কাজী সালমা সুলতানা : যুক্তরাষ্ট্রের বৃদ্ধিজীবীদের একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে ষাটের দশকে। এদের নিউ কনজারভেটিজম বা নয়া রক্ষণশীলবাদ বলা হতো। সংক্ষেপে ‘নিওকন’ নামে পরিচিত ছিল তারা। প্রকৃতপক্ষে ডেমোক্র্যাট ও বামদের কেন্দ্র করে এ আন্দোলন গড়ে ওঠে। কিন্তু ৭০–এর দশকে এসে নিওকন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিকতাবাদ ও কমিউনিস্টবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। এজন্য তারা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকানদের প্রতি আস্থাশীল হয়। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর নিওকনদের একটি দল সে সময়ের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে চিঠি দিয়ে বলে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বের যে কোনো স্থানে হামলার অধিকার তার আছে। এ যুক্তি থেকে আফগানিস্তানে হামলা করা উচিত। আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখল এবং টুইন টাওয়ার হামলার আগের ঘটনা এটি। নিওকনদের দেখানো পথে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হাঁটেননি। কিন্তু ক্লিনটনের পর প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পুরোপুরিই নিওকনদের মতবাদ গ্রহণ করে বিশ্বের দেশে দেশে ধ্বংসের আগুন জ্বেলে দেন। এরপর পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো জোটবদ্ধ হয়ে হামলা করে আফগানিস্তান, ইরাক, সোমালিয়া প্রভৃতি দেশে। নিওকনরা যখন এমন মতবাদ নিয়ে সোচ্চার, তখন তাদের নিজ দেশ মর্মান্তিক এক হামলার শিকার হয়, যার নামকরণ হয়েছে ‘৯/১১’।
৯/১১’র ঘটনার সপ্তদশ বার্ষিকী আজ। কী ঘটেছিল সেদিন? ২০০১ সালের এ দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকাল এসেছিল অন্যদিনের মতোই। সেদিনের আবহাওয়া ছিল চমৎকার। মানুষ ধীরে ধীরে কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিল। সকাল ৮:৪৫ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৬৭ বিমানটি প্রায় ২০ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল নিয়ে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। এটি ছিল ১১০ তলা ভবন, যার ৮০তম তলায় বিমান আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ মানুষ মারা যায়। বহু আটকা পড়ে ওপরের তলাগুলোয়। এই ভবন ও টুইন টাওয়ারের অপর ভবন সাউথ টাওয়ার থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া শুরু করা হয়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল এটি কোনো মাতালের কাণ্ড। কিন্তু ১৮ মিনিটের মাথায় ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের আরেকটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান সাউথ টাওয়ারের ৬০তম তলায় ঢুকে পড়ে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয় এবং ভবনের বিচ্ছিন্ন খণ্ডগুলো আশেপাশের ভবনের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। তখন ধারণা করা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। এ হামলায় বাংলাদেশের পাঁচজনসহ তিন হাজারের মতো লোক মারা যায়। যাদের মধ্যে ৪০০’র বেশি ছিল পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণকর্মী। যুক্তরাষ্ট্রের অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের জন্য ইতিহাসের ভয়াবহতম দিন ছিল এটি। একদিনেই অগ্নিনির্বাপণকারী দলের মারা যান ৩৪৩ জন। ১০ হাজারের মতো লোক আহত হয়, যাদের অনেকের অবস্থা ছিল গুরুতর। হামলার পর ঘটনাস্থলে এক মাস ধরে আগুন জ্বলেছিল। তবে কেউ কেউ জানান, হামলার ৯৯ দিন পর পর্যন্ত আগুন জ্বলার প্রমাণ রয়েছে। তারা জানান, এ আগুন ২০০১ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বলেছিল।
অসংখ্য মানুষ যখন টুইন টাওয়ারের ওপর চোখ সেঁটে রেখেছে, তখনই ৯:৪৫ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের আরেকটি বিমান বোয়িং ৭৫৭ আঘাত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনের পশ্চিম অংশে। এ হামলায় পেন্টাগনের ১২৫ সামরিক–বেসামরিক ব্যক্তি মারা যায়। একই সঙ্গে বিমানে থাকা ৬৪ আরোহীর সবাই মারা যান।
চতুর্থ বিমানটি নিয়ে হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। নিউজার্সির বিমানবন্দর থেকে চতুর্থ বিমানটি উড়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশে। ৪০ মিনিটের মধ্যেই বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। কিন্তু বিমানটি যাত্রা করেছিল নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে। টেলিফোন আলাপে অনেক যাত্রীই জেনে যান টুইন টাওয়ারে হামলার বিষয়টি। বিমানটি ছিনতাইয়ের পর যাত্রীরা বুঝতে পারেন কী হতে চলেছে। কয়েকজন অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নিয়ে ককপিটে হামলা করেন, বাধা দেন ছিনতাইকারীদের। ১০:১০ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার এক মাঠে আছড়ে পড়ে বিমানটি। হামলাকারীরা বিমানটিকে আসলে কোথায় নিতে চেয়েছিল, সেটি পরিষ্কার নয়। মনে করা হয় হোয়াইট হাউজ, মেরিল্যান্ডে প্রেসিডেন্সের অবকাশ যাপন কেন্দ্র ‘ক্যাম্প ডেভিড’ কিংবা পশ্চিম উপকূলে থাকা কয়েকটি পারমাণবিক বিদু্যুৎকেন্দ্রের কোনো একটি ছিল তাদের লক্ষ্য।
বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টাওয়ার দুটির কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল মজবুত ইস্পাতে, যা ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগের বায়ুপ্রবাহ, এমনকি বড় মাত্রার অগ্নিকাণ্ড সহনীয় ছিল। কিন্তু জেট ফুয়েলে সৃষ্ট উত্তাপ সামাল দিতে পারেনি ইস্পাতের কাঠামোটি। উদ্ধারকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন ভবনটির ওপরের তলাগুলো থেকে আটকেপড়াদের উদ্ধার করতে। এই বর্বরতম হামলার ১৭ বছর পরও ৯/১১ ঘিরে নানা সমালোচনা রয়েছে। এ আক্রমণের শিকার হওয়া নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও। সন্দেহ, সমালোচনা ও আলোচনার কোনো সমাধান হয়নি। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আসলে হামলাকারী কে, এর পেছনে কাদের মদত ছিল, জেট ফুয়েলচালিত বিমান দিয়ে টুইন টাওয়ারের মতো বিশাল ভবন ধসিয়ে দেওয়া যায় কি না !এসব প্রশ্ন নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। তদন্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নানা সংস্থা। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নতুন প্রশ্নের আবির্ভাব ঘটেছে। সবার কাছে বিশ্বসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই এ হামলার ঘটনা আগামীতে আরও নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দেবে।
৯/১১–এর ঘটনা নিছক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আঘাত, নাকি এ ঘটনা ছিল একটি একটি সাজানো পরিকল্পিত বিষয়, যে ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে ? স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর বিশ্বরাজনীতি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দেশে দেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রভাব বাড়তে থাকে। কোথাও কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সব গোপনীয়তাকে পেছনে ফেলে দেওয়া হয়। ৯/১১ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিওকনদের মতবাদকে পুরোপুরি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে যদিও কিছুটা রাখঢাক ছিল; কিন্তু ৯/১১–এর পর তারা আর কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করেনি। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও লাজলজ্জা বাদ দিয়ে বিশ্ব দখলে নেমে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। অন্য দেশের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনৈতিক ঘটনাকেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে চালিয়ে দেওয়া শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধকালে এসব কর্মকাণ্ডে আপত্তি তুলত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় এখন জাতিসংঘকে ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারছে যুক্তরাষ্ট্র। স্নায়ুযুদ্ধকালে মার্কিন আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল শত্রু ছিল কমিউনিস্টরা। কিন্তু ৯/১১–এর পর মূল শত্রু হিসেবে দাঁড় কারানো হলো মুসলমানদের। স্নায়ুযুদ্ধকালে আফগানিস্তান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামে যুদ্ধ হয়েছে। এখন গোটা বিশ্বেই লড়াই হচ্ছে অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে। এর পেছনেও কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। যুদ্ধ বাধিয়ে সে যুদ্ধের ব্যয়ভার গ্রহণ করা হচ্ছে ওইসব দেশে অনুগত সরকার বসিয়ে। একদিকে অস্ত্র বিক্রির লাভ জমা হচ্ছে মার্কিন কোষাগারে; অপরদিকে যুদ্ধের ব্যয়ভারের অর্থও পাওয়া যাচ্ছে একই কোষাগারে। বিত্ত সংগ্রহের এর চেয়ে সহজ উপায় আর কী থাকতে পারে! আজও আফগানিস্তান কেঁপে ওঠে আত্মঘাতী বোমা হামলায়। তালেবানরা আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ইরাকে এতিম ও বিধবাদের সংখ্যা বাড়ছে। সিরিয়ার উদ্বাস্তুরা প্রতিদিনই ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। লিবিয়ায় গুম, খুন বাড়ছে। আইএস, আলকায়দার নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন নতুন দেশে সন্ত্রাসীরা নিজেদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। সারা বিশ্বই আজ মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
টুইন টাওয়ার হামলায় উগ্র ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত করা হয়েছে আলকায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে। কিন্তু এসব অভিযোগের পর বিচিত্র কিছু ঘটনাও জানা গেছে। যেমন বলা হয়ে থাকে, মার্কিন সরকার বা ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা এ হামলার পেছনে ছিল। কারণ টুইন টাওয়ারে ওইদিন কোনো ইহুদি মারা যায়নি। আবার বলা হয়, বিমানের আঘাতে টুইন টাওয়ার ধসে পড়া সম্ভব নয়। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ার ধসে পড়েছিল বিমানের আঘাতে নয়, বরং ভবনটির ভেতরে বিস্ফোরক বসিয়ে তা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে অবশ্য বলা হয়েছে বিমানের আঘাতের পর আগুনে টাওয়ার দুটির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওপরের তলাগুলো ভেঙে পড়তে থাকলে তার চাপে পুরো ভবনটিই ধসে পড়ে। কিন্তু এখনও অনেকেই এসব বক্তব্যে বিশ্বাস করেন না। এমন একটি ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রহস্য উন্মোচনের পরিবর্তে সন্দেহ বাড়িয়েছে। এ ঘটনায় স্বজন হারানোদের যেমন হামলার কারণ ও হামলাকারীদের সম্পর্কে জানার অধিকার রয়েছে, অধিকার রয়েছে বিশ্ববাসীরও। মার্কিন প্রশাসন এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। সেই যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে করতে হবেÑতা বিশ্ববাসীর জানার অধিকার রয়েছে। টুইন টাওয়ার আক্রমণের বিষয়ে সম্পন্ন হওয়া কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি অনেক প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট একাডেমি জানিয়েছে, টুইন টাওয়ারে হামলার পর ব্যবহƒত বিমানের মাত্র একটি ইঞ্জিন উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। টুইন টাওয়ার হামলায় বিস্ফোরণ ও সৃষ্ট তাপে ইঞ্জিনটির টিকে থাকা এখনও রহস্যজনক।
টুইন টাওয়ার আক্রমণ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন ২৮ পৃষ্ঠার এক তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। কিন্তু ঘটনার ১৬ বছর পরও ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে মার্কিন জনগণ জানতে পারেনি। তাদের দাবি, এ প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। অবশ্য হাউজ ও সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির অনুমতিতে কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ২৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পড়তে পেরেছেন। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাদের একটি বিশেষ সাউন্ডপ্রুফ রুমে নিয়ে যান। সেখানে তারা প্রতিবেদনটি পড়েন। এ সময় একজন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যেন রাজনীতিকরা ওই প্রতিবেদনের কোনো তথ্য লিখে নিতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে। ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বর এ হামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবারের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করা হোক এটাই মার্কিন প্রশাসনের প্রতি মানুষের দাবি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

