স্তালিন ও সেই সময়ের কবি সাহিত্যকরা

ফাতেমা জোহরা :প্যারিসের পাশাপাশি ১৯০৫ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে রাশিয়ার রাশিয়ার পিটার্সবুর্গে ( লেনিনগ্রাদ) শুরু হয় আঁভাগার্ড শিল্প আন্দোলন। চিত্রকলায় মার্ক শাগাল,ভাসিলি কান্দিনাস্কি ,সঙ্গীতে সের্গেই প্রকোফিয়েভ ও ইগোর স্তাভিনাস্কি ,উপন্যাসে ইভান বুনিন ও আন্দ্রেই বিয়েলি ,কবিতায় আলেকসান্দর ব্লক,ফিওদর ত্যুচেভ ও ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ; এঁরা মনে করতেন একমাত্র নতুন শিল্পসাহিত্যই জন্ম দিতে পারে নতুন এক সমাজ।মিখাইলভস্কায়া ও ইতালিয়ানভস্কয়া স্ট্রিটের কোণায় অবস্থিত ” স্ট্রে ডগ বা দলছুট কুকুর ” ছিল এঁদের বা পরবর্তী শিল্পী সাহিত্যিক প্রজন্মের সূতিকাগার। ১৯১৩ সালে স্ট্রে ডগ ক্যাফে ছিল সেন্ট পিটার্সবুর্গের বড় আঁভ্যাগার্ড ক্যাফে।বিশ শতকের আধুনিক শিল্পকলার একটি প্রধান ধারার উদ্বোধন হয় এঁদের হাত ধরেই।১৯১৭ সালে ২৫ শে অক্টোবরের বিপ্লব ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এই ক্যাফের শিল্পী , সাহিত্যিক , কবি, চিত্রকরদের পরস্পর থেকে কোথায় ছিটকে ফেলেছে , তা বাস্তবতা অনুধাবন করা ছিল অবিশ্বাস্য।

সংসদ নিয়ে এসেরভ ও বলশেভিকদের দ্বন্দ্বে ১৯১৮ সালের ৩০ শে জানুয়ারি আতাতায়ীর গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন লেনিন।সেসময় চেকা’ র ( গোয়েন্দা সংস্থা) প্রধান উৎরিৎস্কির উপরও হামলা হয়, এতে তিনি মারা যান। এই দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় “রেড টেরর” পর্ব। ১৯১২ সালে মে মাসে লেনিন স্ট্রোক করেন।এপ্রিলে স্তালিন সোভিয়েত পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন।প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য লেনিনের পর যে নামটি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে উচ্চারিত হত তিনি ছিলেন ট্রটস্কি। ১৯২৩ সালে ১৩ তম পার্টি কংগ্রেসের অধিবেশনকে উদ্দেশ্য করে লেনিনের লেখা ” কংগ্রেসের কাছে খোলা চিঠি ” যেটাকে বুখারিন বলেছিলেন ” লেনিনের লাস্ট টেষ্টামেন্ট ” ; এর পাদটীকায় লেনিন লিখেছেন , সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে স্তালিনকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য । পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে স্তলিন অপরিমিত ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করে রেখেছেন । কংগ্রেসের উচিত হবে এমন কাউকে নির্বাচন করা যিনি গুণাবলীতে স্তালিনের সমকক্ষ , আচরণগত দিক দিয়ে স্তালিনের চেয়ে অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল , অনুগত ও সৌজন্যপরায়ন হবেন তার কমরেডদের প্রতি।কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্য,চিঠিটা কংগ্রেসে নয়,পড়া হয় পলিটব্যুরোর বর্ধিত সভায়।সেখানে স্তালিন স্বীকার করেন , লেনিন যেসব ত্রুটি উল্লেখ করেছেন তার সবই সত্য পর্যবেক্ষণ।সেইসঙ্গে যোগ করলেন স্তালিনীয় আপ্তবাক্য – “তিনি ভুল করতে পারেন কিন্তু লেনিন ভুল করতে পারেন না।” কমরেডদের কাছে সময় চাইলেন আত্মশুদ্ধির জন্য।

যে উদ্বেগ ছিল মনের ভেতর ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর তা বাস্তব শংকায় পরিণত হল । ১৯২৮ সালে ট্রটস্কিকে পার্টি থেকে বহিষ্কার এবং দেশত্যাগে বাধ্য করা হলো। ১৯৩৪ সালে পার্টির সেক্রেটারি সের্গেই কিরভ আতাতায়ীর হাতে নিহত হলে গোটা দেশব্যাপী শুরু হলো শুদ্ধি অভিযান।পলিটব্যুরোর দুই সদস্য কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ গ্রেপ্তার হলেন।প্রাভদার সম্পাদক , স্তালিনের এক সময়ের মিত্র বুখারিনও গ্রেপ্তার এড়াতে পারলেন না । ১৯৩৪ সালে ১৭ তম কংগ্রেসের ১৯৯৬ জন সদস্যের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মৃত্যুবরণ করেন শুদ্ধি অভিযানে । ১৩৯ জন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের মধ্যে ৯৮ জন মারা যান শুদ্ধি অভিযানে । আন্না আখমাতভা এই শুদ্ধি অভিযানের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন , ” এটা হচ্ছে সেসময় যখন মৃতরাই কেবল সুখে হাসতে পারতো — শেষপর্যন্ত নিষ্কৃতি মিলেছে এই বোধে। ”

রুশ কবিতার রজত যুগের কবি ছিলেন গুমিলিয়ভ , মান্দেলমাস্ত , আন্না আখমাতভা ও মারিনা সিভেতিয়েভা ।

আন্না আখমাতভা :

মায়ের দিককার পূর্ব প্রজন্মের কোন এক তাতার রাজকন্যার নাম ছিল আখমাতভা,আন্না তাঁর গোরেনকো (বাবারপদবি) বাদ দিয়ে আখমাতভা পদবি গ্রহণ করেন। ১৯১০ সালে বিয়ে হয় গুমিলিয়ভের সাথে । ১২ বছরের বিবাহিত জীবন ছিল তাদের । একমাত্র সন্তান লেভ গুমিলিয়ভ । আন্নার প্রণয়ীদের তালিকায় ইসাইয়াহ বার্লিনের নামও উচ্চারিত হয় । আলেক্সান্দার ব্লক বলেছেন,আন্নার সৌন্দর্য ” অদ্ভূত ভীতিকর “, আন্নার জনপ্রিয়তার মূলে যত না তাঁর সৌন্দর্য , তারচেয়ে অধিক তাঁর কবিতা পড়ার ধরণ । রুশ সমালোচক গিওর্গি এডামবিচ বলেন , তিনি ছিলেন সুন্দরের চেয়ে শ্রেয়তর কিছু । আমেদেও মদিলিয়ানি থেকে শুরু করে নাথান আল্টমেন , আলেক্সান্দার টাইসলার তাঁর প্রতিকৃতি ও একাধিক ভাষ্কর্য তৈরি করেন ।

লিরিকের মেজাজে আন্না কবিতা লেখেন , যার মূখ্য বিষয় সমাজ নয় , আন্না নিজে । ভালবাসা , বিষন্নতা , শোকের মাতম এসব তাঁর প্রথম দিককার কবিতার উপজীব্য বিষয় । আকষ্মিকভাবে ঢুকে পড়ে তীব্র রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন কোন লাইন। আন্নার ” সন্ধ্যা ” কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে সমালোচক কর্নেই চুকোভস্কি বলেন , আগামী দুই , তিন প্রজন্মধরে রুশিরা প্রেমে পড়লে এ বই তাদের সঙ্গে রাখতেই হবে । শুদ্ধি অভিযানে হারিয়ে যাওয়া লোকদের নিয়ে আন্না আখমাতভা লিখেছিলেন ” রিকুইলম “( শোকগাথা ) । লিখেছিলেন বললে ভুল হবে , স্তালিনের জীবদ্দশায় এটা কোথাও ছাপা হয় নি বা লিখিত পান্ডুলিপি পাওয়া যায় নি । বহু বছর পর্যন্ত কবিতাটি সংরক্ষিত ছিল কিছু মানুষের স্মৃতিতে । মান্দেলমাস্ত , মারিনা সিভেতায়েভা , আন্না আখমাতভার বহু কবিতা টিকেছিল এইভাবে । প্রাচীন মানব গোষ্ঠী যেভাবে ইতিহা

প্রাচীন মানব গোষ্ঠী যেভাবে ইতিহাস , কিংবদন্তি ও প্রবাদ – প্রবচন বাঁচিয়ে রেখেছিল মৌখিক ঐতিহ্যে ।

১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্না আখমাতভা লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ” যে কবিতার কোন নায়ক নেই “। কবিতাটিতে একটা প্রচ্ছন্ন ক্রিটিক ছিল পার্টিতন্ত্রের বিরুদ্ধে । যার ফলে সেটি স্তালিনের সময় আলোর মুখ দেখে নি । এই কবিতায় আন্না ফিরে যান ১৯১৩ সালে স্ট্রে ডগ ক্যাফে তে । যেখানে চেয়ারে বসা হলুদ গেঞ্জি পরা মায়াকোভস্কি , তাঁর সাথে মিখাইল কুজমিন ও মান্দেলমাস্ত । কিছুটা দূরত্বে বসে আছেন তিনি । হাতে জ্বলছে সিগারেট , পরনে আঁটোসাঁটো স্কার্ট , কাঁধে স্কার্ফ , গলায় লাল রুবীর একটা নেকলেস । এই ক্যাফেতে বরিস পাস্তেরনাকের সাথে আন্নার পরিচয় হয়।

আন্না আখমাতভা ছিলেন রাইটার্স ইউনিয়নের বাইরে । দেশোদ্রোহী (!) গুমিলিয়ভের স্ত্রীকে কোন ইউনিয়ন সদস্য পদ দেবে ? তাঁর জন্য বয়স্ক ভাতা , মাসোহারা বা পেনশনের ব্যবস্থা নেই । এসব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন তিনি । আর্থিক চাপে পড়ে পুত্র লেভকে বাধ্য হয়ে রেখেছেন মান্দেলমাস্তের বাড়িতে , এমনকি ব্যয়ভার মেটাতে তাঁর ভাষ্কর্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ১৯৩৪ সালের শুদ্ধি অভিযানে আন্না গ্রেফতার হলেন না সত্য কিন্তু তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা রেহাই পান নি । গুমিলিয়ভের মৃত্যুর পর আন্না বেশ কয়েকটি বিয়ে করেন । আন্নার তৃতীয় স্বামী নিকোলাই পুনিন ও পুত্র লেভ সোভিয়েত বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন । আন্না তাদের মুক্তির জন্য স্তালিনের কাছে চিঠি লিখেন , বরিস পাস্তেরনাকও আন্নার স্বপক্ষে সুপারিশ করেন। উল্লেখ্য মায়াকোভস্কির মৃত্যুর পর স্তালিন পাস্তেরনাককে রুশ কবিতার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি মনে করতেন । এ যাত্রায় তারা মুক্তি পেলেও সে সৌভাগ্য স্থায়ী হয় নি। ১৯৩৬ সালে লেভকে লেনিনগ্রাদ ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করা হয় ।
১৯৩৮ সালে লেভ আবার গ্রেফতার হয় । লেনিনগ্রাদে আটক থাকাকালীন আন্না প্রতিদিন তাঁর সাথে দেখা করার জন্য জেলখানার বাইরে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ফুলে যেত । আন্নার বিখ্যাত কবিতা ” রিকুইম ” এ একটা অংশ আছে। আন্না লিখেছেন , ” ইয়েজভ আতংকের ভয়াবহ বছরে আমি প্রায় সতেরো মাস জেলখানার বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছি । একদিন ভিড়ের মধ্যে কে যেন আমাকে চিনতে পেরে নাম ধরে ডাক দিল । আমার পেছনে ছিল এক তরুণী , ঠোঁটজোড়া জমে নীল হয়ে গেছে । সে আমার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বললো , এই যা হচ্ছে আপনি কখনো কি তা বর্ণণা করতে পারবেন ? আমি বললাম – পারবো । দেখলাম সে কথা শুনে তার মুখে হাসির মত কিছু একটা খেলে গেল , একসময় যা তার মুখচ্ছবি ছিল । ”

এভাবেই দুঃখ – শোকে , উৎসবে – বিপ্লবে , বেদনায় – ক্ষোভে আন্না আখমাতভার ” “রিকুইম ” এর জন্ম । স্তালিনের মৃত্যুর পর আন্নার শেষজীবন কোন বিপর্যয় ছাড়া কেটেছিল । ১৯৫৬ সালে লেভ ছাড়া পান। ১৯৬৬ সালে আন্না এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।

নিকোলাই গুমিলিয়ভ:

গুমিলিয়ভ ও মান্দেলমাস্ত উভয়েই পিটার্সবুর্গের সবচেয়ে এলিট স্কুল ৎসারস্কয়া মেলো লাইসিয়ামে পড়েছেন । এই স্কুল থেকে যারা বেরুতো , তারা ইম্পেরিয়াল সার্ভিসে যোগ দেবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল । প্রথম মহাযুদ্ধে গুমিলিয়ভ জারের ইম্পেরিয়াল বাহিনীতে যোগ দেন। অফিসার হিসেবে বীরত্বের জন্য দুইবার পুরষ্কৃত হন । গুমিলিয়ভের আকর্ষণ ছিল পারস্য রাজ্য ও আফ্রিকার প্রতি৷ ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন । তাঁর বিখ্যাত কবিতা গুলো জীবজন্তু ও ভ্রমণকাহিনি নিয়ে । আফ্রিকায় তিনি বিভিন্ন রোমাঞ্চকর অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ইথিওপিয়ার লোককাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করেন। ছোটদের আফ্রিকা সম্পর্কে বই লেখার জন্য তাঁকে এখনো স্মরণ করা হয়।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তীকালীন কেরনস্কি সরকারের সময় গুমিলিয়ভ ফ্রান্সে প্রেরিত হন বিশেষ দূত  হিসেবে । তাঁর রাশিয়ায় ফিরে আসার কথা নয় । এই ব্যাপারে গিওর্গি ইভানভ ” চায়নীজ স্যাডোজ ” বইয়ে লিখেছেন , আমরা কয়েকজন রাশান অফিসার ঘটনাক্রমে লন্ডনের এক ক্যাফেতে মিলিত হয়েছিলাম । সবাই একযোগে বলে উঠলো – আমাদের করার কিছু নেই । কেউ বললো আফ্রিকায় যাব সিংহ শিকার করতে । কেউ আবার বিদেশি আর্মিতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। একজন জিজ্ঞেস করলো – গুমিলিয়ভ তোমার চিন্তা কী ? কবি বললেন – আমি অনেক যুদ্ধ করেছি , আফ্রিকাতেও গেছি তিনবার । এখনো কোন বলশেভিকের সাথে সাক্ষাৎ হয় নি। তাই রাশিয়ায় ফিরে যাচ্ছি । সিংহ শিকারে চেয়ে বলশেভিক বেশি বিপদজনক হতে পারে না । উল্লেখ্য ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবকে মেনে নেন নি গুমিলিয়ভ । ১৯১৮ সালে গোর্কির আমন্ত্রণে গুমিলিয়ভ বিশ্বসাহিত্য প্রকল্পে যোগ দেন । এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল রুশ সাহিত্যের বাইরে মণি-মুক্তা অনুবাদ করে স্থানীয় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া । কবি আলেক্সান্দার ব্লক ও রাজনৈতিক স্যাটায়ার রচয়িতা ইয়েভগনি জামিয়াতিনের মত খ্যাতনামা লেখকরা এই প্রকল্পে ছিলেন ।

১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্রনস্তাদের ঘাঁটিতে নৌবিদ্রোহ ছিল বলশেভিকদের বিরুদ্ধে বড় ধরণের প্রতিবিপ্লবী ঘটনা। ট্রটস্কি স্বয়ং রেড আর্মির নেতৃত্ব দিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করেন । লেনিন মনে করেন – এই প্রতিবিপ্লব ছিল ইউরোপীয় পুজিবাদী দেশ ও রাশিয়ার হোয়াইট আর্মির যৌথ ষড়যন্ত্র ।বিদ্রোহের সন্দেহভাজন হিসেবে গুমিলিয়ভকে ১৯২১ সালে ২৪ শে আগস্ট ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারা হয় ।

ওসিপ মান্দেলমাস্ত:

১৯৭৫ সালে ” হোপ এগেইনষ্ট হোপ ” স্মৃতিকথায় নাদিয়েদঝা মান্দেলমাস্ত লিখেছেন , ” মান্দেলমাস্তের কবিতা ছিল এমন বিপদজনক , সেসব কবিতার যারা ছিলেন প্রথমবারের শ্রোতা , তাদেরও সবার ট্রাজিক পরিণতি হয়েছিল । ” প্রথাগত অর্থে মান্দেলমাস্ত রাজনৈতিক কবিতা লিখতেন না । কেন যে তাঁর মনে হলো স্তালিনের গোঁফজোড়া তেলাপোকার দুই শুঁড় — সেটা অবিশ্বাস্য । বন্ধু গুমিলিয়ভের মত তিনি বিশ্বাস করতেন ” আকমেইজম ” শিল্প আন্দোলন । আকমেইস্তরা জীবন থেকে তুলে আনা বাস্তব চিত্রকল্প ব্যবহার করতেন । মান্দেলমাস্ত যে কবিতাটির জন্য অভিযুক্ত হলেন সেটার নাম “নেকড়ে “।

১৯৩৪ সালের ১৩ ই মে আন্না আখমাতভা গিয়েছিলেন মান্দেলমাস্তের বাসায় ছেলে লেভকে দেখতে । রাতে কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দিলেন আন্না । ঘরে ঢুকে এনকেভেদের সদস্যরা মান্দেলমাস্তকে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাল । আখমাতভা একটু আগে তার জন্য প্রতিবেশির কাছ থেকে চেয়ে আনা সেদ্ধ ডিমটা মান্দেলমাস্তকে খেতে দিলেন । সারারাত ফ্ল্যাট উলোটপালোট করে খুঁজে চললো এনকেভেদের সদস্যরা । পরদিন আবারও এলো তারা । আখমাতভা ও নাদিয়েঝদা বুঝলেন , তারা তন্ন তন্ন খুঁজছিলেন মান্দেলমাস্তের ” নেকড়ে ” কবিতাটি । কুলাকবিরোধী অভিযানে কৃষকদের প্রতি নির্যাতনের প্রতিবাদ ছিল এই কবিতায় । সেটার কোন লিখিত লিপি ছিল না । সেটা ছিল মান্দেলমাস্তের মাথায় । জেরার একপর্যায়ে মান্দেলমাস্ত কবিতাটা লিখে দেন স্মৃতি থেকে । সোভিয়েত পতনের পর কে জি বি ” র অনেক গোপন আর্কাইভ খুলে দেওয়া হয় । সেখান থেকে প্রাপ্ত মান্দেলমাস্তের কেইস নাম্বার ৪,১০৮ , জেরার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় । ” বিচ্ছিন্ন করে দাও কিন্তু টিকিয়ে রাখ ” এই নীতির ভিত্তিতে উরালের একটা ছোট শহরে তিন বছরের জন্য নির্বাসিত করা হয় মান্দেলমাস্তকে । বার তিনেক আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর কিছুটা শোকে , রোগে , ঠান্ডা ও ক্ষুধায় সাইবেরিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় মারা যান মান্দেলমাস্ত । শেষের দিনগুলোতে নির্বাসন ক্যাম্পে শতচ্ছিন্ন কাপড় , মাথাভর্তি উঁকুন , দেহে নানা ধরণের ক্ষত নিয়ে মান্দেলমাস্ত বন্দীদের পড়ে শোনাতেন তাঁর কবিতা বাড়তি কিছু রুটির আশায় । বরফে জমে মারা যাওয়া মান্দেলমাস্ত বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলন ।

মারিনা সিভেয়েতভা:

বরফ ভাঙ্গার জাহাজকে হতে হয় সর্বাধুনিক ও ক্ষমতার দিক দিয়ে শক্তিশালী । ১৯৮৯ সালে এন্টার্কটিকা অভিযানে পোল্যান্ড এক জাহাজ তৈরি করেন । যার নাম রাখা হয় বিস্মৃতপ্রায় রুশ কবি মারিনা সিভেয়েতভার স্মরণে । মারিনা ছিলেন পথিকৃৎ নারীবাদী কবি ও চিন্তকদের একজন। খুব অল্প বয়সে সের্গেই এফ্রনের প্রেমে পড়েন । বিবাহিত জীবনের একপর্যায়ে লিভ টুগেদার করেছিলেন অভিনেত্রী সোফিয়া পারনকের সাথে । দুই মেয়ে , এক ছেলে । ছেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যান ফ্রন্টে । ইরিনা অল্প বয়সে মারা যান । অন্যমেয়ে আলিয়া গুলাগ শিবিরে কোনরকমে বেঁচে ছিলেন ।

চিরটাকাল অভ্যস্ততার বাইরে চিন্তা করতে উৎসাহী ছিলেন মারিনা । বিপ্লবের আগে জারতন্ত্রের সমালোচক ছিলেন । কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তনকেও সহজে মেনে নিতে পারেন নি । বলশেভিক মস্কোয় থেকে বলশেভিজমের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন তিনি । ১৯২২ সালে রাশিয়া ছেড়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিলে , তিনি হয়ে উঠলেন বুর্জোয়া বিরোধী । একসময়ের বলশেভিক বিরোধী সের্গেই এফ্রন ক্রমে বলশেভিকদের পক্ষে অবস্থান নেন । সোভিয়েত কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর পক্ষ হয়ে কাজ করতে শুরু করেন । এফ্রনের গোয়েন্দা তৎপরতায় মারিনা কখনো জড়ান নি । দুয়েকটা ব্যতিক্রম বাদে মারিনার কাছে রাজনীতি ছিল ” নোংরা ” ক্ষেত্র । তিনিই প্রথম নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন । মারিনার বাবা ছিলেন মস্কোর মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও মা ছিলেন খুব উঁচুদরের পিয়ানোবাদক । বরিস পাস্তেরনাক ও মান্দেলমাস্ত ছিলেন তাঁর প্রথম জীবনের প্রণয়ী । আখমাতভা মনে করতেন , মারিনা তাঁর সমসাময়িক কালের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি ।

১৯৩৭ সালে এফ্রন রাশিয়ায় চলে আসবার দুইবছর পর মারিনা ফিরে আসেন রাশিয়ায় । ১৯৩৯ সালে মেয়ে আলিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলো । তাঁকে চাপ দিয়ে জবানবন্দি নেওয়া হলো – এফ্রন ছিল ডাবল এজেন্ট , ফ্রান্স ও রাশিয়ার । এর কিছুদিন পর এফ্রন গ্রেপ্তার হলেন । ১৯৪১ সালে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে বুতিয়ার্কা জেলে গুলি করে মারা হয় । মারিনাকে রাশিয়ায় দেখা হতো প্রতিবিপ্লবী বা ” হোয়াইট এমিগ্রি ” হিসেবে। যারা মারিনার কবিতা পছন্দ করতো , তারাও মারিনার সঙ্গ এড়িয়ে চলতো । শুধু পাস্তেরনাক জীবনধারণের জন্য মারিনাকে অনুবাদের কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন । বোদলেয়ার ও লোরকার অনুবাদ করেন তিনি এইসময়।

মারিনার শেষদিনগুলো ছিল অস্পষ্ট । ১৯৪১ সালে জার্মানির সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ বেঁধে গেলে মারিনা ইয়েবুলগা হয়ে চিস্তাপল শহরে আসেন । রাইটার্স ইউনিয়নে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে নিরাশ হন তিনি । কথিত আছে , বাসন মাজা ও কাপড় ধোয়ার কাজও তিনি খুঁজেছিলেন জীবনধারণের জন্য। নিরুপায় হয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর কোলে আশ্র‍য় নেন । মৃত্যুর পূর্বে ছেলে মুরকে লেখা এক চিঠি —

“আমাকে ক্ষমা করে দিস । এভাবে চলতে থাকলে অবস্থা আরো শোচনীয় হত । আমি প্রচন্ড অস

আমাকে ক্ষমা করে দিস । এভাবে চলতে থাকলে অবস্থা আরো শোচনীয় হত । আমি প্রচন্ড অসুস্থ । আমি আর আমাতে নেই । আমি তোকে প্রচন্ড ভালবাসি । বাবা ও ইলিনার সাথে দেখা হলে বলিস , শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাদের খুব ভালবাসি । তাদের বুঝিয়ে বলিস কেন আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল ।”

বরিস পাস্তেরনাক:

স্তালিন বরিস পাস্তেরনাককে বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন ‘ মেঘে মেঘে ঘুরে বেড়ানো ‘ মানুষ মনে করতেন । মায়াকোভস্কির মৃত্যুর পর স্তালিন পাস্তেরনাককে মনোনীত করেন প্রধান কবি হিসেবে । বলা হয়ে থাকে , পাস্তেরনাক প্রথম রুশ কবি যিনি জর্জীয় কবিতার মণিমুক্তা অনুবাদ করে বৃহত্তর রুশ পাঠকদের সাথে পরিচিত করান । সেজন জর্জীয় স্তালিন পাস্তেরনাকে প্রতি নমনীয় ছিলেন । শুদ্ধি অভিযান তিনি নিরাপদে পার করেন। একথা সত্যি যে পাস্তেরনাক স্তালিনকে সত্যিকার নায়কের চোখে দেখতেন । স্তালিনের মৃত্যুর পর পাস্তেরনাককে বেশ তিক্ত অভিজ্ঞতা বরণ করতে হয় । ১৯৬০ – ৭০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিষিদ্ধ লেখা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম সাম – ইজদাত বা হাতে লিখা পান্ডুলিপির স্টেনসিল কপি বিতরণ । ১৯৪৮ সালে পাস্তেরনাক রচিত ডক্টর জিভাগো’র প্রথম দিককার অধ্যায়গুলো সাম – ইজদাতের মাধ্যমে মস্কোয় বিতরিত হত। ডক্টর জিভাগো সোভিয়েত ও পাশ্চাত্যে বেশ আলোড়ন তোলে । কারণ স্তালিন আমলে সৃষ্ট সমাজতন্ত্রের পূর্বছায়া তিনি দেখেছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের রক্তাক্ত টানাপোড়েনের মধ্যে ।জিভাগো ট্রাজিক চরিত্রে হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৬ সালে উপন্যাসটির রচনা শেষ হয় । এবার রাষ্ট্রীয় রোষ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না পাস্তেরনাক । ১৯৫৬ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর এলেনবুর্গের ভাষায় ‘ বরফ গলতে ‘ শুরু করেছে । কিন্তু গলতে গলতে সে বরফ আবার জমাট বাধা শুরু করলো । এ অবস্থার মধ্য দিয়ে নোভি মির জিভাগো উপন্যাসটি ছাপাতে অস্বীকার করলো । ১৯৫৭ সালে উপন্যাসটি ইতালিতে প্রকাশিত হয় । ১৯৫৮ সালে এর ইংরেজি সংস্করণ বহির্বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে । ১৯৫৮ সালে ২৩ শে অক্টোবর সুইডিশ নোবেল কমিটি বার্তা পাঠিয়ে পাস্তেরনাককে জানান তিনি এই বছর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন । কনস্তানতিন ফেদিন ছিলেন রাইটার্স ইউনিয়নের মস্কো শাখার প্রধান । তিনি পাস্তেরনাককে পুরষ্কার প্রত্যাখানের অনুরোধ করেন। পাস্তেরনাক এ ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন । এর পরপরই তাঁকে রাইটার্স ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কার করা হয়৷ ইউনিয়ন ভোট গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিল পাস্তেরনাককে দেশ থেকে বহিষ্কারের ।

ট্রটস্কি একবার পাস্তেরনাককে জিজ্ঞেস করেছিলেন – আপনার লেখায় সামাজিক বিষয় কেন অনুপস্থিত ? পাস্তেরনাকের উত্তর – আমি অকৃত্রিম ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী । ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ হচ্ছে নতুন সমাজদেহের এক নতুন সামাজিক কোষ । রাইটার্স ইউনিয়নের তৎকালীন সেক্রেটারি আলেক্সান্ডার ফাদায়েভ বলে উঠলেন – ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ আমাদের সমাজের জন্য একটা বিজাতীয় ধারণা । অনেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে পার হলেও সমাজতন্ত্রের প্রতি পাস্তেরনাকের মৌলিক আস্থায় চিড় ধরাতে পারে নি । ১৯৬০ সালে ১১ ই জুন পাস্তেরনাক মৃত্যুবরণ করেন । জিভাগোর কারণে রাইটার্স ইউনিয়ন তাঁর মৃত্যুতে শীতলতা দেখিয়েছিল , এমনকি সরকারিভাবে কোন শোকসভা পর্যন্ত হয় নি । ডক্টর জিভাগো’র এক জায়গায় —

” আমাকে একজন ডাক্তার বা লেখক হিসেবে ফলপ্রসু হতে বাধা দিচ্ছে কোন ব্যাপারগুলো ? সেটা আমাদের অভাব নয় , অথবা নয় আমাদের যাযাবরের মত ঘুরে বেড়ানো ; এমনকি প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া আমাদের অস্থির জীবনধারাও নয় । আমাকে বাঁধা দিচ্ছে আজকের দিনের শ্লোগানগুলোর দাপট । কিরকম পুণরুক্তিময় এই শব্দগুলো, ভবিষ্যতের উষালগ্ন , নতুন পৃথিবীর নির্মাণ, মানবসভ্যতার মশাল বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা ” — যে কারণে গালভরা শোনায় এই শ্লোগানগুলো , তা হলো এদের পেছনে কোন কল্পনাই নেই ; কেননা এর পেছনে যে চিন্তা কাজ করছে , তা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর । ”

পাস্তেরনাক এই দ্বিতীয় শ্রেণীর চিন্তা ও কল্পনা শক্তিহীন শ্লোগানধর্মী বক্তব্য বা ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন সারাজীবন । সে যুদ্ধে আমৃত্যু তাঁর সহচর ছিলেন আন্না আখমাতভা , নিকোলাই গুমিলিয়ভ , ওসিপ মান্দেলমাস্ত ও মারিনা সিভেয়েতভা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.