মহীরূহির সালতামামি শেষ হবার নয়

দেশকে রূপান্তরিত করা কখনোই এনজিওর কাজ নয়। এনজিও বা সরকারের কাজ সমান্তরাল চলা মানেই বুঝতে হবে সরকার তার নিজস্ব কাজে ঘাটতি রেখেছে।  একটি দেশে এনজিও বৃহৎ বা সামগ্রিক কাজে জড়িয়ে থাকলে, মানে দেশ গড়ার কাজে জড়িত থাকলে, মূলত সরকারের দূর্বলতাই প্রকাশ পায় । দেশ গড়ার মূল কাজ অবশ্যই সরকারের কাজ। এনজিওগলো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে ( ক্ষেত্র বিশেষে  ) । তা অবশ্যই দেশ গড়ার মূল ভূমিকায় হতে পারে না । লক্ষণীয় যে আমাদের দেশে সরকারগুলোর নানাবিধ দূর্বলতার কল্যাণেই এনজিওগুলো বেশি শক্তিশালীতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা দেশের জন্য মোটেও ভালো নয় । আর বর্হিবিশ্বের এনজিওগুলোতো অনুন্নত বা স্বল্প উন্নত দেশগুলোতে তাদের নিজস্ব একটি আদর্শকে কাজের চেয়ে বেশি প্রতিফলিত করার প্রচেষ্টা থাকে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পশ্চিমা দেশগুলোর এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় মিশনারি এনজিও । শোনা যায় যেখানে বেশিরভাগ ধর্মের একটা অনুপ্রাস নিহীত থাকে, সত্য/মিথ্যা জানিনা। তবে পশ্চিমা বিভিন্ন মিশনারি এনজিওগুলোর সমন্ধে সেরকম একটা ধারণা জনমানুষের মাঝে কাজ করে অথবা হতে পারে অপপ্রচার । তবে উন্নত দেশগুলোতে বেশিরভাগ এনজিওগুলো বিভিন্ন মিশনারি ভিত্তিক এবং সেই সকল এনজিওগুলো ওদের নিজেদের দেশেও বিভিন্ন কাজে ক্ষুদ্রাকারে করে থাকে, তবে সে কাজটা কখনোই দেশ গড়ার কাজ নয়।

images (8).jpg

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মভিত্তিক পাওয়া যায় । তবে সেখানে জোর জবরদস্তি বলতে বিন্দুমাত্র কিছুই নেই, কেবলমাত্র ক্ষেত্র বিশেষে সামাজিক কর্মেই জড়িত থাকে। অর্থনৈতিক বিষয়টি তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায় না বা নাই। আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি, অন্তত ইউরোপে আমার বসবাসের রাষ্ট্র বা অন্যান্য দু- চারটি রাষ্ট্রের কথাও বলতে পারি, যেখানে এনজিও ভিত্তিক কোনো ঋণ সংস্থার অস্তিত্ব নাই, আমি দেখি নাই। ইউরোপের সব রাষ্ট্রেই ঋণ ব্যবস্থা কেবলমাত্র ব্যাংকিং সেক্টর থেকেই হয়। অর্থনৈতিক কিছু সংস্থা আছে যা একান্তই প্রাইভেট, তবে অর্থ ঋণের ব্যবস্থা সার্বিকভাবেই সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমেই হয় এবং অবশ্যই সুদের হার স্বাভাবিকের চেয়েও দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশিই হয়। এনজিও বা সংস্থাগুলো মূলত মধ্যস্থতাকারির ভূমিকা পালন করে। সেই সব সংস্থা থেকেও ঋণ গ্রহণ করতে হলে ব্যাংকখাতের মতন সকল নিয়ম কানুন, যেমন মর্গেজ রাখা, সাক্ষ্য রাখা কিংবা কারো দ্বারা অনুমদিত হওয়া  ( যা মৃলত ঋণগ্রহীতার বিপরীতে বন্ড হওয়া) ইত্যাদি পূরণ করতেই হবে। মূলত সেগুলো কোনো এনজিও নয়, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান মাত্র ।

images (9).jpg

সুতরাং এক কথায় বলা যায়,ঋণ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের ব্যাংকখাতই সব চাইতে সুবিধেজনক খাত বলে , সেই সকল প্রাইভেট মিশনারির সংস্থার ধারে কাছেও কেউ পা মারাতে যায় না, একান্তই  জরুরি না হলে । যেহেতু পশ্চিমা দেশগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে সকলেই প্রকারভেদে সমান অর্থাৎ প্রত্যেকটি ব্যাক্তি জীবনে নিজের চলার ও জীবন চালানোর একপ্রকার নিশ্চয়তা ও সহযোগিতা সরাসরি সরকার থেকেই নিশ্চিত করা আছে, বিভিন্ন পদ্ধতিতে, যেমন কর্মসংস্থান বা যারা কর্মে আগ্রহী নয় তাদের জন সরকারি খরচে থাকা খাওয়ার নিশ্চয়তা,  অবশ্যই সেগুলো জীবনমানে সাধারণের সমসাময়িক নয়, তাই এনজিওগুলোর এই দেশগুলোতে কোনো কর্ম করার সুযোগ নাই। তাই লেখার প্রথমেই বলেছিলাম, এনজিও কখনোই সরকারের প্যারেলাল হতে পারে না । সমাজ বা দেশ রূপান্তর করা কেবলমাত্র সরকারের এবং এককথায় বললে বলতে হয়, একমাত্র সরকারের প্রধান কাজ।

images (1).jpg

উপরের কথাগুলো বললাম, মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে সমাজকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে আমাদের দেশে গড়ে উঠা বিশ্বের সবচাইতে বড় এনজিও ব্র্যাক প্রতিষ্ঠানের সদ্য প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদ স্যারের কথা বলার জন্য । আমাদের দেশে গড়ে উঠা এই ব্র্যাক এনজিও প্রতিষ্ঠানটি তাদের মাত্র এক লাখ কর্মী নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর ১১ টি বিশেষ দেশের ১২০ মিলিয়ন মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে চলছে। বেসরকারি উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া ফজলে হাসান আবেদ সমাজকর্মের জন্য স্যার উপাধি পাওয়া ছাড়াও বিশ্বের বহু সম্মানিত পুরস্কারে ভূষিত হয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত করেছেন। এক কথায় বলা যায়, তিনি মানুষ হিসেবে ছিলেন উদ্যমী, দারুন সফল ও স্বপ্নদ্রষ্টা।

images (3).jpg

এই বাংলাদেশী মানুষটি ছিলেন একজন নির্মোহ মানুষ । তিনি চাইলে ব্যক্তিজীবনে অনেক সম্পদের মালিক হতে পারতেন , এতে সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নিশ্চয়ই নাই। তবে তিনি ব্যক্তিজীবনে সেই পথে হাটেননি। উনার এক সাক্ষাৎকারে ( অনেক আগে ) শুনেছিলাম, তিনি ব্র্যাক থেকে বেতন নেন, নিজের কিছু নাই, ভাড়া করা ফ্ল্যাটে থাকেন, উনার ভাষ্য ছিলো, যখন ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন তখন থেকেই নিজের জন্য কিছু করবেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিলো, দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার , তাই সম্পদের পিছনে ছুটলে জীবনের ব্রত থেকে দূরে সরে যেতে পারেন বিধায় সেই দিকে কখনোই পা বাড়াননি।

Download (1).jpg

তিনি আরো মনে করতেন, নারী- পুরুষের সমতা ছাড়া কখনোই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য সাধারণ মানুষকে জেন্ডার সমতা, নারী ও শিশুদের অধিকার এবং সর্বোপরি মনুষ্যত্বের মূল্যায়ন, এসব বিষয়েই বেশি সচেতন করে তুলতে কাজ করেছেন তিনি। সমাজের দরিদ্রদের জন্য তাদের সামর্থ্য ও দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা পরিচালনা করেছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে যেন নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, তার উপর বিশেষ লক্ষ্য রেখেই কাজ করে গেছেন। তিনি তাঁর লক্ষ্যমাত্রায় কেবল ব্র্যাক প্রতিষ্ঠানই করেননি, এই প্রতিষ্ঠানটিতে গড়ে তুলেছে, ব্র্যাক ব্যাংক, বিকাশ, আড়ংয়ের মতো ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থায় পরিণত করতে দৃঢ়তার সাথে এই প্রাণপুরুষ নতুনদের সাথে নিয়ে একনিষ্ঠভাবে এগিয়ে গেছেন। স্যার ফজলে হাসান আবেদ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক স্বপ্ন দেখতেন এবং জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন পূরণে সক্ষমও হয়েছিলেন। মানুষ তাঁর জীবনের লক্ষ্যেতে অটল থাকতে পারলে এবং সাথে কঠিন পরিশ্রম করতে পারলে সফলতার দোরগোড়ায় যে পৌঁছানো যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্যার ফজলে হাসান। তিনি একটি আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ তৈরি করে গেছেন।

images (4).jpg

সময়ের দিক দিয়ে দেখলে ৪৭ বছর ধরে তিলে তিলে প্রতিষ্ঠানটি তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর এনজিও আর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের এনজিও কখনোই এক বিষয় নয়। স্যার ফজলে আবেদ সেই কঠিন কাজটিই নিজ দেশ থেকে, একেবারেই শূন্য থেকে কেবলমাত্র দেশমাতৃকার প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা থেকেই করতে পেরেছিলেন। দেশের প্রতি একান্ত ভালোবাসা, নিখুঁত দেশপ্রেম, দেশ গড়ার প্রতি একনিষ্ঠ প্রতিজ্ঞা ছাড়া এই কাজ সম্ভব নয়, যা উনার ভিতরে শতভাগ ছিলো। কালের আবর্তে নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে ৮৩ বছর বয়সে ব্র্যাক থেকে অবসর নেন। সেই সময়ের বাংলাদেশে স্যার ফজলে হাসান আবেদের মত মানুষ ছাড়া ব্র্যাক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও বিশ্বাস করতেন ব্র্যাকের বর্তমান অবস্থানে আসতে সব পরিশ্রম করেছেন ব্র্যাকের কর্মীরা। তাঁর দুরন্ত সাহস, দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতার কাহিনী আগামীর তরুণ প্রজন্মকে অনবরতভাবে সাহস ও শক্তি যোগাতে সহায়ক হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্যার আবেদ সকলের কাছেই বাংলাদেশ হয়ে বেঁচে থাকবেন। 

images (7).jpg

স্যার ফজলে হাসান আবেদ সমন্ধে বলার মত জ্ঞাণ আমার নেই। কেননা এতবড় মানের ও মনের মানুষ নিয়ে লেখার জন্য ভিন্ন মাত্রার সংযোজন প্রয়োজন হয়। এখানে একটু বলা প্রয়োজন যে, এই ব্র্যাক নামক প্রতিষ্ঠান নিয়ে দেশে অনেকের মাঝেই ভিন্নমত আছে বটে এবং থাকতেই পারে। যখন কখনো কখনো কোনো এক বিশেষ দিবসে বাহিরের ৭০০ টাকার একটি পাঞ্জাবি যেকোনো কারণেই ব্র্যাক প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে আড়ংয়ের দোকানে হয়তো বা ১৩০০ টাকায় বিক্রি হয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তার মানে এই নয়, সেই সামান্য একটি পাঞ্জাবিকে সামনে এনে এতবড় একটি প্রতিষ্ঠানকে, যে প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ মানুষ ও স্যার আবেদের অক্লান্ত ঘামে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে, তাকে একেবারেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে , প্রতিষ্ঠানটি এবং সাথে এতবড় একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে অকথ্য ভাষায় বলে দেশের কল্যাণ হবে। মনে রাখা ভালো যে, স্যার আবেদ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মাটিতে দেশের কল্যাণেই মায়া মমতা দিয়ে, দরিদ্র মানুষদেরকে সাথে নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন, এটা চাট্টিখানি কথা নয়। যে প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্বের বৃহৎ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান ।

images (2).jpg

 

আমরা নিজেরা গড়তে জানি না, তবে সমালোচনায় সর্ব শ্রেষ্ঠ অবশ্যই । সমালোচনা হোক, সেটা ভালো। তবে নিজেদের জীবনে কি বা কতটুকু দেশকে দিতে পেরেছি, সেটার হিসেব রেখেই সমালোচনার বাক্যেবাণ প্রয়োগ করাই ভালো। ব্র্যাক একটি প্রতিষ্ঠান, ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, সেই ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে, প্রতিষ্ঠানটিকে সহায়তা করাই হবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব । কেননা এই প্রতিষ্ঠান বা এনজিওটি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের মটিতে গড়া প্রতিষ্ঠান , কোনো পশ্চিমা নয়। স্যার ফজলে হাসেন আবেদ এই দেশের একজন বিশেষ গুণীজন ছিলেন, আর যে দেশ তাঁর গুণীজনদের সম্মান দিতে জানে না, সেই দেশ ভুতের মতন পিছনেই হাঁটে। হেটস্ আপ টু স্যার ফজলে হাসান আবেদ। পরকাল আপনার সুন্দর হোক। বিনম্র শ্রদ্ধা ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.