ট্রাভেল পারমিটের অপেক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার লাশ ! এ লজ্জা কার?

“পুরুষের চোখের জল দেখাতে নেই”– কথাটি আমার নয়। কথাটি বলছিলেন সুদূর আমেরিকা থেকে টেলিফোনে মোহন ভাই। কামাল সাঈদ, যিনি মোহন নামেই সবার কাছে পরিচিত মুখ। মোহন ভাইয়ের পরিচয়টি ছোট্ট করে বলা প্রয়োজন । ছোট্ট করে বলতে গেলে বলা যায় ” মুক্তিযোদ্ধা “। এরপরে আর কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। তারপরেও একটু বলি, মুক্তিযুদ্ধ কালিন বিএলএফএর সদস্যরা ঢাকাকে দুইভাগে ভাগ করে যুদ্ধ করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু ভাইয়ের অধিনে ঢাকা ইস্টার্ন ছিলো এবং তিনি ছিলেন ইস্টার্নের কমান্ডার। ওয়েস্টার্ন ছিলো আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্টু ভাইয়ের অধিনে এবং তিনি ছিলেন ওয়েস্টার্নের কমান্ডার । ওয়েস্টার্নের  অধিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর এই অঞ্চলগুলো ছিলো। মন্টু ভাইয়ের এই ব্যান্ডকোর এর অধিনে চারজন সাব কমান্ডার ছিলেন, যাদের একজন এই কামাল সাঈদ ( মোহন ভাই ) ।

গত কয়েকদিন পূর্বেই লিখেছিলাম, মোহন ভাইকে আমি প্রায়শই টেলিফোন করে বিরক্ত করি। তবে টেলিফোনের অপর প্রান্তে মোহন ভাই কখনো বিরক্ত হচ্ছেন বলে আমার কাছে মনে হয় নাই । আর আমিও মুক্তিযুদ্ধ/মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাস জীবন আরো কত কিছু নিয়ে প্রশ্ন বা গল্প করতেই থাকি, আর মোহন ভাই গড়গড় করে সব বলেই যান। কখনো কখনো ঘন্টাখানেক আলাপ হয়। প্রতিটি টেলিফোন আলাপেই মোহন ভাইয়ের একটি উচ্চ হাসি জড়িয়ে থাকে। আজকের ভোরে ( ইউরোপের) আমি নিজেই মোহন ভাইকে ফোন করি । সম্ভবত তখন আমেরিকায় গভীর রাত হবে ( সময়ের পার্থক্য অনুযায়ী)। মোহন ভাই টেলিফোনটি রিসিভ করতে পারেন নি। ফোনটি করার উদ্দেশ্যে ছিলো, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর খবরটি আরো নিশ্চিত হবার জন্য । কেননা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে ঢু মারতেই দেখলাম, ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা পরলোক গমন করেছেন। গত দুদিন পূর্বে এমন খবর ফেসবুকে ছিলো, যা অসত্য অথবা ভুল বসত ছিলো । তাই আরো নিশ্চিত হবার জন্যেই মোহন ভাইকে এত গভীর রাতে ফোন করা। কেননা আমি জানতাম মোহন ভাই উনার সহযোদ্ধা খোকা ভাইয়ের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। যদিও ইতিমধ্যেই আমি দেশ থেকে সাদেক হোসেন খোকা বীর মুক্তিযোদ্ধার অতি নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে মেসেজটা পেয়েছিলাম। ঘন্টাখানেক পরেই মোহন ভাইয়ের ফোন কল। প্রথমেই বললেন, স্যরি । আমাকে রাতে ঘুমের ঔষধ নিতে হয়, তবে তোমার ফোন রিসিভ করে হ্যালো হ্যালো বলেও আর তোমার কন্ঠস্বর পাইনি। টেলিফোন রেখে আবার ঘুমিয়ে যাই। উঠেই তোমাকে কলব্যাক করলাম। তখন খোকা সাহেবের প্রশ্ন উঠেই আমাকে টেলিফোনে কনফার্ম করলেন, হ্যাঁ খোকা ভাই আর নাই, বলতেই গলার স্বর থেমে গেলো। মোহন ভাই নিজেই বললেন আমি পরে কল করছি বলে টেলিফোন রেখে দিলেন।

আমি সন্ধ্যার দিকে একটু নদীর পাড় থেকে হেটে বাসায় কেবলমাত্র ফিরেছি। তখনই মোহন ভাইয়ের ফোন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে প্রথমেই যা বললেন, উপরে সেই কথাটিই লিখেছি। উনার গলার স্বর ভীষণ জড়তাপূর্ণ। কিছুক্ষণ থেমে থাকলেন, আমিও কিছু বলছি না।  অনেকক্ষণ পরে বললেন খোকা ভাইয়ের জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে। একজন সহযোদ্ধার লাশটি এখন কিনা ট্রাভেল পারমিটের জন্য অপেক্ষা! একজন মুক্তিযোদ্ধার কি ভাগ্য! একজন মুক্তিযোদ্ধার কি পাসপোর্ট থাকতে নেই ? বলেই আবার কিছুক্ষণ চুপ। আমি মোহন ভাইয়ের সাথে এতবার কথা বলেছি টেলিফোনে অথচ কখনোই এতটা ভাঙা গলায় কথা বলতে শুনিনি! আমি অনেকটা নিরব থেকে আবার কিছু প্রশ্ন করলাম। এবার মোহন ভাই একটু শক্ত হবার চেষ্টা করলেন বলেই মনে হলো। বললেন, খোকা ভাই আমেরিকায় পলিটিক্যালি স্থায়িত্বের জন্য ইউএস ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী পাসর্পোট জমা দেওয়া ছিলো এবং অ্যাপিল করা ছিলো। সেটা প্রসেসিং চলছিলো, কোনো ডিসিশন আসে নি। ২০১৭ সালে খোকা ভাই দেশে চলে যাবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ১৭ ই এপ্রিল নিউইয়র্কের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট পাবার জন্য প্রসেসিং করেন, তবে দূতাবাস থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়, এটা উপরের সিদ্ধান্ত, আমাদের কিছু করার নেই । শেষ অব্দি উনাকে আজকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো, অথচ এমন একজন সহযোদ্ধা, এত বড় বীর মুক্তিযোদ্ধা, এখন উনার লাশটি দেশে পাঠাতে ট্রাভেল পারমিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় !  কথাগুলো মোহন ভাই বললেন ঠিকই, কিন্তু গলার স্বর মোহন ভাইয়ের ছিলো না। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো, এ যেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধার আহত হবার কান্নার সুর।যে মোহন ভাই টেলিফোনে এমন উচ্চ হাসি দিয়ে কথা বলেন, অথচ আজকে মোহন ভাইয়ের গলার স্বর আমি চিনতেই পারছিলাম না ! আর অল্প কিছুক্ষণ কথা হলো, তারপরে আমরা টেলিফোন রেখে দেই।

20191104_234623.jpg

টেলিফোন রাখলাম বটে, তবে স্থির থাকতে পারলাম না। মনে শত প্রশ্ন জাগছে। একটি যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে কেন এমন হয় ? কেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে এই মাটির জন্য যুদ্ধ করে,  স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। আজ উনাকেই দেশহারা হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয় ! এখন আবার নিথর লাশটিরও  ট্রাভেল পারমিটের জন্য অপেক্ষা! কি জবাব দেবে এই মাটি ? কি জবাব দিবে দেশ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে ? আগামীর ইতিহাসে কি লেখা থাকবে ? সেই ইতিহাস কি  যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের জন্য লজ্জার নয় কী ? কেন দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য  বিশেষায়িত সম্মান দেখাতে পারে না ? কেন দেশকে দেখতে হয় এমন সব অপচর্চা ? এইদল আর ওইদল , এই আদর্শ আর সেই আদর্শ সব মেনে নিয়েই বলছি, কেন দেশ এই বীরদের ক্ষেত্রে এক মঞ্চে সামিল হতে পারলো না ? মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ অপমান করার অধিকার রাখে না। এত রক্তের দানে দেশ, নিশ্চয়ই তার বীর যোদ্ধাদের অবহেলা/অপমান করতে চায় না। তাহলে, এই এত শত উত্তর ভবিষ্যতে কাউকে না কাউকে দিতেই হবে। আগামীর প্রজন্ম এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেই। কি উত্তর দিবে তখন রাজনীতি?

20191104_234609.jpg

সাদেক হোসেন খোকা বীর মুক্তিযোদ্ধার অনেক সাহসী গেরিলা ফাইটিং এর ইতিহাস আমরা পড়েছি। হিট এন্ড রান ছিলো তাদের বিশেষ পদ্ধতি । এই হিট এন্ড রানেই কুপোকাত হয়েছিলো পাকিস্তান আর্মি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ৭১ এর জুনের দিকেই হঠাৎ কয়েকজন অসীম সাহসী ছেলে, নির্লিপ্ত মুখায়ব, দৃঢ়তার মূর্তি, অকুতোভয় তারুণ্য, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতির চলাফেরা, ঢাকার আকাশে নতুন কিছুর আগমন। ভয় কে জয় করা এই যুবকেরা তাদের বিশেষ হিট এন্ড রান পদ্ধতি ব্যবহার করে ঢাকা জুড়ে একের পর এক ভয়ংকর গেরিলা আক্রমণ করে, পাকিস্তান আর্মিদের বুকের ভিতর চমকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো। প্রতিদিন ঢাকার কোথাও না কোথাও একের পর এক গ্রেনেড হামলা আর অ্যামবুশে পাকিস্তান আর্মির ভীত নড়ে গিয়েছিলো । ঢাকাবাসীদের নিকট এই যুবকেরা বিচ্ছু নামে বেশ পরিচিত হয়ে উঠে। এই বিচ্ছুরা সেই সময়ের বিখ্যাত ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা বাকি ছিলো না, যেখানে হিট এন্ড রান পদ্ধতি ব্যবহার করে অপারেশন চালায় নাই। ইতিহাসে ঢাকায় অনেক ভয়ংকর সব গেরিলা অপারেশনের কথা পাওয়া যায় । আর সেই অপারেশনগুলোর একজন বীর সাদেক হোসেন খোকা । বিনম্র শ্রদ্ধা ।

এই লেখা যখন লিখছি তখন অনেক রাত, মেসেন্জারে মোহন ভাইয়ের একটি মেসেজ পেলাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার লাশ আগামী মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সময় রাত ১১ টায় ফ্লাইট EK2021 তে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবে এবং আগামী বৃহস্পতিবার সকালে দেশে পৌঁছাবে।  দেশে  এই বীরের লাখো ভক্ত/কর্মীদের জন্য মেসেজটি লিখলাম যেন বীরের লাশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সুবিধে হয়। আমি লিখছি আর ভাবছি, মোহন ভাইয়ের কথা। উনার নিজেরও অনেক বয়স হয়েছে। যদিও টেলিফোনে কথা বললে মনে হয়, টেলিফোনের অপর প্রান্তে একজন তরুণের সাথে কথা বলছি। সব সময় উচ্চ হাসি মুখে লেগেই থাকে। আজকেই প্রথম মোহন ভাইয়ের ভিন্ন রূপ টের পেলাম। হয়তো বা একটু বেশিই আঘাত পেয়েছেন সহযোদ্ধার পরলোক গমনে। সাদেক হোসেন খোকা যেকোনো দ্রুততর সময়ে চলে যাবেন এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড ছেড়ে , এ কথা মোহন ভাই আমাকে গতদুদিন পূর্বে বলেছিলেন, ডাক্তারা এটা মোহন ভাইকে বলেছিলো। ধারণা করি এত শক্ত মনের মানুষ মোহন ভাই , নিশ্চয়ই সার্বিক বিষয়গুলো ভেবেই বেশি মর্মাহত হয়েছেন। হবারই কথা , কেননা তিনি নিজেই সাদেক হোসেন খোকার সাথে একজন মাঠের মুক্তিযোদ্ধা । উনার মনেও নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগে, যে যোদ্ধা যুদ্ধ করে দেশের জন্ম দিল , কেন আজ সেই  বীরকে দেশহারা হয়ে পৃথিবী ছাড়তে হয় ? ভাবি, সেই বেদনাই মোহন ভাইকে হয়তো বেশি কাঁদিয়েছ। আর সেই কান্না থেকেই হয়তো বা মোহন ভাই নিজের অজান্তেই বললেন , “পুরুষদের চোখের জল দেখাতে নেই “! লেখার শেষে বলি, মোহন ভাই আপনাদের মত বীরদের কাছে আমরা চির ঋণী, এই দেশশ ঋণী, এই জাতি ঋণী। আপনারা দীর্ঘজীবী হোন।  বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই ।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.