কৃষক,শ্রমিক,গরিব,মেহনতি মানুষের পক্ষেই আমার কলম চলবে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। এই শ্রেনির ঝড়ানো ঘামেই আমাদের দেশের চাকা চলে। সরকারের বাহাদুরি, ফুঁটানি সব এই সব মানুষের ঘামের ফসল। তবে বাস্তবতার বাহিরে গিয়ে কোনো কিছুর আবদার বা দাবীকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না। মূলত মেহনতি মানুষের উপার্জনের পথ গুলোকে ব্যবহার করে যে সব তৃতীয়পক্ষের মানুষেরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুবিধা ভোগ করে, তারাই সবক্ষেত্রে সার্বিকভাবে দায়ী এবং তারাই যত ঝামেলা মূলে, নিজেদের স্বার্থের টানে। সুতরাং নিরিখ চোখে দেখেই সকল ব্যবস্থা গ্রহণ সার্বিকভাবে দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর বলে মনে করি।
বলছিলাম ঢাকার রাস্তায় রিক্সার কথা। ইতিমধ্যেই সকলেই আজ হাড়ে হাড়ে এই রিক্সা কাহিনীর টের পেয়েছেন, বিশেষ করে মধ্যেবর্তী সমাজের লোকজনতো বটেই। প্রথমেই রিক্সা যানটির কথা বলা প্রয়োজন । এই যানটি মানুষ হয়ে মানুষকে বহন করে ! যে যত কথাই বলুক, এই শ্রমটি পৃথিবীর সবচাইতে অমানবিক শ্রম। কলকাতার সেই হাতেটানা রিক্সা থেকে বাংলাদেশের প্যাডেলমারা রিক্সা দুটোই নিতান্তই অমানবিকতার চরম। যদিও এই বাহনটি আমাদের সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে গেছে। তারপরেও বলতেই হবে , এটা অমানবিক । কলকাতায় ধীরে ধীরে হাতেটানা রিক্সা উঠে গেছে। এখন আমাদের দেশের পায়ে চালিত রিক্সার এক সময় দিন শেষ হতেই হবে।
ঢাকা শহর বর্তমানে জিম্বাবুয়ের হারারের পরেই সব চাইতে খারাপের দিক দিয়ে আছে। অথচ এই ঢাকা চারটি নদী ঘিরে উৎপত্তি হয়েছিলো, পৃথিবীতে একটি সুন্দরতম শহর হবার জন্য । ইটালির বেনেডিক্ট শহর পানির উপরে ভাসে। আর ঢাকা হতে পারতো সেই বেনেডিক্ট শহরের আপন যমজ ভাই। না সেই সৌভাগ্য আমাদের হয়নি আমাদের নিজেদের আগ্রাসনের কারণেই। যাক সেটা ভিন্ন আলাপ । তবে ঢাকা শহরকে বর্তমানে নূন্যতম বসবাসের যোগ্য করতে হলে এর বিশাল পরিবর্তন হতেই হবে। এই শহরের জনসংখ্যার দিক থেকে যে পরিমাণ সবুজায়নের দরকার ছিলো তার সিঁকি ভাগও বর্তমানে অনুপস্থিত । সব মিলিয়ে এখন এই শহর মানুষের গলায় ফাঁস হবার উপায় হয়েছে।
লক্ষ্যণীয় যে ,আমাদের দেশে সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রীক ! ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন আসলেই আমাদের পরিচালনাকারীদের কেমন জানি একটা ভীমরতিতে পায়। ওনারা কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে থাকেন না ! কেন ? এটা একটা কোটি টাকার প্রশ্ন । যাকগে, প্রশ্ন হলো তাহলে এখন কিভাবে এই রিক্সার সমস্যার একটি সুপরিকল্পিত সমাধান হতে পারে। আবার বলি এই রিক্সা ঢাকা থেকে উঠাতেই হবে। কেউ আবার ভুল বুঝবেন না, আমি মেহনতি মানুষের কথা বলে কেন , এই কথা বলছি। বলছি , তার সুস্পষ্ট কারণ হলো , এই শহর বর্তমানে যেভাবে চলছে , সেভাবে কেউই শান্তিতে থাকতে পারবে না। সুতরাং সময় এখন চুড়ান্তভাবে হয়েই আছে, সমাধানের পথ ঘোঁজার।
আমার মাঝে মাঝে বুঝে আসে না বা আমার জ্ঞানে অধরাই রয়ে যায়, কেন আমরা কোনো কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে পারি না ! আপনি সরকার বাহাদুর ঢাকা রিক্সা মুক্ত করবেন ভালো কথা , আমরাও চাই। তবে কেন সেটা হঠাত্ করে ঘোষণা দিয়ে পাঁকা ধানে মই চালাবেন ? আজকের কাজটিই আপনি কেন অন্তত দুইবছরের টার্গেট নিয়ে করতে পারেন না।ক্ষমতায় তো আছেন প্রায় এচযুগের কাছাকাছি ।পাশের দেশ কলকাতা তাদের সমাধান দুই বছর যাবত্ করেছিলো। প্রচুর প্রচার চালিয়ে, মেহনতি মানুষদের হাতে পর্যাপ্ত সময় দিয়েই তারা সমস্যার সমাধান করেছে। কথায় কথায় সিঙ্গাপুর/ মালয়েশিয়ার উদহারণ টানেন। সেটাকি হুটহাট করেই হয়ে যায় । আকস্মিকতায় শুধু ঝামেলা বাড়ে , সমাধানের পথ পাওয়া যায় না।
আর এই ঝামেলা কিন্তু বিরোধীরা করছে না। করছে আপনার সরকার দলের নানান লীগের নামে, পত্রিকান্তে তাই দেখলাম। সঠিক তথ্য দিতে পারবো না। তবে শোনা যায় ঢাকা শহরে ৯৬ হাজারের মত রিক্সার লাইসেন্স আছে। অথচ চলাচল করে ৭ লাখের উপরে ! এটা কি করে সম্ভব হলো। সেখানেই আপনার সরকার দলীয় লীগের মানুষেরা এই কাজগুলো করে বেড়াচ্ছে। মনে রাখা ভালো , মেহনতি মানুষেরা যেকোনো কাজে প্রস্তুত থাকে। তারা পেটের দায়ে কর্মকে সম্মান করে। সুতরাং বলাই যায়, তাদের কর্ম সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো। এইতো গত কয়েকদিন পূর্বেই ধান কাঁটার মানুষ ছিলো না! অথচ দেশে শ্রমিকের অভাব নেই ! তাহলে বুঝাই যায়, সমস্যা ভিন্ন কোথায় নিহিত আছে।
আরো একটা বিষয়, পৃথিবীর সকল উন্নত দেশগুলোতে ট্রেনের সর্বোপরি ব্যবহার হয়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচলের জন্য ছোটো ছোটো ট্রেন চলাচল করে জনমানুষের সুবিধার্থে । অদচ আমাদের দেশে সেই ট্রেনকেই অচল করে রাখা হয়েছে ! শোনা যায় প্রাইভেট বাস মালিকেরাই চাননা আমাদের দেশে ট্রেন শক্তিশালী হোক। কেননা এতে যে ওনাদের আঁতে ঘাঁ ধাগবে। এটা আরেক বিশাল আলাপ। একবার ভাবুন তো , ঢাকার চারপাশে ছোটো ছোটো ট্রেনে নির্বিঘ্নে মানুষ চলাচল করতে পারে। তাহলে কি আর ঢাকা শহরে এত জ্যাম লাগতো ? ঢাকা শহরের চারপিশের নদীর কথা আপাতত বলাই স্বর্গ কল্পনা করা। কিন্তু একবার ভাবুনতো, ঢাকার মানুষ ইচ্ছানুসারে নদী বা সড়ক পথে যা খুশি সেটাই ব্যবহার করে চলাচল করতে পারচ্ছে। বিষয়টি কেমন হতে পারতো ?
কথা প্রসঙ্গে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সাহেবের কথা মনে আসে। তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ঢাকার সমস্যা সমাধানের এবং বেশ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছিলো। ওনার মৃত্যুতে মনে হচ্ছে যেন সকলের মৃত্যু হয়েছে ! কই, দেখলাম না তো, ওনার কর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বলবেন দুবছর নির্বাচন হয়নি ! তাতে কি ? দায়িত্বে কেউ না কেউ তো ছিলেন ! আনিসুল হক সাহেব গুলশান এলাকায় কি চমত্কার একটি ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিটি রিক্সা চালকের নিজস্ব পরিচয় ছিলো। কোমরে ব্যাল্ট আর সাথে নিশ্চয়তা। সেই পদ্ধতিও এখন বেহেসত্ যাবার অবস্থা । ফ্রান্চাইস্ সিস্টেম করে সকল যান বাহনকে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা কতদিন ধরে বলে আসচ্ছে। ভাগ্য খারাপ, সেই দিকে পা দেবার পূর্বেই তিনি পরলোকে। কই, সেই সকল কর্মকে কেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা এগিয়ে নেননি ? এখন হঠাত্ করেই ঘোষণা, রিক্সা চলবে না ! এভাবে শুধু ভেজালই বাড়বে বই কমবে না।
আর একটি কথা, রিক্সার পরিবর্তে যানবাহনকেও তো মানুষের প্রয়োজন মেটাতে হবে । সেই দিকটি লক্ষ্য রাখা বিশেষভাবে করণীয় নয় কি ? আর শুধু রিক্সা উঠাবেন, সাথে যানবাহন কম থাকবে! তাহলে মানুষকে অন্তত যাতায়াতের জন্য ফুটপাত গুলো পরিষ্কার করে দিন। মানুষ যেন কয়েক কিলোমিটার হেটেই অফিস আদালতে যেতে পারে । আমি তো মনে করি মানুষ হাটতে চায়, ব্যবস্থাতো আপনাকে আগেই গ্রহণ করতে হবে। প্রশ্ন হতে পারে , এই ফুটপাত উঠাতে গেলেও যে আপনাদের সরকারি লীগের লোকজনকেই আগে শায়েস্তা করতে হবে। কেননা, গরিবের কোনো দোষ দিবেন না, তারা পেটের দায়েই ফুটপাতে বসে, তবে সেটার কিন্তু সব নিয়ন্ত্রণ আপনার সরকার বাহাদুরের লোকজনের হাতেই পরিচালিত হয়।
সবশেষ কথা হলো, রিক্সা উঠান কোনো আপত্তি মনে হয় না জনগণ করবে। শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষেত্র পেলেই ঝামেলা চুকে যাবে। আমি বলছি না, কর্মসংস্থান খুব সহজ হবে, তবে সেটা আছে । সেইখানেই সরকারকে হাত দিতে হবে। এ কথাও সত্য, তবে , কিন্তু, অথবা , এবং এগুলো বেশি না ভেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। ঢাকা রিক্সা মুক্ত হোক, ফুটপাত দখলদার মুক্ত হোক, জনমানুষ একটু স্বস্তি পাক। ঢাকা শহর প্রাণে বঁচে উঠুক, মানুষ একটু ভালো থাকুক । সরকারকে সব সময় কঠিন হস্ত হতে হয়, তবে শ্রমিকের প্রতি সহনশীল আচরণ করে এবং সহানুভূতিশীল থেকে কাজগুলো সাড়া প্রয়োজন । কেননা এই মেহনতি মানুষেরাই মূলত দেশ গড়ে। ঢাকা ঝামেলা মুক্ত হোক, সকলের কল্যাণে ।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

