প্রথমেই মওলানা ভাসানীর একটি রাজনৈতিক কাহিনী বলি। এটাকে রাজনৈতিক কাহিনী বলার চেয়েও রাজনৈতিক কৌশল বলাই মাননসই হবে। কাহিনীটি হলো, মওলানা ভাসানী একবার পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিম বঙ্গে প্রেসিডেনট আইয়ুব খানের আমন্ত্রণে একটি আলোচনায় অংশ নিতে যান। অনেক আগে কার বইয়ে পড়েছিলাম সঠিক মনে করতে পারছিনা বিধায়, দিনক্ষন মনে নেই। মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন পুরোদস্তুর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্বাভাবিক কারণেই রাজনৈতিক কলা কৌশলে ভালোই অভ্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে আইয়ুব ছিলেন সামরিক ব্যক্তিত্ব । যা হোক মাওলানা সাহেব লোকবল নিয়ে সঠিক সময়েই প্রেসিডেনট ভবনে পৌছালেন। অফিসের কর্তারা মাওলানা সাহেব কে নিয়ে ভিতরে গেলেন, কিন্তু ভিতরে ঢুকার পরেও দেখলেন, তখনও আইয়ুব খান ওনাকে রিসিভ করার জন্য আসেন নি। বিষয়টি মাওলানা সাহেবের ভীষণ আঁতে লাগে এবং বিরক্তিকর মনে হয়। অতিথি রুমে বসে আছেন, হঠাত্ মাওলানা সাহেব একটি জায়নামাজ চেয়ে নিয়ে নামাজে বসে পরেন। ওনার নামাজ পড়া অবস্থায় আইয়ুব খান অতিথি ঘরে এসে মাওলানার নামাজ শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাওলানা নামাজ শেষে উঠে আইয়ুব খানের সাথে মোলাকাত করেন।
আলোচনা শেষে ফেরার পথে মাওলানার সাথে থাকা একজন জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর আপনি তো আগেই জহোরের নামাজ আদায় করেছিলেন। তবে কেন অবার নামাজে বসলেন ? কোন নামাজই বা এত জরুরি ছিলো যে প্রেসিডেনট হাউজে গিয়ে পরতে হলো? মাওলানা সাহেব হেসে ওনার সাবলীল ভাষায় বলেন, “লক্ষ্য করনি উর্দি পরা বেক্কল দাওয়াত দিয়া আনছে, অথচ মাথায় একটু ঘিলুও নাই কিভাবে অতিথি কে সম্মান করে রিসিভ করতে হয় । দেখ নাই আমরা পৌঁছাই গেছি, আর বেক্কলে নিজে আইসা রিসিভ না কইরা পাক পেয়াদা দিয়া রিসিভ করাইছে। তাই নামাজে বইসা বেক্কলটারে কিছুক্ষণ খাঁড়া কইরা রাখছিলাম। শুনো মিঞা, নামাজ বেশি পরাতে কোনো ক্ষতি নাই, লাভই হয় “।
এখন আসি বর্তমানের সংলাপের রাজনৈতিক কৌশলের কাহিনীতে ,লক্ষ্যণীয় যে :
* বিএনপি পাঁচ বছর যাবত্ সংলাপ চেয়ে আসছে, আর অন্যদিকে সরকার, কিসের সংলাপ? কার সাথে সংলাপ ? কেন সংলাপ? হবে না ইত্যাদি চলছিলো।
লক্ষ্যণীয় যে, ১৪ তে নির্বাচনে সরকার নিজ উদ্যেগে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলো। সেটা কিন্তু চাপে পরেই আহ্বান জানিয়েছিলো। তাহলে বলাই যায়, আ লীগ চাপে থেকে যদি সংলাপের আহ্বান দিতে পারে। তাহলে বিএনপি কেন চাপে থেকে অন্তত এক বছর আগে থেকেই সংলাপের চিঠি দিতে পারলো না, বা দিলো না। সেটা যদি সরকার গ্রহণ নাও করতো, অন্তত সেটা জনগণ কে এখন জানাতে পারতো।সেই চিঠিই পৌঁছালো, তবে ট্রেন অনেকদূর পৌঁছে গেছে। এখন সময়ের প্যাচে আঁটোসাঁটো অবস্থা । হয়তো বিএনপির সমর্থকরা বলবেন,যদি সরকারের ইচ্ছা থাকে তাহলে সব সম্ভব । হ্যাঁ, তাতো সম্ভবই। কিন্তু সরকার যদি সুযোগ থাকে তা গ্রহণ করবেই বা কেন? সরকার নিজেও তো ক্ষমতায় থাকতে চায় । বলতেই হয় বিএনপি রাজনৈতিক কৌশলে এখানে ভালোই ধরা পরেছে।
* যেই না চিঠি সরকারের ঘরে পৌঁছালো, সরকার অনায়াসে গ্রহণ করে আরেকবার বিএনপি কে রাজনৈতিক কৌশলে কুপোকাত করলো। এখন তো আবার বিএনপিকে শুনতে হচ্ছে, দেখো শেখ হাসিনা কতটুকু গণতান্ত্রিক মনা। উনি সব সময় আলোচনাকেই প্রাধান্য দেন।
* ১ থেকে ৭ তারিখ আলোচনায় বসিয়ে , ৮ তারিখেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দিল পুরানো থিউরিতে। নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে। বিএনপি বলতে পারে এটা একটা কুকৌশল। এই বলাতে সরকারের গায়ে একটুও সুঁড়সুঁড়ি লাগে না। বিএনপি যে তফসিল ঘোষণার পরে কিছুই করতে পারবে না, সেটাতো পরিষ্কার । আবার আলোচনা চলতে পারে বলে দরজাও খোলা রেখেছে। সুতরাং বিএনপি যদি কোনো আন্দোলন করে এবং দেশে অশান্তি হয়, তাহলেও সরকার আবার সুযোগ নিবে বিএনপি আলোচনায় বিশ্বাসী নয় বলে। এখানেও বিএনপি কট।
* নাজিমুদ্দিন রোড থেকে থালা বাটি সহ খালেদা জিয়া কে নিয়ে আসলো। তখন কতজনকে বলতে শুনেছি, কিছু একটা সমাধান হচ্ছে বলেই খালেদাকে মরা জেল থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিএনপিও উৎসাহিত হলো। অথচ একই দিনে, তফসিল ঘোষণা এবং অন্যদিকে খালেদা কে পুরোনো ঠিকানায় ফেরত পাঠানো। লক্ষ্যণীয় যে, আজকে বিএনপি কি করতে পারতো ? একটি মিছিল ? কিন্তু সেটা কিসের ভিত্তিতে? তফসিলের বিরুদ্ধে না খালেদা কে আবার সেই কঠোর অবস্থানে ফেলার বিরুদ্ধে? দুটাই বিএনপির জন্য সাঁকের করাত অবস্থা ।
* মনে পরে কি সবার, ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এই সরকারই একটা ঘটনা ঘটলে ঠিক সাথে সাথে আরো একটি ঘটনা ঘটিয়ে আগের ঘটনা কে আর আলোচনারই সুযোগ দিতো না। উদহারণ অনেক দেওয়া যাবে, যেমন শেয়ার মার্কেট কেলেংকারি, খালেদার বাড়ি ভাঙা, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম সাহেবের গুম, বিশ্বজিত হত্যা ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক ঘটনার বিপরীতে অন্য ঘটনা এসে উপস্থিত হতো। ফলে আর পূর্বের ঘটনা আলোচনাই হতো না বা গায়েব হয়ে যেতো। ঠিক এখনও অনেকটাই কাছাকাছি কৌশল চলছে বলা যায় ।
এরকম বলতে গেলে অনেক বলা যায় । সেটা খাওয়া দাওয়ার ছবি থেকে শুরু করে ভিতরের কিছু কথা যা বাহিরে আসার প্রয়োজন ছিলো না। তারপরেও ঘটেছে।
বলছিলাম সংলাপে যে রাজনৈতিক কৌশল চলছে ভালো। ভাগ্য ভালো যে এখানে কোনো আইয়ুব খানের মত ঘিলুহীন কেউ নাই। সবাই আমাদের গর্বিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব । যত কৌশলের খেলাই হোক না কেন, সর্বোপরি একটা সুষ্ঠু এবং ইনক্লুসিভ নির্বাচন দেশের জন্য অপরিহার্য। বর্হিবিশ্বে আমাদের নির্বাচন নিয়ে যেনো আর প্রশ্ন না উঠে, সেটাই আমরা কামনা করা। একে অপরের কাছে কৌশল বা কুকৌশলের কাছে হারুন, অসুবিধে নেই। এই কৌশল ব্যবহার করে যদি কেউ নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে আসতে পারেন তবুও অসুবিধে নেই । তবে ভালো নির্বাচনের দায়িত্ব কিন্তু সর্বোপরি বর্তমান ক্ষমতাশীনদের উপরেই বর্তায় ।
সংলাপে আমন্ত্রণ বা দাওয়াতটা কেন জানি আমার কাছে সেই ” শেয়াল আর বক” কাহিনী মনে হয়েছে। মনে আছে নিশ্চয়ই সেই গল্প। শেয়াল বক কে আমন্ত্রণ জানিয়ে কাঁশার থালায় দুধ খেতে দিয়েছিলো। সরকার অনেকটা সংলাপের দাওয়াত দিয়ে সেরকমটিই করলেন। বক বেচারা যেমন লম্বা ঠোঁটের কারণে দুধ খেতে পারেনি। এবার সংলাপে ঠিক অনেকটাই সেরকম ঘটলো বলেই আপাতত তাই মনে হচ্ছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না। এক মাঘে যেমন শীত যায় না। সেই বকও কিন্তু শেয়াল কে আমন্ত্রণ জানিয়ে কাঁশার কলসি তে দুধ দিয়েছিলো। ভবিষ্যতে সেরকমটি যেন না ঘটে তাই আমাদের কাম্য।

বুলবুল তালুকদার
সহকারী সম্পাদক,শুদ্ধস্বর ডটকম

