বলতে শিখেছি ভালোবাসি

সমগ্র বিশ্বেই আজকের দিনটি মা দিবস। এই দিবসটি নিয়ে যখন লিখছি, ইউরোপে তখনও এই দিবসটি চলছে তবে আমাদের দেশে দিবসটি পার হয়ে গেছে। এই দিবসটির পিছনের কারণে যাচ্ছি না । সেটা ভিন্ন আলাপ । তবে বর্তমান পৃথিবীতে এই মা দিবসটি একটি সিম্বলিক হিসেবে পরিচিত , যা থেকে অন্তত সমগ্র বিশ্বেই মাকে সবাই আলাদা করে বলছে , ” মা তোমাকে ভালোবাসি ” ।

আজকের বিশ্বায়নের দিনে ধীরে ধীরে আমাদের দেশেও নানান দিবসের আগমন ঘটেছে । মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস আরো অনেক দিবস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজকে এই মা দিবসে অনেকের চমত্কার এবং সুন্দর সুন্দর পোস্ট দেখেছি, যা সত্যি মানুষের হৃদয়কে আলোড়ন করে। আবার বিপরীতে দু চারজনের পোস্ট দেখেছি , মা /বাবা দিবসতো বছরের ৩৬৫ দিনই এটাকে আলাদা করে বলার মধ্যে কোনো গর্ব নাই। হ্যাঁ অবশ্যই এবং নেহাত সত্য কথা, বছরের ৩৬৫ দিনই তো মা/বাবা দিবস।

এবার লক্ষ্য করুণ, এই বিশ্বায়নের যুগে এই দিবসগুলো আমাদের কি দিয়েছে ?  আমি মনে করি অন্তত  ” ভালোবাসার যে ভিন্ন মাত্রা থাকতে পারে তা শিখিয়েছে “। বেশি দিন আগের কথা নয়, ৮০ দশকেও আমাদের দেশে কেউ কি মা কে বলতে পেরেছেন ( অবশ্যই ভিন্নতা থাকতে পারে ) মা আমি তোমাকে ভালোবাসি। না বলা হতো না , কেননা এই ভালোবাসা শব্দটি ছিলো একান্তই একটি পক্ষের জন্য , প্রেমিক/প্রেমিকার ভাষা।

আজকে আমরা সেখান থেকে বেড়িয়ে এসে এই ভালোবাসা শব্দটির ব্যাপকতা শিখেছি এই বিশ্বায়নের কারণেই। সেই সময়ে মা/বাবা/ভাই/বোন কাউকে ভালোবাসি বলা হতো না এবং তার পিছনের কারণটি  ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে বলে ধারণা করা হতো। হয়তো বা সরাসরি বেয়াদব নামেই পরিচিত পেতে হতো। তাহলে বলতেই হয় বিশ্বায়নের সব কিছুই যে খারাপ তা মোটেও নয়।

এই বিশেষ দিবসগুলো কিভাবে এই দেশে আসলো বা কারো ভাষায় আমদানি হলো ? যদি ভুল না হয়, যতটুকু মনে পরে ৯৩ সালের দিকে সেই সময়ের বহুল প্রচলিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ” যায়যায়দিন “ যার প্রধান সম্পাদক ছিলেন জনাব শফিক রেহেমান, তিনিই তার পত্রিকায় প্রথম ভালোবাসা দিবস নিয়ে সম্ভবত সর্বোচ্চ ১৪০০ শব্দের পাঠকের চিঠির আহ্বান জানান। সেই পাঠকের চিঠি পত্রিকায় একটি বিশেষ সংখ্যায় ” ভালোবাসা দিবসের বিশেষ সংখ্যা “ হিসেবে প্রকশ করেন।সেই থেকে প্রতিবছর এই দিবসটির ভালোই সাড়া জাগে তরুণদের মাঝে। পরবর্তীতে দেখা গেলো যায়যায়দিন পত্রিকাটি ধীরে ধীর মা দিবসে , বাবা দিবসেও পাঠকের  চিঠি আহ্বান করে বেশ ভালোভাবেই দিবসগুলোকে মানুষের মাঝে পরিচয় করাতে সক্ষম হয়। বলতে হয় যায়যায়দিন পত্রিকাটি স্বার্থক হয়েছিলো এবং এখন সবাই বেশ আগ্রহের সাথেই দিবসগুলোকে গ্রহণ করে  মনের মত করেই পালন করে যাচ্ছে। এটার নিশ্চয়ই একটি ভালো দিক সমাজে আছে।

এই মা দিবস নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি কাহিনী বলেই ইতি টানবো। দিনক্ষণ মনে নেই, তবে মনে আছে সেই সময় আমি তেমন বড় হইনি, বয়স কত তাও মনে নেই , তবে কোনো এক রোজার ঈদে সন্ধ্যা সময় বাসায় সবাই মেহেদী লাগাচ্ছে। আমিও পাটায় বাটা মেহেদী নিয়ে একটি ঘরে গিয়ে খুবই গোপনে বাম হাতে মেহেদী দিয়ে ইংরেজিতে  Love  লিখেছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই আমার  সবচাইতে কাছের এবং প্রিয় বন্ধু, ইমিডিয়েট বড় ভাই দাদা সে এটা দেখেই বললো আমি এটা কি লিখেছি !! যদি কেউ দেখে ফেলে? তাহলে আমার কপালে শনি আছে। আমিও একটু ঘাবড়ে গেলাম , আবার সাথে বেশ স্পষ্ট করেই বললাম এই  Love  তো মার প্রতি। আমি মা কে ভালোবাসি। আমার দাদা আমাকে উদ্দেশ্যে করে বললো , এই ছাগলে এই সব কি কয় ! আমিও কাঁচা মেহেদী হাত থেকে তুলে ফেললাম। কিন্তু সমস্যা হলো হাল্কা কিছুটা মেহেদীর রং এর  Love  লেখাটি দেখা যাচ্ছিল । উপায় না পেয়ে নিজ হাতের তালুর উপরে ব্লেড দিয়ে যতটা সম্ভব হয়েছিলো তুলে ফেলেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে সেই বয়সেও একটু বাউন্ডুলে ছিলাম বলেই হয়তো  Love  লিখতেও পেরেছিলাম এবং কিছুটা তুলতেও পেরেছিলাম । আজকের দিনে এই লেখাটি লিখতে গিয়ে সেই ঘটনা মনে পড়লো আর নিজ থেকেই হাসি পাচ্ছে।  বলতেই হয়, সেই Love  লেখাটি মা কে উদ্দেশ্যে করে লেখা ছিলো না।

আগামীতেও মা/বাবা/ভালোবাসা দিবস বা অন্যান্য দিবসগুলো সুন্দর হয়ে আসুক সবার কাছে । আজকের  এই দিনে আমার মা/বাবা দুজনেই নেই । মা তোমাকে ভালোবাসি, বাবা তোমাকে ভালোবাসি, প্রবাস জীবনে প্রতিটি নিশ্বাস প্রশ্বাসে তোমারাই হৃদয় আছো , থাকবে। সত্যি বলছি এই দিবসে শিখেছি , ” বলতে শিখেছি ভালোবাসি “। 

20181221_172132

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.