অপূর্ণতা লুকানো লজ্জার

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করছি “সব মানুষের জীবনেই অপূর্ণতা থাকবে । অতি পরিপূর্ণ যেসব মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করলে সেও অতি দুঃখের সঙ্গে তার অপূর্ণতার কথা বলবে। অপূর্ণতা থাকেনা শুধু বড় বড় সাধক ও মহাপুরুষদের”। পৃথিবীতে অপূর্ণতা বলে খুব মহামূল্যবান একটা কথা আছে। মানুষের জীবনে এই অপূর্ণতা আছে বলেই মানুষ জীবনে পূর্ণতা পেতে চায়। আমার কৈশোরকালের পরিচিত একজন। তার তরুণ বয়সে অধিক পরিমাণে চুল ঝরে টাকের সৃষ্টি হয়। তাই সে সবসময় মাথায় ক্যাপ পরে থাকতো। একদিন পরিচিত কিছু মেয়ের সাথে কথা বলছিল। হঠাৎ বাতাসে ওর ক্যাপ উড়িয়ে ফেলে দে। মেয়েদের সামনে তার মাথার টাক প্রকাশ পায়। সেই থেকে সে ঐসব মেয়ের সামনে যেত না। তাদের দেখলে নিজেকে আড়াল করতো। একদিন তাকে বললাম- টাক থাকা তো লজ্জার নয়। অনেকের টাক আছে। জনপ্রিয় অভিনেতা আবুল হায়াতেরও টাক আছে। ও বললো- আমি আমার টাকের জন্য লজ্জিত নই। এতোদিন আমি লুকিয়ে রেখেছি। আড়ালে রেখেছি। তা প্রকাশ হয়েগেছে তাই লজ্জিত। মনে হচ্ছে আমি এতোদিন মুখোশধারী ছিলাম, আমার মুখোশ খুলে গেছে। তাই আমি লজ্জিত। অপূর্ণতা লজ্জার নয়, অপূর্ণতা লুকানো লজ্জার! কিন্তু আমরা অনেকে অপূর্ণতা লুকিয়ে রাখি। আর কোন একদিন তা প্রকাশ পায় তখন লজ্জিত হই। ভণ্ড হিসাবে পরিচিত হই। কোন মানুষ সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ নয়। কোন না কোনভাবে অপূর্ণ থাকে। অপূর্ণতা লুকানো হয় সবচেয়ে বেশি বিয়ের সময়। শুধু অপূর্ণতা লুকায় তা নয়, বাড়তি কিছুও যোগ করে। যেমন পাত্রের বেতন ত্রিশ হাজার টাকা। পাত্রপক্ষ বলে পঞ্চাশ হাজার টাকা। পাত্রীপক্ষও অনেক বিষয় লুকায় এবং বাড়তি যোগ করো। কিন্তু বিয়ের পরপর দাম্পত্যজীবন অশান্তি সৃষ্টির কারণ হয় অপূর্ণতা লুকানো। যেমন পাত্রের মাথায় চুল কম, পাত্র পরচুলা ব্যবহার করেছে। বিয়ের পর স্বামীর মাথায় টাক পড়ার ১০ নাম্বার বিপদ সংকেত দেখলে স্বাভাবিক কারণেই মন খারাপ হয়। যদি বিয়ের আগে থেকে জানতো বা দেখতো তাহলে মন খারাপ হতো না। তেমনি বিয়ের পর স্ত্রীর অপূর্ণতা প্রকাশ পেলে স্বামীর মন খারাপ হয়। বিষয়টি আগে দেখলে মন খারাপ হতো না। আসলে আমরা যা তা নিয়ে সুখি হওয়ার চেষ্টা করি না, আমরা সুখি হতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকি। এই মিথ্যার আশ্রয় কিন্তু আমাদের অশান্তির কারণ হয়ে থাকে। আমি একজন মেয়েকে চিনি যে তার স্বামীকে নিয়ে তার আত্মীয়স্বজন-দের বাড়িতে বেড়াতে যায় না। কারণ তার স্বামী বেটে। লোকজন লজ্জায় দিবে, বাট্টুর বউ বলবে তাই। অথচ মেয়েটি প্রেম করে বিয়ে করেছে। এ কেমন ভালোবাসা, ভালোবাসার মানুষকে জড়িয়ে তিরস্কার শোনা তো গর্বের। তার স্বামী যেমন তেমনিই সবার কাছে পরিচিতি করা প্রয়োজন। যাদের মন নোংরা তারা অবশ্যই তিরস্কার করবে। তাতে কী আসে যায়! এভাবে লুকিয়ে স্বামীকে নিয়ে মিথ্যা গল্প করলে বরং লজ্জার। কারণ একদিন না একদিন তার স্বামীকে দেখবে, তখন! যার যা আছে তা প্রকাশ রাখলে কেউ কোনদিন অপূর্ণতা জন্য লজ্জিত হয় না। লুকিয়ে রাখলে একদিন প্রকাশ পাবেই তখন লজ্জিত হতে হয়, ভণ্ড হিসাবে পরিচিত হতে হয়। অপূর্ণতা আফসোসের নয়, অপূর্ণতা দোষের নয়। পৃথিবীর সকল মানুষের মাঝে অপূর্ণতা আছে। স্রষ্টা সৃষ্টিকে অপূর্ণতা দিয়ে তৈরী করেছে, যাতে সৃষ্টি স্রষ্টার সমকক্ষ দাবী করতে না পারে। কারো অপূর্ণতা চোখে পড়ে কারো অপূর্ণতা দেখা যায় না। কেউ অপূর্ণতা টাকা দিয়ে ঢাকে আর কেউ ঢাকে ক্ষমতা দিয়ে। তাই নিজের যা অপূর্ণতা তা না ঢেকে সঙ্গীর অপূর্ণতা মেনে নিলে জীবনে সুখী হওয়া যায়, নয় তো না। নিয়ম মানুন, ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদেরও প্রত্যেককে নিয়মটি মেনে চলা উচিত। খুব জরুরি প্রয়োজন না হলে আমরা যেন ঘরের বাইরে না যাই। অন্যের সংস্পর্শ যেন এড়িয়ে চলি। আর বাইরে বের হলেও যেন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখি। আঁধার কেটে যাবে, পৃথিবীর অসুখ সেরে যাবে, সুদিন আসবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.