‘মুঠো খুলে দেখি’ ‘চিরায়ত হিসাবের খাতা’ -ড. সন্দীপক মল্লিক

‘মুঠো খুলে দেখি’ ‘চিরায়ত হিসাবের খাতা’

ড. সন্দীপক মল্লিক

কবি খাতুনে জান্নাত(জন্ম : ১২ জুলাই, ১৯৬৯ খ্রি.) কবিতায় জীবন-পূর্ণতার জ্যোতিকেই লালন করেন। তাঁর শিল্পবোধ এবং জীবনায়োজনের বৃত্ত বিন্যস্ত হয় সত্যায়ত রূপমায়। দেশ-কাল-বোধের পরিচ্ছন্ন চিত্রদীপ্তি সম্যকভাবে সংবৃত হয় তাঁর কবিতায়। ‘মুঠো খুলে দেখি’(প্রথম প্রকাশ ; ঢাকা : অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬ খ্রি.)। প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান। পৃ. ৬৪। মূল্য : ১৫০ টাকা) কাব্য-সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের প্রণিধানযোগ্য উক্তি :

ক.

‘মুঠো খুলে দেখি’ কবি খাতুনে জান্নাতের আত্মমগ্নতার এক বিমুগ্ধ প্রতিচ্ছবি। মুগ্ধতার অবয়বে

এক ঐন্দ্রজালিক জীবন-উপলব্ধির আনন্দ এবং ঘনকুয়াশার ছবি বুনন-কৌশলে উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুট

এই গ্রন্তভুক্ত কবিতায়।(প্রচ্ছদলিপি)

খ.

কবি শব্দ-সচেতন এবং কাব্যময়তার দক্ষ কারিগর। প্রেম ও প্রকৃতির সৌন্দর্য-অনুধাবনে কবির দৃষ্টিভঙ্গি

.. আকর্ষণীয়। গভীর দেশাত্মবোধ ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল অনুরাগী কবি .. উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ,

অলঙ্কার, অনুপ্রাস ও ভাবের দ্যোতনায় কবির আবেগ ও ভাষা কবিতার পাঠক ও বোদ্ধার ভাবনা ও

অনুভূতির অংশ..(ঐ)

উপর্যুক্ত শ্রীমগ্ন অনুভাবনায় ‘সত্য’ই সংস্থিত। শব্দ-সত্য-জ্যোতির্ময় কবি জীবন-বিশ্বস্ততার আলপনা এঁকেছেন অবলীলায়। তিনি ‘কালের ব্যর্থতা ও বিষ-মন্ত্রণা’র রক্তাক্ত রূপমাকে আত্মঃস্থ করেছেন । মানবিক ‘বিশ্বাসের ভিত নড়ে’ – তাও তিনি উপলব্ধি করেছেন সুগভীর সচেতনতায়। তবু তিনি উচ্চারণ করেছেন :

মুঠোতে জলের অণু, রোদ-রাঙা মেঘের উপমা,

জীবন নামক উদ্দীপনা হাট খোলে।..

গভীর আবেগে একে-অন্যে কাছে এনে দেয় সুখ

বারোমাসি ফুল হয়ে মুগ্ধতার ছন্দতাল শোনে।(মুঠো খুলে দেখি)

১.

জয়শ্রীমান দেশদীপ্তি আর জীবন-সৌন্দর্যের সন্দীপ্তি কবির সৃজন-পরিব্যাপ্তিতে। ‘বৃক্ষের বাকল’, ‘এদোঁডোবা’, ‘বিস্তীর্ণ জলের ক্রন্দন’, ‘পিতার গায়ের ঘ্রাণ’, ‘ঢেলার গুঁড়োয় বাঁধা বলদের টান’, ‘মায়ের বড়শি-পাতা পুকুরের কোণে কুমড়ো ফুল’-এর সংবৃত-সংরাগী ঐশ্বর্যের সৌরভ কবি-আত্মাকে বিমুগ্ধ করেছে। কবির প্রাণময় উক্তি :

ঝাঁপফেলা দোকানির দিনভাঙা স¦র,

পড়শির কানাকানি

ধুলোর ভূমিতে বাতাসের সাথে

নারীর কান্নার ধ্বনিতে শিশুর প্রথম ক্রন্দন।..

মননের ধার..

খড়িমাটি, ছকটানা

অদল-বদল নুন, পান, চুন।

 

হাতটা সরিয়ে নাও

এখানেই থেমে থাক কিছুটা জনম।(হাতটা সরিয়ে নাও)

সত্তার পুলক-সঞ্চারী উপমা আর উৎপ্রেক্ষার ফাগুন, ছন্দ-মাধুর্যমন্ডিত অন্ত্যমিল দিব্যশ্রীমান হয়েছে কবির শিল্পায়নে। পল্লিমগ্ন জীবনের আয়ুষ্মান মুগ্ধতায় ভাস্বর কবির উক্তি :

নাড়ার আগুনে শীত ভাঙে যুবতীরা,

উনুনের তাপে রাখে সিক্ত হাত..

কোষ-কলায় সঞ্চারী ধারাপাত।

শ্রাবণ ঝরছে, অঘ্রাণ ডালে ডালে..

গ্রীষ্ম প্রখর পোড়াবার কামনায়

পোড়োবাড়ি ধরে কোনাকুনি হেঁটে যায়।..

দাঁতে কামড়ে ধরে আঁচলের খুঁট,

রাতের ছায়ায় অমাবস্যা থমথম

দেহের পূর্ণিমা হতে চায় লুট।(যুবতী জ্যোৎস্নায়)

 

কবির প্রেম-মগ্নতা – দ্বৈত-অদ্বৈত-তৃপ্তি বিন্যাস – স্বপ্নময় সন্নিধান যেন ‘সকালের গান, সন্ধ্যার বিরহী গীতাঞ্জলি হয়ে’ ‘পিপাসায় তুলে আনতে’ চায় ‘উদ্গত ঝরনার প্রবহমানতা’, ‘আকাশ-ভাঙা বর্ষার উন্মত্ততা, তেজোদ্দীপ্ত সৌরকণা’। কবির বাসনা :

স্বপ্নের ওপারে স্বপ্ন চাই

স্বপ্নের ওপারে স্বপ্ন চাই আজ।(স্বপ্নের ওপারে)

অপরূপ প্রেমাত্মক কবির শব্দ-সন্দীপনার বৃত্তায়ন ! বাক্যময় অনুভব – সুষম প্রিয়-সান্নিধ্যযাপন -যৌবন-মদিরতা ! চৌদিকে ‘বিবর্ণ দিন’ ! তবু কবির উচ্চারণ এমন :

রুটিন মতো দু’একটি চুমুর চুম্বক,

এক পশলা আশায় মেশা অনুভূতি নিয়ে

পরস্পর  পাশাপাশি…

রোমাঞ্চিত পুরনো গন্ধ..

বর্ষণের শহরে হুডঢাকা রিক্সার সারি !

আমাদের পোশাকে আটকে থাকে

দৈনন্দিনতার পীতাভ সেফটিপিন।(সেফটিপিন)

কবির প্রাণ-সম্পুষ্ট শিল্পানুগ দিশা কষ্ট-বেদনার বৃত্ত-অতিক্রমী। তাই তিনি উচ্চারণ করতে সক্ষম এমন কথা :

মীনের আত্মা বয়ে সারবো সাঁতার ধূসর ধারায়..(পাল)

কবি তো স্বার্থান্ধ ‘শিয়াল’- কে পশ্চাতে ফেলেই ‘লুকানো আতর’-এর আবাসন গড়তে আগ্রহী। প্রেম-অন্বীক্ষুমুগ্ধতায় তাঁর কবিতালাপ সজ্জিত হয় হৃদয়মোহন ভঙ্গিমায় :

এপার ওপার হতে মালতি মলয় হোক বিনিময়..(ঐ)

২.

সমাজ-পটভূমে আজ মানবিক কষ্টের পাটাতন ! কবির অন্তর-বিন্যাসে তাই ‘পাহাড় পাথর’, ‘ধু ধু বালুচর’। জন্মভূমির ‘প্রাণের সজ্জায়’ সর্বজনীন ‘ঝিনুকের জল’।(দিনের জঠরে দিন)

কবির সৃজন-পরিসরে সংসিদ্ধ লোকজ ভাব-পোষণা – ‘বিন্যস্ত বিরহ’, ‘কলমি শাক’, ‘সোনামুখী সুই’-এর চারু-যোজনা :

আয় আয় সোনামুখী সুই আমার

এইখানে গেঁথে রাখি বেদনা খসার চাবি ;

নাকছাবি খুলে কার আরুদ্র সকাল সকাল কেঁদে-কেঁদে

রাতের বাড়িতে যায় ছুঁই তার বিন্যস্ত বিরহ,

আদি-অন্ত দাবি।(জীবন-কথা)

 

কবির প্রার্থিত নয় এমন অনুভব –

দিন থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায়

মায়ের স্নেহের ভোর

প্রেমিকের উষ্ণতার দুপুর

বন্ধুর বিশ্বস্ত হাতের বিকেল

পিতার প্রাজ্ঞ বোধের নির্ঝঞ্ঝাট রাত্রি।(অনুভব)

কবির প্রার্থিত নয় ‘শৃঙ্খলাহীন নগরী’র ‘আশা-হাহাকার’, ‘কালো হাত’-এর ক্রুর আবাহন !

 

কবির মনন-স্পন্দনে উত্তর-আধুনিকতার রূপান্বয় আর লোকজ সংবৃতির সুধা। উদ্দেশ্য – শান্তি, স্বধা আর স্বস্তি। কিন্তু দৃশ্যাবয়বে –

গলছে মনের মুখ ও মুখোশ

বোধ ও বধিরতার সংলাপ শেষে

মানুষের মেদ ও মাংস ঝুলে থাকে

বৈদ্যুতিক করাতে কাটা সময় শাখায়।

 

অন্ধকারে বুক-পোড়া গন্ধ –

জোনাকি ডানায় বুঝি আগুন দিয়েছে কেউ !

বৃক্ষদের আর্তনাদে পথ-ভাঙা পথ ধরে।(শান্তি ও শান্তি)

 

কবির আক্ষেপ বর্তমান-সত্যের অগ্নিক্ষরা যন্ত্রণাক্ত পটে –

কেউ বোঝে না মর্ম, কে যে কী কী  বলছে !

তুমি কী করে ফিরবে ও  সই

তোমার যে গণধর্ষণ চলছে !(ঐ)

কবির প্রাণমুগ্ধ বাসনা – তাঁর জন্ম-সুরভিত সত্তায় সঞ্জীবিত হোক ‘জারুল, জামরুল নিশিন্দার দোলা’, ‘শস্য-মাটি-ভ্রূণ’, ‘নদী-ঘাটতলা’, ‘কচুরিপানা’র আদর। তাঁর অন্তরায়ত অনুভব-সন্নিধান :

হৃদয় পুড়–ক – ভস্মীভূত হোক –

বাতাসে আলোতে যাক বিড়ালির রূপ

দূর্বা-মাটি, জলকণা, পরানের রোগ

গলে গলে ঘুরে ঘুরে

সুশীলা হৃদয় পুণ্যবতী হোক।(পুণ্যবতী)

যতোই বেদনার্ত হোক অস্তিত্ব, বস্তু-জাগতিক অপঘাতে, শোষণে যতোই বিধ্বস্ত হোক সত্তার সজ্জা, প্রভাত-প্রশান্তি আর প্রাণ-প্রেম-সুষমাই কবির প্রার্থিত, যা সর্বজনীন। সর্বাত্মক স্বস্তির আরাধনায় – পল্লি-সৌন্দর্যের আনুপূর্বিক অন্বেষায় কবির কবিতা-জ্যোতির্ময় অনুভব-অনুবন্ধের আয়োজন। তাঁর উচ্চারণ :

কবিতা হাঁটছে …

ভোরের পান্তাথালা-বাসন হয়ে

ধানস্তূপের কোল নাড়ার আগুন ;

উঠানে ছড়ানো জাল, মাছের খলুই

কাদার গন্ধ মেখে ডুবসাঁতার শেষে

হাঁড়ের কাঁপুনিতে উনুনের আঁচ।(কবিতা প্রসঙ্গ)

কবির ‘কবিতা নরম হাতে’ ছুঁয়ে থাকে ‘আমবাগান’, ‘তালতলা’, ‘খেসারি-শাক’, ‘শামুক’, ‘হাটের ঝুনঝুন টুনটুন বোল’, ‘ইটভাঙা হাতুড়ি’, ‘ফড়িংয়ের অভিসার’, ‘কৃষকের ঘর্মাক্ত জীবন’ আর ‘নাইওরির জমানো বেদনা’।

‘গ্রাম-শহর-মহাশহর ছুঁয়ে-ছুঁয়ে অভিবাসী হৃদয়ের স্তর’ কবির কবিতা-সম্ভূতির সন্তুষ্টি বিধান করে। ‘জল ও মাটির সেতু’ ‘বুড়িগঙ্গা’র হাহাকার, ‘মিছিল শ্লোগান’, ‘জীবন বদলাবার অভিপ্রায়’, ‘সংগ্রামী জীবন’, রমনার বটমূল, শহীদ মিনার, নিরিবিলি স্মৃতিসৌধ, নূর হোসেন চত্বর’, ‘জাতির ঐতিহ্যে উজ্জীবিত পঙ্ক্তিমালায়’ অবিনাশী বাসর বিনির্মাণ করে। মরমী মুগ্ধতার সজ্জিত রূপায়ণা যেন !

৩.

চুয়াল্লিশ  বসন্তের আবহে কবির সার্বভৌম ভাব-প্রসারণায় জন্মভূমির ‘গ্রাম, নদী ও সরলতার স্বরলিপি’, ‘সাদা আলো ছড়ানো কাশফুল’, ‘টক-ঝাল বাতুলতা’, ‘মাছরাঙা, হরিয়াল’, ‘বেতফল’, ‘পুরাতন পুকুরে প্রতিবিম্বিত পাকা স্কুলঘর’, ‘নৃত্যরত কিশোরীকাল’ আর ‘পুঁই-গোটার রঙে রাঙানো হাতের তালু ও ঠোঁট’ দৃশ্যায়ত জ্যোতি-রূপমায় সন্দীপ্ত যেন ! কবির তারুণ্য-বিভান্বিত কথকতা :

আজীবনের লুকানো কথা

সময়ের বালিয়াড়িতে ঢেউ তোলে, পাড় ভাঙে..

পায়ে স্বর্ণলতিকার নূপুরজোড়া শব্দহীনতার শব্দে-

মাতে অগোছালো পথঘাট, টিলা ও  টানেল।

 

নানা সন্ধিক্ষণের সন্ধি ডিঙিয়ে এ চোখ এখনো সবুজ

বিস্তীর্ণতার উর্মি উড়িয়ে পার হয় দিগন্ত-তটরেখা।

আউল-বাউল মন কাঁচাহলুদ গায়ে মেখে..

রোদমাখা সোনামাখা দিনগুলোর দিকে..

বুঝি অরুণোদয়ের সাক্ষী রেখে

ভালোবাসবে পেছন-আগামী রূপালেখ্য কথকতা।(চুয়াল্লিশ)

 

কবির ‘ইচ্ছার কাঁকন’ ‘সুষমা জড়িয়ে’ ‘প্রাণ আলো করার তাগিদ’ অনুভব করে। ‘পুস্পের মনোহারী সংগ্রাম’কে ভালোবেসে ‘সুপ্তি ও মগ্নতায় প্রেমিকের হাতের আলতো চাপ’ সুপ্রসন্ন হয়। কবির প্রাণময় কথন :

দাও না ভিতর বাইরে সুবাসিত স্বচ্ছ কোলাহল।

বিরহী বিকাল হয়ে থেকো না,

এমন পরবাসী রাত পার হয়ে,

এমন ভার-করা ভোর পার হয়ে,

কোথাও নিয়ে চলো, অন্য কোথাও।(ইচ্ছার কাঁকন)

 

কারণ, ‘ঝড় ও ঝঞ্ঝায় ছুটতে ছুটতে’ কবি বিপর্যস্ত। অবাঞ্ছিত ‘প্রহেলিকা’য় বিপন্ন ! সর্বজন-ভাব-আয়োজক কবির নির্মেদ সত্যায়ন -‘আজীবন বয়ে বেড়ানো সুন্দরের গাল চাটে বেহায়া আঁধার!’(ঐ)

কবির দর্শন-অভীক্ষা :

মমতা, সরল-মাখা সেদিন..

স্বপ্নের বেসাতিসহ পাড়ি দেবে শূন্যতায়..

 

বাড়ন্ত যৌবন চায়

ভুল-চুক মেপে-ছেঁকে যদি কিছু পায়

তারই নির্যাস মেখে নেরে আতরের মতো

যখন শরীরে বয়সের বাড় বাড়ে-(পাথর কুড়ানো পথ)

অন্তর্জোতির্ময় প্রীতি-সম্পৃক্ততা – সুধা-সমন্বিত ‘পুঁই, সিম ঝোপহীন দক্ষিণ দুয়ারি বাড়ি’ – শ্রীমগ্ন স্মৃতি-পুলকিত ‘ভাদি-তাল’-‘ডুমুর’-‘খেজুর হাঁড়ি’র স্বপ্নময়তা – কবির সত্তা-নিমজ্জনের বৃত্তায়ন যেন ! এমনই পরিবেশ-সংজ্ঞাধৃত জন্মস্থান – পিতৃ-মাতৃ-বাড়ি থেকে কন্যা তথা কবির চিরায়ত গমন ! উচ্চারণে মননের প্রভা :

বিজন-বিবশ রাতে কে-যে নাম ধরে ডাকে !..

ও বাড়ি তো সুনসান..

নেই মগন বর্ষায় চাল-ডার ভাজার আবদার-

কন্যারা সব ঝেঁটিয়ে বিদায় হয়েছে।(কে যে নাম ধরে ডাকে)

 

কবি তো প্রকৃতিরই সু-সন্তান -কন্যা-রত্ন ! পরিপার্শ্বের ‘কুয়াশা’, ‘শিশির’, ‘সৌরভের রোদ’, ‘মুগ্ধ প্রজাপতি’, ‘হুতুমের ডাক’ কবির অন্তরায়ত প্রজ্ঞানের জ্যোতি যেন ! কবির অন্ত্যমিল-সমুন্নত উচ্চারণ :

আমি আর প্রকৃতি তো মেয়ে

নদী বয় কুল কুল কুল

হৃদয়ের উৎসারণে নেয়ে

হৃদয়ের রক্তিম বকুল।(প্রকৃতি)

৪.

‘যৌবন’ তো বিনাশী জীবনপটের অবিনাশী এক বাসন্তী রূপমা। কবির বাসনা-সংবৃতিতে এমন গুণ-রূপ-স্থিতিই এক পূর্ণতার শোভাকে লালন করে। ‘আগ্রহী উঠোন’ হয়ে ওঠে ‘অপেক্ষা-ঘুঙুর’-এর বাস্তব-পরিসর। দ্বৈত-অদ্বৈতাবেশে ফাগুন রসাবিষ্ট কবির বক্তব্য :

তুমি-আমি রয়েছি দিনকতক যৌবনের ঘরে..

কেটেছি অনেক পথ

ঘুরে-ঘুরে পরেছি নিয়তি-টিপ..

আমরা চাইনি বেশি কিছু..

কবিতার কাঁধে হাত রেখে ছুটে যাই জলডুবি মোড়ে।

স্বপ্ন-ইচ্ছা জড়াজড়ি করে অশ্রু মাখে পরস্পর।(যৌবন)

 

জীবন-আবহে উদ্রিক্ত বিচিত্র ভাব-নসায়ন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে অস্থির হলে কবিতাময় গীতাশ্রয়ের পাথেয় খুঁজে ফেরে। তখন ‘স্মৃতির ভান্ড খুলে চাঁদ-রাতে গান গাইবার’ তৃষ্ণা জাগে প্রাণপুটে। তখন ‘নিঃশব্দ বাতাসে আলোটুকু কাঁপে।(কম্পন)

 

কবির অনিন্দ্য হৃদয়-উদ্ভাসনা :

ফাগুনের উচ্চতায়

নাভিমূল থেকে কাটে তন্দ্রার ঘোর

কেঁটে ঝেঁটে ছুঁড়ে ফেলি পুরনো অসুখ।(দাগ)

 

মানবিক সচ্ছল ভাবনা – প্রগতিসূত্র, ইতিহাসচেতনা, কল্যাণ-সংবেদী বিজ্ঞান-সূত্র নিঃশেষিত হতে পারে না ! দূষণ-উন্মুখী বিনষ্টি-বিতান স্থায়ী কেন হবে ? স্থিতি-উজ্জ্বল হবেই হৃদয়ের ‘আশ্বিনদোলা’, শরীরের ‘ফুলের ডালি’, নিঃশ্বাসের নির্যাস’ আর ‘মননের আকাশ’। কবি যদিও সৃজন করেছেন ‘দুষণ-উন্মুখ’ নামের কবিতা !

 

অতলান্ত অতীতের আধিকারিক কবির মনন আর নয়নÑ

ফিরে পেতে চায় আজ পুরনো হিসাবসহ সুদাসলে।

অনুসন্ধানী নৃতাত্ত্বিক

পরতে পরতে খুলবে সে আদিবাস..(ফসিল)

 

কবি সম্পন্ন জীবনেরই সম্পোষক। ইহকাল-পূর্ণতার চন্দন-শুদ্ধতাই তাঁর প্রাপ্তব্য, যা সর্বজনীন পুণ্যেরই আধার। তাঁর উক্তি :

কাঁচা-রোদের বয়স খুলে ধরতে হয়

চোখে লেগে থাকা ফসলের দোলায়িত শীষ।(সরস্বতী)

 

নকশি-কাঁথার জমিনে জমানো জীবন কবিতা..

এর এক ফাঁকে সরস্বতী আসে, সরবেই আসে..(ঐ)

 

প্রিয়তম যে, তার জন্যেই প্রীতি-সমুন্নত শিল্পাশ্রয়ী বাক্য হয় স্বতঃস্ফূর্ত, প্রেম-সম্বেগী ! কবির প্রাণনা :

তার চোখ সকালের দীপ্তি যদি –

স্পর্শে তার আমি হই শিশিরের ঘাস।..

বিগত দিনের পথ, মত, জ্বরা, শূন্যতা

ফুঁড়ে জেগে রয় মুখোমুখি প্রথম আলাপ..

ভালোবাসা নাম নেয় কণ্ঠে ব্রজবুলি গীত..(রাতের আলাপ)

৫.

কবির অনুভবের বিস্তারণ, সূ*-সমুজ্জ্বল সত্যাহরণ -প্রবুদ্ধ বিচক্ষণতা –  মনস্বিতা-সমৃদ্ধি অতুল্য। তাঁর কাব্যদ্যোতনা :

জলে পাতা পড়ার শব্দে চতুর তক্ষক যেমন সতর্ক হয়

তেমনই সতর্কতা –

তেমন সুচের মতো সূ² বিবেক

হামাগুড়ি দিয়ে কোথাও লুকিয়ে থাকে।(বিবেক)

 

জন্মভূমি সোনার বাংলার মর্মন্তুদ অধ্যায় গার্মেন্টস ট্রাজেডি নিয়ে কবির ক্রন্দন :

চেতনার গভীর তলদেশে এত এত লাশ শুয়ে আছে

ঘুমোতে পারি না..

অস্তিত্বের ভেতরমৃতের যুগল পা,

প্রগতির ভেতর মৃতের নূপুর পা..

 

সন্ধ্যায় রমণীরা গ্রাম-শহরের বাটে বাটে

নিত্যই বিছিয়ে দিতো রান্নার সুঘ্রাণ

এখন মানুষপোড়া গন্ধে এদেশ কঁকিয়ে ওঠে।(জীবন-পোড়া কাব্য)

 

পরিপার্শ্বের শ্রম-শোষকের বাহার, শ্রমিকজনের বেদনার্ত নিঃশেষণ কবিকে স্বস্তিহীন করেছে ! তিনি জন-আত্মার ক্রন্দনকে লালন করেছেন সহমর্মিতার বিভূষণায় ! কবির অশ্রæসিক্ত কথকতা !

ভাবনায় রক্তাক্ত প্রহরের গোল্লাছুট..

অশ্রæ, বেদনা ও আঁধার

এ তিনের কবর যন্ত্রণায় চাপা পড়ে আছি।..

কীভাবে ঘুমোই বলো !(আমি ঘুমাবো)

 

কবির নির্মেদ বক্তব্য :

গার্মেন্টসপিষ্ট অগণিত বেওয়ারিশ লাশ ঘাস হয়ে যায় !..

ধ্বংস-স্তূপের স্তব্ধতায় যার যার মতোই নিয়তি হাতড়ায় !..

পূর্ব-জনের সংগ্রামের ঐতিহ্যে ভাগাড়ে রেখে

মগজ ঠুকরে খাওয়ার নগ্ন উল্লাস নিউরনে বাজার বসায়।(আহত কালের আর্তনাদ)

 

কবির মননে জীবন-সৌরভ-সঞ্জীবিত পৌষালী আহ্বানের লীলা ! পল্লির সবুজময় সংসারে – ‘ধুলো-বালিমাখা পথ’, ‘ঘন ঘাস’, ‘ধান-কাউনের আমোদিত শীষ’, ‘বেগুনি কচুরিপানা’ কবির শরীরী-মানস সত্তাকে প্রসন্ন-প্রগাঢ় করে তোলে। সুস্নিগ্ধ হয় তাঁর অন্তরাত্মার সত্যমগ্ন মুগ্ধতার পরাগ ! কৃষ্টিসম্বুদ্ধ কবি উচ্চারণ করেন :

শিশিরের গায়ে মেখে রোদের স্মারক

হাজার বছরের রোগ, শোক ও মর্ষতা

রূঢ় বঞ্চনা পেরিয়ে ডেকে নেবে আপন ছায়ায় ;

মায়া দেবে অনাদিকালে অনন্ত প্রেমাকাক্সক্ষার বীজ বুনে-

যেমন রমণীর ভেজা-শরীরে জলের ঝিলিক জানিয়ে দেয়

দূর হওয়া স্বেদ ও ক্লান্তির অবসান।..

 

এসো আঁজলায় তুলে আনি মুঠো মুঠো পাওয়া।

কৃত্রিমতার বল্কল খুলে দেখি রক্তের ইতিহাস

যেমন ডোম্বিনী ডাকে নড়ে কাপালিক ঘরের বাতাস।(চলো)

 

অস্তিত্বের সুধাময় আবাসন – ‘বৃক্ষের নিবিড়তায় মনোহারিণী বাড়ি’ই কবির বাঞ্ছিত। কারণ –

শহুরে সুধীজনেরা বিছিয়ে রাখে লোহার রড, কাঠ, বালির স্তূপ

ডাস্টবিন ছাড়াও যত্রতত্র ময়লার ব্যাগ, কাকের চিৎকার।

কখনো বিশাল গর্ত খুঁড়ে আবক্ষ সেঁধিয়ে দিতে হা করে থাকে

আমার বিরহ-বিনির্মাণের বিরামহীন পথচলা।(অন্বেষণে..)

 

কবি কবিতাময় পরিপূর্ণতার ধারক। তাঁর আত্মার সংসারে সময়-চিত্তের ধৃতি আর কৃতির শব্দায়ন, ছন্দায়ন। তাঁর সৃজন-লীলাময় উচ্চারণ :

কাটাছেঁড়া কবিতার বোঝা নিয়ে বসে থাকি

ময়লার বিনে ফেলে কুড়োই আবার ;

ওরা আমার খন্ডিত ভাবনার অনুপ্রাস,

চেতনার ঘরে এক-ঝোঁকা রাতের বাতাস..

 

ওরা স্মৃতি-বিস্মৃতি..

সাহসিক প্রজ্জ্বলন

পুরনো প্রচ্ছায়া

নতুন যাপনা..

আহা ওরা যে অসমাপ্ত !(অসমাপ্ত)

 

কবির আত্মা পল্লিফাগুন-তৃষ্ণায় ভরপুর ! তাঁর স্মৃতিময় সত্তায় চলশ্রীমান ‘প্রজাপতির লেজবাঁধা সুতো উড়ানো কাল’।(গুঞ্জরন)

তাঁর ‘বিহ্বল মন’-এ ‘পাতার উড়নি’র শোভা, ‘চৈত্রের বাতাস’ !

 

কবির অন্তর্মগ্নতায়, কবিতা-চারুতায় – প্রেমময় সৃজন-বিহ্বলতার আবেশ। তৃষ্ণায় তাঁর প্রিয়তম সত্তার সম্বেগ। তিনি ‘কবিয়াল কালে সন্ধ্যার শিখায় মুখোমুখি মুখের ঝলক’(কড়চা)-সংরক্ষণী শক্তি লালন করেন। প্রিয়তমকে তিনি বলেন :

অনুভূতির বৈধব্য-বধে তোমাকে ভাবি

তা থেকে ছেঁকে নিতে হয় জীবন বটিকা..

বেদনার উপর আশ্বস্ত হয় তোমার সঙ্গীত।(ঐ)

 

‘নিশিগন্ধা সময়’ কবির প্রাণ-বাতায়নে। তিনি ‘মৌরী ফুলের পাপড়ি- ছেঁড়া সাদা বিছানায়’(নিশিগন্ধা সময়) প্রিয়তম মানবিক পূর্ণতার আলো খুঁজে ফেরেন। তাঁর ‘কবিতার করতলে মনমন্দিরা-পিউকাঁহা’ স্বনন-সমৃদ্ধির আলপনা আঁকে, সবাক-স্বারূপ্য হয় সত্যায়। বস্তুতঃ ‘জীবন নামের ঠিকানা খুঁজতে-খুঁজতে সোনামুখী দিনের দিকেই মন’..(গড়ন) তাঁর। তাঁর কথা :

ঘাস, মাটি, জল ও তেঁতুল পাতা হয়ে ওড়ে

এ-মাথা ও-মাথা।(ঐ)

 

কবির ‘ঠোঁটের উষ্ণতা, গতির গুঞ্জন, চিরসবুজাভা..

বুকের বাড়ন্ত ইচ্ছ-ডানা থেকে মধুমক্ষিকাও বাড়ালো সংগ্রহ।

শুধু তুমি পেলে না কিছুই –

বিকৃতি, বিষণ্নতা ও রুগ্নতা ছাড়া..(বিপন্ন)

 

মানবিকতার বিপর্যয়, প্রেমানুভূতির  কষ্টাশ্রয়ী প্রলম্বনই  যেন বর্তমানের ধৃতি ! কবির অনুভব :

কখনো বা ভুলে, কখনো বেভুলে –

তুমি দেখেও না দেখার মতো থাকো –

যেন দু’পাশে দু’নদী মাঝখানে অথৈ কালো।(অথৈ)

 

কবির চৈতন্যের সন্দীপনায় বাস্তবতার অলিন্দ। তাতে পরাবাস্তবতার নিষ্পাপ ‘নিরীহ ক্রন্দন’-এর আবহ। কবির প্রেমজ দ্বেত-অদ্বৈত অনুভাবনায় পরম-সত্তার বিভূষণা যেন ! তাঁর কবিতায়ন :

কেবল তুমি জেগে থাকো-

বিক্ষত বেদনাসহ বিচিত্র আরক।

সে-সব কিছু নিয়ে পড়ে থাকে –

কাদামাখা জল ও মীনের পাশে

আহত বকের পাশে নিরীহ ক্রন্দন।(নিরীহ ক্রন্দন)

 

কবির  কবিতায়তন – উপমা-উৎপ্রেক্ষার অপাপবিদ্ধ মুগ্ধতার শিহরণ – প্রেম-চন্দ্রিমার আয়োজন –

রাতের ভিতর চাঁদ

চাঁদের ভিতর দেখি চাঁদমুখ..

 

চুমুর চুম্বকে ভারি ঠোঁটে

কবিতা-কবিতা এক উষ্ণ নিঃশ্বাস-(জল)

 

কবির প্রিয়জ্যোতির্ময় উক্তি :

বিক্ষত যন্ত্রণা ছেড়ে স্পর্শ দাও আশা ;

দু’গালে গড়িয়ে পড়া চোখের জলের মতো..

 

কেবল তোমার কাছে কিছুটা তো

পাওনা থাকে প্রেম।(স্পর্শ)

৬.

শৈলী-সজ্জা – প্রেম-ভাবনাময় বিরহ-ব্যাপ্তি – প্রেমজ-প্রসাদ-সিদ্ধি – ক্রম-পর্যায়ী পরাবাস্তবতা কবির কবিতা-ধ্যানের অলঙ্কার যেন ! তাঁর কথা :

আহত মীনের মতো ভাসি-ডুবি খাবি খাই বিছানার হ্রদে,

তুমি চলে গেছো – নিয়ে গেছো বাঁচবার বনৌষধÑ

চিরচেনা ঘর জুড়ে অচেনা আভাস।(মৃত্যুঞ্জয়ী)

 

আধুনিক নাগরিক পটে কর্মব্যস্ত প্রিয় বর ও সুপ্রিয় বধূর সম্পন্ন প্রেম-সদ্ব্যবহার – বিরহ-বিন্যাস কবির কবিতা-কৃতির আভরণ-স্বরূপ। অদ্বৈত-সন্দীপনায়,প্রোজ্জ্বল ভাব-সৌকুমার্যে অভিনব উৎকর্ষের প্রামাণ্য এমন কবিতা-রূপমা :

বাতাসে গায়ের গন্ধ, চুম্বনের আহ্বান ছুঁড়ে

কাজের খসড়া নিয়ে তুমি চলে যাও।

আধমরা গৃহিণী এখানে –

রান্নার আয়োজনে ভুল-চুক নিয়ে

বিরহ ছড়িয়ে দেয় জানালার গ্রিলে..

 

গৃহিণীর শরীরে গতরাতের

আধেক তৃষ্ণার কাতরতা

আর দ্বৈত ভূমিকার প্রক্ষালন। (দ্বৈত)

 

শব্দচয়ন, অনুভূতি-প্রক্ষালন আর বাক্য-বিনির্মাণে কবি নিরুপম সাধক এক। কবি অনুপম মানবিক  বোধি, ইতিহাসচেতনা আর কল্যাণ-সম্পৃক্ত কবিতা-শরীরের ভাস্কর ! সর্বজনীন শিল্প-সমুচ্ছ¦াস কবির উচ্চারণে

আমাদের  আস্তিন ও বোধের নিচে

বোধিভ্রমে কিছুটা ক্লান্তির ক্লেদ জমে..

 

বিগত জীবনের অথবা অনাগত কালে..

স্মৃতি, ঘ্রাণ, হর্ষ ও মর্ষতার দারুন উপযোগ..

তারপরও সরিয়ে রাখি কিছু গাঢ়-নীল-(গাঢ়-নীল)

 

লন্ডনের জীবনবীক্ষা – নর-নারীর সম্প্রীতি জীবনদীপ্তি, প্রকৃতির সৌন্দর্যজ্যোতি সমুদ্ভাসিত এমন সব পঙ্ক্তিতে :

ভাসছে রোদের ওমে লন্ডন শহর..

রোদের নরম চুলে রাখি হাত

উদোম শরীরে শরীরের ন¤্রকষাঘাত..

 

জরির ওড়না পরা উর্বশৗ এক

ঘুঙুর বাজিয়ে কোমর দুলিয়ে খাঁচাখোলা পাখিদের মতো।(রোদের লন্ডন)

 

প্রিয়-প্রিয়ার দ্বৈত-অদ্বৈত প্রেমলীলা – অন্তরায়ত সম্মিলন – জীবন-পূর্ণতার সন্তুষ্টি-সংবৃতি যেন ! কবির উক্তি :

চোখে- চোখে কথা বলে রাগ-অনুরাগ।

প্রত্যাশা, প্রাপ্তি এসব কিছুই নয়..

 

মুগ্ধতার মান খুলে মুগ্ধ হয়..

 

আজ শুধু তোমার সাথেই কথা বলবো..

বিরহী বিকেল ও রাতে কবিতার হাত

খুলে দিতে অপেক্ষায় থাকা

প্রার্থনার মতো – (কথা বলবো)

 

পবিত্রতা-সঞ্জাত অভিপ্রায় অভিপ্রায় – প্রেমানুভূতি যেন প্রগাঢ়-অদ্বৈতেরই সম্যক সত্যায়ন ! অগ্রণী প্রেমায়োজক কবির সত্যশ্রীমান উচ্চারণ উচ্চারণ :

চুমুর সিঞ্চনে রূপকথার জিয়নকাঠি-স্পর্শের মতো

একটি জীবন এসে দাঁড়াক জীবনের সমানে সমান..(কাল দেখা হলে)

 

প্রেম-বিহ্বলতা তো দ্বৈত-সঞ্চয়নেরই অদ্বৈত-সমর্পিত প্রকাশনা ! ‘অভিলাষী ইচ্ছা আদর করা’র মোহনীয় তৃষ্ণাভঙ্গি এমনই সত্যদীপায়নে হয় সমর্পিত। প্রেমিকের প্রতি কবির কবিতা-মথিত কথা :

তুমি কি এলিয়ে পড়া সময়ের স্তূপ

অথবা বহমান নদী

মৃত্যু ও নিয়তি সমর্পিত প্রহসন !(দীর্ঘ-দীর্ঘ শ্বাস)

 

তুমি-আমি অচেনা অজানা…

নিষ্কাম প্রেমের মতো আমাদের মুঠো খুলে

নির্বাণের স্বরলিপি পাঠ করি-(নির্বাণ)

 

প্রেমই অনির্বাণ প্রভাবক – অস্তিত্বের মাধুর্যবিন্যাস ! ‘কষ্টের কল্পদ্রæম’ ‘জ্যোৎস্নায় ভেসে যায়, নিঃশেষিত হয় ! প্রেমিকের উদ্দেশে কবির কথকতা :

সুখগুলো গচ্ছিত রেখেছি তোমার কাছে..

বিরহে বিবর্ণ পথ..

তোমার পায়ের শব্দে রাতের শরীরে -কতো আনন্দাশ্রু জমা হলো তুমি বুঝতেই পারলে না..

তুমি অনাদি-কাল থেকে মিশে আছো অনন্ত-স্মৃতি আর ¯স্নেহাতুর চোখের ভাষায়..

তুমি চাইলেই পারো আকাশকে সুগন্ধী রুমাল বানিয়ে আমার হাতের মুঠোয় পুরে দিতে..

এসো স্মৃতির মোহনায় রজনীগন্ধার চারা লাগাই ; প্রজাপতির বংশবৃদ্ধি হোক।(টুকিটাকি-১)

 

মাঙ্গলিক প্রেমদর্শন – অমৃত-তৃপ্তির পরাগ-বিহবল স্বস্তি  ‘নিদ্রাবিভা’র আয়ুষ্মান শোভা। তবে, ‘বুকের ভিতর আহত আর্তনাদ’ উজ্জীবিত হলে, ‘ক্ষত-বিক্ষত শরীর ও  মনে’ মাধবী-ক্রন্দনের জ্যোতি হয় ‘অন্তর্হিত’!

 

কবির প্রেমদীপ্ত বাণীবন্ধ :

বিকেলটাকে ধান-শালিকের পাশে রাখলাম। ওরা খুঁটে খুঁটে খায় শস্যদানা যেমন আমরা পরস্পরের কথা.. হেমন্ত ঢলে পড়লো বলে ; তারপর তুষারকন্যা – বিরহের বিপন্নতা জড়ো করে তার গলায় মালা পরাবো কারও কাছে চাইবো না আর ভোর-(টুকিটাকি-২)

 

কবি জাগৃতি-অভীপ্সা,  চৈতন্য-প্রভুত্ব এবং মানবিক সম্পূর্ণতার দীপ্তিমান দিশারী। সঙ্গতকারণে কবির আত্মজৈবনিক প্রেম-প্রসূন, সাথে সমকালীন নারী-অধিকারভিত্তিক অভিঘাত তাঁর অন্তরকে বিক্ষত করেছে ! তিনি উচ্চারণ করেছেন :

খরায় পুড়ছে শহর ও শহরতলী। কাকের কর্কশ স্বরের সাথে আমি মিলিয়ে দিলাম দহনপোড়া চিৎকার..

মনের বৃষ্টিতে ধুয়েছি সকাল..

উঠে দাঁড়াতেই কয়েকজন যুবা আমাকে পায়ের বুটে পিসে চলে গেলো। সেই থেকে ধুলো হয়ে আছি..

ভোরের আলো ফুটতেই এ-পাড়ার মেয়েরা গান গাইতে গাইতে পাথর ভাঙতে যায় Ñ একটাও পাথর ভাঙা হয় নি আমার..

শুধু শ্রেণি- বৈষম্যের পীড়নটা ঘুরে ফিরে আসে.. বৃষ্টি এক পাগলী মেয়ের নাম..  সে তার শরীরটাকে সারাতে গিয়ে মনকে বলাৎকার করে যে এলো, সে এখনো অহিংসা ও সাম্যের কথা বলে।(টুকিটাকি-৩)

 

সত্য-বিভূষিত কল্যাণ-চেতনাধারক কবি একজন লোকজ অভিযাত্রিকও ! ‘মাসী-পিসির  উলুধ্বনি’, ‘পুলি-পিঠা-পায়েস’-এর সুঘ্রাণ, ‘মুড়ি-চিড়া’র ‘আহ্লাদ’, ‘শিরীষ শাখায়’ সন্নিবদ্ধ ‘বিকেলের ছায়া’, ‘গোধূলির বিদায়ী কাতরতা’, ‘গাঁয়ের বৌদের মুখরিত গোসলের গল্প আর সিঁদুর-ধোয়া জল’, ‘বাটুই ফুল’, ‘পাকা জামরুল, ‘সন্ধ্যার সুগন্ধ’ কবি-অন্তরায়তনের চিরায়ত সম্পদ ! Ñ কবির তন্ময়তা-মুগ্ধ মন্ময়-অনুভবের বিন্যাস এমন :

সন্ধ্যার কাছে ফেরত চেয়েছি ঘরে-ফেরা বাসনার কথা। শিরীষশাখায় শেষ বিকেলের ছায়া। বাল্যসখি, তোমার গোধূলী চোখে বিদায়ী কাতরতা ; তুমি ভালো থেকো।(টুকিটাকি-৪)

 

নারী-রূপমা-সুষমামÐিত মাতৃদীপনা-সমুত্থিত কবির ব্যক্তি-শ্রী-সাযুজ্য, সময়-চেতনা, মানবিক প্রবৃদ্ধি-সমৃদ্ধি, অমানবিক বেদনা-দহনশক্তি, কাব্য-সমুন্নত শৈলী-সঞ্জীবিত শিল্পায়ন-প্রক্রিয়া অপরূপ এক সৃজন-প্রভাতী সংযোজনা ‘মুঠো খুলে দেখি’।

কাব্যের ‘প্রচ্ছদ’-এর রঙ-বৈচিত্র্যে সঞ্চয়িত নয়ন-মনন-সম্মোহিত ধ্যান-বিস্তারণের বিভূষণা !

 

 

 

69597290_687350655102864_4804498056806400000_n

খাতুনে জান্নাত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.