ছাত্র রাজনীতি এবং ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে বলতে গেলে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকটা ভেবে চিন্তেই বলতে হবে। কেন ? তা না বললেও আশা করি সবার কাছে বেশ পরিষ্কার । সত্যি বলতে সার্বিক ছাত্র রাজনীতি নিয়ে লিখতে গেলেই মহা বিপদ। কেননা স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির মান আর স্বাধীনতার পরবর্তী সময়কাল ছাত্র রাজনীতির মানে একটা বিরাট পার্থক্য নিশ্চয়ই আছে। যদিও যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের আশা আকাঙ্খা ছিলো ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী মানটি নিশ্চয়ই স্বাধীন দেশে আরো অনেক উচ্চমার্গে চলে যাবে। কিন্তু মহাভারতের মত সত্য হলো সেই কাঙ্খিত আশা কতটুকু পূরণ হয়েছে, সেই প্রশ্ন করাটাই অবান্তর বটে। তবে একথা অনায়াসেই বলা যায়, একটি পরাধীন রাষ্ট্রে সার্বিক আন্দলোন আর ছাত্রদের হুঙ্কারে একটি মান মর্যাদা বরাবরই ক্লাসিক হয়। বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তারচেয়েও বড় উদাহরণ আমাদের নিকটেই বিরাজমান । এই দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত আমাদের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস ঘাটলেই তার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায় সার্বিক ভাবে।
গত ২০০৮ সাল থেকেই দেশে একটি রাজনৈতিক দল এককভাবে ক্ষমতায় আছে , যে দলটি স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত ছাত্র রাজনীতির দলের একটি বিশাল ঐতিহ্য আছে। সেই কারণেই আজকে ভিন্ন ছাত্র রাজনীতির দল নিয়ে আলোচনায় না গিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলকেই কেন্দ্রবিন্দু করে কিছুটা আলোচনা । লক্ষণীয় যে, ছাত্র লীগের জন্ম তার প্যারেন্টস্ দল আওয়ামী লীগেরও পূর্বে । ১৯৪৮ এ ছাত্র লীগের জন্ম আর ১৯৪৯ এ আওয়ামী লীগের । আরো লক্ষণীয় যে , ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গসংগঠন বা নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলো না। ছাত্রলীগ তার নিজস্ব স্বকীয়তায় এবং সম্পূর্ণ নিজেদের বলয়ের ছাত্র সংগঠন ছিলো । সত্যি বলতে জন্ম এবং কর্মকা দিয়েই ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
রূঢ় সত্য হলো, একটি পরাধীন দেশের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ পরবর্তীতে স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে তার সেই ঐতিহ্যবাহী স্বকীয়তা মোটের উপর ধরে রাখতে পারেনি। এখানে একটু বলে রাখি , গত দুদিন সেই সময়ের পোড় খাওয়া ছাত্রলীগের কয়েকজন সাবেক কর্মী ও নেতাদের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছি। তাদের মুখের ভাষ্যেনুযায়ী ( নাম বলা থেকে বিরত থাকলাম) স্বাধীনতার পরপরই দেশে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একটা বিরাট পরিবর্তন চলে আসে। সেই সময়কালেই ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী গড়ে উঠে। নাম ঠিকানা সহ অনেকেই বলেছেন, সেই সময়েও টর্চার করার জন্য নির্দিষ্ট করে জায়গা ছিলো। আনেক ভিন্ন মতের মানুষেরা সেই টর্চারের স্বীকার ছিলো। কথাগুলোর সত্যেতার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ের সাত মার্ডারের কথা সবারই জানা। প্রয়াত ছাত্রলীগের শফিউল আলম প্রধান ( যিনি পরবর্তীতে বিএনপি ঘরনার একটি দলে ছিলেন ) যাকে সেই সাত মার্ডারের প্রধান বলেই সবাই জানতো। কথাগুলো বলার কারণ , মোটেও ছাত্রলীগকে ছোটো করার জন্য নয়, এটাই কঠিন ইতিহাস ।
আসুন একটু দেখে নেই, ছাত্র রাজনীতি কিভাবে তাদের স্বাধীনতা হারালো? স্বাধীনতা বলতে , ছাত্র রাজনীতি কিভাবে প্যারেন্টস্ দলগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলো। এই অন্তর্ভুক্তের কথা বলতে গেলেই স্বৈরাচারের অপকারিতার কথা চলে আসে। সালটি ১৯৭৮ এ, প্রেসিডেনট জিয়া, তিনিই প্রথম স্বাধীন দেশের ছাত্র রাজনীতিকে মূল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীতে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের কাহিনী সেই ৮০ দশকে কি ছিলো? বা কতটুকু ভয়ানক ছিলো ? বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে কত খুন খারাপি হয়েছে? সেটা সবারই মোটামুটি জানা, আজকে সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে সারসংক্ষেপ বলা যায়, প্রেসিডেনট জিয়ার হাত ধরেই ছাত্র রাজনীতি তার নিজস্বতাকে বলি দিয়েছিলো। এই সত্যেকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই।
ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আরেক স্বৈরাচার প্রেসিডেনট এরশাদও কম জান নাই! এই এরশাদের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বেশ হুমকি ধামকির কথা সবার জানা। এই স্বৈরাচারেরও আকাঙ্খা ছিলো ছাত্র রাজনীতি চিরতরে বিদায় দেবার। কেননা এই ছাত্ররাই ছিলো তার বড় হুমকি । অবশ্য পরবর্তীতে ছাত্রদের কল্যাণেই এই স্বৈরাচারের বিদায় ঘন্টা বেজে ছিলো, ইতিহাস বড়ই নির্মম হয়। এই স্বৈরাচার কিন্তু পারেনি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের প্রয়াশ পূরণ করতে। অবশেষে রাজনীতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে সরকারী টাকায় ( মূলত জনগণের) নিজের রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন জাগদলের জন্ম দেয়। একথাও সত্য অস্র আর টাকা দিয়েও তার তৈরি জাগদল ( ছাত্র সংগঠন ) তার নিজের পতনকে ঠেকাতে পারেনি। তবে ছাত্র রাজনীতিকে কয়েক ধাপ বেশি কলুষিত করতে পরেছে বটে।
শেষ খেলায় ১/১১ তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ এর নির্বাচনের সময় নির্বাচনের শর্ত সাপেক্ষে, ছাত্র সংগঠনগুলোকে প্যারেন্টস্ দল থেকে একটু দূরে ঠেলে দিতে পেরেছে বটে। আইন করে ছাত্র সংগঠনগুলোকে প্যারেন্টস্ দলের সহকারীতে পরিণত করছে। ব্যপারটি অনেকটা এক্সিডেন্ট করে হাতে ক্রেক ধরিয়ে দেবার মত। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটো। অবশ্য এখানে রাজনৈতিক মূল দলগুলোর চাওয়াই পূরণ করা মাত্র । প্যারেন্টস্ দলগুলো নিজেরাই চায় না, ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের স্বকীয়তায় চলুক। কেননা, ছাত্র সংগঠনগুলোর যদি আলাদা ভূমিকা থাকে, তাহলে না আবার নিজেদের কুকর্মের উপরেই না আবার ঝড় আসে। সুতরাং ছাত্র সংগঠনগুলো যত বেশি অধীনস্থ থাকবে , প্যারেন্টস্ দলগুলোর ততই সুবিধে বেশি। রাজনৈতিক স্বার্থ বলে কথা !
ছাত্রলীগের কথা বলতে গিয়ে পারিপার্শিকতার কারণেই কিছু ভিন্ন কথা চলে এসেছে। লক্ষ্য করুন, ছাত্রলীগের প্যারেন্টস্ দলের প্রধান মাননীয় শেখ হাসিনা একবার ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে বিরক্তি প্রকাশ করে ছাত্রলীগের প্রধান কর্তা থেকে নিজেক দুরে সরিয়ে নেন। একই ধরনের কর্ম বিএনপি প্রধান মাননী খালেদা জিয়াও একবার ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দুই ছাত্র সংগঠনই আবার তাদের ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং ফিরে পেয়েছিলো বটে। এখানেই ছাত্র সংগঠনগুলোর দূর্বলতা প্রকাশ পায়। কেন এই দূর্বলতা, সেটার অনুধাবন ছাত্র সংগঠনগুলো আজ অব্দি বিবেচনায় বা চর্চায় নেয়নি।
সাম্প্রতিককালে ছাত্রলীগের দুই প্রধান শোভন ও রাব্বানীকে বিদায় দেওয়া হলো বটে ! কাজের কাজ কি হবে ? সেটার দিকে কেউ লক্ষ্য করছি না। শুধুমাত্র বিদায় দিয়ে এদেরকে শুদ্বতায় আনা যাবে বলে মনে করি না। তাদের কেন বিদায় করা হলো ? কোনো কারণ কেউ বলতে পারবে না। কেননা কারণ জানা থাকলেই যে তার একটা আক্ষরিক আইনগত বিচারের প্রশ্ন চলে আসবে। এখানে স্পষ্ট যে, মূল রাজনৈতিক দলগুলো আগামীর স্বার্থপরতার কথা মাথায় রেখেই সেই বিচারের দিকে যাচ্ছে না। কেননা, এই ছাত্র সংগঠনই যে প্যারেন্টস্ দলগুলোকে শক্তির জোগান দেয়। সুতরাং সামনে আবার যে এদেরকেই ব্যবহার করতে হতে পারে, সেই সুযোগটা নিতেই প্যারেন্টস্ দলগুলোর চুপসে যাওয়া !
লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে জানি। বুয়েটের কথা কিছু বলেই শেষ করবো। আবরারের হত্যা কাহিনীতে আর যাচ্ছি না। আবরারের হত্যার কারণে ছাত্রলীগের বুয়েটের নেতা/কর্মীদের তাৎখনিক কিছু বহিষ্কারের কথা পত্রিকায় দেখলাম। ভালো, তবে আবার কেবলমাত্র সেই বহিষ্কার বলেই মনে নানান প্রশ্নের জন্ম দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ছাত্রলীগের নিজস্বতা কতটা দূর্বল যে, এই সংগঠনের নেতা কর্মীরা আবরারের মর্মান্তিক হত্যার বিপরীতে একটি সাংগঠনিক মিছিল, প্রতিবাদ সভা বা মানব বন্ধন পর্যন্ত করার মত চিন্তা তাদের মাথায় আসলো না !!!
সবার মনে আছে নিশ্চয়ই, বুয়েটে এক সময় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ছিলো। গতকালই খবরে দেখলাম একদল সাধারণ ছাত্র , ছাত্র রাজনীতি বন্ধের জন্য স্লোগান দিচ্ছে। সেই সাধারণ ছাত্রদের আকুতি অবশ্যই সবাই অনুধাবন করে নিশ্চয়ই । তবে এটাও বুঝার বিষয় যে , ছাত্র রাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান মোটেও নয়। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে যা হবে, প্রথমত: নিজেদেরকে না বুঝেই একটি অন্ধকার গহ্বরে ঢুকিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত : ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে, এই উচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ বুঝেই ধর্মের দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অতিশীঘ্র হিজবুল তাহেরী বা ধর্মান্ধ গুষ্টির তৎপরতা বেড়ে যাবে, জামায়াত শিবির তো আছেই এবং ওরাই হয়ে উঠবে প্রতিষ্ঠানগুলো হর্তাকর্তা, ওরাই সব চাবিকাঠি চালাবে।
তাহলে করণীয় কি ? হ্যাঁ, মূল করণীয় হলো ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিজেদের স্বার্থেই লেজুরবৃত্তি শতভাগ ছাড়তে হবে। নিজেদেরকেই শুদ্ধতায় আনতে হবে। ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের চাহিদাতেই চালাতে হবে। জাতির প্রয়োজনে অবশ্যই ছাত্রদেরকে ছাত্র সংগঠনকে সাথে নিয়েই এগিয়ে আসতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই প্যারেন্টস্ দলগুলোর স্বার্থের কারণে নিজেদেরকে আর বলি হওয়া যাবে না । কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মে নিজেদেরকে সংশ্লিষ্ট করা থেকে শতভাগ বিরত রাখতে হবে। সর্বোপরি ছাত্রদের অধিকার সর্বোচ্চ অধিকার বলে বিবেচনায় নিতে হবে। ছাত্ররা, আপনারা অনেক বলি হয়েছেন, সামনে আর বলি হবেন না। আপনারা এই ধাপগুলো লেজুরবৃত্তি ছাড়া এগিয়ে আসুন, এই দেশের ভালো চায় এমন হাজারো জ্ঞাণীগুনীজন/ শিক্ষিতজন নিশ্চয়ই আপনাদেরকে ভবিষ্যতে আরো ভালো পরামর্শ দান করবেন। আপনারাই এই স্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ শক্তিশালী তরুণ সমাজ। আপনাদের পানেই দেশমাতৃকা চেয়ে থাকে। আপনাদের নিজেদের সম্মানে, দেশের সম্মানে এবং ভবিষ্যতের জন্য এখনি মেরুদণ্ড সোজা করে রুখে দাঁড়ান। জয় আপনাদের হবেই। কেননা আপনাদের শরীরে তারুণ্যের রক্ত প্রবাহ, আপনাদের কেউ রুখতে পরবে না । জয় হোক সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম।

