎ বিল কমেনি, কিন্তু আয় গেল কমে। সংসার চালানোর হিসাব মেলাবে কীভাবে শ্রমজীবী মানুষ?

একদিকে কাজ করেও সংসার চালানোর হিসাব মেলাতে পারছেন না একদল শ্রমিক, অন্যদিকে কাজ হারানো এবং বেকারদের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে দিন দিন। ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩৬ লাখ শ্রমশক্তির অন্তর্ভুক্ত। বাকি ৪ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে। শ্রমশক্তির অন্তর্ভুক্তদের মধ্যে ৬ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার মানুষ কাজ করছেন আর ২৬ লাখ ৮০ হাজার কর্মক্ষম মানুষ বেকার। এ সংখ্যা এখন কত দাঁড়িয়েছে তা ২০১৯ এর জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ হলে জানা যাবে। কিন্তু সাদা চোখেই চাকরি প্রত্যাশীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবছর ২২ লাখের মত নতুন কর্মপ্রত্যাশী শ্রমবাজারে আসে। ৭ থেকে ৮ লাখ পাড়ি জমায় বিদেশে বাকিরা কাজের সন্ধানে ঘুরতে থাকে। এরা একদিকে যেমন সংরক্ষিত শ্রমশক্তি অন্যদিকে সস্তা শ্রমের যোগানদাতা। এ কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা শ্রমশক্তি আর দ্রুত গতিতে ধনী হওয়ার দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। করোনা ধনী হওয়ার গতি কমাতে না পারলেও শ্রম শক্তিকে আরও সস্তা এবং শ্রমিকদেরকে আরও অসহায় করে ফেলছে।

দেশের শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশের বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। পরিবহণ, নির্মাণ, হকার, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, ছোট দোকানদার ও দোকান কর্মচারি, হোটেল শ্রমিক, সেলুন, স্বর্ণ শিল্পী, দলিত সম্প্রদায়ের কর্মজীবী, পাদুকা শ্রমিকসহ বহু খাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে তারা। তাদের মোট সংখ্যা সাড়ে পাঁচ কোটির মত। প্রায় দেড় মাস কর্মহীন থেকে তাদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। কতই বা সঞ্চয় ছিল তাদের! সেই সীমিত সঞ্চয় শেষ, সবার অবস্থা একই রকম ফলে ধার দেনা করার উপায় নেই। এখন জীবন বাঁচাতে যে কোনো ঝুঁকি নিতে পারে তারা। এদের মধ্যে ৫০ লাখ জনকে এককালীন আড়াই হাজার টাকা নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে ১৪ মে। বাকিদের কী হবে? ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, ক্ষুধার আতংক আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদেরকে কাজের সন্ধানে পথে নামতে বাধ্য করবে। এর সঙ্গে যদি বঞ্চনার ক্ষোভ যুক্ত হয় তা হলে পরিস্থিতি চরম খারাপের দিকে যেতে পারে। সময় থাকতেই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাস এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অর্থ ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক:    রাজেকুজ্জামান রতন , বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.