বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: আনসার খানের প্রথম গ্রন্থ ‘সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি’। এই গ্রন্থে লেখক বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর আলোচ্য প্রবন্ধগুলোতেÑবিষয়ের অনুসন্ধান ও চর্চাধারা, সমসাময়িক থেকে আধুনিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক বিষয়ে একাধিক রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্পর্ক, বোঝাপড়া, পারস্পরিক আদান প্রদান, সহযোগিতা এবং বাদানুবাদ ইত্যাদি নিপুণভাবে উঠে এসেছে। এতে আলোচিত বিভিন্ন ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বায়ন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব, বাস্তুসহ সহনশীলতা, নিউক্লিয়ার শক্তির বিস্তার, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক উন্নতি, সন্ত্রাসবাদ, মানবনিরাপত্তা এবং মানবাধিকার প্রভৃতি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমগ্র বিশ্বকে নিয়ে আলোচনা করে। অর্থাৎ বিশ্বের সকল খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখানে স্থান পায়। কীভাবে একটি রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, কীভাবে জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে, কীভাবে তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে, কীভাবে বিশ্বে তার প্রভাব বিস্তার করতে পারে এসব বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়টি আলোচিত হয়।
বিশ্ব রাজনীতিতে সবসময়ই পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহ বিদ্যমান। আনসার খান এসব বিষয়ের উপর গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন। তাঁর বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে বিভিন্ন যুক্তি ও সমাধান তুলে ধরেছেন। ‘আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার অবসান কী অনিবার্য’ প্রবন্ধে তিনি আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পরিবেশে মানুষের নিরাপত্তা এবং জীবনব্যবস্থার সার্বিক দিক আলোচনা করেছেন।
বর্তমানে বিশ^নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় চীন হচ্ছে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘চীনের অর্থনৈতিক ও নতুন বিশ^ব্যবস্থা’ প্রবন্ধে তিনি চীন কিভাবে বিশ^ অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে, তার বিশদ আলোচনা তুলে ধরেছেন। এছাড়াও তিনি দক্ষিণ চীন সাগর : কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, চীন-আমেরিকার বিশ^ নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর, চীন ও ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীন-আমেরিকার রাজনীতি ইত্যাদি প্রবন্ধে এই দুই দেশের বিশ্ব নেতৃত্বের স্থান দখলের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন।
লেখক মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তার গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। বিশে^র অন্যতম পেট্রোডলারের দেশ সৌদিআরব ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীন সম্পর্ক নিয়েও লেখক তার মূল্যবান বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর আলোচনায় ওঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যত, বিশ^ব্যবস্থা ও ইসলাম ওয়ার্ল্ড, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, গাজা সংকট, সোমালিয়ার আল সাবাব গোষ্ঠীর উত্থান ও বিকাশ, আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বৈরি রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখক তাঁর গ্রন্থে বেশ মূল্যবান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।
আনসার খান পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) প্রাথমিক সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু করেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সিলেট জেলা শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সত্তর দশকের মধ্যভাগে। বর্তমানে তিনি গণফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা গণফোরামের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি এবং মৌলভীবাজার জেলার গণফোরামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মৌলভীবাজার জেলা গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তিনি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ও ১১ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের গ্যাস রক্ষা আন্দোলনে ঢাকা-বিবিয়ানা পদযাত্রা কর্মসূচি (২-১৩ মার্চ ২০০২ খ্রি.) সফল ও বাস্তবায়ন করতে এবং মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডের আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি গণফোরামের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। সত্তর দশক থেকে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও নিবেদিত প্রাণ একজন নেতা।
১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই আনসার খানের লেখালেখিতে হাতেখড়ি। যুগভেরী পত্রিকায় তিনি মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে হককথা, সিলেট সমাচার ও সাপ্তাহিক সিলেটের ডাকসহ বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে লেখালেখি করেন। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র এবং সাময়িকীতে তিনি লিখে যাচ্ছেন।
লেখক ও সমাজচিন্তক আনসার খান-এর লেখনীশৈলী তীক্ষ্ণ, ভাষা প্রাঞ্জল। তথ্য ও উপাত্তের দিক থেকে গ্রন্থটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ‘সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি’ গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হলো। ইতিহাসের আলোচনা ও গবেষণায় ‘সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি’ গ্রন্থটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সিলেটের সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা পাণ্ডুলিপি প্রকাশন।১৬০ পৃষ্ঠার বইটিতে স্থান পেয়েছে ২৫টি প্রবন্ধ এবং মূল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা।

