রাত মাত্র নয়টা বাজে বাজে করছে। হঠাৎ করেই জার্মানি থেকে হাবিব বাবুল ভাই মেসেঞ্জার এ ছোট্ট করে লিখে পাঠালেন; হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কিছু লিখেন, বেশ এইটুকুই। আমি তখন কিছু একটা লিখছিলাম, দেশে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া শত অস্বাভাবিকতার কথা নিয়ে । হাবিব বাবুল ভাইকে লিখে পাঠালাম বিষয়টি আমার ভাবনায় ছিলো না। আজকে হুমায়ূন আহমেদের ৭১ তম জন্মবার্ষিকী, অথচ আমার হৃদয়ের একজন মানুষ, কোটি হৃদয়ের প্রিয় মানুষ, অথচ উনাকে নিয়ে কিছু লেখার কথা মনেই আসলো না! উনাকে নিয়ে প্রতিদিন লেখা যায়, বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না । উনার গল্প, উপন্যাস, গান, সিনেমা, নাটক নিয়ে কেউ চাইলেই প্রতিদিন লিখতে পারে। আমার চোখে সাহিত্যজগতে উনি বিশাল এক বটগাছ। আমার চোখে কেন বললাম, সেটার ব্যাখ্যায় পরে আসবো।

হাবিব বাবুল ভাইকৈ ধন্যবাদ দিয়ে শুধু বললাম, চেষ্টা করবো। মনে মনে ভাবছি এক লাইন হলেও কিছু একটা লিখবো। এত বড় মাপের মানুষ, উনাকে নিয়ে কিছু লেখা, আমার মত ক্ষুদ্র জ্ঞাণের একজনের মানায়ও না। আবার ভাবি আমিতো উনার কোনো গল্প- কবিতা নিয়ে লিখছি না, আমি তো আমার হৃদয়ের ভালোবাসার হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লিখবো। যাই লিখি, সেটা নিশ্চিত আমার হৃদয়ে হুমায়ূন আহমেদ যে জায়গায় আছেন, সেখান থেকেই বের হবে, ভালোবাসার ছোঁয়া থাকবে, হৃদয় থেকে বলা থাকবে, ভুল হলেও তো আমার হৃদয় থেকে বের হয়ে আসা কথা থাকবে, অসুবিধে কিসে। এই ভাবনা থেকেই ইলেকট্রনিক কলম চালাচ্ছি ঠিক তখন আবার হাবিব বাবুল ভাইয়ের আরো ছোট্ট একটি মেসেজ । হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার বেশ স্মৃতি আছে, দুকলম লিখতে গিয়েও লেখা হলো না। কেন লেখা হলো না? কোনো প্রশ্নই করলাম না। হাবিব বাবুল ভাই লিখলে অনেক বেশি কিছুই জানা যেতো বলে ধারণা করি। আমি জানি হাবিব বাবুল ভাইয়ের সাথে হুমায়ূন আহমেদের কিছু স্মৃতির কথা । উনার জার্মানির বাসায় হুমায়ূন আহমেদের আগমনের কথা। দুচারটি ছবি উনি কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শেয়ার করেছেন। আমি এও জানি হাবিব বাবুল ভাই নিজেও একজন হুমায়ুন ভক্ত । হুমায়ূন ভক্ত কে নয়? এই বাংলা থেকে ওই বাংলায় কোটি কোটি হুমায়ূন ভক্ত আছে। আবার এই হুমায়ূন আহমেদের সাথে সাহিত্যের বাজারে টিকতে না পেরে কত শত হুমায়ূন সমালোচক আছে যার অভাবও কম নয়। আমি বলছি না, সমালোচক থাকতে নেই, অবশ্যই থাকবে। তবে হুমায়ূন আহমেদের সমালোচকদের অনেককেই দেখেছি, তাদের সাহিত্যের বই বাজারে দশখানাও বিক্রি হয় না। আমি এও বলছি না যে, বই বিক্রি হয় না বলে উনাদের সাহিত্যের মান খারাপ। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, হুমায়ূন সাহিত্য সাধারণ মানুষের মত সরল সাহিত্য, সাধারণ মানুষের চাহিদার সাহিত্য। হুমায়ূন সাহিত্য সাধারণ মানুষের মনের খোরাক জোগায়, একথা জোর গলায়ই বলা যায় । আর যে সাহিত্য সাধারণ মানুষের মনের খোরাকের জোগান দেয়, তার চেয়ে বড় সাহিত্য কি হতে পারে ? আমার অন্তত সেটা জানা নেই।

হুমায়ূন সাহিত্য কেমন? সেটা পরিষ্কার বুঝিয়ে বলার মত ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমার ধারণায় বা বুঝে যা আসে, সেটাই বলার চেষ্টা করছি। আমি যখন ক্লাশ সেভেন থেকে এইটে উঠার ছাত্র, সেই সময়ে অন্য আরো দশজন ছাত্রের মত আমিও গোপনে, লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা, গুপ্তচর, এমন বইগুলো জোগাড় করে পড়তাম। খাতার ভিতরে লুকিয়ে রেখেও সেই বইগুলো পড়ার স্মৃতি আছে। সেই সময়ে মনে মনে কতবার মাসুদ রানা সেজেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। এখনও মাসুদ রানার গল্প অনেকগুলো ঠোঁটের আগায় আছে। গড় গড় করে এখনও বলতে পারি সেই কাহিনীগুলো। কি আকর্ষণ ছিলো সেই বইগুলোতে। সেই বইগুলোর অনেকগুলো আমাদের নিজেদের বাসাতেই ছিলো, কখনো আবার আমার প্রয়াত বন্ধু মারুফের কাছ থেকেও পেতাম। মাসুদ রানার পরে যে বইগুলোর বা বলা যায় ম্যাগাজিনের প্রেমে পড়েছিলাম, তা ছিলো ” কামনা ” নামক একটি সাপ্তাহিক অথবা মাসিক পত্রিকা । অনেকেই হয়তো সেই ম্যাগাজিনের কথা স্মরণ করতে পারবেন। কিছুই ছিলো না সেই ম্যাগাজিনের ভিতরে । কলকাতা বা ঢাকার কিছু নায়িকাদের হালকা কাপড় পড়া ছবি অথবা একটু হেলেদুলে গালে হাত বা পা একটু উঁচিয়ে কিছু ছবির ক্যাপশন, সাথে কিছু গরম গরম কথা। এই ম্যাগাজিনগুলো আমাদের ঘরেই একটি বইয়ের আলমারির ড্রয়ারে চাবি দিয়ে লক করা থাকতো। এখানে একটু বললেই সবাই বুঝে নিতে পারবেন, আমি চার ভাইয়ের সবার ছোটো আবার আমার বড় দুবোন আছে। সেই চাবি কিভাবে ব্যবস্থা করেছিলাম, সেটা ভিন্ন কাহিনী । সেই মাসুদ রানা-গুপ্তচর থেকে কামনা ম্যাগাজিন হয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ঈদের সময় নানান বিশেষ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ইত্যাদি বেশ পড়া হতো।

আমাদের ঘরে একটি বইয়ের আলমারি ছিলো, যেখানে ছিলো কেবল বই আর বই। সেখানে খোয়াব নামা বই থেকে শুরু করে হাদিসের বই থাকতো , সাথে নানান লেখকের বই এবং শরৎচন্দ্র চট্টাপধ্যায়ের ” শ্রীকান্ত “এর চার খণ্ডের উপন্যাস । ক্লাশ এইট থেকে নাইনে উঠার ছাত্র আমি । এর মাঝেই মাক্স/লেলিন এর বই নেড়েচেড়ে দেখা হয়েছে, বইগুলো আলমারিতে ছিলো (মেজ ভাইয়ের সংগ্রহ ,মিঞাভাই এক সময়ের জাসদ করা মানুষ ) বলেই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা বা কখনো কখনো উল্টে-পাল্টে দুচার পাতা পড়াও হয়েছে, তবে কখনো আকর্ষণ করেনি। হঠাৎ একদিন কেন জানি শ্রীকান্ত উপন্যাসের প্রথম খন্ডটি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলাম। পড়তে থাকলাম, পড়েই চললাম, কি এক আশ্চর্যের বিষয় শ্রীকান্ত উপন্যাসটি আমায় প্রায় পাগল করে ছাড়লো। আমি শ্রীকান্ত পড়া ছাড়া অন্য কোনো বইয়ে , এমনকি টেক্সট বইয়েও মনোযোগ দিতে পাড়ছিলাম না। যতটুকু মনে পড়ে সামনেই ছিলো নাইনে উঠার ফাইনাল পরীক্ষা । কিন্তু শ্রীকান্ত যতই পড়ছি ততই আমার আকর্ষণ উপন্যাসটির প্রতি বেড়েই চলছে। মনে পরে আমি একটানা কয়েকদিনের মধ্যেই প্রথম খন্ড শেষ করেছিলাম। এইভাবেই পরীক্ষার পূর্বেই চার খন্ড শ্রীকান্ত শেষ করেছিলাম।

শ্রীকান্ত উপন্যাসটির ঘটনা কেন বললাম। বলতে গেলে সেখান থেকেই আমার বই পড়ার একধরনের আগ্রহ বাড়ে। আমার নিজের বুঝে বলতে পারি শরৎচন্দ্র চট্টাপধ্যায়ের লেখায় তেমন কিছুই ছিলো না। তবে যা ছিলো তা সবই আকর্ষণ, একপ্রকার চার্ম। এত মোটা বই, তারপরেও পড়ার মাঝেই সারাক্ষণ মনে যে বিষয়টি বেশি কাজ করতো , ঘটনাটির তারপরে কি হবে বা হতে যাচ্ছে। অনেকটা ছোটো গল্পের মত, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। কি যেন কমতি রয়ে যায় । শ্রীকান্ত উপন্যাসে দেখা যায়, দাদা বাবু ( বুড়ো দাদা নয়, বড় ভাই) গরুর গাড়ি করে রেলেস্টশন থেকে রওনা দিয়েছেন। দশমাইল পথ গরুর গাড়িতেই পাড় হতে হবে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, ঠান্ডা হীমেল হাওয়া, তার উপর সন্ধ্যা শেষে রাত নেমেছে । দিদি গত সপ্তাহে দাদার পাঠানো পত্রে পড়েছে দাদা বাবুর শরীরটিও তেমন ভালো না, কাঁশি আর বুকের বেদনা বেড়ে গেছে । সাত গ্রাম পাড়ি দিয়ে আসতে হবে। পথি মধ্যে কয়েকটি গ্রামে কলেরার ছড়াছড়ি । কি হতে কি হয়ে যায়। দাদা বাবু শহরের বড় চাকুরি করা মানুষ , এতটা কস্ট সইবেন কেমন করে , ইত্যাদি । এদিকে এই সব চিন্তা দিদি করতে করতে কাহিল অবস্থা, এক উনুনে গরম জল করা হচ্ছে দাদা বাবুর জন্য স্নান করবার জন্য, অন্য উনুনে আবার গরম তেলে লুচি ভাজা হচ্ছে দাদা বাবুর জন্য । ঘোষাল যে দুধ দিয়ে গেছে, দুই বলগ দেবার পরেই ফেঁটে একাকার, দই পাতা হয়নি এখনো। অমলকে আবার বাজারে দুধ আনতে পাঠানো হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি । কিছুই নাই কাহিনীতে তবে আকর্ষণ আছে, মারাত্মক আকর্ষণ । এখানেই শরৎচন্দ্র চট্টাপধ্যায়ের সাহিত্যের সেই বিশারদ। বলার ভঙিমা, পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার অস্বাভাবিক ক্ষমতা।

আমি হুমায়ূন আহমেদকে চট্টাপধ্যায়ের সাথে তুলনা করছি না। উনারা দুজনে দুজনার স্থানে বড় মাপের সাহিত্যিক, একথা জোর গলায়ই বলা যায় । হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যেও আমি এক প্রকার চার্ম বা আকর্ষণ খুঁজে পাই। আমি নিজে হুমায়ূন আহমেদের যে বই হাতে নিয়েছি, শেষ না করা পর্যন্ত উঠতে পারি নাই। উনার সব লেখাতেই একটি নিবিড় আকর্ষণ আছে, যা অন্তত আমাকে চুম্বকের মত ধরে রাখে। আমি নিশ্চিত সেই চুম্বকের আকর্ষণটি কোটি হুমায়ূন ভক্তকেউ টানে।

প্রবাসে আমার ছোট্ট একটি লাইব্রেরি আছে, যেখানে হুমায়ূন সাহিত্যের অনেকগুলো বই আছে। প্রতিটি বই সযত্নে রেখেছি। মনে চাইলেই হুমায়ূন আহমেদকে হাতে পাই। অনেকেই হুমায়ূন গল্প, উপন্যাসকে একটু বেশি ছোটো করে দেখাতে পাড়লেই যেন নিজেদের সাহিত্যের বাটখারাটার ওজন বেড়ে যাবে। কি আশ্চর্য, একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিককে ছোটো করে কিভাবে নিজে বড় হওয়া যায়, আমার জানা নাই। সেই জন্যেই উপরে বলেছি, আমার নিজের ব্যাখ্যার কথা। একথা মহা ভারতের মত সত্য যে, হুমায়ূন আহমেদের গল্প, উপন্যাস এদেশের প্রায় সবার ঘরেই পাওয়া যায় । নাটক, সিনেমার কথা নাই বা বললাম।

হুমায়ূন আহমেদের একটি চমত্কার সাক্ষাত্কারের কথা ছোট্ট করে বলি। কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই, তবে অনেক আগের পড়া। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই বলছেন, আমি অনেক বড় বড় বইয়ের শুধুমাত্র নাম বলেই অনেক বড় বড় পন্ডিত ব্যক্তিদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছি। আমি নিজেও সেইসব বই কখনোই পড়িনি এমন কি হাতে নিয়েও দেখেনি এবং চোখেও দেখেনি। শুধুমাত্র কোথাও নামটি পড়েছি। বড় বড় পন্ডিত ব্যক্তিদের সাথে কোনো টেবিলে বা আড্ডায় তাদের পাণ্ডিত্যের মাঝে শুধু নাম দিয়েই জিজ্ঞাসা করতাম অমুক বই/তমুক বইটি পড়েছেন কি ? উনারা কেন জানি হাঁসফাঁস করতেন। আহ্হা, এত ভালো বই এখনও পড়া হয়নি বলে আফসোস করতেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাষ্য , আমি মনে মনে শুধু হাসতাম, যে নাম বললাম, সেটাতো আমিও চোখেও দেখিনি, পড়াতো দুরের কথা, অথচ উনারা আফসোসে মরে যেতেন, এটা আমাকে বেশ আনন্দ দিত। কেননা সব বই কি সবার পড়তেই হবে! তাছাড়া সব বই কি সবার পক্ষে পড়া সম্ভব? হুমায়ূন আহমেদ একটি কথা বলতেন, ” অন্যের উপর বিশ্বাস রাখার চেয়ে নিজের উপর বিশ্বাস রাখাটা অনেক বেশি কার্যকর “।
লেখার শেষে শুধু বলবো, আমরা অকালে এমন একজন সাহিত্যের নক্ষত্রকে হারিয়েছি, যা অতি সহজে পূরণ হবার নয়। আজ হুমায়ূন আহমেদের ৭১ তম জন্মবার্ষিকীতে আমার মনের একটি কথা বলেই শেষ করবো। রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের কবি, বাংলা ভাষার বিশাল নক্ষত্র, রবীন্দ্র ছাড়া বাংলা ভাষা অপূর্ণ।আমরা ভারতের শান্তি নিকেতন নিয়ে কত গর্ব করি। সেখানে একবার কেউ ঘুরে আসতে পারলেই নিজের জীবনে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। কত গর্ব করে বলি জীবনে আর চাওয়া পাওয়ার কিছু নাই। আমার জীবনটি স্বার্থক ইত্যাদি ইত্যাদি ।
অথচ আমাদের মাঝে হুমায়ূন আহমেদ আছে। সেই হুমায়ূন আহমেদের নিজের হাতে গড়া নুহাশ পল্লী আছে। আমরা কি পারি না, নুহাশ পল্লীকে শান্তি নিকেতনের মত করে গড়ে তুলতে। আমরা কি পারি না, সেখানে হুমায়ূন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে, যেখানে সাহিত্যের চর্চা হবে, যেখানে হুমায়ূন চর্চা হবে, যেখানে এদেশের বাংলার কৃষ্ট-কালচারের চর্চা হবে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে হুমায়ূন কে স্বরণ রাখা হবে। হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্য যা দিয়ে গেছেন তা তো চিরস্মরণীয় সাহিত্য । সর্বোপরি আমরাও একদিন গর্ব করে বলতে পারবো, আমাদের নুহাশ বা হুমায়ূন পল্লী (নিকেতন) আছে। আমাদের আগামীর প্রজন্ম নিশ্চয়ই সেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলতে পারবে, আমার জীবনটি স্বার্থক, আমি হুমায়ূন পল্লীতে এসেছি।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম।

