মাখন ভাইয়ের মহাপ্রয়ান।স্মৃতিতে যা এখনো ভেসে উঠে:
চিকিৎসার জন্য ১৯৯৩’সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠকদের দুই দিকপাল তখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছিলেন।একজন ডাকসূ’র সাবেক ভি পি আ স ম আবদুর রব নিউইয়র্কে।অন্যজন ডাকসূ’র জি এস আবদুল কুদ্দুস মাখন ফ্লোরিডাতে।মাখন ভাইয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন ছিলো।স্থানীয়রা চাঁদা তুলে উনার চিকিৎসার জন্য আপ্রান প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো।কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিলোনা।কিন্তু আমাদের জাতির দূর্ভাগ্যই বলতে হবে-কি সরকার বা বাংলাদেশের কোন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সম্পদশালী কোন ব্যক্তি এগিয়ে আসেনি।নিউইয়র্কে রব ভাইয়ের সফল অস্ত্রোপাচারের পর ডাক্তারদের পরামর্শে সানফ্রানসিসকোর বিখ্যাত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে বললে উনি সানফ্রানসিসকোর কাছাকাছি আমার বাসায় অবস্থান করছিলেন।তখন ল্যান্ডফোন ছাড়া যোগাযোগের অন্য কোন মাধ্যম ছিলোনা।রব ভাই আমার হাতে একটা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে বললেন-যে কোন মুহুর্তে এই নাম্বার থেকে কল আসলে বিন্দুমাত্র দেরী না করে আমাকে জানাবে।একদিন আমেরিকার পশ্চিম উপত্যকার সময় রাত দূ’টার দিকে হঠাৎ কল আসে।অপর প্রান্ত থেকে বললেন-“আমি হাঁসু আপা (মাখন ভাইয়ের সহধর্মিনী)বলছি।”আপনাদের মাখন ভাই আর নেই।(তখন ফ্লোরিডাতে ভোর পাঁচটা)রব ভাইকে একটু দেবেন ভাই?তাৎক্ষনিকভাবে খবরটি বজ্রপাতসম মনে হয়েছিলো।সম্বিত ফিরে পেলে রব ভাইকে ঘূম থেকে জাগিয়ে হাঁসু আপার কলের কথা বললে উনি লাফিয়ে ঘূম থেকে উঠলেন।টেলিফোনে কথা বললেন।উনি নির্বাক।চোখ থেকে অবিরত অশ্রু বর্ষিত হচ্ছে।হাঁসু আপাকে বেশ কিছু নির্দেশ দিলেন।আমাকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত সকলের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন।নিজেও দেশে অনেকের সাথে কথা বললেন।
আমি তখন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক যথাক্রমে ফারুক বখত চৌধূরী,এহসানুল হক মিলন এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক যথাক্রমে নূরুল ইসলাম অনু,আবদুস সালাম ভাইদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি।অবশ্য তখনও আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ভোরের আলো দেখা দেয়নি।জাসদের মাসুম মোহাম্মদ মহসীন,আবদুল মোসাব্বির,এডভোকেট মুজিবুর রহমান ভাইসহ অনেকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি।পরে প্রয়াত জাহাঙ্গীর আলম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি।উনি একসময় জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।উনি বললেন-উনি মাখন ভাইয়ের নবীনগরের একই এলাকার সন্তান।আমাকে বললেন-কোন চিন্তা করোনা।সব দায়িত্ব আমার।আমি সবার সাথে যোগাযোগ করে একটা ব্যবস্থা গ্রহন করবো।রব ভাইকে সামলাও।পরবর্তিতে জাহাঙ্গীর ভাই সম্ভবত: কাউকে পাশে না পেয়ে বাংলাদেশ বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার আবদুন নূরের শরণাপন্ন হলে(উনি তখন সবেমাত্র জাপান থেকে বদলী হয়ে নিউইয়র্কে)উনি লাফ দিয়ে উঠে বলেন-আমি জনযুদ্ধের সময় মাখন ভাইয়ের সেক্টরে ছিলাম।আমার চাকরী চলে যাক-ক্ষতি নেই।আমি সব ব্যবস্থা গ্রহন করছি।কোন চিন্তা করবেননা।পরবর্তি ঘটনা সকলের জানা।তবে সেদিনের হাঁসু আপার কাতর ও কম্পিত অসহায় কন্ঠ আমি কোনদিনই ভূলিনি।পরম করুনাময়ের কাছে মাখন ভাইয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
সিকদার গিয়াস উদ্দিন, লেখক কলামিস্ট ।
শুদ্ধস্বর/এস এ কে

