আপনার ঘরে হয়ে আছি সব গোলাম নফর মুটে!

 ১৯২৫ সালে প্রকাশিত নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের রাজা-প্রজা কবিতার ক’টি লাইন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
111
অবাক হয়ে ভাবছি আজকের কথাগুলো তিনি প্রায় শত বছর আগে কিভাবে লিখেছিলেন। হয়তো ওই সময়ের জন্যও সত্য কথাটি আজকের জন্যও সত্য। কিন্তু তখন তো আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে জর্জরিত। এরপর কত সংগ্রাম, কত ত্যাগের পর আজ আমরা নিজেদের স্বাধীন বলে দাবি করি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান; পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই, সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আজ তো আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক জীবন তো আজও তুচ্ছ। লর্ড, জমিদার, রাজা, উজির, সামন্ত, জেনারেলদের নাম বদলে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব, ডিসি, এসপি হয়েছে। আর কিছু কি? ও হ্যা, প্রজা থেকে আজ আমরা নাগরিক নামটি পেয়েছি। গত ২৫ জুলাই রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের দায়িত্বরত অতিরিক্ত সচিব আব্দুস ছবুর মণ্ডলের গাড়ি না আসায় ফেরি ছাড়তে তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়। রাত ৮ টায় ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষকে বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স কাঁঠালবাড়ি ১নং ফেরিঘাটে পৌঁছায়। তখন ফেরিটি ঘাটেই ছিল। কিন্তু ওই কর্মকর্তার গাড়ি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়তে রাজি হয়নি ঘাট কর্তৃপক্ষ। প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত পৌনে ১১টার দিকে মি. মণ্ডলকে বহনকারী মাইক্রোবাসটি ঘাটে আসার পর রাত ১১টার দিকে ফেরি ছাড়া হয়। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণে আম্বুলেন্সেই মৃত্যু হয় স্কুলছাত্র তিতাসের। ভাবছিলাম ওই মূহুর্তে ছেলেটির মায়ের কথা। চোখের সামনে নিজের ছেলেকে মরতে দেখছেন। কিন্তু কিছুই করার নেই তার। ছেলেকে বাচানোর জন্য কতই না আর্তনাদ করেছেন”। কিন্তু তিনি তো মন্ত্রী-আমলা নন। তার ছেলের জীবনের মূল্য এই রাষ্ট্রের কাছে নেই – এই সত্যটি হয়তো তখন তিনি বুঝতে পারেননি। আশা করি এতক্ষণে তিতাসের মা সেটা জেনে গেছেন। অবাক হলাম পরে যখন জানলাম তিতাসের মা, বোন সবাই মিথ্যা বলছে। পুলিশ ও ঘাটে কর্তব্যরত বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কাছে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে যখন রোগীর কথা জানানো হয় তখনই তাদের অ্যাম্বুলেন্সটি ফেরিতে লোড করে ১০ মিনিটের মধ্যেই ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। আর সরকারি কর্মকর্তা ২০ মিনিটের মধ্যে চলে এসেছেন। এখন উজির, সামন্তরা যেটা বলছেন – সেটাই তো মানতে হবে। সচিব সাহেবের বক্তব্য মতে তারা তো মানুষের জীবন বাচান। তাদের দিকেই আমরা প্রজারা আঙুল তুলি। কি অকৃতজ্ঞ আমরা! ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তিনিই ‘ভিআইপি যাবে’ বলে ফেরি বিলম্ব করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্ত কমিটি কি রিপোর্ট দেয় তা দেখার অপেক্ষায় আছি। অবাক হব না যদি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে তিতাসের মৃত্যুর পেছনে তার পরিবারই দায়ী ছিল। রাজা যখন তার উজির-নাজির, সামন্ত, পাইক-পেয়াদাদের সহায়তায় নিজের সিংহাসন ধরে রাখে, তখন তারা প্রত্যেকেই নিজেদের জমিদার ভাবতে শুরু করেন। কদিন আগে পত্রিকান্তরে জানলাম সিলেটের বিশ্বনাথের ইউএনও হিসেবে যোগদানের দিন থেকে একটি দিনও অফিস করেননি নবনিযুক্ত ইউএনও বর্ণালী পাল। অথচ সিলেটের বিশ্বনাথ একটি বন্যা কবলিত উপজেলা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বন্যা মোকাবেলার মূল দায়িত্ব তার। গত ২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম তার সহধর্মনীর সঙ্গে সেলফি তুলতে গেলে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের মোবাইল হ্যান্ডসেট পানিতে পড়ে যায়। ইউএনও সাহেবের মোবাইল হ্যান্ডসেট উদ্ধারে জামালপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা দুজন ডুবুরিসহ চার সদস্যের একটি উদ্ধার দল নিয়ে শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে সোয়া ৮টা পর্যন্ত পানিতে ডুব দিয়ে ফোন সেটটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। ফায়ার সার্ভিস ধন্যবাদ পাবারই যোগ্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা না হয়ে মি. ইসলাম একজন সাধারন মানুষ হলে কি ফায়ার সার্ভিসের এই সার্ভিস পেতেন! ক’দিন আগে ডিসি সম্মেলনে আমরা দেখেছি জেলা প্রশাসকগণ যে সকল দাবি উত্থাপন করেছেন তাতে তারা প্রত্যেকে স্ব স্ব জেলার জমিদারি চাইছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরদের মত ক্ষমতাবান হতে তারা জেলা-উপজেলায় আয়কর আদায়, ফৌজদারি অপরাধ বিচারের ক্ষমতা, কোটি টাকার থোক বরাদ্দ, এনজিও কার্যক্রম তদারকি, ডিপিপি প্রণয়ন, মোবাইল কোর্টের অধীনে নতুন নতুন আইন অন্তর্ভুক্তকরণ, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে ডিসিদের সভাপতি, উপজেলা শিক্ষা কমিটিতে ইউএনওদের সভাপতি করার প্রস্তাব করেছে। প্রশাসন ক্যাডারদের জন্য নতুন ব্যাংক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন জেলা প্রশাসকগণ। তিতাস, নুসরাত, রিফাত, লিমনরা আমাদের ক্ষমা করবে কিনা জানিনা। ‘ভিআইপি’দের তাতে কি’ই বা এসে যায়? কারণ জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় জনগণের সেবার জন্য যে মানুষগুলোকে রাখা হয়েছে, তারাই আজ দেশের মালিক বনে গেছে। তাই নজরুলের ভাষায় বলতে হয় – বন্ধু হাসিছ চুটে, আপনার ঘরে হয়ে আছি সব গোলাম নফর মুটে!
সাকিব আনোয়ার Email: mnsaqeeb@gmail.com
 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.