যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার, রুমমেট আটক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই নিখোঁজ বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর রহস্যময় অন্তর্ধানের ঘটনা চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। নিখোঁজের এক সপ্তাহ পর স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর থেকে ২৭ বছর বয়সী জামিল লিমনের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহকে (২৬) প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তবে লিমনের সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া অপর শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি (২৭) এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

শুক্রবার সকালে হিশামের পারিবারিক বসতি থেকে একটি সহিংসতার ফোনকল পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে পৌঁছালে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। হিশাম নিজেকে ঘরের ভেতর ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের বিশেষায়িত সোয়াত টিম এবং ক্রাইসিস নেগোশিয়েটরদের তলব করা হয়। দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ থাকার পর হিশাম হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করেন।

গ্রেপ্তারের পর হিশামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, অবৈধভাবে বন্দী রাখা, তথ্য-প্রমাণ লোপাট, মৃত্যুর খবর না দেওয়া এবং বেআইনিভাবে মরদেহ সরানোর মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, হিশামকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘারবিয়েহ ইউএসএফ-এর সাবেক ছাত্র। এর আগেও ২০২৩ সালে দুবার তাঁর বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। হিশামের আপন ভাই তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, হিশাম তাঁর মা এবং ভাইয়ের ওপর আক্রমণ করেছেন। যদিও পরে কিছু মামলা খারিজ হয়ে যায়, তবে তাঁর সহিংস আচরণ গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিল। লিমনের মরদেহ উদ্ধারের আগে হিশামকে দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি পরে পুলিশের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন।

গত ১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে জামিল লিমনকে তাঁর ক্যাম্পাসের বাইরের বাসভবনের সামনে শেষবারের মতো দেখা যায়। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর সকাল ১০টার দিকে নাহিদা বৃষ্টিকে ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিল্ডিংয়ের কাছে দেখা গিয়েছিল। ১৭ এপ্রিল তাঁদের কোনো খোঁজ না পেয়ে একজন পারিবারিক বন্ধু পুলিশকে খবর দেন। এরপর থেকেই ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ ও এফবিআই এই অনুসন্ধানে যুক্ত হয়। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ এই নিখোঁজ সংবাদটিকে ‘বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

জামিল লিমন ইউএসএফ-এ ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল—কীভাবে জেনারেটিভ এআই (যেমন: চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ইত্যাদি) ব্যবহার করে দক্ষিণ ফ্লোরিডার ক্রমহ্রাসমান জলাভূমি পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাঁর ভাই জুবায়ের আহমেদ কান্নায় ভেঙে পড়ে সিএনএন-কে বলেন, ‘আমার ভাই অত্যন্ত বিনয়ী এবং হাসিখুশি মানুষ ছিল। আমরা একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেছি। দুটি শিক্ষার্থী এভাবে হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে পারে না।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জামিল ও নাহিদা বৃষ্টির মধ্যে বিয়ের আলোচনা চলছিল। লিমনের পরিকল্পনা ছিল এই গ্রীষ্মেই বাংলাদেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করা এবং পিএইচডি শেষে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা।

লিমনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নাহিদা বৃষ্টির কোনো হদিস না মেলায় পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ বাড়ছে। শেরিফ চাড ক্রনিস্টার বলেছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। আমরা বৃষ্টির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রতিটি সূত্র খতিয়ে দেখছি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের কর্মী ও শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। আমরা সবাই নাহিদার জন্য প্রার্থনা করছি।’

মেডিকেল এক্সামিনার বর্তমানে লিমনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে কাজ করছেন। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে লিমনের ওপর ঠিক কীভাবে হামলা চালানো হয়েছিল এবং নাহিদা বৃষ্টির নিখোঁজ থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক ঠিক কতখানি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.