মোঘল সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের একটি উপযুক্ত সময় নির্বাচন করতেই বাংলা সনের প্রবর্তন করেন প্রচলিত ইতিহাস তাই বলে। তবে সর্বজন গ্রহণযোগ্য মত ও প্রামাণ্য দলিল ভিন্ন কথা বলছে। পণ্ডিতদের অনেকেই বাংলা সন প্রবর্তনের কৃতিত্ব আকবরকে দিতে চান না। যদিও তাদের মতও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বেড়াজালে বন্দি বলে অন্য পণ্ডিত কর্তৃক সমাদৃতও হয়নি। তবে বাংলা সনের বিবর্তনের ইতিহাস বলে কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ অথবা কোনো সুলতানি বা মোঘল শাসক নয়, বাংলা সনের মুল স্রষ্টা বাঙালি নিজেই। ইতিহাসের নানা বাঁকে বাংলার সাধারণ মানুষই বাংলা সনকে আপন সন্তানের মতো পরম মমতায় আগলে রেখেছে বলেই হাজার বছর পরও বাংলা সন স্ব মহিমায় টিকে আছে। তাই বাংলা নববর্ষের মতো বাংলা সন বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। বাংলার মাটি আলো বাতাস জলে বিকশিত হয়ে আজকের বাংলার সন পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে কমবেশি বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন মোগল সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সনই কালের পরিক্রমায় বাংলা সনের মর্যাদা পেয়েছে। এই মতবাদের মধ্যেও আবার দুটি পক্ষ আছে। সম্রাট আকবর– ক) রাজস্ব আদায়ের জন্য যে সনের প্রবর্তন করেন তাই বাংলা সন। খ) দ্বীন–ই–ইলাহী ধর্মকে কেন্দ্র করে যে সনের প্রবর্তন করেন তাই বাংলা সন। দ্বীন–ই–ইলাহীর সভ্যরা ওই ধর্মের অনুষ্ঠানাদি পালনে একটি সাল প্রচলনের দাবি করলে সম্রাট আকবর এই সনের প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর তার প্রবর্তিত ধর্মের অনুষ্ঠানাদি পালনার্থে একটি সনের প্রচলন করেছেন তা সত্য হলেও সেই সনই বাংলা সন এ মত নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে।
আর রাজস্ব আদায়ের ছুতো ধরে বাংলা সন প্রবর্তনের কৃতিত্ব আকবরকে দিয়ে দেয়া হলেও আকবর প্রবর্তিত ওই সন তার শাসনামলে বাংলা অঞ্চলের জন্য কতটুকু প্রযোজ্য ছিল সেই বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ সম্রাট আকবরের শাসনামলে সমগ্র বাংলার উপর মোঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আফগান ও বারভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আকবরের সেনাপতিদের সাল ও তারিখ ধরে রাজস্ব আদায়ের ফুসরতই ছিল না বললেই চলে। তাই বাংলায় রাজস্ব আদায়ের জন্য আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন এমন মত ইতিহাসের কষ্টি পাথরে যাচাই করে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া কঠিন।
অবশ্যই আরেক দল পণ্ডিত বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবর নন; এই সনের উৎপত্তি হিজরি সন থেকে হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন। তবে হিজরি সন থেকে বাংলা সনের উৎপত্তি হয়েছে এই মতকেও এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতে চান এমন পণ্ডিতেরও অভাব নেই। প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত বৌদ্ধশাসক হর্ষবর্ধন অথবা অন্য খ্যাতিমান শাসক শশাঙ্ককেও বাংলা সনের জনক হিসেবে স্বীকৃত দেন অনেকে। আর যারা হিন্দু শাসকই বাংলা সনের প্রবর্তক মনে করেন তারা সেন শাসক লক্ষণ সেনের উপর ভর করেন। তবে গোলাম মুরশিদের ‘বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখ (একটি আলোচনা)’ প্রবন্ধের এই বক্তব্য তাদের জন্য চপেটাঘাত বলে মনে হতে পারে: ‘লক্ষণ সেন নিজে একটি সনের প্রচলন করেন। এই লক্ষণাব্দ এক সময় সমগ্র বাংলায় চালু ছিলো। অর্থাৎ বাংলা সন থাকলেও তা লুপ্ত হয়েছিল।’
মুরশিদের ওই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, লক্ষণ সেন বাংলা সন প্রবর্তন তো করেননি বরং তার প্রচলিত লক্ষণাব্দের ফলে বাংলা সনের বিলুপ্তি ঘটে। তবে ওই বক্তব্য থেকে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, বাংলা সনের উৎপত্তিতে মুসলিম শাসকের কৃতিত্ব না থাকলেও পুনঃপ্রচলন যে তাদের দ্বারা হয়েছিল তা নিশ্চিত। কারণ লক্ষণ সেনের পরে বাংলা মুসলিমরাই শাসন করেন। লক্ষণ সেনের সময় যদি বাংলা সনের বিলুপ্তি ঘটে; তবে আমরা তা ফেরৎ পেলাম কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে হয়ত মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসের কানাগলিতে হাঁটলে পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদের ‘বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখ’ প্রবন্ধের বক্তব্য গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আজ আর এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন মুসলমান বাদশাহ–আমীররা অগ্রণী ছিলেন, তেমনি প্রচলিত বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটেছিল তাদের হাতেই।’
তবে বাংলা সন কোন মুসলিম শাসক প্রবর্তন করেছিলেন তা নিয়েও মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অনেক গবেষক বাংলার হোসেনশাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলা–উদ–দীন হোসেন শাহকে বাংলা সনের জনক বলে মনে করেন। অবশ্যই শামসুজ্জামান খান তার ‘বাঙালি ও বাংলা সন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বাংলা সন চালু করেন মুর্শিদাবাদের নবাবেরা; হয়তো মুর্শিদকুলী খাঁ। তবে হোসেন শাহ বা মুর্শিদকুলী খাঁ বাংলা সনের প্রবর্তক এমন প্রামাণ্য দলিল ঐতিহাসিকদের হাতে নেই।
বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে নানা বিতর্কের নানা পথ পাড়ি দিয়ে আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত সম্রাট আকবরের নিকটই ফেরৎ যেতে হবে। পলাশবরণ পালের সাল–তারিখের ইতিহাস গ্রন্থের ভাষায়: ‘কুড়ি–পঁচিশ বছর আগে ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দটার চল ছিল না, তখন বলা হতো ‘সাল’ বা ‘সন’। পশ্চিম ভারতে কেউ বিক্রম সংবৎকে বিক্রম সাল বা বিক্রম সন বলে না। নেপালে বুদ্ধ সংবৎকে কেউ বুদ্ধ সাল বলে না। বাংলায় তাহলে ‘সাল’ বা ‘সন’ বলা হয় কেন? এখানে মনে রাখতে হবে, সাল কথাটা ফারসি, সন কথাটা আরবি। এ থেকে মনে হয়, হিজরি ক্যালেন্ডার থেকেই কোনোভাবে উদ্ভূত আমাদের ‘বাংলা অব্দ’ বা ‘বাংলা সাল’। তাই যদি হয়, তাহলে আকবর থিউরির চেয়ে বিশ্বাস্য অন্য কোনো থিউরির সন্ধান পাওয়া মুশকিল।’ ডক্টর কাজী দীন মুহাম্মদ এবং ব্রতীন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন।
তবে আমরা বলতে চাই, সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সাল বা সনই বর্তমান প্রচলিত বাংলা সন নয়। সম্রাট আকবর যে সালের প্রবর্তন করেছিলেন তা সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়েছে, সংস্কার হয়েছে। সম্রাট আকবর ওই সাল কেবলমাত্র বাংলার মানুষের জন্যই প্রচলন করেননি। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের জন্যই প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ওই সাল মোগল সাম্রাজ্যের অনেক রীতি–নীতি, উৎসবের মতো ভারতবর্ষের প্রায় সব এলাকা থেকে বিলুপ্ত ঘটে। সম্রাট আকবর প্রবর্তিত সাল হিন্দু–বৌদ্ধ–মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ বাঙালিরা গ্রহণ করেছিল বলেই এখনও পর্যন্ত তা বাংলায় টিকে আছে। আর সাধারণ মানুষের কাছে এই সালকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত বাংলার প্রাদেশিক শাসকরাই মুল ভূমিকা রেখেছিলেন। এক্ষেত্রে গোলাম মুরশিদের বক্তব্য যথার্থ বলে মনে হয়। তার ভাষায় : ‘আমরা আকবর ব্যতীত অন্য কোনো রাজা বাদশার নামের সঙ্গে বাংলা বছরের যোগাযোগ ঘটাতে চাইনে। কেননা সেরকম কোনো ঐতিহাসিক দলিল আজো আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু আকবর এর প্রচলন করেন নিঃসন্দেহে তাও বলা চলে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বঙ্গাব্দের জন্ম একটি বিশেষ দিনে হয়নি, এই হচ্ছে আমাদের ধারণা। এলাহী সন হয়তো আকবরের জীবিতকালে বাংলাদেশে আদৌ সর্বজনমান্য সনে পরিণত হয়নি। পরে ধীরে ধীরে এই সন বাঙালীদের সকলের এমন কি পূজোর ব্যাপারে, স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমাদের এ অনুমান সত্য হলে বঙ্গাব্দ প্রবর্তনার কৃতিত্ব আকবরের চেয়ে বঙ্গদেশে যে সব শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন, তাদের বিশেষ একজন অথবা সম্মিলিত কয়েকজনের বেশি প্রাপ্য। কেননা তার অথবা তাদের চেষ্টায় এলাহী সন বঙ্গাব্দে রূপান্তরিত হয়।’
পরিশেষে, বাংলা সন যে আজও টিকে আছে তার মুল কৃতিত্ব এদেশের সাধারণ মানুষের, যারা এই সনকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছেন। নিজের জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেন বলেই ইংরেজি সালের আধিপত্যের যুগে, প্রায় দুইশত বছর ইংরেজদের উপনিবেশিক শাসনের পরও আজও বাংলা সন স্ব–মহিমায় টিকে আছে। তাই বর্তমান যে বাংলা সনকে কেন্দ্র করে নববর্ষের উৎসবে আমরা মেতে উঠছি তা যে হিন্দু–বৌদ্ধ বা কোনো মুসলিম শাসকের নয়, বাংলার সাধারণ মানুষের নিজস্ব সে কথা বলা যেতেই পারে।
*মো: আবুসালেহ সেকেন্দার: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। salah.sakender@outlook.com

