ভারত ছাড় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের অভ্যূদ্বয় বামপন্থার পথ হারা পথ

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বশেষ বৃহত্তর গণআন্দোলন ছিল ভারত ছাড় আন্দোলন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কালে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ   নানা আন্দোলনের ডামাডোলে    অশান্ত গণ আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতে প্রধান প্রধান শহর গুলিতে ।  সর্ব ভারতীয় পর্যায়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মোহনদাস করম চাঁদ   গান্ধির  নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল ভারত ছাড় আন্দোলন । ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতবাসীর পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও মুক্তির আকাঙ্খা  বিদ্রোহে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল । ১৯৪২-এর ভারত ছাড়া আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়। আন্দোলন শুরুতেই   গান্ধি-সহ কংগ্রেসের সব শীর্ষনেতাদের গ্রেফতার ও  কারারুদ্ধ  করে ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসন । ভারত ছাড় আন্দোলন চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে যেতে পারেন নাই।  এর অন্যতম প্রধান কারণ  কংগ্রেস এর সামনে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্মসূচী না থাকা ।   কংগ্রেস দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারা অভাব বা অনুপস্থিতি  আলোচনার বাইরে রাখতে আন্দোলন সহিংসতার দিকে যাচ্ছে এই অজুহাতে আন্দোলনকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিল ।

পটভূমি : সুভাষচন্দ্র বসু ও ক্রিপস মিশন

সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে  জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালীন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক  আন্দোলনের সূচনা করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।  গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত, কংগ্রেসের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা এবং বিরুদ্ধ-মত প্রকাশ করার জন্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু  । মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের নীতির বিপরীতে  ভারতের স্বাধীনতার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু  সশ্রস্র সংগ্রামের পথ গ্রহণ করেছিলেন।

কংগ্রেস ত্যাগ করে সুভাষ বসুর ফরওয়ার্ড ব্লক নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিলেন। নানা চড়াই -উৎরাইয়ের এক  পর্যায়ে সুভাষ বসু ভারত থেকে পালিয়ে ইউরোপ ও জাপানে চলে যান ১৯৪১ সালে । ১৯৪১ সালে ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সুভাষ বসু  আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন।  প্রবাসে সুভাষ বসুর যুদ্ধ প্রচেষ্টা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বড় ধরণের প্রভাব পড়েছিল। সিঙ্গাপুর -মালয়েশিয়া অঞ্চলের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় নাগরিকদের বড় অংশ আজাদ হিন্দ ফৌজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সুভাষ বসুর ভারতের ভিতর ও বাইরে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি অর্জন কংগ্রেস ও ব্রিটিশ প্রশাসনকে নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক চাপে ফেলেছিল।

বিশ্বব্যাপী যেখানেই ব্রিটিশ যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল সেখানেই ভারতীয় সেনা অংশ নিয়েছিল । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেড়  লাখ ভারতীয় ( ভারত – পাকিস্তান – শ্রীলংকা – বাংলাদেশ নেপাল ) অংশ নিয়েছিল। ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশ যুদ্ধযাত্রার প্রধান খুঁটি ছিল। এই যুদ্ধে ৮৭ হাজার ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিল।   অৰ্থনৈতিক কারণ বাদ  দিলেও শুধু মাত্র যুদ্ধরত ভারতীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ  এর জন্য অপরিহার্য্য হয়ে পড়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪১সালে  জার্মানির আক্রমণের চাপে মিত্রশক্তির দেশগুলি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ভারতে জাপানের আক্রমণের প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। যুদ্ধকালীন জটিল পরিস্থিতিতে ভারতবাসীর আর্থিক ও সামরিক -রাজনৈতিক সর্মথন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ সরকারের ।  এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার সদস্য স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ক্রিপস মিশন ভারতে আসে ১৯৪২ সালে । স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস  ভারতের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পর একগুচ্ছ প্রস্তাব রাখেন, যা ‘ক্রিপস প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। কংগ্রেস ও মুসলিমলীগ পৃথক পৃথক কারণে এই প্রস্তাব গুলির বিরোধিতা করেছিল।

যুদ্ধ ও ভারত ছাড়

‘ক্রিপস প্রস্তাব’  প্রত্যাখ্যান ও সুভাষ বসুর রাজনৈতিক আন্দোলনের দানা বেঁধে উঠার শুরুতেই কংগ্রেস ভারত ছাড় আন্দোলনের ডাক দেয়। ‘ক্রিপস প্রস্তাব’ -এ পূর্ন স্বাধীনতার কোন কথা না থাকায় কংগ্রেস ইংরেজদের বিরোধী  সংগ্রাম – ভারত ছাড় আন্দোলনের ডাক দেয়। এই আন্দোলন ভারতের সকল প্রান্তেই ছড়িয়ে পড়ে ছিল।  বিপুল উদ্দীপনা এবং অদম্য সাহসে নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের  বিরোধিতায় নেমে ছিল ভারতবাসী । ব্রিটিশের দমন পীড়নে অসংখ্য মানুষ খুন হয়েছিল,হাজার হাজার মানুষ কারারুদ্ধ হয়েছিল এই আন্দোলনে। কংগ্রেসের বেঁধে দেওয়া পথে ‘ভারত ছাড়ো’ সীমাবদ্ধ থাকেনি ৷  হয়ে উঠেছিল প্রকৃত অর্থেই গণবিদ্রোহ – বিপ্লব। সুভাষ বসুর কংগ্রেস ত্যাগের কারণে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল   ভারত ছাড় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের সেই হারানো মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল।  কংগ্রেস নেতাদের কারাবরণ ও  গান্ধির অনশন জন মানসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।

কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও ভারত ছাড় আন্দোলন 

হিন্দু মহাসভা কিংবা মুসলিম লীগের ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশ না খুব বেশি অস্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির ব্রিটিশ প্রীতি নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।  ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ ঘেঁষা নীতি অপরাপর অপরাপর বামপন্থী দল গুলির ভারত ছাড় আন্দোলনের ইতিহাসকে মাটি চাপা দিতে প্রভাবকের কাজ করে আসছে।

প্রথম মহাযুদ্ধ ও ও কমিউনিস্ট নীতি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের মধ্যে নিজ দেশের শাসকদের সমর্থন নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।  এই বিতর্কে দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ভেঙে যায়। দেশে দেশের কমিউনিস্ট পার্টি নিজ দেশের শাসকদের পক্ষে দাঁড়ায়। জার্মানিতে রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল লিবাকানেক্ট, রাশিয়ার ভ.ই  লেনিন ও ট্রটস্কি যুদ্ধ বিরোধী আন্তর্জাতিকতা বাদী অবস্থান নেয়। আন্তর্জাতিকতাবাদ হচ্ছে যুদ্ধে নিজ দেশের শাসক দের সমর্থন না করা এবং অন্যদেশ দখল ও আক্রমনের সক্রিয় বিরোধিতা করা। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে বিপ্লবী যুদ্ধে রূপান্তরিত করার ডাক দেয় আন্তর্জাতিকতাবাদরা । প্রথম মহাযুদ্ধের আন্তর্জাতিকতাবাদীর সঠিক নীতি রাশিয়ার সেনাবাহিনীর উপর প্রভাব ফেলেছিল।  বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে সেনাদের বড় অংশ পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।  সৃষ্টি হয়েছিল প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও উল্টোমুখী নীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরিত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট শিবিরে মতপার্থক্য দেখা ছিল। এই মত পার্থক্যের শুরু ১৯২৪ সালে লেনিন পরবতী সময়ে। একদেশে বা জাতীয়  সমাজতন্ত্র বিনির্মানের স্তালিনীয় নীতি থেকে যুদ্ধ সম্পর্কে উল্টো নীতির যাত্রা হয়েছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি  স্তালিনের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় আন্তর্জাতিক কমিন্টার্নকে অনুসরণ করে। ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে, কমিন্টার্নের অংশ হিসেবে সিপিআই-সাম্রাজ্যবাদীকে জনযুদ্ধ  হিসেবে চিহ্নিত করে ।  সিপিআই এর ভারত ছাড় আন্দোলনের বিরোধিতা স্তালিনের বৈদেশিক নীতির প্রতিফলন ছিল মাত্র ।

সিপিআই এর  ভারত ছাড় আন্দোলনে ব্রিটিশ তোষণ নীতির পুরস্কার হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা ব্রিটিশ এর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল। ঠিক একই সময়ে ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কংগ্রেস সহ অপরাপর কমুনিস্ট মতাদর্শের দল আরএসপি, আরসিপিআই, বিএলপিআইর নেতা কর্মীরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের মধ্য দিয়ে  যাচ্ছিল।

ভারত ছাড়  আন্দোলন কালে ভারতে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল – আরএসপি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি – আরসিপিআই, বলশেভিক লেনিনবাদী পার্টি – বিএলপিআই  এর মত মার্ক্সবাদী দল সক্রিয় ছিল। এই দল গুলি  স্তালিনের নেতৃত্বাধীন  তৃতীয় আন্তর্জাতিকের (কমিন্টার্ন) বিরোধী ছিল। সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদী নয়, মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতার দৃষ্টিভঙ্গীতেই তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে মনে করেছিল।

এই দল গুলির মতে,   কমিন্টার্নের  যুদ্ধ নীতি সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতির থেকে আলাদা নয়। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্তর্জাতিকতার পথ থেকে কমিন্টার্ন বিচ্যুত। দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিচার না করে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির  নির্দেশে সি পি আই কাজ করেছে। এই সময়ে সিপিআই কমিন্টার্নকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় কংগ্রেস সম্পর্কে ঘন ঘন অবস্থান বদল করছে।

পরদিকে আরএসপি, আরসিপিআই, বিএলপিআই বিশ্বযুদ্ধকে প্রথম থেকেই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হিসেবে দেখে আসছিল । তারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে ছিল এই দল গুলি ।

বাংলাদেশের স্বাদীনতা যুদ্ধ ও কমিউনিস্ট আন্দোলন 

১৯৪৭ সালে আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রধানতঃ হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আসা অসাম্প্রদায়িক মানুষদের প্রাধান্য ছিল । ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, শত্রু সম্পত্তি এই অঞ্চল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশকে  দেশান্তরীত  করে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির ১৩ হাজার পার্টি সদস্যের ১২ হাজার পার্টি সদস্য দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।

এই দমন পীড়নের মধ্যেও কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ব শাসন, ভাষা আন্দোলনে সঠিক ভূমিকা পালন করে।  এই ভূমিকা প্রথম বড় ধরণের পরিবর্তন দেখা যায় পাক-ভারত যুদ্ধ ১৯৬৫ সালে। এই সময় সোভিয়েত রাশিয়ার   সহায়তায়  পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতি পৌঁছায় । পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতির মধ্যস্থতায় জড়িয়ে পড়া  ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার পররাষ্ট্র নীতির অংশ।  কোন ভাবেই মার্ক্সবাদী দলের নীতি নির্ধারণী নির্দেশনা নয়।

এই ঘটনার পর থেকেই এই পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি আইয়ুব বিরোধী ধীর চলো নীতি গ্রহণ করে। এর পরেই চলে আসে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের চীন – রাশিয়া বিতর্ক – ভাঙ্গন। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে যায়। একটি চীন অপরটি রাশিয়া পন্থী। দল দুইটির নীতি নির্ধারণে চীন- রাশিয়া পররাষ্ট্র নীতি বিশেষ ভূমিকা  রাখে। প্রথম ভাঙ্গনের রেশ কাটতে না কাটতে চীনপন্থী অংশ বেশ কয়েক ভাবে ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্থানের সামরিক শাসক আইউব খানের সাথে চীনের সম্পর্ক ভাল থাকায় চীন পন্থী কম্যুনিস্টরা  Don’t disturb Auyib. নীতি গ্রহণ করে। পুরুস্কার হিসেবে কয়েকজন শীর্ষ নেতার উপর থেকে হুলিয়া তুলে নিয়েছিল পাক প্রশাসন। ১৯৪২ সালের পুনরাবৃত্তি।

এই ধারাবাহিকতায় কমিউনিস্ট পার্টির দুই অংশই চীন – রাশিয়ার পররাষ্ট্র নীতি দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে থাকে।  এই গড্ডালিকা প্রবাহে চীন পন্থী কমিউনিস্টদের বড় অংশ ১৯৭১ সালের মুক্তি যুদ্ধের সময় অস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।  চীন পন্থিদের প্রধান উপদল পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল ) মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।  চীন – পাকিস্তানের মিত্র হওয়ায় পাকিস্তানের জাতিগত নিপীড়ন সম্পর্কে নিরাবতা পালনের পথ বেছে নিয়েছিল।  চীন পন্থীদের কোন কোন অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তবে পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল )  এর ভূমিকার কারণে ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়া চীনপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস খুব একটা সামনে আসতে পারে নাই। রাশিয়া পন্থী কমিউনিস্ট পার্টি রাশিয়ারকে অনুসরণ করায় চীনপন্থীদের মত অবস্থায় পড়ে নাই তবে মুক্তিযুদ্ধে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে নাই।

অন্ধ অনুকরণবাদ ও নতুন শক্তি

চীন পন্থী কমিউনিস্টদের বিভক্ত ও বিভ্রান্তিকর অবস্থানের কারণে যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের বিকাশ বন্ধ হয়ে যায় । যুদ্ধত্তোর কালে ৩/৪ বছরে নানান উপদলে বিভাজিত চীন পন্থীরা আঞ্চলিক দল হিসেবে সক্রিয় ছিল।  যেমন পাবনা -রাজশাহী অঞ্চলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এম-এল), যশোর – খুলনা অঞ্চলে পূর্ব পাকিস্থান  কমুনিস্ট পার্টি (এম-এল) ইত্যাদি। যুদ্ধকালীন বিভ্রান্তকর অবস্থান এই দল  গুলিতে নতুন কর্মী -সদস্যের টানতে ব্যর্থ হয়ে ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে।

বিপ্লবী আন্দোলনের এই শূন্য স্থান পূরণে তৎকালীন ছাত্রলীগের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী অংশ সফলতার পরিচয় দেয়। এই অংশের উদোগে যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠিত হয়েছিল। নতুন কর্মী সদদের আকৃষ্ট করার জন্য জাসদের যুদ্ধ কালীন অবস্থান ও চীন – রাশিয়ার পররাষ্ট্র প্রভাব মুক্ত সমাজতন্ত্রের স্লোগান যথেষ্ট কাজ দেয়। যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে নতুন শাসক গোষ্ঠীর ব্যর্থতা কে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জাসদ প্রভাব শালী দল হিসেবে প্রতিষ্টিত করতে সমর্থ হয়েছিল। যদিও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীদের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় নাই।   এই ধারার উল্কার গতিতে উত্থান  ও পতন পৃথক আলোচনার দাবী রাখে ।

অপু সারোয়ার

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.