ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের নৌ চলাচল অবাধ ও স্বাধীন রাখার লক্ষ্যে বা পন্থা খোঁজার লক্ষ্যে ২০০৭ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র- জাপান- অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সাথে যে সংলাপের সূচনা শুরু হয়েছিলো সেটাই মূলত কোয়াড্র্যলেটারাল সিকিউরিটি ডায়লগ বা কোয়াড ।
প্রকাশ্য এটাকে সামরিক জোট বলা না হলেও সামরিক জোট হিসেবেই কাজ করছে বলে বলা হচ্ছে। এই জোটকে এশিয়া মহাদেশের ন্যাটোও বলা হচ্ছে। এই জোটকে মূলত চীনবিরোধী জোট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কেননা ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যও বেশ পরিলক্ষীত হয় । কোয়াড নামক জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হবে তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বা কোনো প্রকার তৎপরতা এখন অব্দি স্পষ্ট নয় । এটাই মূলত কোয়াড নিয়ে সার্বিক বার্তা ।
সম্প্রতি টোকিওতে কোয়ডভূক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বেঠক করেছেন। এশিয়ায় ন্যাটোর এই ছোট্ট পরিসর বা সংস্কারণ এই অঞ্চলে যার যার সার্বভৌমত্ব, নৌচলাচলের স্বাধীনতা, সীমান্তসংক্রান্ত স্বাধীনতা, অবাধ বানিজ্য ইত্যাদি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
চীন থেকেই উদ্ভূত করোনা মহামারীতে বিশ্ব যখন টালমাটাল মূলত সেই সময়টাতেই চীনের আগ্রাসী বিস্তারবাদী আচরণ কোয়াডকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যবদ্ধ বা ঐকমত্যে পৌঁছাতে বেশ আগ্রহী করে তোলে বলেই দেখা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে এই কোয়াডকে চীন একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছে, এটা গত কয়েকদিনের চীনের তৎপরতায় বেশ স্পষ্টতই দেখতে পাওয়া যায় এবং চীনের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং অবশ্যই তাদের ভাবনায় থাকবে, এটা বলাই বাহুল্য।
কোয়াডের আলোচনায় আসার পূর্বে ছোট্ট করে ইউরোপ ঘুরে আসা প্রয়োজন। সম্প্রতি ভারতী- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক একজন রাষ্ট্রদূত ফ্রান্স নিয়েগ দিয়েছে। এদিকে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সভাপতির চেয়ারের দায়িত্বটি বর্তমানে জার্মানি পালন করছে। সাম্প্রতিককালে জার্মানি একটি নীতিমালায় বা নীতি নির্দেশিকায় ভারতীয়- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে সব ধরণের ঝুঁকিমুক্ত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পদক্ষেপ নিতে জোরদার করেছে। এমন পরিকল্পনায় এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, আগামীতে কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো বা ইইউ অঞ্চল একজোট হয়ে এই কোয়াডের সাথে সংযুক্ত হবে। সুতরাং চীনের জন্য হবে বড় বাঁধা এবং খুব স্বাভাবিক কারণেই কোয়াড চীনের বর্তমান বড় মাথা ব্যথা।
একদিক থেকে দেখলে বোঝাই যায় বিশ্বে চীন ধীরে ধীরে এবং বর্তমানে অতি দ্রুত গতিতেই বেশ আগ্রাসী হয়ে উঠছে। বর্তমান বিশ্বে সত্যি অর্থেই কে বেশি শক্তিশালী সামরিক দিক থেকে সেটা বলা বেশ মুশকিল বটে। তবে ধারণা থেকে বা বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে বলাই বাহুল্য যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবার চোখে শক্তিশালী হলেও চীন যে একেবারেই কম নয়, তা বেশ স্পষ্ট। তবে অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন আবার স্পষ্টতই এগিয়ে এবং অনেক বেশিই এগিয়ে আছে বলে প্রতীয়মান হয়। আবার ভিন্নভাবে বলাই যায়, যাদের অর্থ বেশি তাদের হাতে ক্ষমতাও বিশ্ব বাজারে কুক্ষিগত হয় অতিব দ্রুত।
চীনের আগ্রাসন প্রবণতা ভূকৌশলগতভাবে হিসেব- নিকেশ সব বদলিয়ে দিচ্ছে আজকাল। সব বাদ দিয়ে ভারতের সাথেই চীনের বর্তমান প্রেক্ষাপটটি বিবেচনায় নিলেই তা স্পষ্ট হয় । লক্ষণীয় যে, চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং হিমালয় অঞ্চলে তাদের পিপলস লিবারেশন আর্মিকে ভারতে আঘাত হানতে বাধ্য করেছিলেন এবং ভারতকে মোকাবিলায় সর্বদাই বেশ প্রস্তুত। আরো লক্ষণীয় যে, লাদাখে চীন যেভাবে সাম্প্রতিককালে আঘাত হেনেছিলো, ভারতকে সে সময়ে অভাবনীয় বিচলিত দেখা গেছে বলেই খবরে দেখতে পাই। সুতরাং কোয়াড ভারতের জন্য মুক্তারমালা হয়ে উঠবে। কেননা ফের চীন ভারতের কোনো অঞ্চলে হামলা বা আঘাত হানলে এই কোয়াড নীতিগতভাবেই ভূমিকা রাখবে বলেই মনে হচ্ছে। যদিও ভারতীয় প্রশান্ত মহাসাগর এই কোয়াডের মূল বিষয়। তবে সেটা যে কেবলি কাগজে কলমে হবে তা অনেকটাই স্পষ্ট।
এই ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন যাবৎ একপ্রকার যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব মূলত ছিলোই। কেননা সব পরাশক্তিরাই দখলে রাখতে ভালোবাসে। এক দিকে কোয়াড গড়ে উঠেছো তো চীন আর বসে থাকবে কেনো? চীন ইতিমধ্যেই এশিয়া অঞ্চলীয় দেশগুলো ঘুরে ঘুরে অতীতের ঠান্ডা যুদ্ধের স্মৃতিকে উস্কে দিয়ে সমুদ্রপথে তাদের আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্য বা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের গেইমপ্ল্যানকে গোটা অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্টের মূল কারণ হিসেবেই তুলে ধরছে এবং পূর্ব এশিয়াকে একজোট হবার প্রয়াশ নিয়েই এগুচ্ছে। সত্যি বলতে বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে দেখতে পাই ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পুরোদস্তুর এক সমুদ্রযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েই আছে। যুক্তরাষ্ট্র আর চীন এই দুই পরাশক্তির ঝড়ঝাপটা আগামীর ভবিষ্যতে ভারতের ওপর দিয়েই যাবে বলে মনে হচ্ছে। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে দু’দিকেই অক্ষ তৈরি হয়েই আছে বলে লক্ষণীয় হয় ।
বাংলাদেশ যেহেতু নীতিগতভাবে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়ঁনি তাই সংক্ষেপে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটু বলা প্রয়োজন। ” ডিক্যাব টক “- কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিক্যাব আয়োজিত ডিক্যাব টকে এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি ঝিমিং হঠাৎ করেই বা বলা যায় জেনে বুঝেই কোয়াড আলোচনাকে চাঙ্গা করে তুলেন। চীনা রাষ্ট্রদূত সরাসরিই সকল কূটনৈতিক বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করেই বলে দেন, ” কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মানে সরাসরি চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাস্তবিক অর্থেই খারাপ ( সাবটেনশিয়ালি ড্যামেজ ) বা অধিক বৈরী হবে ” । পরাশক্তির দেশ হলেও স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি এটা সরাসরি হুমকি স্বরূপ বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন হলো কেনো ডিক্যাব টকে কোয়াড আলোচনা ? মূল কারণটি হলো গত দু- সপ্তাহ পূর্বেই চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঢাকায় সফরে ছিলেন। সেই সময়েই তিনি চীনের রাষ্ট্রীয়বার্তা বাংলাদেশকে জানিয়ে গেছেন। খবর চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া । সেই খবরে বলা হয়, এই অঞ্চলে যেন কোয়াড প্রভাব বিস্তার না করতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই বিষয়ে চীনের উদ্বেগ ও অস্বস্তির কথা স্পষ্ট করা হয়েছে বা বলা যায় সরাসরি চীন ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এই জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকার কূটনৈতিক পরামর্শ বা ভিন্নভাবে বললে বলা যায় হুমকি দিয়েছে । কেননা চীন সরাসরি মনে করে কোয়াড চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ তো কোয়াডে নেই । তাহলে চীন পরাশক্তি বলেই কি এমন হুমকি ? বিভিন্ন খবরাখবর থেকে দেখা যাচ্ছে যে, কোয়াডকে অতি দ্রুতই ” কোয়াড প্লাস ” এ বিস্তৃত করতে যুক্তরাষ্ট্র সহ কোয়াডের সদস্য দেশগুলো প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে । আর চীনের মূল আশঙ্কা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে কোয়াড প্লাসে অন্তর্ভূক্ত করার প্রয়াশ গ্রহণ করবে। সার্বিক বিবেচনায় কোয়াডের কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কিনা ? এমন প্রশ্ন আপাতো হীমাঘরেই থাকুক।
চীনা রাষ্ট্রদূত একটি প্রশ্নের জবাবে যেভাবে কোয়াডকে টেনে এনে বলেছেন সেটা কতটুকু কূটনৈতিকভাবে সমুচিত তা অবশ্যই একটি বড় প্রশ্ন। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ” কোয়ডের পরিস্থিতি আমরা বিবেচনা করে দেশ ও দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবো এবং নেই । তবে বাংলাদেশ কোনো ডিফেন্স প্যাক্টে যোগদান করার আগ্রহ রাখে না । আমাদের মূল নীতি হলো, কারো সাথে শত্রুতা নয় এবং সবার সাথে বন্ধুত্ব ” । আপাতত আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বচন অব্দিই থাকতে হবে কেননা এখনও অনেক কিছুই পরিষ্কার নয় বলেই অনুমেয় হয়।
আমরা সবাই জানি চীন বাংলাদেশে অনেক বড় বিনিয়োগকারীদের একটি দেশ। ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তাদের একটি আপাত টার্গেট আছে এবং পত্র পত্রিকার খবর অনুযায়ী ইতিমধ্যেই ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। অপরদিকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আবার একেবারেই ভিন্ন সূত্রে গাঁথা, বৃহত্তর পড়শি দেশ এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী দেশ। সম্পর্কটি অনেক গভীরের তো অবশ্যই। তবে ভারতের সাথেও যে বৈরীতা চলছে তা খালি চোখেই ভেসে উঠে। এই সব কিছুই বাদ দিয়ে ভিন্ন মাত্রায় বিষয়টি আপাতত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে স্নায়ুর টনপোড়ন ক্রমাগত বেড়েই চলছে। এদিকে তাইওয়ান ও হংকং ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জোটকে বিস্তৃত করার পদক্ষেপে চীন নিশ্চিত ভাবিত হবেই। পরাশক্তির লড়াইয়ে ছোটো দেশগুলোর চাওয়া- পাওয়ার তেমন কোনো বড় বাঁধা হয় না । তবে আপাতত একটি অধিক পিরিচিত বচনের কথা মনে হচ্ছে, অন্ধকারে ভয় কাঁটাতে জোরে চিৎকার করে চলো। চীনের এমন সরাসরি হুমকি বাংলাদেশের প্রতি অনেকটা তেমনই মনে হচ্ছে ।
আগামীর ভবিষ্যতেই বলা যাবে বাংলাদেশের সঠিক করণীয় কি হওয়া উচিত বা প্রয়োজন। তবে একটি কথা বলতেই হয়, ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ বেশ ভালো একটি অবস্থানেই আছে এবং এই অবস্থানকে শতভাগ ব্যবহার করে, পরাশক্তিগুলোর সাথে যথাযথ হিসেব- নিকেশের সুযোগ কিন্তু থেকেই যায়। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে নিজেদেরকে সূদৃঢ় করার জন্য সর্বপ্রথম যা প্রয়োজন তা হলো রাজনৈতিকভাবে দেশের ভিতরে জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে বিবেচনায় নেওয়া এবং দেশের ভিতরে রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম অবশ্যই অবশ্যই গণতান্ত্রিক ও জনমানুষের জন্য গড়ে তোলা হবে বিপদকে পাড় করার প্রথম শক্তিশালী ধাপ। মনে রাখা ভালো যে, দেশের রাজনীতিতে দেশের ভিতরে সমাধান না থাকলে বা সমঝোতা না থাকলে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ভুগতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। ভৌগলিকভাবে যতই ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ থাকুক না কেনো, রাজনীতি সঠিক না থাকলে, ছড়ানো ভাত কাকেই খেয়ে যাবে।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম।

