অবেলার রোদ্দুর ——জাকওয়ান হুসাইন

দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল প্রায়। এখনও স্টেশনের পাশের একটা ফাকা মতন জায়গায় বসে আছে বাদল।সেই কাকডাকা ভোরে ট্রেন থেকে এই কানুপুর স্টেশনে নেমেছে। তারপর স্টেশন থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে মুকুন্দপুর নদীর ঘাটে।টইটই করে ঘুরে বেড়িয়েছে পুরো মুকুন্দপুর।তারপরও মকবুল প্রামানিকের কোন খোঁজ পায়নি।দুপুরের আগে আগে আবার ফিরে এসেছে কানুপুরে। স্টেশনের পাশে এই ফাকা জায়গাটাই বসে ভাবছিল কি করা যায়। ও কি ফিরে যাবে নাকি আরো খোঁজ করবে। মকবুল প্রামানিকের খোঁজ ওর চাই চাই। কিন্তু এখানে থাকাটা খুব মুশকিল।থাকার জায়গা নাই।খাবার দোকানও নাই। দুপুরে স্টেশনের টং দোকানটা থেকে গোটা তিনেক সিঙারা খেয়েছে।গ্রামের স্টেশন। চারদিক বড্ড বেশি নিস্তব্ধতায় ভরা। স্টেশনের পাশের ওই ফাকা জায়গাটায় শুয়ে শুয়ে জীবনের কথা ভাবতে থাকে বাদল।ঢাকার একটা নাম করা প্রায়ভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে ও। বাবা অনেক বড় ব্যবসায়ী।জন্মের পরই মা মারা যায়। ছোটবেলা থেকে তাই শুনে আসছে ও। বন্ধু-বান্ধব,পড়াশোনা,সোস্যাল ওয়ার্ক সবকিছু নিয়েই মেতেছিল এতদিন। বাবার সাথে খুব একটা দেখা হতো না ওর। ব্যবসা নিয়ে অনেকটাই ব্যস্ত সময় পার করতেন তিনি। বাদলের এই সাজানো জীবনের গতিপথটা হঠাৎ করে পাল্টে গেল। মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। রোদেলা আপুর বিয়ে ছিল সেই দিন। ওহ,রোদেলা আপুর কথা মনে পড়ে গেল আবার। রোদেলা তালুকদার। রোদেলার সাথে বাদলের পরিচয় ২ বছর আগে।রোদেলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। সদ্য পাস করা ডাক্তার। চাকুরীর পাশাপাশি পিজি থেকে এফসিপিএস করছিল। বাদলের সাথে পরিচয় জাতীয় শহীদ মিনারে একটা অনুষ্ঠানে।ওর থেকে বছর দশেকের বড় ছিল।পরিচয়ের পর বন্ধুত্ব হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।ওদের বন্ধুত্বে বয়স কোন প্রভাব ফেলেনি। বাদল রোদেলাকে আপু বলেই ডাকত। একটু সময় পেলেই দুজনে বেরিয়ে পড়ত ঘুরতে। ছুটির দিনগুলোয় চুটিয়ে আ্ড্ডা দিতো। কখনো কখনো টিএসসি, শহীদ মিনার পেরিয়ে আজিমপুর হয়ে লালবাগ কেল্লার সামনে দিয়ে চলে যেত বুড়িগঙ্গার ধারে। ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকায় করে কত সন্ধ্যায় ঘুরে বেড়িয়েছে বুড়ি গঙ্গা বুকে তার ইয়ত্তা নেই। ওদের এই অসম সম্পর্কটাকে অনেকে অনেক রকম ভাবে দেখতো। কিন্তু তাতে ওদের কিচ্ছু যায় আসতো না। নিয়ম করে মুভি দেখা, রোদেলা আপুর বিয়ের জন্য পাত্র দেখার নাম করে রেষ্টুরেন্টে খেয়ে দেয়ে পাত্রকে বোকা বানানো অনেক মজাই করতো দুজন মিলে। এমন করে কেটে যায় প্রায় তিনটে বছর। রোদেলা আপুর বাড়ি থেকে তার বিয়ে ঠিক করে। রোদেলা আপু ছুটি নিয়ে চলে যায় তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে।বিয়ের দিন গিয়েছিল বাদল রোদেলা আপুর গ্রামের বাড়িতে।রোদেলা আপুদের বিশাল বাড়ি সেজেছিল বিয়ের সাজে।বিয়ের সাজে অপূর্ব লাগছিল রোদেলা আপুকেও।কিন্তু বেশিক্ষন থাকতে পারেনি ওই বাড়িতে বাদল।বাড়ির একটা খালি কামড়ায় ডেকে নিয়ে গিয়ে রোদেলা আপু ওর হাতে একটা চিঠি দিয়ে বলেছিল, তুই চলে যা বাদল।বিয়ের তুই থাকলে আমি সহ্য করতে পারবনারে। ভ্যাবাচেকা খেয়ে বাদল যখন চলে আসছিল রোদেলা আপু আবার ডেকেছিলো ওকে। ঘুরে দাড়াতেই বুকে জড়িয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলেছিল যখন আরো বড় হবি তখন বুঝবি আজকের দিনটা কতটা যন্ত্রনাময়।
রোদেলা আপুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসে বসে চিঠিটা পড়েছিল বাদল। একটা কবিতা লেখা ছিল…..

দখিনা হাওয়ায় সেদিনই মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছিলাম
যখন তোমার আমার বিচ্ছেদ ঘটেছিলো,
সময় আমাকে একটা চিরস্থায়ী মৃত্যু উপহার দিলো
তোমার বিচ্ছেদের প্রতিটি সেকেন্ড,
আমার একেকটি মৃত্যুমুহুর্ত
ভালবাসা ভাল থেকো……

রোদেলা আপু কবিতাটি কেন লিখেছিল তখন বোঝেনি ও। এখন বোঝে।যখন হৃদয়ের প্রত্যেক্ প্রকোষ্ট জুড়ে রোদেলা আপুর উপস্থিতি টের পায়।
রোদেলা আপুর বাড়ি থেকে ফিরে চিঠিটা রাখার জন্য পুরনো আলমারি খুলেছিল। ওর খুব বেশি প্রয়োজনীয় জিনিস ওই আলমারিটাতেই থাকে। সেদিন আলমারির ডালা খোলা মাত্র অনেকগুলো চিঠির খাম পেয়েছিল। ১৯৯৭ সালের পর থেকে সেদিন পর্যন্ত বছরের একটা সময় চিঠিগুলো এসেছে। ওর বাবার নামে। ৩১ শে ডিসেম্বরে। মানে ওর জন্মদিনে।সবগুলো খামের ভেতরে একই রকম নীল কাগজে গোটা গোটা করে লেখা, শুভ জন্মদিন বাবা সোনা। চিঠিগুলো এসেছে যশোরের মুকুন্দপুর গ্রামের জনৈকা দীপ্তি সরকারের পক্ষ থেকে। বাদল তখুনি গুগল ম্যাপে সার্চ দিয়ে খুজে বের করে মুকুন্দপুর গ্রাম।পোষ্টাল একাডেমি তে ফোন করে বের করে মুকুন্দপুর পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাষ্টারের নাম। তারপর রওনা দেয় এই মুকুন্দপুরের উদ্দেশ্যে।বাবাকে কিছুই জানায়নি ও। ওর সব আত্মীয় স্বজনের কথা জানে ও। কিন্তু বাবা কখনও ওর নানাবাড়ির কথা বলেনি। আর ওরও খুব একটা মনে হয়নি।হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছে বেশিরভাগ সময়।আত্মীয় স্বজনের সান্নিধ্যে যাওয়ার খুব একটা সুযোগ মেলেনি।
কানুপুর স্টেশনের পাশের ওই ফাকা জায়গাটায় শুয়ে থাকতে থাকতে টুপ করে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে ও টেরই পায়নি। মাগরিবের আজানের ধ্বণিতে সম্বিৎ ফিরে পায়। উঠে স্টেশন মাষ্টারের রুমের দিকে হাটা দেয় ও। উদ্দেশ্য রাতটা কোন রকম কাটিয়ে দিয়ে কাল সকালে আবার মুকুন্দপুর যাবে ও। স্টেশন মাষ্টারের রুমে গিয়ে ডাক দেয় ও,
-কে আছেন?
-কে? গলা বাড়িয়ে জবাব দেয় স্টেশন মাষ্টার।
-আমি ঢাকা থেকে এসেছি।আজকের রাতটা থাকার মতোন কোন জায়গা কি হবে আশেপাশে কোথাও?
-এখানে তো বাবা থাকার কোন জায়গা নেই। পৌঢ় স্টেশন মাষ্টার বলল।
-তাহলে কি করা যায়?
-তুমি বাবা আজ রাতটা আমার এখানেই কাটিয়ে দিতে পারো।
গ্রামের স্টেশন। স্টেশন মাষ্টার নিজেই রান্না করে খায়। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে স্টেশন মাষ্টার জিজ্ঞেস করে,
-তা বাবা এখানে কোথায় এসেছ?
-মুকুন্দপুরে একজনকে খুঁজতে এসেছি। আজ দেখা হয়নি।কাল আবার যাব।
-কাকে খুঁজতে এসেছ? আমি অনেকবছর এদিকে আছি। মুকুন্দপুরের সবাইকেই চিনি।
-মকবুল প্রামানিক।
-অ!কিন্তু তুমি তারে মুকুন্দপুর খুজলে তো পাবে না।নদী পার হয়ে আশুগঞ্জ যেতে হবে। আজ ঘুমাও। আমি কাল একটা লোক সাথে দেব তোমাকে নিয়ে যাবে।

পরেরদিন অনেক বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে বাদল।ফ্রেশ হয়ে স্টেশন মাষ্টারের দেয়া লোকটাকে সাথে নিয়ে রওনা হয় আশগঞ্জের উদ্দেশ্যে।রাতেই জানতে পেরেছিল পোষ্ট অফিস মুকুন্দপুর হলেও অফিসটা আশুগঞ্জেই চলে গেছে এখন।নদী পার হয়ে আশুগঞ্জে পৌছে ভগ্নপ্রায় একটা ভবনে পোষ্ট অফিসের সাইনবোর্ড দেখতে পায় ও।ভেতরে গিয়ে দেখতে পায় একটা বুড়ো লোক বসে সুতো দিয়ে মাছ ধরা জাল বানাচ্ছে। অজপাড়া গাঁ। পোষ্ট অফিসের তেমন কোন কাজ নেই। বুড়ো লোকটাই যে মকবুল প্রামানিক তা আর বুঝতে বাকী থাকে না।বাদলকে ঘরে ঢুকতে দেখে চোখ তুলে তাকায়। বাদল জিজ্ঞেস করে,
-আপনি মকবুল প্রামানিক?
-হ্যা।জবাব দেয় বৃদ্ধ।
-দেখুন তো এই চিঠির খামগুলো চিনতে পারেন কি না?
বৃদ্ধ কিছুক্ষন চেয়ে দেখে বলে,
-এসব তো রাণীমার চিঠি।
-রানীমা? কে তিনি?
-দীপ্তি সরকার। মনমোহন সরকারের মেয়ে।এককালে উনার দাদা রাজা ছিলেন। এখনও এলাকার বেশিরভাগ জমি জায়গা তাদের।এখানকার মানুষজন উনাকে রাণীমা নামেই চেনে। জবাব দেয় বৃদ্ধ।
– আমি একটু উনার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে নিয়ে চলুন উনার কাছে।
-চলো
তখন বিকেল প্রায় শেষ। বুড়ো পোষ্টমাস্টার মকবুল প্রামানিকের সাথে কিছুদুর এগিয়ে যেতেই দেখতে পায় বিশাল এক পুরনো অট্টালিকা। প্রাচীন যুগের রাজবাড়ীই বলা চলে।বিশাল সিংহ দরজা পেরিয়ে ঢুকতেই দেখতে পায় বিশাল পুকুর। পুকুরের পাড়ে অজস্র ফুলের গাছ। প্রাসাদের ঠিক সামনে উচু মতোন জায়গায় একটা তুলসী গাছ লাগানো। দেখেই বোঝা যায় হিন্দু বাড়ি। বুকটা ঢিবঢিব করছিল বাদলের। সিংহ দরজা পেরিয়ে মাঝখানের উঠোনটা পার হতেই অনেকটা সময় লাগল। কারন সুবিশাল জায়গা নিয়ে নির্মিত প্রাসাদটা।উঠোন পেরুতেই দেখতে পেলো একজন মহিলা অসংখ্য কবুতরের মাঝে দাড়িয়ে আছে। তার হাতে খাবারের পাত্র। শত শত কবুতর তাকে ঘিরে আছে। বোধ হয় এই সময় তিনি কবুতরদের খাবার দেন।
মাথায় সিঁদুর পড়া, হালকা আকাশী কালারের শাড়ি পড়া মহিলাটিকে একদম দেবীর মতই লাগছিল।
মকবুল প্রামানিক এগিয়ে গিয়ে মহিলাটিকে বলে,
-রাণীমা,ঢাকা থেকে একটি ছেলে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।
মহিলাটি মুখ তুলে তাকায়।তাঁর চোখ পড়ে বাদলের মুখের উপর।কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষে।হাত থেকে পড়ে যায় খাবারের পাত্রটি।
এদিকে বাদলও দেখেই চিনে ফেলে তিনি আসলে কে।রক্তের টান তো আর উপেক্ষা করা যায় না।
দীপ্তি সরকার এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বাদল কে। বুকের ভেতর নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-কেমন আছিস বাবা?
-তুমি আমাকে চিনলে কিভাবে?বাদল জিজ্ঞেস করে।
-সব সন্তানেরেই একটা পরিচিত গন্ধ আছে। যা কেবল মায়েরাই টের পায়।
– আচ্ছা বাবা আর দাদুবাড়ির সবাই কেন বলতো তুমি মারা গেছ?
-জানিনা।
-তোর বাবা কেমন আছেন
-ভাল আছে। জানো, সবাই বলে আমার মা নাকি মারা গেছেন। বাবাকে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি তোমার কথা। উনার সাথে আমার তেমন দেখাই হয়না।
-তোর বাবা এমনই। নিজেকে কষ্ট দিয়ে পালিয়ে বেড়ায় সত্যের কাছে থেকে।
-তুমি আর বাবা আলাদা হলে কেন?
-আলাদা তো হইনি। চাইলেই কি আলাদা হওয়া যায়? তবে হিন্দু একজন মেয়েকে কোন মুসলমান ছেলের স্ত্রী পরিচয় দেয়াটা অনেক কঠিন। আমাদের সমাজ মানতে চায় না।তুই পারবিনা হয়তো মা বলে পরিচয় দিতে।
-মা!! মায়ের গায়ে তার ধর্ম লেখা থাকে না। মা’কে আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাদল।বিকেলে শেষ হয়ে গেলেও চনমন করে ওঠে রোদ্দুর। হয়তো মা ছেলের মিলনটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যেই এই অবেলার রোদ্দুর!!!

49183524_221208595465542_5255786252170428416_n

জাকওয়ান হুসাইন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.