আমার ছোটবেলার পাঠশালা আজও আমার চোখে ভাসে — যেন কালকেরই কথা। বয়স তখন চার বছর। সেই বয়সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। এর আগে আরও একটি শ্রেণি ছিল, নাম ছিল “লাড্ডা”। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে সেই শ্রেণিতে যাওয়া যেত, কিন্তু আমার সেখানে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কেন হয়নি তা আজও ঠিক মনে নেই, তবে ধারণা করি, বাড়ির সবাই ভেবেছিলেন — “লাড্ডা শ্রেণিতে সময় নষ্ট হবে।”
আমার শৈশব কেটেছে নানা বাড়িতে। মামা-খালাদের ভিড়ে বড় হয়েছি আমি। তখন বাড়িটা যেন এক শিক্ষার আলয় — সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বইয়ের গন্ধ, পাঠের আওয়াজ, আবৃত্তির সুর। সেদিনগুলোর কথা ভাবলে মনে হয়, পুরো বাড়িটাই যেন এক চলমান বিদ্যালয়। খেলাধুলা বলতে ছিল দুয়ারের সামনের ব্যাডমিন্টন কোর্ট। মামা-মামীদের সঙ্গে খেলতাম আমি। তবে লুডু খেলায় আমাকে অংশ নিতে দেওয়া হতো না — “তুমি ছোট, এখনো বোঝো না,” বলে তারা হাসতেন। তবু আমি দূর থেকে তাকিয়ে থাকতাম, লুডুর গুটি চলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ছোট্ট বয়সের কৌতূহলও দৌড়াতো। সংস্কৃতি চর্চা তখন ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কবিতা আবৃত্তি, রেডিওতে নাটক শোনা — টেলিভিশনের যুগ তখনও আসেনি। বিদ্যুৎও ছিল না, তাই ভরসা ছিল কেবল হারিকেনের আলো আর হাতপাখার বাতাসে। আমার নানা ছিলেন খুব সৌখিন ও ধনবান মানুষ — বলা যায়, তখনকার কেরানীগঞ্জের অন্যতম সম্পন্ন ব্যক্তি। বাড়িতে কাজের মানুষ ছিল চারজন। গরু পালতেন তিনি, গরুর জন্য ছিল পাকা ঘর। সেই ঘরে নিয়ম করে মশার কয়েল জ্বালানো হতো — যেন গরুগুলোও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। রান্নার জন্য নানা পুরো বছরের লাকড়ি একসাথে কিনতেন। বুড়িগঙ্গার তীরে লাকড়ির নৌকা ভিড়লেই তিনি পুরো নৌকাটা কিনে ফেলতেন। সেই লাকড়ি রাখার জন্য ছিল আলাদা আধাপাকা ঘর — আমরা বলতাম “লাকড়ির ঘর।” রান্নাঘরের পাশে ছিল “ভাতের ঘর” — এখন যাকে সবাই বলে ডাইনিং রুম। বড় খালা তখন ঢাকার টিকাটুলির কামরুন্নাহার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছেন। বড় মামা বিএসসি শেষ করে মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছেন — নিয়মিত ক্লাস করতেন। এক রাতে আমরা তিনজন — আমি, নানা আর বড় মামা — একসাথে খেতে বসেছি। হঠাৎ মামার মুখে বমি বমি ভাব। নানা জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে?” মামা হাসিমুখে বললেন, “আজ ক্লাসে ইঁদুর কেটেছি, তাই একটু বিরক্ত লাগছে।” নানা তখনই বললেন, “তাহলে আর মেডিক্যালে পড়ার দরকার নেই!” এরপর মামা মেডিক্যাল ছেড়ে দিয়ে আইন পড়তে ভর্তি হলেন — “ল”-এ।
ছোট মামা ছিলেন রুচিশীল, ছিমছাম পোশাক পরতেন, কিন্তু পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিলেন না। একাধিকবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েও পাশ করতে পারেননি। নানা তখন তার মাথার তেলের ইন্ডাস্ট্রিতে তাকে নিয়ে বসালেন। “ঈগল মার্কা তেল” — সেই সময়ে ঢাকায় এটি ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। এই ছিল আমার শৈশবের পাঠশালা — যেখানে বইয়ের চেয়ে মানুষ শেখাত বেশি, যেখানে পরিবারের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি দিন ছিল এক একটি শিক্ষা।
প্রথম পর্ব

