ওসমান গনি। আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতির প্রাক্তন সভাপতি। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি প্রতিষ্ঠায় তার অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতিতেও।
একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মানসম্মত বইয়ের প্রকাশক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন তিনি। বাংলাদশের সৃজনশীল প্রকাশনার বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ এবং সমিতি পরিচালনায় প্রকাশকদের করণীয় সম্পর্কে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কবীর আলমগীর
সারাবাংলা: একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ অংশ নেয়া বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সদস্যসহ বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা যেভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখিন হলেন তার জন্য সমিতি কতটুকু দায়ী বলে আপনি মনে করেন?
ওসমান গনি: অবশ্যই সমিতির দায়ভার রয়েছে এই অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য। আপনারা জানেন, এ বছর বইমেলার পরিসর বৃদ্ধি পেয়ে ৮ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে আয়োজিত হয়েছে। এটা অপ্রয়োজনীয় ছিল বলেই মনে করি আমি। বাংলাদেশে নিয়মিত যারা বই প্রকাশনা করে অর্থাৎ যারা পেশাদার প্রকাশক তাদের নিয়ে এবারের বইমেলা আয়োজিত হয়নি। এ বছর বইমেলায় অপেশাদার এবং ভুঁইফোড় বইবিক্রেতা, সিজনাল পুস্তক ব্যবসায়ী ঢুকে পড়েছে। বইমেলা আয়োজক কমিটিতে যেহেতু সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির প্রতিনিধি আছে তাই তারা এই দায় এড়াতে পারেন না। দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রকাশক নেতৃত্বের অভাবেই এই সমস্যাটি হয়েছে বলেই আমি মনে করি।
আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই, অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে পেশাদার প্রকাশকরা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। মেলার পরিসর বেড়ে এবার ৮ লাখ বর্গফুট জায়গা দখল করেছে। ৬০০-এর অধিক প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয়! এত প্রকাশক কোথা থেকে এলো? দুই সমিতির সৃজনশীল প্রকাশকের সংখ্যা ৩০০-এর বেশি হবে না। এবারের বইমেলায় স্টলবিন্যাস নান্দনিক হলেও মৌসুমী/সৌখিন/ভূঁইফোড়/ড্রয়িংরুম প্রকাশকদের ভিড়ে পেশাদার প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। পেশাদার প্রকাশকদের জন্য প্রথমে স্টল বরাদ্দ করে, প্রয়োজনে অন্যদের আলাদা জোনে স্টলবরাদ্দ করতে হবে। এটা শুধু দাবি নয়, এটা পেশাদার প্রকাশকদের অধিকার। আগামী বইমেলায় এই অধিকার আমরা প্রতিষ্ঠা করব।
সারাবাংলা: শুধু অমর একুশে গ্রন্থমেলা নয় সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আয়োজিত প্রায় প্রতিটি বইমেলার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন প্রকাশকরা! আপনার অভিমত?
ওসমান গনি: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের বইমেলাগুলো বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সহযোগিতায় আয়োজিত হয়ে থাকে। আমরা যখন সমিতির দায়িত্বে ছিলাম তখন এই মেলাগুলোতে সমিতির পক্ষ থেকে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রেরণের মাধ্যমে আমরা বইমেলাগুলো প্রকাশকবান্ধব হিসেবে আয়োজনের চেষ্টা করতাম। একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণায় আমাদের সমিতির একটি নিজস্ব টিম কাজ করতো। কিন্তু বিগত দুই বছরে সমিতির পক্ষ এই ধরনের কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি।
আমি এই ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন উদাহরণ এবং মডেল মেলা হিসেবে বাগেরহাটে আয়োজিত বইমেলার প্রসঙ্গ টানতে পারি। এই বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রকাশক ব্যবসায়িকভাবে দারুণ সফলতা পেয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা, লেখক-কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবিসহ স্থানীয়ভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় এমন সফল বইমেলা আমরা আয়োজন করেছি আমরা বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পক্ষ থেকে। এই মেলাটিকে মডেল হিসেবে ধরে যদি আমরা কাজ করতে পারি তাহলে প্রকাশকগণ অবশ্যই বইমেলার সুফল লাভ করবেন। এ ক্ষেত্রে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবী নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
একটি বাণিজ্যিক সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচনে আমরা যদি ভুল করি। অদক্ষ, অযোগ্য এবং আত্মকেন্ত্রিক মানুষ দিয়ে সমিতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সমিতি পরিচালনায় প্রয়োজন দক্ষ এবং মেধাবী নেতৃত্ব। আশা করি আমাদের সমিতির সাধারণ সদস্যরা ভবিষ্যতে ভেবেচিন্তে সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।
সারাবাংলা: একের পর এক বইমেলায় ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের ব্যবসার উন্নয়নকল্পে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাই।
ওসমান গনি: আপনারা জানেন, বাংলাদেশে এখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন চলছে। এই আয়োজনের অংশ হিসেবে আমরা মুজিব শতবর্ষে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সৃজনশীল বই কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ করার দাবি জানাচ্ছি। এ ছাড়া গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই কেনার বাজেট কমপক্ষে ১০ গুণ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে শিক্ষিত জাতি গঠনে পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি বলেই মনে করি। আমরা জানি বঙ্গবন্ধুর লেখা একাধিক বই আছে, তার কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনারও অনেকগুলো বই আছে। এছাড়া দেশ পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আছেন অনেক মন্ত্রী-আমলাসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আমাদের আমাদের পরিচিত লেখকগণ। তাই বইমনষ্ক জাতি হিসেবে আমরা যদি বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আর বাংলাদেশের বই প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত সমিতিগুলোকে সমন্বিত স্বরে এই দাবিগুলো তুলতে হবে। দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের পক্ষে এইসব দাবি আদায় করা কঠিন কোনো ব্যাপার নয় বলেই মনে করি আমি।
সারাবাংলা: এই মাসেই বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাচন। বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনার অগ্রগতিতে সমিতির ভূমিকা ও করণীয় সম্পর্কে জানতে চাই।
ওসমান গনি: এই সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের সদস্য আমি। বাংলাদেশের সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের নিয়েই এই সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সমিতির অন্যতম উদ্দেশ্যগুলো ছিল :
– সৃজনশীল প্রকাশনার বিকাশ সাধন এবং সৃজনশীল প্রকাশকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রসার এবং প্রকাশনায় পেশাদারিত্ব জোরদার করা। দেশের সর্বত্র বিশেষভাবে জেলা, থানা ও গ্রাম পর্যায়ে এবং স্কুল থেকে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবধি সরকারি-বেসরকারি পাঠাগার প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করা, বিদ্যমান পাঠাগারসমূহের বিকাশে সচেষ্ট হওয়া এবং পাঠাগারে পুস্তক ক্রয়ে সুষ্ঠ বিধি ও স্বচ্ছতা প্রবর্তন করা। দেশে পাঠপ্রবণতা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা পালন এবং ইউনেস্কো কর্তৃক উল্লেখিত রিডিং সোসাইটি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হওয়া। লেখক, সম্পাদক, চিত্রশিল্পী, মুদ্রক, বাঁধাইকারক প্রমুখ পেশাজীবীর সঙ্গে প্রকাশকদের সম্পর্ক নিবিড় করা; লেখক-প্রকাশকদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন ও প্রতিপালনে সহায়তা করা। প্রকাশনা সহায়ক সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে সমর্থন-সহায়তা যোগানো ও সরকারি সহায়তা বৃদ্ধিকল্পে সচেষ্ট হওয়া। বাংলাদেশ ও বিদেশে প্রকাশনা-সহায়ক সেমিনার, বইমেলা, সাহিত্য সম্মেলন ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। বিদেশে বাংলাদেশের বইয়ের বাজার প্রসারে উদ্যোগী হওয়া এবং প্রকাশনা সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক গড়া। গ্রন্থউন্নয়নের অনুকূলে তথ্যাদি প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে লিফলেট, পুস্তিকা, ক্যাটালগ ইত্যাদি প্রকাশ করা।
কিন্তু সম্প্রতি সমিতির দিকে তাকালে আমরা ব্যথিত হই। কারণ সমিতির মূল্য উদ্দেশ্য, লক্ষ্য আর আদর্শ থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি ক্রমশ। ইদানিং লক্ষ্য করছি সমিতিকে একটি পারিবারিক গোষ্ঠীতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই অপচেষ্টা বন্ধ করতে না পারলে আমাদের প্রকাশকদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা যে সমিতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম তা নষ্ট হয়ে যাবে।

সুত্র, সারাবাংলা
শুদ্ধস্বর/বি এস

