বিশ্বে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি : কীসের ইঙ্গিত

অ্যাডভোকেট আনসার খান:দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিটিউট ফর স্ট্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা ব্যয় চার শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে,-যা বিগত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম উল্লম্পন। বিশেষ করে, আমেরিকা ও চীনের বিপুল সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা ব্যয় আগের বছরগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইআইএসএস বলেছে যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বৃদ্ধি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নতুন সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহ ও উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা এবং উইক্রেন থেকে লিবিয়ায় দুযোর্গপূর্ণ সংঘাত ও দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীনের সামরিক আধুনিকায়ন, বিশেষ করে নতুন হার্ড-টু-ডিটেক্ট হাইপারসনিক মিসাইলস অস্ত্র উৎপাদনের চেষ্টা করার বিষয়টা আমেরিকাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এবং চীনের এই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কর্মসূচির মোকাবিলা করতে গিয়ে আমেরিকাও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে বলে আইআইএসএস তার সমীক্ষায় জানিয়েছে।
এই সংস্থার বার্ষিক-‘মিলিটারী ভারসাম্য’-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০১৮-২০১৯ সালে আমেরিকা প্রতিরক্ষা খাতে এককভাবে ৫৩.৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে, যা বৃটেনের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়ে বেশি ছিলো। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে ২০১৮ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমেরিকা ও চীন উভয়েই প্রতিরক্ষা ব্যয় ৬.৬% শতাংশ করে বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার সাথে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ইউরোপ সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে ৪.২% শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরো দেখানো হয়েছে যে, প্রতিরক্ষা বাজেট ৬.৬% শতাংশ বৃদ্ধির ফলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৮৪.৬ বিলিয়ন। অন্যদিকে, ৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে চীন এবং এর ফলে দেশটার মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮১.১ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে, আমেরিকান প্রতিরক্ষা ব্যয় চীনের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইআইএসএস-এর সমীক্ষা অনুসারে-রাশিয়া প্রতিরক্ষা-বিনিয়োগ ব্যয়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে রয়েছে, তবে এর প্রতিরক্ষা বাজেট আমেরিকার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ ছোট।
মিউনিখ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে এই প্রতিবেদনের সূচনা করে আইআইএসএসের প্রধান জন টিপম্যান বলেন-আর্থিক সংকটের প্রভাব থেকে অর্থনীতিগুলো পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে ব্যয় বেড়েছে, একই সাথে হুমকির তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার জন্যই ব্যয় বৃদ্ধির চেষ্টা করছে ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো-যারা বারবার আমেরিকার ফ্রিওয়েডিংয়ের অভিযোগ করেছিলেন।
ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের-বিশেষত: জার্মানী ২০১৪ সালের ন্যাটো প্রতিশ্রুতিতে জিডিপির দুই শতাংশ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি না মানার জন্য সমালোচনা করেছেন।
বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্য দানকালে জার্মানীর প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমিয়ার হুশিয়ারী দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট কৌশল ও নীতিটি বিশ্বের শৃঙ্খলার জন্য বিপজ্জনক এবং এটা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। তিনি আরো বলেছিলেন ‘আমরা আজ বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান ধ্বংসাত্মক গতি প্রত্যক্ষ করছি।’
‘প্রতিবছর আমরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার আমাদের লক্ষ্য থেকে আরও এবং আরও দূরে সরে যাচ্ছি।’-বলেন স্টেইনমিয়ার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিলো তার মূল উপাদানগুলো ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করা হয়।
আইআইএসএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-শীতল যুদ্ধযুগের মধ্যবর্তী-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) চুক্তির শেষ বছর এবং ২০২১ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ নতুন স্ট্রার্ট হ্রাস চুক্তির পূর্ণনবায়নের বিষয়ে সংশয় অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।
চীনের সামরিক আধুনিকায়নের কর্মসূচি, তার স্কেল, গতি ও উচ্চাকাংখা আকর্ষণীয় হিসেবে বর্ণনা করেছে আইআইএসএস এবং এর ফলে ওয়াশিংটন ও প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ের তার মিত্রদের অস্থির করে তুলেছে। গেল অক্টোবরে বেইজিং তার ডিএফ-১৭ হাইপারসনিক গ্লাইডবান সহ নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছিলো-যাতে প্রতিপক্ষের বাধা এড়াতে সক্ষম এবং এতে বিশাল ওয়ারহেড-যার গতি অনেক অনেক বেশি,-তা সংযোজনের ডিজাইন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া তার নিজস্ব আধুনিকায়ন প্রকল্পটি অনুসরণ করে ইতোমধ্যে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমে প্রবেশের ঘোষণা দিয়েছে। মস্কো জানিয়েছে-ডাবিড অ্যাভানগার্ড ব্যবস্থাটি ম্যাক ২৭, বা প্রায় ৩৩০০০ (তেত্রিশ হাজার) কিলোমিটার (২০৫০০ মাইল) বেগে (প্রতি ঘন্টায়) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পশ্চিমা কর্মকর্তাদের নিকট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এগুলো খুব দ্রুতগতিতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং এতোটাই অব্যর্থ যে, এগুলোর আঘাতে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়বে। এগুলোর সুবিধা এতোটাই যে, শত্রুর দিকে আক্রমণ সম্পর্কিত কোনো ধরনের অগ্রিম সতর্কতা পাওয়া যায় না।
ন্যাটোর অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছিলেন যে, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়-‘মাটিতে তৎপরতা না হওয়া পর্যন্ত লক্ষ্যটি কী’-তা পরিষ্কার হয়ে ওঠতে পারে না।
আইআইএসএস-এর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে, অন্য মহাদেশের উদাহরণ হিসেবে এশিয়ার কথা বলা যায়। এ মহাদেশে প্রতিরক্ষা ব্যয় ৫০% শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, গত এক দশকে। ২০১০ সালে এশিয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিলো ২৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯ সালে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৩ বিলিয়ন ডলার। এ মহাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য তাদের প্রতিরক্ষা খাতে আরো বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়েছে বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) এর বৈশ্বিক অস্ত্র শিল্পের বিষয়ে করা এক নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র উৎপাদন পুরো গতিতে এগিয়ে চলছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র কারখানাগুলো আবার ও তাদের অস্ত্র বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এ তালিকায় আমেরিকার অবস্থান প্রথম বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের ১০০ বৃহত্তম অস্ত্র উৎপাদনকারী এবং সামরিক ঠিকাদাররা গত বছর বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিক্রি করেছিলো সর্বমোট ৪২২ বিলিয়ন ডলারের যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় ৮.৬% শতাংশ বেশি।
সমীক্ষায় দেখা গেছে-বিশ্বের ১০টা বৃহত্তম অস্ত্র কারখানা তাদের বাজারের শেয়ারের পরিমাণ ৫.৮% শতাংশ বাড়িয়ে ২১০ বিলিয়ন ডলার করেছে। আর ২০০২ সালের পরে প্রথম বারের মতো পাঁচটা বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক ছিলো আমেরিকান। অস্ত্র প্রস্তুতকারী এসব পাঁচ প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ১০০টা কোম্পানীর মধ্যে এককভাবে অস্ত্র বিক্রয় করেছিলো মোট ৩৫% শতাংশ। অর্থাৎ ৯৫টা অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেছিলো ৬৫% শতাংশ অস্ত্র। আমেরিকান সংস্থা লডহিড মার্টিন এখনও অস্ত্র বিক্রির শীর্ষে প্রথম স্থানে রয়েছে। সংস্থাটা ২০১৮ সালে তার অস্ত্র বিক্রি ৫.২% শতাংশ বাড়িয়েছে। ১০০টা সংস্থা গড়ে বিক্রি বাড়িয়েছে ১১% শতাংশ। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বৃহত্তম সংস্থা বোয়িং-২৯.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। এসআইপিআরআই কর্তৃক উদ্ধৃত ট্রাম্প প্রশাসনের এক গবেষণাপত্র অনুসারে, বিক্রি বৃদ্ধি হলো মূলত ‘আন্তঃরাষ্ট্রীয় কৌশলগত প্রতিযোগিতা।’
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে যে, আমেরিকা তার বৃহত্তম দু’টি চ্যালেঞ্জার রাশিয়া ও চীনকে মোকাবেলার লক্ষ্য থেকেই সামরিক অস্ত্র কর্মসূচী সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর মধ্যে ২৭টার মালিকানা রয়েছে ইউরোপে। এর মধ্যে বৃহত্তম হলো ব্রিটিশ মেগা কর্পোরেশন বিএই সিস্টেম, যেটাতে ৮৩০০০ তিরাশী হাজারেও বেশি কর্মী কাজে নিয়োজিত আছে।
ব্রিটিশ কোম্পানীগুলো ২০১৮ সালে ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। পক্ষান্তরে, ফরাসি সংস্থাগুলো বিক্রি করেছিলো ২৩.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র। তবে জার্মান অস্ত্র নির্মাতারা ৮.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে, যা আন্তর্জাতিক অস্ত্র শিল্পে তাদের অংশের ৩.৮% শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
রাশিয়ান সংস্থাগুলোর লেনদেন হয়েছে ৩.২ বিলিয়ন ডলার, বিশ্বজুড়ে অস্ত্র উৎপাদনের ৮.৬ শতাংশ। এসআইপিআরআই-এর মতে, বিশ্বব্যাপী বিক্রির তাদের অংশটা ২০০৯ সাল থেকে নিয়মিত বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে-‘এটা মূলত: ২০১১-২০ সালের জন্য একটা বড় সামরিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনার বাস্তবায়নের সাথে রাশিয়ার অস্ত্র ক্রয়ের ওপর ব্যয় বৃদ্ধির ও কিছুটা হলেও অস্ত্র রফতানীর বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত ছিলো।’
পরিশেষে এটা বলা যায় যে, বিশ্বের ছোট-বড় সকল রাষ্ট্রই তাদের প্রতিরক্ষা ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে, অস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে; অস্ত্রের মওজুদ বৃদ্ধি করছে এবং সে সাথে নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করছে অস্ত্র নির্মাণে, অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র উৎপাদন, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি সবগুলোই বিশ্বব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন ওঠেছে-বড় যুদ্ধ কী অত্যাসন্ন?
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.