সালটি ১৯৯৯। প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল বাংলাদেশ ইংল্যান্ডে। বাংলাদেশকে নিয়ে আজকের মতো সবার মধ্যে তেমন উচ্ছ্বাস, আবেগ নাই লন্ডনের প্রবাসী বাঙ্গালীদের। ভারতীয় হিন্দু বাঙ্গালীদের তো নই-ই। এখনো নাই। বিলাতে ক্রিকেট অন্যান্য ( ফুটবল, রাগবি, টেনিস ) খেলার চেয়ে কম জনপ্রিয় নয় এখনো। ফলে দোকানদার মহলে পণ্য বাজারজাত করার প্রয়াস লক্ষণীয়। ওদের (ব্যাবসায়ীদের) মুনাফার উদ্দেশ্যে ক্রিকেট জার্সি বাজারজাত হয় এর পরের বিশ্বকাপে। প্রথম দেখলাম ভারতীয়দের মধ্যে। বিশেষ করে গুজরাটি প্রবাসীরা ভারতীয় জার্সি গায়ে দিয়ে দোকানদারি করে। একধরনের জাতীয়তাবোধ !
যাই হোক, ৯৯সালের ওই সময়ে গিয়েছিলাম লেসটার স্কয়ারে এমনি ঘুরতে। প্রেমের দেবী এরস-র মূর্তি ঝর্নার মাঝখানে, যা লন্ডনের শূন্য বিন্দু। প্রচুর মানুষের ভিড় দিন রাত জমজমাট করে রাখে এলাকাটাকে। অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক। ঠিক দক্ষিণ দিকে এক বিরাট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। নাম ‘লিটলউড’ । বড় বড় কাঁচের পেছনে শোভা পায় নানান বাহারের পণ্য, ডিসপ্লে করে ক্রেতা আকর্ষণের উদ্দেশ্যে। সেদিন সেই বৃহৎ আকারের কাঁচের সারি সারি ডিসপ্লেতে ছিল বিশ্বকাপে প্রতিযোগী দেশের একের পর এক mannequins ( প্লাস্টিকের তৈরি প্রমাণ সাইজের মুণ্ডু বিহীন পুতুল সদৃশ), যাদের পরানো হয়েছে বিভিন্ন দেশের জার্সি। পেছনে সে দেশের পতাকা। তখন স্মার্ট টেলিফোন ছিল না। যার কারণে এত সুন্দর ডিসপ্লে’র ছবি তুলে রাখতে পারি নাই। ঘুরে ঘুরে দেখছি সব দেশের ক্রিকেট জার্সির রং, ডিজাইন এবং পতাকা। বিশ্বকাপের প্রতিযোগী সব দেশের জার্সি ও পতাকা ডিসপ্লে করা হয়েছে প্রায় ৫০ মিটার লম্বা ওই কাঁচের জানালার ভেতরে। একবার দুবার করে এ মাথা ওমাথা হাঁটলাম, ভেতরে উঁকি দিলাম – নাহ্, বাংলাদেশ নাই। পাকিস্তান, ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউ জিল্যানড, শ্রীলঙ্কা, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা …… , উঁহু, সবাই আছে, শুধু বাংলাদেশ নাই।
কেন ? মেজাজটা খিঁচরে গেল। ঢুকে পরলাম ভিতরে। একজন সেলসম্যান ‘গুডমর্নিং’ করে স্বাগত জানালো। প্রত্যুত্তর দিয়ে, জানতে চাইলাম, ‘তোমাদের ফ্লোর সুপারভাইজার কোথায় ? অথবা ম্যানেজার ?
সেলসম্যান প্রথমে একটু ইতস্তত করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিলো এক স্যুটেড-বুটেড বেশ লম্বা দেখতে ভদ্র লোককে। ‘হ্যালো, স্যার, গুডমর্নিং ! কি খেদমতে আসতে পারি আমি আপনার?’ বিনয়ের অবতার !
বললাম, ‘তোমাদের এই বিশ্বকাপের জার্সি ডিসপ্লের আইডিয়া সত্যি প্রশংসনীয়।’ গদগদ হোল ভদ্রলোক।
‘তুমি খেলা দেখ ?’ প্রশ্ন করলাম তাকে।
‘হ্যাঁ, সময় পেলে। তুমি ?’
‘আমিও, সুযোগ সুবিধা পেলে। তবে টেলিভিশনে, না হলে রেডিও ধারাবিবরণীতে কান পাতি’। ‘স্কুল জীবনে খেলতাম’ বলেই, ধাক্কাটা দিলাম, ‘তুমি কি জানো, বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে খেলছে?’
আমার মনে হোল, তিনি আকাশ থেকে পরলেন। ‘ব্যাংলা…!’
‘বাংলাদেশ’ জোর দিলাম কথাটার উপর।
‘না ! কোন দেশ ? কোথায় ওটা ?’
উহ! চড় কশাবো একটা ! বর্ণনা দিতে হোল। ৭১রের কথা শোনালাম। সর্বশেষে আসল কথাটা পারলাম। ‘তোমরা যখন বিশ্বকাপের প্রতিযোগী দেশের জার্সি ডিসপ্লে করার এত সুন্দর আয়োজন করলে, তো একমাত্র বাংলাদেশের নামটা ভুলে গেলে কেন ? তোমরা কি তালিকা, খেলার সূচী দেখ নাই ? সেখানে কারকার সাথে বাংলাদেশের কবে কোথায় খেলা হবে, লেখা আছে। পত্রপত্রিকায় দেয়া হয়েছে সে খবর।’
একটু লজ্জিত হলেন তিনি। ‘সরি, আমার এসব জানা ছিল না। আমি আজই আমার ম্যানেজমেন্টকে জানাবো।’ এরপর আমার আর কিছু বলার থাকে না।
‘হ্যাঁ, প্লিজ, চেষ্টা কোরো, যাতে বাংলাদেশের জার্সি-পতাকা ডিসপ্লেতে থাকে।’
বলে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম।
এরপর দুটি ঘটনার কথা না বললে সেদিনের গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তখন বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে স্পন্সর করার কেউ ছিল না। আজ দেখছি বা শুনছি কত আপ্যায়ন, কত আদর যুক্তরাজ্য জুড়ে।
আহা ! সেদিন ? না, কাউকে পাওয়া যায় নাই।
ঢাকা থেকে আসা ইমরান নামের এক তরুণ (নন সিলেটী) ভারতীয় চাল আমদানিকারক ‘ভিটি’ রাইস কোম্পানির মার্কেটিং অফিসার। আমি একটা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের দায়িত্বে। ওটার বিজ্ঞাপনের কারণে আলাপ হোল ইমরানের সাথে। জানলাম, ও ওর কোম্পানি ভিটি রাইস-কে দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমকে স্পন্সর করতে রাজী করিয়েছে। জার্সি বানিয়ে দিয়েছে খেলোয়াড়দের। আমাকে অনুরোধ করলো, ‘প্লিজ, দেখবেন আমাদের বাংলা পত্রিকাগুলো যেন এটাকে একটু ‘হাই লাইট’ করে।’
জানিয়েছিলাম তখনকার প্রকাশিত পত্রিকাগুলোকে। একটিও সাড়া দেয় নাই। তখন বাংলা চ্যানেল বলতে একটা কিম্বা দুটো।
আর বুকি’র ঘর। এদেশে বাজী ধরার জুয়ার আড্ডাখানা বা দোকান রয়েছে প্রতিটি শহরে কমপক্ষে দু তিনটি। যাকে বুকি ঘর বলা হয়। এখানে ঘোড়ার এবং কুকুরের দৌড় প্রতিযোগিতার উপর বেটিং ( অর্থ বাজী ) করা যায় শুধু নয়, এখানে ফুটবল, রাগবি, ক্রিকেট, কিম্বা অন্য কিছুর উপর বাজী ধরা যায়। এমন কি, ভবিষ্যৎ প্রধান মন্ত্রী কে হচ্ছে, আগামী খ্রিস্টমাসের দিনটিতে তুষারপাত হবে, না শুষ্ক থাকবে ( হোয়াইট খ্রিস্টমাস, না ব্ল্যাক ), মানে যেকোনো ব্যাপারে জুয়া এদেশে বৈধ। এর ফলে কিছুটা কেন, বেশ প্রভাবিত হয় ‘পাবলিক অপিনিয়ন’। যেমন, এমুহূর্তে বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, বাজীতে সকলের ফেভারিট। ফলে, ৫টাকার বাজী ধরলে, পাওয়া যাবে ১টাকা। অর্থাৎ ১-টু ৫। মিঃ হান্ট রয়েছেন ৮-টু ১, এক টাকায় আট টাকা। এসব দর নিয়ে সংবাদ মাধ্যম জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যমে সম্ভাবনার খবর পরিবেশন করছে প্রতিদিন।
সেই দিন, যেদিন বাংলাদেশ পাকিস্তানের খেলা ছিল, সব বুকির ঘরে দর ছিল ৫০০ টু এক। আমি জুয়া খেলি না। নাহলে, দশ পাউনডে পাঁচ হাজার পাউনড কামাতে পারতাম। বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হারানোর খবর বেশ ফলাও করে প্রচার হয়েছিল সব সংবাদ মাধ্যমে প্রধান খবর করে। ক্রীড়ামোদীরা সেদিন জেনেছিল বাংলাদেশের নাম। উচ্ছ্বাস আর আবেগ ভাসিয়ে দিয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশীদের। পরের দিনের দু তিনটা পত্রিকা নিয়ে আমি ট্রেনে চড়ে গেলাম ‘লিটলউড’ স্টোরে। সেই ভদ্র লোকটির হাতে পত্রিকা দিয়ে বললাম, ‘দেখলাম এখনো তোমরা ডিসপ্লে করো নাই বাংলাদেশের পতাকা।’
আমি আর খোঁজ করি নাই, ওরা পরে কি করেছিল।
এখন ভিন্ন চিত্র সমগ্র যুক্তরাজ্য জুড়ে, বিশ্ব জুড়ে। সেদিন আমার একক ( লোন ক্রুসেডার, আমি চিরদিনই ) আবেগ ছিল ওইটুকু।
আমি বিশ্বাস করি, চে’র সেই উক্তি, যা আমি উদ্ধৃত করেছি – ( বর্তমানের বিতর্কের আলোকে ) Remember that the revolution is what is important, and each one of us, alone, is worth nothing.
সংযুক্ত ছবিটি Leicester Square-এর। ভবনটি তেমন আছে, লিটলউড উঠে গেছে ব্যাবসায় লালবাতি জ্বালিয়ে।
আর নীচের তথ্যগুলো “আনন্দবাজার পত্রিকা” থেকে নেয়া।
১।। ২০১১-র বিশ্বকাপে ক্যারিবিয়ানদের কাছে মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। সোমবার টনটনে সেই হারের মধুর বদলা নিলেন শাকিবরা। আইসিসি বিশ্বকাপে এমন চমক আগেও দিয়েছেন তাঁরা। কাদের কুপোকাত করেছেন শাকিবরা? মনে পড়ে বাংলাদেশের বিখ্যাত জয়গুলোর কথা? এক ঝলকে ফিরে দেখা যাক সেই মুহূর্তগুলি।
২।। ১৯৯৯-তে প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে জয়ের খাতা খুলেছিলেন আমিনুল ইসলামরা। তবে চমক তখনও বাকি ছিল। নর্থহ্যাম্পটনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগে ব্যাট করে ২২৩ রানের টার্গেট দেয় বাংলাদেশ। তবে ৪৪.৩ ওভারে মাত্র ১৬১ রানেই গুটিয়ে যান ওয়াসিম আক্রমরা। ৩ উইকেট ও ২৭ রান করে ম্যাচের সেরা হন খালেদ মামুদ।
৩।। ২০০৭-এর বিশ্বকাপে ফের চমক বাংলাদেশের। এ বার তাঁরা হারালেন ভারতকে। ত্রিনিদাদে রাহুল দ্রাবিড়েরা আগে ব্যাট করে তুলেছিলেন ১৯১ রান। জবাবে ৪৮.৩ ওভারে ৫ উইকেট খুইয়ে সেই রান পার করে যান মুশফিকুর রহিমের সেনারা। ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন মাশরফি মর্তুজা। ৯.৩ ওভারে ৩৮ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন মাশরফি।
৪।। ২০০৭-এ ভারতকে হারানোর পরও বাংলাদেশের স্বপ্নের দৌড় থামেনি। সুপার ৮-এ উঠে গ্রেম স্মিথের দক্ষিণ আফ্রিকাকে বধ করেন মুশফিকুর রহিমরা। ২৫১ রানের টার্গেট পেয়ে ৪৮.৪ ওভারে ১৮৪ রানেই অলআউট হন প্রোটিয়ারা। ৮৩ বলে ৮৭ রান করে ম্যাচের সেরা হন মহম্মদ আশরাফুল।
৫।। বিশ্বকাপের আঙিনায় এ বার বাংলাদেশের কাছে হারের পালা ছিল ইংল্যান্ডের। সালটা ছিল ২০১১। চট্টগ্রামে প্রথমে ব্যাট করে ২২৫ রান তোলেন অ্যান্ড্রু স্ট্রসরা। এর পর ৪৯ ওভারেই ওই রান তুলে নেন শাকিব আল হাসানরা। ২ উইকেটে জিতে দেশের মাটিতে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেন তাঁরা। ১০০ বলে ৬০ রান করে ম্যাচের সেরা হন ইমরুল কায়েস।
৬।। পরের বিশ্বকাপেও ফের ইংল্যান্ডকে হারায় বাংলাদেশ। অ্যাডিলেডে আগে ব্যাট করে ২৭৫ রান করেন মাশরাফি মর্তুজা বাহিনী। ইংল্যান্ড ৪৮.৩ ওভারে ২৬০ রানেই ইনিংস শেষ হয়ে যায় ইয়ন মর্গ্যানদের। সে ম্যাচে ১৩৮ বলে ঝকঝকে ১০৩ রান করে সেরার সম্মান পান মাহমুদ্দুলাহ রিয়াদ।
৭।। চলতি বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন মাশরাফি মর্তুজারা। ওভালে প্রথমে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ৩৩০ রানে করে বাংলাদেশ। জবাবে ৮ উইকেটে ৩০৯ রান করে ইনিংস শেষ করে ফ্যাফ ডুপ্লেসি বাহিনী। ৮৪ বলে ৭৫ রান করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন শাকিব আল হাসান।
৮।। প্রোটিয়াদের পর সোমবার টনটনে ক্যারিবিয়ানদের অনায়াসে হারায় বাংলাদেশ। ৩২১ রান করলেও সেই লক্ষ্য অতি সহজেই পূরণ করেন শাকিব আল হাসানরা। ৪১.৩ ওভারে মাত্র ৩ উইকেট খরচ করেন তাঁরা। চলতি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শতরান (১২৪ রান) আসে শাকিবের ব্যাট থেকে। সঙ্গে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরাও হন সাকিব ।
সুজা মাহমুদ, লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ।

