নিয়মতান্ত্রিক বাম আর বুর্জোয়ায় গণতন্ত্র

ওই আমি কুল হারা কলঙ্কিনি

আমারে কেউ ছুঁইয়ো না সজনী।

রাশেদ খান মেনন, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত (!) বামপন্থী সংশোধনবাদী ধারার রাজনৈতিক নেতা! বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি । বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি সাম্যবাদী ভাবধারার এই দলটি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি  ( লেলিনবাদী ), বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ এবং অন্য একটি বিপ্লবী গ্রুপ থেকে ১৯৮০ সালে গঠিত হয়। অমল সেন ছিলেন এটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব । ১৯৮৪ সালে ( বামদের নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ) এই দলটি দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয় এবং দুই পক্ষই একি নাম  ব্যবহার করতে থাকে। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে অমল সেন এবং অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে নজরুল ইসলাম । বর্তমান সভাপতি রাশেদ খান মেনন অন্য একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৯২ সালে দলটি পুনরায় একত্রিত হয় এবং এই দলটিই বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটের অংশ ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী  নির্ভেজাল বীনা ভোটের সাংসদ তৎকালিন সর্বদলীয় মন্ত্রী সভার ডাক ও তার মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী  এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী । ২০১৮ এর ২৯ ডিসেম্বরের নৈশভোটের পুনরায় সাংসদ হন। তবে এবার আর ভাগ্য মন্ত্রীত্ব জুটেনি ।

শনিবার সন্ধ্যায়, যশোর টাউন হল মাঠে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ” দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষ । কিন্তু বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে ২০১৫ সালেই বিদেশি বানিজ্যের নামে ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে” ! তিনি আরো বলেন, আমি সাক্ষ্য ও হিসেব দিচ্ছি, গত ১০ বছরে ৯ লাখ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে ! উনার আরো ভাষ্য, সেই পাকিস্তান আমলের মতন নতুন ২২ পরিবারের হাতে সব সম্পদ ।

ra.PNG

লক্ষণীয় যে, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলো সামাজিক ন্যায়বিচার/ মানবিক মর্যাদা/ সমতা/ গণতন্ত্র/ জাতীয়বাদ/ ধর্মনিরপেক্ষতা ।  এই ঘোষণায় ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার । আরো লক্ষণীয় যে, সেই ঘোষণার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যা ছিলো তার সাথে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক দিনকে দিন কমেই আসছে। এই বামপন্থী নেতা সম্মানিত রাশেদ খান মেনন সাহেব, যিনি  বামদের বড় প্রতিক ছিলেন। ছিলেন বললাম কেন ?

সবারই জানা আছে, তারপরেও ছোট্ট করে বলি। নিজেদের হাতুড়ি জমা রেখে ( অবশ্য বলা যায় বর্গা রেখে, কেননা উনার সময়কালেই উনার জোটের কাছে এই হাতুড়ির ব্যবহার দেখেছি, তাই বর্গা বলাই যায় ।) নিজেদের আদর্শকে চুড়মার করে , উনারদের নিজেদর বিশ্বাস ও ভাষায় বুর্জোয়াদের দলে নৌকায় উঠে দুই দুইবার মন্ত্রী । তৃতীয়বার আর সেই সৌভাগ্য হয়নি।  লক্ষ্য করুণ, উপরে বর্ণিত এই সরকারের বিরুদ্ধে ( ঊনাদের সরকার, হবে) গত কয়েকদিন পূর্বেই একি  সমাচার ( তবে সেটা ছিলো ভোটচুরি সমাচার )  তুলেছিলে। স্বরণ করুন তখন সরকারের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো ? এবং রাশেদ খান মেনন সাহেবের স্পষ্ট প্রমাণিত ভাষ্যের পরবর্তী সংকলন কি ছিলো ? অল্প কথায় বলি , এই বাম নেতা সরকারের রক্ত চক্ষুর ধমকে পরবর্তীতে  ” ডাহা অসত্য ( সম্মানের সাথে সংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলাম) বলেছিলেন । বুর্জোয়াদের ঝাঁঝালো ত্যাজ ভালোই টের পেয়েছিলেন।

উনার আরো ভাষ্য, ১৪ দলে উনারা আত্মসমর্পণ করেন নি ! তবে কি করেছেন ? উত্তরে উনি নিজেই সেই পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটেছেন ! জামায়াত/জঙ্গিদের হাতে দেশ চলে যেতো। ১৪ দলে থেকে আর কিছু না হোক, বুর্জোয়া ভাষ্যে অনেকটা কনর্ভাটেট হয়েছেন বলাই যায় । বক্তব্য তাই প্রমাণ করে নিশ্চয়ই। কৃষক- শ্রমিক- গরিব মেহনতি মানুষ এগুলো এতদিন বস্তাবন্দি রেখেছিলেন।

তবে সেই বন্ধ বস্তা হয়তোবা আগামীতে খুলবেন বলেই অনেকে ভাবছেন ? এখানেই সেই সংকটের কথাটি বলি। ওয়ার্কার্স পার্টি দশম কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়ছে, আগামীতে নৌকা নয়, নিজেদের শক্ত হাতুড়ি নিয়েই ভোট বাক্স পেটাবে ! কি চমত্কার দেখা গেলো, তাই না ? আমরা সবাই ভাবছি , যাক রাশেদ খান মেনন সাহেবেরা আবার আদর্শের ঘোড়ায় চড়বেন। না , সেটা মোটেও না, অগ্রিম বলে রাখলাম। কেননা ‘ একবার বুর্জোয়া মানে বরাবরই বুর্জোয়া ‘ কথাটি অনেকেরই হয়তো ভালো ঠেকবে না । তবে কিন্তু ছাড়া বলছি না । আবারো লক্ষণীয় যে, দেশের রাজনীতি আমরা যতটা সহজ সরল করে ভাবছি তা মোটেও না। এই যে মেনন সাহেব এখন এত টাকা পাচারের কথা বলছেন, সামনে সরকার থেকে সেটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না বা ঝামেলাও হবে না, লিখে রাখতে পারেন। বর্তমান সরকার যে সহজ সরল পথে নেই তার প্রমাণ আগামীতে নির্বাচনে ( যদি হয় ) আরো প্রমাণ হবেই। সরকারের প্রয়োজন কঠিন বিরোধী দল, যারা আগামী দীর্ঘদিন রাজপথে থাকবে, তবে সেটা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল, অবশ্যই জাতীয়বাদ নামক দল নয়। কেননা সেটা ক্ষমতার জন্য খুব উটকো ঝামেলা সরকারের নিকট।  আরো অগ্রিম বলে রাখি, আগামীতে জাতীয় পার্টি অনেক শক্তিশালী হবে, রাজপ অনেক উতপ্ত রাখবে, পাশাপাশি রাশেদ খান মেননদের মতন বড় তাত্ত্বিক বট গাছেরাও।

রাশেদ খান মেনন সাহেবা হাতুড়ি নিয়ে একা একা ( মানে জোট প্রতিক নিয়ে নয় ) নির্বাচন করবেন। আমরা সাধারণ জনগণ অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবছি, তাহলে উনার আম- ছালা সব যাবে ! না, সেরকমটি হবে না। আগামীতে ভিন্ন কর্ণার থেকেই রাজনীতি চলবে। যা সাধারণ জনগণ বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ভবিষ্যতে টের পাবে। এটা একটি প্রেডিকশন, একান্তই ব্যক্তিগত ।

লেখার শেষে বলি, উপরের বিবরণীগুলো দেওয়ার কারণ হলো, অতিত, বর্তমান এবং পরিবর্তনকে একটুক মিলিয়ে দেখার জন্য । কথা প্রসঙ্গে বলি, আ স ম রব সাহেবের দলের সম্মেলন হয়ে গেলো। এখানেও একটু বলতেই হয় সেই বাম ধারাবাহিকতার চরিত্রের কথা । বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে গবেষণার সুযোগ সমাজতন্ত্র নিয়ে কমে আসছে তবে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হওয়া নিয়ে বিশদ গবেষণা হতে পারে। যদিও বিচি কলার বিচি সড়বে না। মানে গবেষণায় লাভের লাভ হবে শূণ্য । এই জাসদের গঠন সেই ১৯৭২ সালের ৩১ সে ডিসেম্বরে আর ভাঙ্গনের শুরু ১৯৮০ সালে। এই পর্যন্ত কত টুকরো হয়ে অনু- পরমাণুতে বা ভগ্নাংশে পরিণতি লাভ করেছে, সেই হিসেব দিতে গেলে বড় ইতিহাস লিখতে হবে। সেইদিকে যাচ্ছি না, তবে গতকালকেও আ স ম রব ভাইয়ের জাসদে সেই বাম ধারাবাহিকতার চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। আর ইনারাই সরকারের পতন ঘটাতে উদগ্রীব হয়ে আছেন !

লেখার শুরুতেই একটি গানের কলি লিখেছি। বামেরা সহ রাশেদ খান মেনন সাহেবেরা যদি কোরাস সুরে এই গানের কলিটি গাইতেন , জনগণ উপকৃত হবে নিশ্চয়ই ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার 

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডট কম ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.