মারণাস্ত্রমুক্ত শান্তির পৃথিবী কী সম্ভব

অ্যাডভোকেট আনসার খান :বিশ্বব্যবস্হায় শান্তির সুবাতাস বইছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই,যদিও আপাতত সুনসান নিরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ নিরবতা বড়ধরণের কোনো ঝুঁকির পূর্ব সংকেত কিনা তাও হলফ করে বলা যাচ্ছে না।

আপাত শান্ত পৃথিবীর দিকে চোখ ফেরালে দেখা যাবে বিগত দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে দেশগুলোর মধ্যে ছোটো-বড় সামরিক সংঘাত ও দ্বন্দ্ব চলে আসছিলো গোটা একুশ শতক বিশ্বব্যবস্হার জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠবে বলে মনে করা হয়েছিলো।জাতিগুলো পারমাণবিক সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলেও ভবিষ্যত বাণী করে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। কিন্তু একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে তৃতীয় দশকের গোড়াতে মনে হচ্ছে পৃথিবীতে শান্ত অবস্হা বিরাজ করছে।

প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে দু’দশক ধরে তালেবান সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কোনো ফলাফল ছাড়াই আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।কিন্তু দেশটায় শান্তি ফিরে আসবে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

ইরানের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের কথাও বলছেন বাইডেন,যদিও ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র প্রয়োগ করেছে আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্য নীতিও নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।অথচ ট্রাম্প প্রেসিডেন্সীর সময়টাতে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিলো, যেকোনো সময় উভয় দেশ পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে বলে আশংকা বৃদ্ধি পেয়েছিলো।তবে বাইডেন প্রেসিডেন্সীতে সে আশংকা কমে এসেছে।ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫-সালে ইরান ও ছয় জাতির মধ্যে ইরানের বহুল আলোচিত পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়ার ফলে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছিলো।উভয় রাষ্ট্র পরস্পরের প্রতি হুমকি-ধমকি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো। এমনও প্রতীয়মান হয়েছিলো যে,যেকোনো সময় আমেরিকা ইরানের ওপর হামলা করে বসতে পারে।২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় এবং বাইডেনের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রেক্ষিতে যুদ্ধময় অবস্থা বদলে যায়।বাইডেন চুক্তিতে ফিরে আসার এবং ইরানের সাথে আবারও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ইচ্ছের কথা জানান।ফলে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমে আসে।আপাতত দেশ দুটো কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশংকা নেই।

গোটা মধ্যপ্রাচ্য গত কয়েক দশকধরে অগ্নিয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বের যেক’টি অঞ্চল থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশংকা বিদ্যমান বলে মনে করা হয়,সেগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল অন্যতম।ওই অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত, আন্তরাষ্ট্রীয় সংঘাত, সর্বোপরি আমেরিকা,রাশিয়া ও চীনের মতো বিশ্বশক্তিগুলোর ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য স্হাপনের প্রতিযোগিতা,ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত কেন্দ্র করে তিন-তিনবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে অব্যাহত সামরিক সংঘাত,ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠার তীব্রতাজনিত দ্বন্ধ ইত্যাদি বিষয়গুলোর কারণে গত প্রায় আট দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য একটা অস্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে এবং ওই অঞ্চল থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশংকা এখনও বিদ্যমান থাকাবস্হায়ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সকল পক্ষই তৎপর বলা যায়।

ইতোমধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে পরিচালিত ইয়েমেন বিরোধী যুদ্ধে ভাটা পড়েছে।আমেরিকা ওই যুদ্ধে সৌদি বাহিনীর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার কারণে ওই যুদ্ধ থেমে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে,ওই অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ংকর সামরিক সংঘাতপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত স্তিমিত হয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সমর্থন হ্রাস পাওয়ার কারণে। ট্রাম্প প্রশাসনের একপেশে নীতির কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো।যদিও এখন বাইডেন প্রশাসন দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য অঙ্গীকার করেছে।তাই ওখানটায় সংঘাত একেবারে কমে গেছে।কিন্তু ফিলিস্তিনীদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার অস্বীকার করে স্হায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব।

অন্যদিকে,ইসরায়েলের সাথে আরব দেশগুলোর চিরবৈরিতার অবসান ঘটতে চলেছে। সৌদি আরব,কাতার,সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আমেরিকান মিত্রদেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্হাপনের জন্য উদ্যোগী হয়েছে,কোনো কোনোটা আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্হাপনও করে ফেলেছে।ইরান ও তার মিত্ররাষ্ট্রগুলো ব্যতীত মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবদেশই ইসরায়েলের বন্ধু হতে চলেছে বিধায়”যুদ্ধ ও সংঘাত প্রবণ অঞ্চল হিসেবে গণ্য”ওই অঞ্চলে এখন শান্তির রেখা স্পষ্ট হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।এছাড়াও দুটো বিশ্বশক্তি,আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে ওই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকে রাশিয়া ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। চীন,- ইরান ও কয়েকটি আরবদেশের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। তবে আমেরিকার প্রভাব প্রতিহত করার মতো অবস্থায় এখনও পৌঁছাতে পারেনি চীন।তাই ওই অঞ্চলে এখনো আমেরিকার প্রভাব চ্যালেন্জ করার মতো তেমন কোনো শক্তির উদ্ভব ঘটেনি বিধায় আপাতত বৃহৎ কোনো যুদ্ধ-সংঘাতের আশংকা নেই বললেই চলে।তবে,সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলমান আছে।এতে ইরানের প্রক্সি উপস্থিতি আছে বলে ইসরায়েল ও পশ্চিমারা দাবি করছে। সিরিয়ান সেনারা ইসরায়েলের ওপর রকেট হামলা করে বলে অভিযোগ আছে।এছাড়াও,পারমাণবিক অস্ত্র বিতর্কে ইরান-ঈসরায়েলের সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।ফলে যুদ্ধ-সংঘাতের আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শীতল যুদ্ধ যুগের অবসান হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে রাশিয়া ফেডারেশন।রাশিয়ার সাথে আমেরিকার একটা স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান আছে। উভয় দেশের মধ্যে অনেক সময় উত্তেজনা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়,যা থেকে পারমাণবিক যুদ্ধের সূচনা হতে পারে বলে শংকা দেখা দেয়।রাশিয়া কর্তৃক ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সামরিক অভিযান,২০১৪ সালে ইউক্রেনে হামলা করে দেশটার ভুখন্ড ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া এবং এখনও নতুন করে ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনা মোতায়েন করা,রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে নিত্যনতুন প্রযুক্তির অস্ত্র ও পারমাণবিক মারণাস্ত্র উৎপাদন ও মজুদকরণের তীব্র প্রতিযোগিতা,বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উভয় রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টার দরুণ দেশ দুটোকে মুখোমুখি বৈরিতার দিকে নিয়ে গেছে এবং এ বৈরিতা কখনও কখনও চরম সামরিক উত্তেজনায় পর্যবসিত হয়েছে। ফলে দেশ দুটো পারমাণবিক যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে,এমন আশংকাও ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়েছিলো,ভবিষ্যতেও এমটা ঘটতে পারে।যদিও এমূহুর্তে এধরণের আশংকা নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।তবে বাইডেন প্রশাসন নতুন করে রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।এতে করে উত্তেজনা দেখা দিলেও যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার তেমন কোনো শংকা নেই।

চীন একটা উদীয়মান বিশ্বশক্তি।আমেরিকাকে চ্যালেন্জ করার লক্ষ্য নিয়ে চীন তার দেশের অর্থনীতি,সামরিক ও নৌ শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করেছে।পারমাণবিক সমরাস্ত্র আধুনিকায়ন, উৎপাদন ও মজুদ গড়ে তোলছে।দেশ দুটোর মধ্যে বানিজ্য নিয়ে উত্তেজনা চরমে এবং ফলে ‘বানিজ্য যুদ্ধ’ অব্যাহত আছে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে। বাইডেন প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে বানিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নতুন করে।

অন্যদিকে,দক্ষিণ চীন সাগর,তাইওয়ান এবং হংকং নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিরোধ তীব্রতা পেয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যও দেশ দুটো মুখোমুখি অবস্থানে আছে।মূলত চীনের এশিয়ান শক্তি হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা এবং ক্রমে বিশ্বশক্তি হিসেবে উত্থানকে প্রতিহত করাই হচ্ছে আমেরিকার উদ্দেশ্য এবং চীন চাইছে যেকোনো মূল্যে আমেরিকাকে বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ স্হান থেকে সরিয়ে চীনকে সে স্হানে অধিষ্ঠিত করা।বিশ্বশক্তির স্হানের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দেশ দুটোর মধ্যে চলছে তীব্র দ্বন্দ্ব,যা একসময় যুদ্ধের আকারে বিস্ফোরিত হতে পারে।তবে এখনই যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার তেমন কোনো আশংকা নেই বলেই মনে হচ্ছে।

রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সংঘাত, অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতকরণের তীব্র প্রতিযোগিতা বিশ্বের গণমানুষের জন্য, পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য বরাবরই হুমকি হয়ে আছে।এর মাঝে আবার কোভিড-১৯ মহামারী গোটা পৃথিবীকে তছনছ করে দিচ্ছে। পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষা, গণমানুষকে বিপর্যয় হতে উদ্ধার করার দায়িত্ব বিদ্যমান বিশ্বনেতৃবৃন্দের।নেতৃবৃন্দ কতটুকু দক্ষতার সাথে ভূমিকা পালন করবেন তার ওপরে নির্ভর করছে ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ সুন্দর পৃথিবীর।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.