বিজয় দিবসের ভাবনা- সিকদার গিয়াসউদ্দিন

আজ ১৬ই ডিসেম্বর।ঐতিহাসিক বিজয় দিবস।পৃথিবীতে স্বাধীনতার জন্য মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে এতো রক্ত এতো মূল্য সম্ভবত ১৯৭১’পূর্ব কোন জাতিকেই দিতে হয়নি।পাক বাহিনী ও তার দোসরদের অত্যাচার.অবিচার,নির্যাতন,অগ্নিসংযোগ,ধর্ষন,ভারত ও বার্মায় শরণার্থীদের আশ্রয় গ্রহন,পথিমধ্যে কিংবা শিবিরে ,পথে-প্রান্তরে,খালে-বিলে অসংখ্য শিশু কিশোরের অকাল মৃত্যুকে ছাপিয়ে নয় মাসের জনযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান,দূ’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতহরন বা সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীসহ অনেক বিদেশীদের আত্মদানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।শুরু থেকে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গডে উঠা মিথকে কোন দেশে কোন জাতিকে কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করতে দেখা যায়নি।বিশ্বের সব দেশেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের জন্য বিধিনিষেধ সম্বলিত বিভিন্নমূখী ব্যবস্থা গ্রহনসহ তাদের যাবতীয় সম্পদকে রাষ্ট্রীয়করন ও ভোটাধিকারহরন সর্বোপরি দেশের যে কোন রাজনীতিতে বা দলে এমনকি সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের উপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত।১৯৭৫’সালে বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতক মোশতাক চক্র ও তৎপরবর্তি সময়ে জিয়াউর রহমান কর্তৃক অবৈধ পথে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কথা সকলেই অবগত।গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীতে ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযূদ্ধের মেধাবী সেনাসদস্য ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সাধারন সেনাসদস্যদেরকে বিচারের নামে ষডযন্ত্র করে ফাঁসী বা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার বিষয়টি পত্র-পত্রিকান্তরে বা বিভিন্ন লেখা প্রায়শ: নজরে পড়ার কথা।বীরউত্তম কর্ণেল তাহেরের প্রহসনের বিচারকে কেন্দ্র করে আদালতের রায়ও বেশ প্রনিধানযোগ্য।
শুধু তাই নয়-তৃনমূলের মেধাবী ও সাহসী তরুন আওয়ামী লীগ ও জাসদের কর্মীদের জেলজুলুমের বিষয়টি সকলেই জানে।বিশেষ করে জিয়াউর রহমান কর্তৃক কর্ণেল তাহেরের ফাঁসী,রব-জলিল-ইনুসহ হাজার হাজার জাসদ,আওয়ামী লীগের কর্মীদের প্রহসনের বিচারে সাজাপ্রদান,বিশেষ করে জাসদের মাজা ও পাছা ভেঙ্গে দেয়ার বিষয়টি এখনো আলোচিত-সমালোচিত হতে দেখা যায়।অত:পর ১৯৭৪’সালে জিয়াউর রহমান কর্তৃক সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ লেখাটির সম্পূর্ন ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে দাঁডিয়ে ১৯৭৭ সালে “আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট” এবং “মানি ইজ নো প্রবলেম”বলে,সকল ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে পূনর্বাসন,ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গড়ে উঠা সকল শক্তিকে অপকৌশল প্রয়োগ করে ভাঙন ধরানো,মুক্তিযূদ্ধের নেতাদের,রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের রাজনৈতিক চরিত্র হনন,দুর্নীতির চারাগাছ রোপন প্রক্রিয়ায় অসাধারন ধূর্ততার বিষয়টির স্বীকৃতি বিভিন্ন বিজ্ঞজনের লেখা,গনমাধ্যমে ও প্রচার মাধ্যমে প্রায়শ:আলোচিত।সুকৌশলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের ম্যানিপুলেশন শুরু হয়ে যায় তখন থেকেই।১৯৭১’সালের ২৬’শে মার্চের আগে যেনো কোন ঘটনায় ঘটেনি। কোন ধরনের ব্যাখ্যা প্রদান না করে অব্যাহতভাবে ২৬’শে মার্চ থেকে ১৬’ই ডিসেম্বর পর্য্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয়টি প্রচারিত হতে থাকে।তাও নানাধরনের বিকৃতির দিকটি অনেকের নজর এডিয়ে যাওয়ার কথা নয়।এখনও তা চলছে।স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও জেলখানার চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ড,কর্ণেল তাহেরের প্রহসনের বিচার সহ অনেক বিষয় দীর্ঘদিন যাবত নতুন প্রজন্ম জানতে পারেনি।এমনকি হত্যাকান্ডের বিচারকে কেন্দ্র করে সংবিধান পরিবর্তন করে পবিত্র সংবিধানকে দেশে ও বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করার কথা এখন সকলেই অবগত।১৯৭৫’ পরবর্তি সময় থেকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলন ও জনযুদ্ধের বীরদের নিয়ে কাউকে স্কুল,কলেজে পড়ানো দূরের কথা-ভালোভাবে জানতে দেয়া হয়নি।তৃনমূল পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযূদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের কথা বাদই দিলাম।অবস্থা এমনভাবে তৈরী হয়ে গিয়েছিলো-স্বাধীনতা আন্দোলনের ত্যাগী কর্মী ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের আত্মপরিচয় লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিলো।মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে উপহাস আর খিলখিলিয়ে হাঁসির বিষয়টি এখনো অনেকের স্মরন থাকার কথা।হানাদার বাহিনীর দোসরদের গাড়ীতে পতাকা উড়ানোর কথা হাজার বছরেও মূছে যাওয়ার কথা নয়।একটি দেশ ও জাতির জন্মের ইতিহাসকে এভাবে বিকৃত ও ম্যানিপুলেশন করার নজির খূবই বিরল।নাই বললেই চলে।
১৯৭১’সালে যাদের জন্ম-তাদের বয়স এখন চুয়াল্লিশ।১৯৭৬’সাল থেকে ১৯৯৬সাল।অত:পর ২০০১’সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্য্যন্ত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের কথা বাদই দিলাম। সত্যিকারের ইতিহাস সম্পর্কে স্কুল,মাদ্রাসা কিংবা কলেজে এদের সামান্যতম জানানো বা পড়ার বিষয়টি ভেবে দেখার মতো নয় কি?এদের অনেকেই এখনো কনফিউজড।স্কুল কলেজের বাইরে ইন্টারনেট বা প্রচার ও গনমাধ্যমে জানার বিষয়টি অন্য আরেকটি বিষয়।এমতাবস্থায় আমরা কখনো এই কনফিউজড বা ম্যানিপুলেটেড ইতিহাস,যা স্কুল-কলেজে ১৯৭৫’পরবর্তি সময় থেকে ১৯৭১’পরবর্তি প্রজন্মরা পড়ে এসেছে-তার জন্য তাদের দেশপ্রেমের বিষয়টি নিয়ে আমরা যেনো তাদের কখনো কোনক্রমেই দায়ী না করি।আমরা আমাদের ও পূর্ববর্তি প্রজন্মের ব্যর্থতার বিষয়টি আর আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে আগামীতে তা যেন অব্যাহত না থাকে সেদিকেই আমাদের কড়া দৃষ্টি দিতে হবে।তাই আগামী জমানার সন্তানদের আমাদের ১৯৭১’পূর্ব মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধে রূপান্তর প্রক্রিয়া,মুক্তিযুদ্ধে দেশের ও প্রবাসের সকল ঘটনা আর মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নামে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য নায়ক,নেতা,বীর, তৃনমূলের মুক্তিযোদ্ধা ও ত্যাগী কর্মীদের সম্পর্কে জানাতে হবে।স্কুল-কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ইতিহাস পড়ার ব্যবস্থা গ্রহন করার অন্য কোন বিকল্প নেই।দেশপ্রেম কখনো ছেলের হাতের মোয়া হতে পারেনা।এটি ছেলেবেলা থেকে দীর্ঘ পরিচর্যা ও সাধনা ব্যতিরেকে গড়ে উঠার কথা নয়।

একজন বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা আন্দোলন :

কলকাতায় ছাত্রাবস্থায় ছাত্রনেতা হিসাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয়।সোহরাওয়ার্দীর ও শেখ মুজিবুর রহমানের গুরু-শিষ্যের বিরল সম্পর্ক রাজনীতির ছাত্রমাত্রই জানার কথা।শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,মওলানা ভাসানী,মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সহ তখনকার সময়ের জাতীয় পর্য্যায়ের সকল নেতা-নেত্রীর সংস্পর্শে এসেছিলেন।কাজ করেছেন।মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন।তখনও আওয়ামীলীগ দল হিসাবে গড়ে উঠেনি।হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে অসামান্য অবদান,মন্ত্রিত্ব গ্রহন ও দলের প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব বর্জন।ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আন্দোলন ও ঘটনার নায়ক।তারও অনেক পরে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্ত হন।মুসলিম আওয়ামীলীগ গঠনের পর মওলানা ভাসানীর সম্পাদক,মওলানা আবদুর রশীদের সাথে সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন। বিভিন্ন উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে অবশেষে আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহন।জেল-জুলুম নিত্য দিনের ঘটনা।৬ দফা প্রনয়ন। আগরতলা ষডযন্ত্র মামলা,ছাত্র-ছাত্রীদের ১১ দফা দাবী,নি:শর্ত মুক্তি,বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্তি,১৯৭০’সালের নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয়।পাকিস্তান সরকারের প্রতারনা।পরিনতি হিসাবে বাঙালী জাতির মুক্তির আন্দোলনের একক নেতার ভূমিকা পালন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,ছাত্র ইউনিয়ন,ছাত্রলীগ :

১৯৬২ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রইউনিয়নের জনপ্রিয়তা ছিলো ছাত্রলীগের চাইতেও অনেক বেশী।শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে ছাত্রলীগের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়।ততদিনে মুসলিম আওয়ামী লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ যথাক্রমে ‘আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নাম ধারন করে।স্মর্তব্য যে,১৯৭২’সালের আগে ছাত্রলীগ সবসময় দলীয় আনুগত্যের বাইরে থাকলেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে বঙ্গবন্ধু এবং বেগম ফজিলতুন্নেসা মুজিবের সবসময় একটা গভীর সম্পর্ক ছিলো।ছাত্রলীগের সকল কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও আশীর্বাদের বিষয়টি ১৯৬৯’সালের গনঅভ্যূত্থানের আগে কিছু গোপন ও কিছু প্রকাশ্য বিষয়ের কথা অনেককে বলতে দেখা যায়।তবে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদানের পর তা প্রকাশ্যে চলে আসে।একজন জাতীয় নেতার ভাবমূর্তি তৈরী হয়ে গেলে ততদিনে দেশে-বিদেশে সর্বত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবে যাতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী বা অভিযুক্ত না করতে পারে-তাই সবকিছু কৌশলে সম্পাদন করার বিষয়টি সহজেই সকলে অবগত থাকার কথা।নির্বাচনে বিজয়ের পর আরও কৌশলী হয়ে কর্মসম্পাদনের বিষয়টি ঐতিহাসিক ৭’ই মার্চের ভাষনের মধ্য দিয়ে জাতিকে এক কাতারে সংঘবদ্ধ করার কাজটি অবিস্মরনীয় ও অলৌকিক বটে।
১৯৬২’সালে ছাত্রলীগের কনভেনশনে সিরাজুল আলম খান সাধারন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দূ’টি গ্রুপের অস্তিত্বের কথা অনেককে বলতে দেখা যায়।একটি গনতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে যেতে নারাজ।অন্যটি স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছাত্র সমাজ সহ জনগনকে উদ্ধুদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত।তবে সবাই একবাক্যে একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে-উভয় গ্রুপের উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালী জাতির স্বার্থ সংরক্ষন।এরা কেউ আওয়ামী লীগের অনুগত ছিলোনা-তবে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিবের প্রতি অসাধারন ভালোবাসা ও আনুগত্যে আর বিশ্বাসে পরিপূর্ন ছিলো।বিশেষ করে বেগম মুজিবের স্নেহের ধারায় এঁরা সবাই সিক্ত।১৯৬৫সালে শেখ ফজলুল হক মনি ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সিরাজুল আলম খানের একক কর্তৃত্ব স্থাপনের কথা বিভিন্ন জনের লেখায় দেখা যায়।বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধু প্রণীত ছয়দফাকে নিয়ে এগিয়ে গেলে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে।যদিও আওয়ামী লীগের অনেকেই তখন ছয়দফাকে মানতে রাজী ছিলোনা।ছয়দফার পক্ষে দলীয় সংঘাত এড়ানোর জন্য ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রামের এম এ আজিজের মাধ্যমে লালদিঘী ময়দানে ছয়দফা ঘোষনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান।অবশ্য তারও আগে পাকিস্তানে তিনি ছয়দফা নিয়ে কথা বলেন।ছাত্রলীগ ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সর্বত্র জনপ্রিয়তার দিক থেকে ছাত্র ইউনিয়নকে ছাপিয়ে একক জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে।কারন সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে সাধারন ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান।একপর্যায়ে আগরতলা ষডযন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সাথে অস্থিত্বের প্রশ্নে সাধারন ছাত্রছাত্রীদের চাপে ছাত্র ইউনিয়ন ১১ দফা প্রনয়নে তদনুযায়ী ছাত্রলীগের সাথে একযোগে কাজ করার বিষয়টি এখন বিজ্ঞজনদের লেখায় দেখা যায়।১৯৬৯’সালে শেখ ফজলুল হক মনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হলে ঢাকা সহ সর্বত্র ছাত্রসংসদের নির্বাচনে ছাত্রলীগ সিরাজ গ্রুপ বা ছাত্রলীগ মনি গ্রুপ বিজয়ী হতে থাকে।ছাত্র ইউনিয়ন ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আর তেমন সুবিধা করতে পারেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে।তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সিরাজ গ্রুপের ছাত্রলীগ বিজয়ী হওয়ার কথা পত্রপত্রিকা থেকে বা বিভিন্ন জনের লেখায় জানা যায়।বিভিন্ন লেখক ও সংকলন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরাজুল আলম খান,আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াস বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স গঠনের বিষয়টি খূবই গোপনে এগিয়ে যেতে থাকে।অনেকে তাতে যুক্ত হতে থাকে।আগরতলা ষডযন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও একক জাতীয় নেতা হিসাবে প্রতিষ্টার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ছাত্রলীগে সভাপতি হিসাবে তোফায়েল আহমদ ও সাধারন সম্পাদক হিসাবে আ স ম আবদুর রবকে নির্বাচিত করায় ছাত্রলীগ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়। আগরতলা ষডযন্ত্র মামলা থেকে মুক্তির পর ছাত্র জনসমাবেশে লক্ষ জনতার সামনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও ডাকসূ সহসভাপতি তোফায়েল আহমদ সিরাজুল আলম খান ও ছাত্রলীগের হাইকমান্ডের সুপারিশে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।লক্ষ জনতা করতালি দিয়ে তা সমর্থন করেন।(বঙ্গবন্ধু নামকরনের পেছনে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ কর্তৃক প্রকাশিত সাময়িকী সহ সকল তথ্যাদিও সমুদ্র মন্থন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষন করা অতীব গুরুত্বপূর্ন।)ছাত্রলীগের কর্মকান্ড এগিয়ে যেতে থাকে।তখন থেকেই গন অভ্যূত্থানের নায়ক হিসাবে তোফায়েল আহমদের জয়জয়াকার।বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বেরিয়ে সিরাজুল আলম খান আবদুর রাজ্জাককে শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমদকে অন্তর্ভূক্তির বিষয়টি জানালে তদনুযায়ী বি এল এফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স সিরাজুল আলম খান,শেখ ফজলুল হক মনি,আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে পূনর্গঠন করা হয়।পরবর্তিতে এঁরা সবাই চার জাতীয় যুবনেতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নিউক্লিয়াস তার কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকেনি।ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের কনভেনশনে নূরে আলম সিদ্দীকী সভাপতি ও শাজাহান সিরাজ সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়।ডাকসূতে প্রথম সরাসরি নির্বাচনে ছাত্রলীগের আ স ম আবদুর রব সহ সভাপতি ও আবদুল কুদ্দুস মাখন সাধারন সম্পাদক পদে বিজয়ী হন।বাঙালী জাতির ইতিহাসে চার খলিফার ধারণাটি ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে।পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সাধারন নির্বাচন ঘোষিত হলে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশগ্রহনের ঘোষনা দিলে চার যুবনেতার ও চার খলিফার নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা গ্রামেগন্জে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে এককভাবে প্রতিষ্টার প্রচেষ্টায় চার যুবনেতা এবং ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দীকী,সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ,ডাকসূ সহ সভাপতি আ স ম আবদূর রব,ডাকসূ সাধারন সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন আওয়ামীলীগকে নির্বাচনে বিজয়ী করার জন্য উল্কার বেগে দেশব্যাপী ছুটতে থাকে।সবাই অনলবর্ষী বক্তা।সাধারন মানুষ তখন সাধারন ছাত্রছাত্রীদের কথা ‘দেবতার বানী’হিসাবে গ্রহন করতেন।একপর্যায়ে জনগনই তাদেরকে চার খলিফা বলতে শুরু করে।১৯৭১’পূর্ব প্রজন্মের কাছে ওঁরা এখনও চার খলিফা হিসাবে পরিচিত।সেসময় এমনও দেখা গেছে নতুন সন্তান জন্মগ্রহনের পর বিভিন্ন এলাকায় এঁদের কারো না কারো নামে সন্তানের নাম রাখার কথাও শুনা যেতো।নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।চতুর্দিকে বিজয় মিছিল।

নির্বাচনের আগে ও পরে :

নির্বাচনে পাকিস্তান গোয়েন্দাসংস্থা পরিচালিত জরিপের ফলাফল উল্টে যায়।নির্বাচনে জেতার পর তালবাহানার বিষয়টি নজরে রেখেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কর্মপরিচালনায় সারাদেশের মানুষের অকুন্ঠ স্বীকৃতির কারনে ডাকসূকে কেন্দ্র করে ছাত্র-শ্রমিক,কৃষক,মজুর এককথায় সর্বস্তরের জনগন এককাতারে চলে আসে।মধূর ক্যান্টিনে উত্থাপিত ‘জয়বাংলা’শ্লোগান ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে।ছাত্রছাত্রীরা সাক্ষাতমাত্রই মিলিটারী কায়দায় জয়বাংলা বলে স্যালুট দিয়ে পরস্পর করমর্দন করা একধরনের গৌরবের আর গর্বের কারন ছিলো।সারাদেশে ‘জয়বাংলা’শ্লোগানটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে ও সমাদৃত হতে থাকে।ইতিপুর্বে জহুর বাহিনী নামে বাহিনীটি ‘জয়বাংলা’বাহিনী হিসাবে গড়ে উঠে।ছাত্রলীগের কর্মীবাহিনী ধারাবাহিকভাবে জনগনকে স্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্ধুদ্ধ করতে থাকে।চট্টগ্রামের শহীদ স্বপন কুমার চৌধূরী উত্থাপিত “স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ” প্রস্তাব ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিপুল ভোটে গৃহিত হলে চার যুবনেতা ও চার খলিফার সাথে বঙ্গবন্ধুর নিয়মিত যোগাযোগ আরও বাড়তেই থাকে।পাকিস্তানীদের তালবাহানার বিষয়টিকে সামনে রেখে ছয় দফাকে এক দফায় পরিবর্তনের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়।অবশেষে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক ইয়াহিয়া খাঁন পূর্বঘোষিত অধিবেশন বাতিল করলে সারাদেশ আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারন ছাত্রছাত্রীদের দাবীর মূখে ১লা মার্চ চার খলিফার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত হয়।ঢাকাসহ সমগ্র দেশে মিছিলের পর মিছিল।বীর বাঙালী অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর,’জয়বাংলা’শ্লোগানে সারাদেশের আবাল বৃদ্ধবনিতা একই কাতারে অবগাহন,সে এক অবিস্মরনীয় দিন!মুজিব তুমি এগিয়ে চলো-আমরা আছি তোমার সাথে।তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব।তখন মনে হতো-লতাপাতাও শেখ মুজিব শেখ মুজিব বলে চিৎকার করছে।সেসময়ের সবচাইতে বড় সত্য এখন অনেকে বিকৃত করতে চাইলেও ইতিহাসের গতি তার কক্ষপথের দিকে যাবেই।

পতাকা উত্তোলন,ইশতেহার পাঠ,ঐতিহাসিক ৭’ই মার্চ,অসহযোগ আন্দোলন ও প্রতিরোধ দিবস পালন :

১’লা মার্চ থেকেই বঙ্গবন্ধুর সাথে চার যুবনেতা,চার খলিফা খ্যাত স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে,তাজউদ্দিন আহমদ,বঙ্গমাতা বেগম মুজিব ও বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রতিটি মুহুর্তে গোপন ও প্রকাশ্য যোগাযোগ অব্যাহত থাকে।সারাদেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে থাকিয়ে আছে।ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা নির্ধারন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কথা অনেকেই অবহিত।জাতীয় সঙ্গীতও নির্বাচন করার কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।সাধারন ছাত্রছাত্রীদের চাপের মূখে স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ২’রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র জনসমাবেশ আহ্বান করতে বাধ্য হয়।সমাবেশের কথা চতুর্দিকে তাৎক্ষনিকভাবে ঢাকাসহ নারায়নগন্জ ও দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।পরবর্তি দিন ২’রা মার্চ কলাভবনের স্মরণকালের বৃহত্তম ছাত্রসভায় তিল ধরনের ঠাঁই ছিলোনা।এই সভায় চারখলিফার কন্ঠে বাংলাদেশের পূর্ন স্বাধীকার প্রতিষ্টার কথা ঘোষনা করা হয়।শ্লোগানে উত্তেজিত ছাত্রদের ১০টা ৪৫ মিনিটে ডাকসূর সহ-সভাপতি আ স ম রব মাইক হাতে নিয়ে সভায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দীকী সমবেত সকলকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও তাঁর নির্দেশ অনুসরন করে স্বাধীকার প্রতিষ্টার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার শপথবাক্য পাঠ করান।সভায় চার খলিফা ও লক্ষ ছাত্র জনতার উপস্থিতিতে ডাকসূ সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন করেন।পরবর্তি দিন ৩’রা মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেয়া হয়।
৩’রা মার্চের ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত বিশাল জনসভায় অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও আন্দোলনের ঘোষনা প্রদান ছিলো অবিস্মরনীয় ও ঈঙ্গিতবহ।এদিন ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদক ও চার খলিফাখ্যাত শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার বা প্রক্লেমেশন বা ঘোষনাপত্র পাঠ করেন।এদিন বিশাল জনসমুদ্রের করতালি ও শ্লোগানে মূখরিত জনতার সম্মতিতেই বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে ঘোষনা দিলে মুহুর্মুহু করতালি ও শ্লোগানে তা জনগন কর্তৃক গৃহিত হয়।এরপর জাতীয় পতাকা,জাতীয় সঙ্গীতসহ সেনাপতি হিসাবে কর্ণেল ওসমানির নাম ও অন্যান্য সকল কর্মপন্থার ঘোষনা সমূহ একটু খোঁজ নিলেই যে কেউ জানতে পারার কথা।এককথায় ইশতেহারে সবকিছু উল্লেখ ছিলো।এর পরে অন্য অনেকের মতো তখনকার সময়ের অখ্যাত একজন সাধারন মেঝরের ২৭শে মার্চের ঘোষনাপাঠ করাকে গুরুত্ববহ করে তোলা স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয় কি?তবে মেঝর জিয়ার ঘোষনা পাঠের মাধ্যমে আমাদের জনযুদ্ধে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহনের বিষয়টি ছিলো মূখ্য।অন্তত: কালুরঘাটের বেতার কর্মী ও চট্টগ্রামের তখনকার নেতাদের সকলেরই ভাষ্যে তা প্রতিপাদ্য।এর বাইরে অতিরিক্ত সবকিছু ম্যানিপুলেশন ছাড়া কোনকিছুই নয়।
ঐতিহাসিক ৭’ই মার্চ।তার আগে ৩২ নম্বর বাসভবনে বঙ্গবন্ধু চার যুবনেতা,চার খলিফাখ্যাত ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বেগম মুজিবের সাথে অনেক গভীর আলোচনার পর আওয়ামীলীগের হাইকমান্ড গঠনের কথা শুনা যায়।সকলের সাথে পরামর্শের পর বঙ্গবন্ধু প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।৭’ই মার্চ স্বাধীনবাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের চার খলিফা ও তোফায়েল আহমদ সহ চার যুব নেতা অনেকেই মন্চ সহ উত্তাল জনসমুদ্র নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব পালন করেন।ভলান্টিয়ার হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের,ঢাকা ও আশপাশের কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সুশৃঙ্খল কর্মতৎপরতা এখনও অনেককে অবাক করার কথা শুনা যায়।আওয়ামীলীগের হাইকমান্ড ও যুবনেতা পরিবেষ্টিত হয়ে মন্চে আরোহন করার সাথে সাথেই উত্তাল জনসমুদ্র মুহুর্মুহু শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে।পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভাষন দানকালে স্মরন করিয়ে দিলেন-‘যার যা আছে,তাই নিয়ে প্রস্তুত থেকো।”ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল’ সর্বশেষে “এবারের সংগ্রাম,আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম,আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”এরপর আর কি বাকী থাকে?তারপর অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে।এলো ঐতিহাসিক ২৩’শে মার্চ।এই দিনের গুরুত্বও অপরিসীম।এদিন সারাদেশে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা ঘরে ঘরে এমনকি হাইকোর্ট,কূঠনৈতিক মিশন সহ সর্বত্র (কেবলমাত্র আজকের বঙ্গভবন ও ক্যান্টনম্যান্ট ব্যতিত)উড়ানো হয়।ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকার সাংবাদিক টেড কপেলের ক্যামেরা ও ধারাবর্ননা ইউটিউবে দেখা ও পাওয়ার কথা।এদিন জয়বাংলা বাহিনী ও মহিলা জয়বাংলা বাহিনী স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের চার খলিফা যথাক্রমে আ সম আবদুর রব,আবদুল কুদ্দুস মাখন,নূরে আলম সিদ্দীকী ও শাজাহান সিরাজকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু।জয় বাংলা বাহিনীর উপপ্রধান কামরুল আলম খান খসরু গান ফায়ার করে মুক্তিযূদ্ধের সূচনার ইঙ্গিত প্রদান করার বিষয়টি এখনও আলোচিত হতে দেখা যায়।ঐদিন জনসমাবেশের পর জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ৩২ নম্বর ধানমন্ডীর বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর হাতে জাতীয় পতাকা প্রদান করলে তা তিনি উড়িয়ে দেন।

২৫’শে মার্চের ভয়াল রাত :

২৫’শে মার্চের ভয়াল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সর্বত্র পাকবাহিনী গনহত্যা শুরু করে।চতুর্দিকে অগ্নিসংযোগ,নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন,শিশু,কিশোর,তরুন,যুবা,বৃদ্ধ কেউ এদের পাশবিক অত্যাচার থেকে রেহাই পাইনি।শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের আগে চট্টগ্রামের জহুর আহমদের মাধ্যমে তা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবিসি,আমেরিকাসহ বিশ্বের সকল গন ও প্রচার মাধ্যমে এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের লেখায়ও তা বর্নিত হয়েছে।আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের আর্কাইভে তা পাওয়ার কথা।ইন্টারনেটের জগতে নানাভাবে জানাটা এখন খূব সহজ।মুক্তিযুদ্ধ ছিলো জনযুদ্ধ।কামার,কুমার,মুচি,কৃষক থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী,নারী-পুরুষ,শিশু-কিশোর,পুলিশ,ইপিআর,সেনাবাহিনী,শিক্ষক,পেশাজীবি,বুদ্ধিজীবি,সাংস্কৃতিক কর্মী,ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সকলেই সম্পৃক্ত।ক্ষেত-মজুরদের খালিগায়ে লুঙ্গিতে গোছ মেরে রাইফেল কাঁধে যুদ্ধে গমনের দৃশ্য সারা পৃথিবীর মানুষের মূখে মূখে।এঁদের সকলের সম্মিলিত আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।গত ১৪’ডিসেম্বর মহান শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসে ফেসবুকে বাংলাদেশের আমাদের প্রজন্মের বিশিষ্ট কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের একটি ষ্ট্যাটাস অনেকের দৃষ্টি আকর্ষন করে।কবির সাহস আছে।১৯৭১’পূর্ব সময়ে সন্দীপের ‘কবিয়াল শফি’ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মিতভাবে গোপনে প্রকাশিত “জয়বাংলা”ও দূ’একটি সাময়িকী ছাড়া কোন কবি ও লেখক বা বুদ্ধিজীবিরা সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিয়ে ১৯৭১’সালের ২৫’শে মার্চের আগে ‘স্বাধীন বাংলা’ নিয়ে কিছু লিখেছেন কিনা-তা নিয়ে ড: তপন বাগচীর লেখা আলোড়ন সৃষ্টিকারী।চার যুবনেতা ও চারখলিফার অনেককেই একই কথা বলতে দেখা গেছে।একমাত্র কবি শামশুর রাহমান ছাড়া কাউকে সত্যকথন বলতে দেখা যায়নি বলে তপন বাগচীর লেখায় প্রতিভাত।এমতাবস্থায় কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের বক্তব্যটিও সময় ও জাতীয় আকাঙ্খার প্রেক্ষাপঠে বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে।তিনি বলেছেন-
“একাত্তরের সকল শহিদের প্রতি বৈষম্যহীন শ্রদ্ধা রেখে চিরকালের নদীর কাছে আমার একটি প্রশ্ন—

যদি ‘বুদ্ধিজীবী দিবস’ বলে একটি আলাদা দিন থাকে, মুক্তিযুদ্ধে আরও বেশি অবদান যাদের, জন্মভূমির চরম দুঃসময়ে যারা ঘর-পরিজন ছেড়ে রণাঙ্গণে অস্ত্রহাতে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের নামে কেন ‘ছাত্রদিবস’ বা ‘মজুরদিবস’ বা ‘কৃষকদিবস’ নেই? “জয় বাংলা।

এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হচ্ছে-আমার বাবা আবদুল হক সিকদার ও তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য ওসমান সরওয়ার আলম চৌধূরী কোনরকম সংকেত প্রদান না করে পরিবারের কোন সদস্যদের ছাড়াই উনারা দলবল সহকারে আত্মগোপনে গমন করেন।আমাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন।আমরা গ্রামের চাচার বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহন করি।স্থানীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী ফরিদুল আলম সিকদার,জাফর আলম সিকদার,ওবাইদুল হক,পরিমল পাল সহ অনেকেই লাপাত্তা।আমাদের ঘরবাড়িসহ সবকিছুতেই অগ্নিসংযোগ বা পাকদোসরদের মাধ্যমে বিধ্বস্থ।নদীতে নিক্ষিপ্ত।লুঠপাঠ ও অগ্নিসংযোগ চলছে পার্শ্ববর্তী বিখ্যাত জমিদার ঈশান পালের ঘরবাড়ি সহ সমগ্র বানিয়া পাড়া ও পালপাড়ায়।নিরাপত্তাহীন অবস্থায় গভীর জঙ্গলে চলে যেতে হয়।নিরাপত্তাজনিত কারনে আমরা দুই পরিবার অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদিকে গমন করি।লক্ষ্য বর্মায় আশ্রয় গ্রহন।পথিমধ্যে আমার ছোট বোন শিরীন অর্ধাহারে অনাহারে রোগেশোকে পথ্যহীন অবস্থায় বাবা বাবা বলে চিৎকার করে রক্তবমন করে মৃত্যুবরন করে।আমার মা তিনদিন একটি নিমগাছের তলে একফোঁটাও না কেঁদে বসেছিলো।গ্রামের একজন গরীব আত্মীয় আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আমার তিনমাসের ছোট্ট ভাইকে মায়ের কোলে দিলে বেশ কিছুক্ষন পর মা হুহু করে কেঁদে উঠেন।আমার তেরো বছরের ছোট সেই তিনমাসের শিশু ভাইটি এখন বিসিএস প্রশাসনিক কর্মে নিয়োজিত।অন্যদিকে প্রয়াত ওসমান সরওয়ার আলমের ৭১’সালের দেড় বছরের শিশু সন্তান সাইমুম সরওয়ার কমল এখন একজন সাংসদ।এরকম হাজার হাজার শিশুকিশোরের অকালমৃত্যু ১৯৭১’য়ে আশ্রয়ের খোঁজে হয় হারিয়ে গেছে,নতুবা মৃত্যুমূখে পতিত হয়েছে।এমতাবস্থায় আমাদের জাতিকে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে বিনাদ্বিধায় স্বীকার করে নেয়ার অন্য কোন বিকল্প নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় পতাকার ইতিহাসকে সংরক্ষনের ব্যবস্থা সহ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা দিবসের স্বীকৃতির ব্যবস্থাসহ পতাকার বিস্তারিত তথ্য আগামী প্রজন্মের সন্তানদের ও ৭১’পরবর্তিদের জানা জরুরী।জয়বাংলা শ্লোগানের ইতিবৃত্ত ও জয়বাংলা বাহিনী এবং মহিলা জয়বাংলা বাহিনীর বিস্তারিত কাহিনী জাতিকে জানানো দরকার।তা নাহলে অনেক ত্যাগে অর্জিত ‘জয়বাংলা’ শব্দের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব আদৌ অর্জন করা সম্ভব কি?অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার বা ঘোষনাকে জনসমক্ষে ধারন করে বিকৃত ইতিহাসের কড়া জবাব দেয়া সঙ্গত নয় কি? সুতরাং পহেলা মার্চ,২’রা মার্চ,৩’রা মার্চ,৭’ই মার্চ এবং ২৩’শে মার্চের দিনগুলোর স্বীকৃতির ব্যবস্থা গ্রহন করে ইতিহাস বিকৃতিকারীদের দাঁতভাঙ্গা জবাবের ব্যবস্থা করা দরকার।দলীয় আনুগত্যের বাইরে ইতিহাসকে এবং বঙ্গবন্ধুকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য এসব জরুরী।হিমালয়ের বিশালত্বকে সমৃদ্ধ করতে আশেপাশের পাহাড়গুলোর সংরক্ষন অতীব জরুরী।তাই মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে বেশী করে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য জেলের অভ্যন্তরে শহীদ চার জাতীয় নেতা,চার যুবনেতা,চার খলিফাখ্যাত স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের চার নেতা সহ মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি কর্ণেল এম এ জি ওসমানী ও এগারো সেক্টর কমান্ডার,মুক্তিবাহিনী,মুজিব বাহিনী,কাদেরিয়া বাহিনী,হেমায়েত বাহিনী,সহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ছোট বড় সকল বাহিনীসহ জাতীয় ও তৃনমূল পর্যায়ে সকল মুক্তিযুদ্ধের বীরদের কথা জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে দলীয় আনুগত্য ও আচরনের বাইরে জানানোর ব্যবস্থা আগামী প্রজন্মের জন্য খূবই জরুরী।মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত প্রজন্মদের যাঁরা বেঁচে আছেন-তাদের বলতে শুনা যায়-বঙ্গবন্ধু ৭২’ সালের ১০’ই জানুয়ারী ফিরে আসার আগমুহুর্ত পর্য্যন্ত মুজিব নগর সরকার,বি এল এফ এর তথা মুজিব বাহিনীর চার যুবনেতা ও স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে থাকে।এমনকি শুনা যায়- মুজিবনগর সরকারের অনুরূধে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনসহ চারখলিফাখ্যাত ছাত্রনেতারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য একযোগে বিবৃতি প্রদান করেন।কারন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তখনো জাতির কাছে ছাত্রছাত্রীরা দেবতার প্রতিমুর্তি হিসাবে বিবেচিত হতো।শরনার্থী পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্তরা ছাড়াও অনেকে মুক্তিযূদ্ধের সময়ে নানা প্রতিকূলতা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করার জন্য সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন,লাঞ্চিত হয়েছেন-তাঁদের খূঁজে বের করে সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহন আমাদের ইতিহাসের ঝুলিকে সমৃদ্ধ করার কথা।স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষদিনগুলোতেও দেশে সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মুক্তিযূদ্ধের প্রতি সমর্থন,সহমর্মিতা ও প্রয়োজনে মুক্তিযূদ্ধের সৈনিকদের গোপনে সাহায্য করে অবশেষে পাকিদোসর আলবদর,রাজাকার ও আল্শামছ নামক দানবদের হাতে বুদ্ধিজীবিদের নিধনকে কেন্দ্র করে যে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস আমরা পালন করি-সেই দিবসের প্রতি সর্ব্বোচ্চ বৈষম্যহীন শ্রদ্ধা পোষন করে কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের কথায় মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার অনেকের বড় বড় অবদানগুলোর স্বীকৃতি হিসাবে আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে সত্যিকারের মহিমান্বিতকরনে,সমৃদ্ধকরনে ও আগামী জমানার সন্তানদের দেশপ্রেমকে গভীর করে তোলার প্রত্যয়ে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার ও আমজনতার ভাবনা ও স্বপ্নের বাস্তবায়নে সকলে সম্মিলিত ভাবে এগিয়ে আসবে-সেটি আশা করা যায়।তাছাড়াও আমাদের এই মহান জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশে কি সরকারী কি বিরোধী দল সকলেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসাবে দেশ পরিচালনা করবে।একটি Pro Independent Strong Opposition Alliance গড়ে উঠবে অথবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গড়ে উঠবে-সেটি আশা করা যায়।যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিহাসে যেস্থান দখল করেছেন-তাকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য,স্থায়ীকরনের জন্য এদিকে নজর দেওয়া খূবই সঙ্গত।ইতিহাসের গতিপথকে ধারন করতে হবে।গনতান্ত্রিক আচরনের ব্যাপক বিকাশের শিক্ষা গ্রহনের বিষয়টি মূখে না বলে কার্য্যকর করার উদ্দ্যোগ নেওয়া জরুরী।বিজয় দিবসের ভাবনাগুলো তাহলে কখনো না কখনো আলোর মূখ দেখবে।আশাবাদী হতে দোষের কিছু নেই।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষনা কেন্দ্র কর্তৃক স্বীকৃত বই থেকে।
বিভিন্ন ওয়েবসাইট।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন।
কবি আবু হাসান শাহরিয়ার
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের লেখা ও টক’শোতে প্রচারিত আলোচনা।

23168022_1901835453410257_3535430966355565734_n

 লেখক : আমেরিকান প্রবাসী ( লাস্ ভেগাস)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.