বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট সন্তোষ গুপ্ত। তিনি দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতার জীবনে বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। পাঠকমহলে সমাদৃত ছিল সন্তোষ গুপ্তের লেখা ‘অনিরুদ্ধের কলাম’। কবিতা, শিল্পকলা, চিত্রকলা, রাজনীতি, সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ১৪টি বই লিখেছেন। দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকে তার বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ, কলাম ও সমালোচনামূলক নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। তিনি একাধারে কবি ও প্রবন্ধকার ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯২৫ সালের এই দিনে তিনি ঝালকাঠি জেলার রুনসী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তিনি হারান তার বাবা ও কাকাকে। মা কিরণবালা তাকে অনেক কষ্টে মানুষ করেন। ছেলেবেলা থেকেই বই পড়ার প্রচণ্ড নেশা ছিল তার। একবার একনাগাড়ে রবীন্দ্রনাথের ৪৪টা কবিতা মুখস্থ বলে তিনি তার শিক্ষক মহেন্দ্রবাবুকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং তখন তিনি তাকে উপহার দিয়েছিলেন ‘সঞ্চয়িতা’ ও ‘চয়নিকা’। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি তিনি ম্যাক্সিম গোর্কি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, স্বামী বিবেকানন্দ ও কাজী নজরুল ইসলামের রচিত বই পড়েছেন। সন্তোষ গুপ্তের লেখাপড়ার স্পৃহা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর।
সন্তোষ গুপ্ত কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৪৪ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আইজি প্রিজন অফিসে। ১৯৪৫ সালে তিনি পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেন। ঢাকায় কারা বিভাগের আইজির অফিসে সন্তোষ গুপ্তের পোস্টিং হয়। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তিনি গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই দমননীতি নেমে আসে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর এবং অনেকের সঙ্গে সন্তোষ গুপ্ত ও তার মাও গ্রেপ্তার হন। কিন্তু জেলখানায় তাকে দেখে আইজি প্রিজন ভীষণ অবাক হয়ে বলেন, তোমাকে ভুল করে ধরে এনেছে। আমি তোমার রিলিজের ব্যবস্থা করছি। সন্তোষ গুপ্ত বলেন, ভুল হয়নি; পুলিশ ঠিক লোককেই ধরেছে। এর পরও তিনি তিনবার জেল খাটেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর ১৯৫৭ সালে সংবাদে যোগদান করেন। কাজ করেছেন আজাদ পত্রিকায়।
১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসনের শুরুতেই তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কলকাতায় ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে সন্তোষ গুপ্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তিনি মৌলিক কবিতা ছাড়াও শেলির কবিতা আর শেক্সপিয়রের সনেট অনুবাদ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে বেশকিছু ১৯৬৪ সালে দাঙ্গার সময় হারিয়ে যায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং পরে ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতার হত্যার পর তিনি অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি তার বিশ্বাস, নীতি ও আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। তিনি রচনা করেছেন ‘ইতিহাস আমাদের দিকে’, ‘সমাজতন্ত্রের অন্য ইতিহাস’, ‘স্মৃতি-বিস্মৃতির অতলে’ প্রভৃতি গ্রন্থ ও নিবন্ধ। চিত্রকলার সমালোচনাসহ বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চা করেছেন তিনি। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে অবদান রাখার
জন্য তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বহু পদক অর্জন করেন। ২০০৪ সালের ৬ আগস্ট তিনি মারা যান।
কাজী সালমা সুলতানা, কলামিস্ট এবং গণমাধ্যম কর্মী ।
salma15august@gmail.com

