
অ্যাডভোকেট আনসার খান: পিপলস পাওয়ার বা জনগণের শক্তি যে অপ্রতিরোধ্য সেটা আবারো প্রমাণিত হলো সুদান এবং আলজেরিয়াতে। জনগণের প্রচন্ড বিক্ষোভের মুখে দীর্ঘ মেয়াদের স্বৈরশাসক, যথাক্রমে সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল-বশির এবং আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য যে, বশির ত্রিশ বছর এবং বুতেফ্লিকা বিশ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বুতেফ্লিকা এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে বশির ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে জনগণের শক্তির নিকট পরাজয় স্বীকার করে নেন।
দুই কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকের অপমানজনক পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রাসেলসে অবস্থিত অলাভজনক সংগঠনে অতিথি বিশেষজ্ঞ মার্ক পিয়োধনি বলেছেন-আলজেরিয়া ও সুদানের প্রেক্ষাপটের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশ দুটির ঘটনা থেকে বিশ্বের সকল একনায়ক ও স্বৈরশাসকদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো-ন্যায় বিচার, গণতন্ত্র আর সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষুধা সর্বজনীন। দেশ দুটির একনায়ক শাসকদ্বয় জনগণের সর্বজনীন অধিকার অস্বীকার করে কঠোর নিপীড়নমূলক শাসন কায়েম করেছিলো। আর রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের সকল কিছুর ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলো এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ পকেটে পুরেছেন।
রাষ্ট্র ও সম্পদের ওপর জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার অস্বীকার করা এবং জনগণের শক্তির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র শাসন করার ফলে শাসকদ্বয়ের মধ্যে যে দম্ভিকতার ক্ষেত্র তৈরী হয়েছিলো সেটি গুড়িয়ে দিয়ে দেশ দুটির জনগণ প্রমাণ করে দিয়েছেন, জনগণের ক্ষমতাকে অস্বীকার করে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, মননশীলতার অধিকার, সরকার নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তনে জনগণের অধিকার ইত্যাদি মৌলিক মানবিক অধিকার সমূহ এবং ন্যায় বিচার ব্যবস্থার নিশ্চয়তা করার অধিকারগুলোকে অনন্তকাল ধরে দমন করে রাখা যায় না বা অস্বীকার করা সম্ভব হয় না। সাময়িককালের জন্য মানুষকে ভয় দেখিয়ে, নিপীড়ন, নির্যাতন ও অত্যাচার করে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা সম্ভব হলেও চূড়ান্ত বিচারে মানুষকে স্থায়ীভাবে স্তব্ধ করে রাখা যায় না।
দেশ দু’টির আন্দোলনকারী জনগণের মৌলিক দাবি ছিলো স্বৈরশাসকদের পদত্যাগ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন, প্রকৃত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন, প্রকৃত আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির অবসান ও একটি পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম।
স্বৈরশাসনে অতিষ্ঠ এসব দেশের জনগণ তাদের ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন সর্বপ্রকার ভয়ভীতি উপেক্ষা করে। সরকারি বিভিন্ন বাহিনী আন্দোলনকারী বিক্ষোভরতদের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে-মানুষ হত্যা করেছে তথাপি রাজপথ ছেড়ে আসেনি বিক্ষোভকারীরা। আন্দোলনকারীদের এই অনমনীয়তা এবং অদম্য সাহসিকতার কারণেই প্রাথমিক বিজয় নিশ্চিত হয়েছে স্বৈরশাসকদের পতনের মধ্য দিয়ে।
সুদানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যাবে-সর্বস্তরের সকল বয়সের মানুষ একাত্ম হয়েছিলেন আন্দোলনে। মানুষ তাদের জীবনমানের উন্নতি, প্রকৃত স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের পক্ষে শ্লোগান তুলে ৩০ বছরের একনায়ক ও স্বৈরশাসক বশিরকে ক্ষমতা ছেড়ে দেবার জন্য আহবান জানিয়ে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ভবন ও সেনা ছাউনি অবরুদ্ধ করে রেখে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে সচেষ্ট থেকেছে।
সুদানের এই গণআন্দোলনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যেমন-রুটির দাম, তেলের দাম ইত্যাদি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানী শহর থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরের বিখ্যাত লেবার মুভমেন্ট খ্যাত রেলওয়ে শহর আটবারায় ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়েছিলো এবং অল্প সময়কালের মধ্যেই এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দেশের রাজধানী শহর খার্তুম, পোর্টসুদান, আল-গাদারিফসহ ২৮টি শহর ও সিটিগুলোতে এবং দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী শহরগুলোতে। অর্থাৎ সারা দেশের বিস্তৃত জনপদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিলো। আর এই বিক্ষোভ-আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেছিলেন পুলিশের গুলিতে নিহত তরুণ চিকিৎসক ডাঃ বাবিকীর। এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ডাঃ বাবিকীর ১৭ই জানুয়ারী ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট বশির সমর্থক নিরাপত্তা কর্মীদের গুলিতে রাজপথে নিহত হয়েছিলেন এবং তাঁর এই মৃত্যু আন্দোলনকে চূড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো।
এই বিক্ষোভ-আন্দোলনের অন্যতম একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো-নেতৃত্ব কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে ছিলো না। বরং সুদানীজ প্রফেশনাল এসোসিয়েশন বা এস.পি.এ নামক পেশাজীবী সংগঠনের ব্যানারে ও নেতৃত্বে এই আন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছিলো এবং এই সংগঠনটিতে যুক্ত হয়েছিলো চিকিৎসক সংগঠন, আইনজীবী সংগঠন, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক সংগঠনসমূহ এবং বিভিন্ন অন্যান্য পেশাজীবিরা এবং আরো যুক্ত হয়েছিলো রাজনৈতিক দলগুলো। এসব মিলেই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিলো প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে এবং বিশ্লেষকদের অভিমত, সরকার বিরোধী আন্দোলনের মূল শক্তিই ছিলো চিকিৎসক গোষ্ঠী।
প্রেসিডেন্ট বশির বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, আন্দোলনের জন্য যারা রাজপথে নেমে এসেছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ৭০% শতাংশই ছিলেন নানা বয়সের নানা পেশায় জড়িত মহিলারা। এত ব্যাপক সংখ্যক মহিলাদের অংশগ্রহণ আন্দোলন সফল করে তুলতে বড় ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো বলে অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সুদানের স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রামে ও মহিলাদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিলো এবং এরই ধারাবাহিকতায় যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকায় এগিয়ে আসেন সুদানী মহিলারা এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সুদানের স্বাধীনতার ১০ বছর আগে ১৯৪৬ সালে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা রাজপথের আন্দোলনে অংশ নিয়ে সুদানের প্রথম মহিলা ডাক্তার, খালেদা জহির কারারুদ্ধ হয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সুদানী মহিলাদের নিকট আজো তিনি অনুসরণীয় এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
সামরিক স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের আরো একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো : নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশগ্রহণকারী জনগণের প্রায় ৮০% শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নীচে ছিলো বলে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মূল শক্তি ছিলো দেশের ছাত্র-যুব সমাজ। যুবকদের ব্যাপক অংশগ্রহণই বশির বিরোধী গণআন্দোলনকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। এর থেকে আবারও প্রমাণিত হলো, যুব সমাজকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে না পারলে গণবিক্ষোভ সফল করে তোলা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
এই গণবিক্ষোভ আরো প্রমাণ করে যে, শাসক যদি তার জনগণকে সন্তুষ্ট রাখতে না পারে, যদি জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নির্বিশেষে জীবনমানের জন্য অপরিহার্য অধিকারগুলো অস্বীকার ও অবজ্ঞা করে কেবলমাত্র অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের মাধ্যমে জনগণকে ভয়ের মধ্যে রেখে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়, তবে সেক্ষেত্রে স্বৈরশাসক নিজেকে খুব বেশি সময় ধরে নিরাপদ রাখতে সক্ষম হবে না,-জনগণের রুদ্ররোষই তার পতন অনিবার্য করে তুলবে। কারণ, গণশক্তি এ সময় জেগে ওঠবেই।
এই আন্দোলনের আরো একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির এবং জীবনমানের ক্রম অবনতির প্রতিবাদে গণবিক্ষোভের সূচনা হয়েছিলো-সেটাকে ‘ব্রেড রায়টস’ বলে অভিহিত করেছিলো বিশ্বের গণমাধ্যমসমূহ-তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বিক্ষোভ-আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অতি দ্রুতই অর্থনৈতিক আন্দোলন তথা ব্রেড রায়টস, রাজনৈতিক বিক্ষোভে পরিগণিত হয়েছিলো। আন্দোলনকারীগণ, এই আন্দোলনকে ২০১১ সালের আরব বসন্তখ্যাত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে তুলনা করে স্বৈরশাসক বশিরের পদত্যাগ দাবি করে স্বাধীনতা, মুক্তি, শান্তি ও ন্যায় বিচারের দাবিতে শ্লোগান ধরেছিলেন রাজপথে। জনগণের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরতান্ত্রিক একনায়ক শাসক ওমর হাসান আল-বশিরের জন্য বড় ধরনের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো-এমনতরো কোনো চ্যালেঞ্জ বিগত ত্রিশ বছরের মধ্যে মোকাবিলা করতে হয়নি এই স্বৈরশাসককে।
তীব্র গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক নির্বিকার বসে থাকেননি, বরং আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে নিজের শাসনকে দীর্ঘায়ু করার জন্য অতি নৃশংসভাবে বিক্ষোভকারী জনতার ওপর তার নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসেব মতে, আন্দোলনের প্রথম পাঁচদিনেই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৩৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের সর্বপ্রকার সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে আন্দোলনের সমর্থক ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের টার্গেট করে অভিযান চালিয়ে ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে তাদের ওপর জঘন্য ধরনের নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন করেও আন্দোলন দমন করতে পারেনি বশিরের একান্ত সব নিরাপত্তা বাহিনী।
আন্দোলন দমনে বশির বাহিনী যতোই কঠোর দমন নীতি অব্যাহত রাখে-ততোই গণআন্দোলনের পরিধি আরো ব্যাপকতা লাভ করে; লক্ষ লক্ষ মানুষ আন্দোলনের তপ্ত রাজপথে নেমে আসতে থাকে এবং এক সময় এই বিক্ষোভ আন্দোলন ‘গণবিপ্লবে’ অর্থাৎ পিপলস জেরুলেশনে রূপান্তরিত হয় এবং এই গণ বিপ্লবের জোয়ারে স্বৈরশাসক বশিরের তখতে তাউস ভেসে যায়; বশির বন্দী হন সেনাবাহিনীর দ্বারা। আপাতত বশিরের স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয় সুদানবাসী।
সুদানের গণবিপ্লব আবারো প্রমাণ করলো; কোনো স্বৈরশাসক, একনায়ক অনন্তকাল বেঁচে থাকতে পারে না, অনন্তকাল জনগণের বিপক্ষে গিয়ে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না এবং আরোও প্রমাণ হলো যে, জনতার শক্তি বা পিপলস পাওয়ার সর্বকালেই জাগরুক থাকে; পিপলস পাওয়ারকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা বিশ্বের কোনো স্বৈরশাসকেরই ছিলো না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

