( পিন-পয়েন্টঃ বাজেট , স্বাস্থ্য , কৃষি , প্রযুক্তি , তৃণমূল স্তরে মাথাপিছু সঞ্চয় বৃদ্ধি ও বৈষম্য হ্রাসকরন… )
পরিসংখ্যান কারুকাজ খচিত বার্ষিক মোট জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি হারের সংখ্যাগুলোই কেবল অর্থনীতির ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের যথার্থ পরিমাপক নয় । এবার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলেছে , করোনার ( Covid -19) মাঝেও চলতি অর্থ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে হবে। মধ্যবিত্ত হতে বিশেষত তৃণমূল স্তর পর্যন্ত দরিদ্রদের স্থিতিশীল ক্রয়-ক্ষমতা তথা বার্ষিক মোট সঞ্চয় কতটুকু বাড়ল , এবং উপর তলা থেকে নীচ তলার বার্ষিক সঞ্চয় / নীট সম্পদের ব্যবধান কেমন বাড়ল-কমলো , উন্নয়নে সে সবই অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয় ।
করোনা কালের প্রথম এক মাস (এপ্রিল২০২০) যেতে না যেতেই , দেশে এ স্তর-বৈষম্যের ক্যান্সার কত যে ভয়াবহ , এবং এর বিপরীতে বিরাজমান অসম-ব্যাবস্থার বাস্তব করুন চিত্র সুস্পষ্ট হয়ে গেল।
বৈশ্বিক অবস্থাঃ
১৯৩০ সালের মহামন্দার পর বিশ্ব এই প্রথম সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক মন্দায় নিপতিত ।
বিভিন্ন দেশের সরকার জাতীয় অর্থনীতিতে কোটি কোটি ডলার সহায়তা ( প্রণোদনা ) প্যাকেজ দিচ্ছে , যা এক সার্বভৌম ঋণ , তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দ্বিতীয় মন্দার দিকেও ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছে, লন্ডন ভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’। বাংলাদেশেও সরকার একই জাতীয় প্যাকেজ দিয়েছে।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোসহ বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলোরও উৎপাদন খাত এখন অনেকটাই ধরাশায়ী। দুর্বল বা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে পুঁজি, মুদ্রা ও পণ্য বাজার। বিভিন্ন দেশ চীনের উপর নির্ভরশীল। দশ-দিগন্তে মোট বৈশ্বিক-আমদানির ১১ শতাংশ হয় চীনের মাধ্যমে।
করোনা ছাড়াও , যান্ত্রিক অটোমেশন কারনেও দর্জি কারখানায় শ্রমিক অকল্পনীয় হারে ছাঁটাইর আশঙ্কা ৷ এ ধরনের যান্ত্রিক প্লান্ট চীন বসাচ্ছে আমেরিকায়। বাংলাদেশেও ধরনের মেশিন বসানো শুরু হয়েছে। তাতে শ্রমিক ছাঁটাই বাড়ছেই । বিশ্ব-বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও মুনাফা চক্র-বৃদ্ধিতে মালিকদের এ অটোমেশন অভাবিত সাহায্য করবে। ডিজাইনিং , কাটিং , সেলাই, ফিনিশিং, প্যাকিং, ট্রান্সপোর্ট এই যে প্রোডাকশন-চেইন আছে, তাতে ৯০% ভাগ কাজই যন্ত্রে , এমন কি রবোটিক যন্ত্রেই করা সম্ভব। বাংলাদেশের অদক্ষ স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকরা এর মারাত্মক শিকার হচ্ছে , হবে ।
বেদনাদায়ক দৃশ্যটা খেয়াল করার মত এখানেই । ২০১৩ সালে বাংলাদেশে গোটা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৯৫ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত ছিল, যা ২০১৭ সালে সাড়ে ৮৭ লাখে নেমে এসেছে ৷ বছরে কর্মসংস্থান কমে গেছে ১ দশমিক ৬ ভাগ হারে ৷ অথচ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের আয়ও গড়ে ১০ ভাগের বেশি বেড়েছে এই সময়ে ৷
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন , করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক ( Negative growth) প্রবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে ৷ করোনা ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিতে দুই দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলারের লোকসান ঘটাবে, যা গোটা যুক্তরাজ্যের জি.ডি.পি.-র সমান ৷ এর প্রভাব / চাপ যে বাংলাদেশের উপর পরবে না, তা নয় । তবে কতটা পড়বে , কি ভাবে সামলাবে ?
প্রধান ক্ষেত্রগুলোয় অবস্থা কি বা কেমন ?
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি বৈশ্বিক-অর্থনীতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বা পারস্পরিক নির্ভরশীল।
গার্মেন্টস , ঔষধ, চামড়া, সিয়ারমিক ইত্যাদির কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশের আমদানির বৃহত্তম উৎসও হল চীন। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যে অংশীদার। করোনার প্রভাবে ইতিমধ্যে আমাদের পণ্য আমদানি কমে গেছে। রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা লাগছে। সংকুচিত হচ্ছে উৎপদন। করোনা প্রকোপে তৈরি পোশাকের বিশ্ব বাজারে যুক্তরাষ্ট্রে / ইউরোপে খুচরা বাজারে চাহিদা কমেছে শতকরা তিন দশমিক এক ভাগ ৷ প্রবাসী রেমিটেন্সে নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক , তা আরও বাড়বে হয়ত । ফলে শেষত আমাদের ঋণের বোঝা আরো বাড়তে পারে। আভ্যন্তরীণ ঋন আরো বাড়লে আমাদের ফিনান্সিয়েল প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়াও হতে পারে । কাগুজে নোট ছাপতে হতে পারে, যা বড় বড় বিশেসজ্ঞদের কেহ কেহ বলেছেন । তবে দুর্বল প্রশাসনের দেশে এটা দীর্ঘ মেয়াদে তা ক্ষতিকরও হতে পারে ।
প্রস্তাবিত বাজেটে (২০২১ ) এক দিকে ধনিকদের সুবিধা বাড়ছে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের এখন যা সবচেয়ে বেশি দরকার , সে সব স্বাস্থ্য ,কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ এবং বৃদ্ধির হার একেবারেই সীমিত; কোথাও কোথাও মনোযোগের বাহিরে ।
স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয় জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ স্থিতিশীল রয়ে গেছে । জি.ডি.পি-র মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ ; -যদিও এবারই জরুরি ছিল অন্তত বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মতো জি.ডি.পি-র ৪ শতাংশ বা তার ওপরে বরাদ্দ রাখা। যদিও ‘পরিচালনা ব্যয়’ গত অর্থ বছরে জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে । অথচ এ মহামারী কালে বিভিন্ন উন্নত দেশেও সরকার এ খাতে কৃচ্ছতা / আভ্যন্তরীণ ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে । তাছাড়া , শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে , সে সবও একেবারেই যথেষ্ট নয়।
অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্থ হয় মৌলিক সেবা – জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতগুলোয় । দীর্ঘকাল হতেই স্বাস্থ্য খাত চরমভাবে বিপর্যস্ত । স্বাস্থ্যসেবার মাত্র প্রায় ৩০ভাগ সেবা সরকারী সেক্টরে। বাকীটা অরাজক ‘প্রাইভেট’ সেক্টরে । এক শ্রেনীর চিকিৎসক, ঔষধ উৎপাদক – ব্যবসায়ী , অসাধু আমলা – টাউট ইত্যাদি বিশেষ প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় স্বাস্থ্য শিল্পকে একচেটিয়া মুনাফা লুটার পন্যে রূপান্তর করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না , সরকারী হাসপাতালেও রোগীকে সেবা বাবতে ঘাটে ঘাটে বিভিন্ন ভাবে মোট ব্যায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খরচ করতে হয়।
করোনা যুদ্ধকালে অনেকেই দেখেছেন , ডাক্তারদের বাইরেও বিভিন্ন পেশার যে এক বিশাল জনবল সম্পৃক্ত রয়েছেন , মানবতার সেবা নিবেদন করার জন্য। কিছু দিন আগেও উনাদের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয় নি, তেমন স্বীকৃতিও দেয়া হয় নি । এ সব নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ান ও মেডিকেল এটেনডেন্ট, জীবানু গবেষক ও প্রকৌশলীদের মত পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতার পাশাপাশি তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বীকৃতি, আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ডাক্তার-নার্স-হেলথ টেকনিশিয়ানের অনুপাত ১:৩:৫ হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশে নামকা-ওয়াস্তে মাত্র ১:০.৫:০.২৫। প্রতি ১০হাজার জনগণের জন্য কম পক্ষে ২৩জন চিকিৎসক থাকা দরকার ; বাংলাদেশে আছে মাত্র ৫.২৫ জন। তারাও বেশির ভাগ ( প্রয় ৭০%) বড় বড় নগরে কর্মে নিয়োজিত । বিভিন্ন যন্ত্রপাতি জোচ্ছুরি -কীর্তিকলাপের মাধ্যমে কিনলেও বেশ কিছুই বিকল। নয়ত চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত লোকবল নেই । করোনার যন্ত্রপাতি/ সরঞ্জাম অপর্যাপ্ত অবস্থা বর্তমানে আরও নির্মম ও শোচনীয় । এ নিয়ে প্রভাবশালীদের কালো ব্যবসার খবর আসছেই অহরহ ।
‘উন্নয়ন অন্বেষণে’র হিসাব বলছে, লকডাউনের কারণে আয় কমে যাওয়ায় বা বন্ধ থাকায় ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার চেয়ে কম আয় করবে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগে ৪৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করবে। নয়া কর্ম-সংস্থান সৃষ্টি ও পদ্ধতিগত নয়া কৌশলে অর্থনীতি পুনরায় সচল করতে পারলে , দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা ৩৯ দশমিক ৪৩ শতাংশে নেমে আসবে। ২০২৪ নাগাদ স্বল্প উন্নত দেশে উত্তরণ লাভ ( তথা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন) সম্ভব বলে মনে হয় না ।
কৃষিতে গত ছয় বছর ধরে ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যে আটকে আছে। অর্থ বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর অনুদানের অনুপাত হ্রাস পাচ্ছে । কৃষিতে পর্যাপ্ত ভর্তুকির ঘাটতি রয়েছে। এ অর্থ বছরে সরকার ভর্তুকিতে ৫০০ কোটি টাকা ( জি.ডি.পি.-র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ ) বাড়িয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি স্থিতিশীল খাদ্য সুরক্ষা তৈরি করতে যথেষ্ট নয়। মনে রাখা দরকার , কৃষিকাজে নিয়োজিত জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ ; যদিও জিডিপিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কম (~১৪%)। এর জন্য দায়ী বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা , রসদ ও সরঞ্জামের অপ্রতুলতা , অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প / উদ্যোগ খাতে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান করোনা কালে বন্ধ হয়েছে। ব্যাংকগুলোর আরোপিত কঠিন শর্তের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের উদ্যোক্তারা ঋণে সহজ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। নারী উদ্যোক্তারা এস.এম.ই. খাতের সব ঋণের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ পাওয়ার কথা। নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে প্রধান বাধা জামানত–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা ও গ্যারান্টি, বাণিজ্য লাইসেন্স ও ঋণ-পদ্ধতিতে কঠোরতা, এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি ব্যাংকারদের মানসিকতা।
আমাদের মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৮ লাখ, যার মাত্র ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিয়মিত অনিয়মিত শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কি হবে – তার কোন পরিকল্পনা নেই ; এরাও করোনা কালে আয়-উপার্জন হারিয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ।
ব্যাংক , পুঁজি বাজার , মেগা পাবলিক পারচেজ , মেগা প্রোজেক্ট , আমদানী রপ্তানী ইত্যাদি হতে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে , প্রতিকার বিহীনভাবে , পাচারে হয়ে যাচ্ছে । দেশে-বিদেশী এই লুঠেরা শ্রেনী করোনা আক্রান্ত অর্থনীতিকেও বর্তমানে রেহাই দিচ্ছে না ।
কর্তৃপক্ষ কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে ?
করোনার অতিমারী স্তিমিত হলেও এর যন্ত্রনাময় প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে অনেক কাল থাকবে ; – পেইনটিং যতই করা হোক। এ বাজেট স্পষ্টতই স্বল্প মেয়াদী ব্যবস্থা হিসাবে প্রদত্ত বলে মনে হয়েছে । তবে এতে করোনা নিরাময়ের উপর ফোকাস কম ।
বাজেটে ‘কালোটাকা’ ‘সাদা’ করার আইনী ব্যবস্থা দেয়ার বিষয়টা অতীতের চেয়েও আরও খোলা মেলা ভাবেই ধনীদের অনুকূলে করা হয়েছে । অর্থনৈতিক অপরাধে শর্ত সাপেক্ষে কারো বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না (?) , এমন এক ধারনা আকার-ইঙ্গিতে বুঝানো হল । এটা কতটা নৈতিক ?
গবেষক ফাহমিদা খাতুনের হিসাব মতে, যাঁদের আয় বেশি তাঁরা বেশি সুবিধা পাবেন। যাঁর মাসিক কর যোগ্য আয় ২৫ হাজার টাকা, তিনি বছর শেষে ৫ হাজার টাকার ছাড় পাবেন। আর যাঁর মাসিক কর যোগ্য আয় ৪ কোটি টাকা , তিনি বছর শেষে ছাড় পাবেন প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা (প্রথম আলো, ১২ জুন ২০২০)।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা আগের অর্থ বছর (২০১৯-২০)এর তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। …. এখন প্রশ্ন উঠছে , বরাদ্দের পরিমাণ কত বাড়ল বা কমল তা দেখব পরে , স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ঠিক করার কোনো পরিকল্পনা নেই কেন ? বাজেটে কেন উল্লেখ নেই যে , কভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রাইভেট হাসপাতালকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এনে আগামীতে সম্ভাব্য সংক্রমণ কিভাবে মোকাবেলা করবে ? তাহলে কি এই বাজেট শুধু ৩০ শতাংশ সরকারী সেবার জন্য প্রদত্ত ? বেসরকারী খাতের বাকি ৭০ শতাংশ সেবার বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা থাকবে না ? বেসরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলুকে কি নিজের ইচ্ছা মতো করোনা নিয়েও ব্যবসা করতে দেয়া হবে ? বর্তমানে প্রাইভেট হাসপাতালে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে দ্বিগুণ দামে করোনা টেস্ট করতে হয়। কেন বাংলাদেশীদের বছর বছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার (২০১৮সন) ভারতে খরচ করতে হল , তার সুরাহা করার কোন পরিকল্পনা নেই কেন ? এ অর্থ দিয়ে মফস্বলে ( হাওড় , পার্বত্য, নিম্নাঞ্চলে , ) কয়েকটা সরকারী কলেজ -হাসপাতাল ও বিজ্ঞান গবেষণাগার নির্মাণ করা যেত ।
অর্থমন্ত্রী অনলাইনে কৃষিপণ্য বিক্রির যে উদ্যোগের কথা বলেছেন, সেটি ভালো। এতে ক্রেতা ও উৎপাদকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হবে। ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমবে। কৃষকও তাঁর পণ্যের ন্যায্য দাম পেতে পারেন ।
রাজস্ব নীতিমালা সংস্কার , রাজস্ব আদায়ের বলয় বৃদ্ধি ,ধনবান স্তরে কর নিয়মিত আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির বলিষ্ঠ শৃঙ্খলিত কোন পরিকল্পনা নেই ।
স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কি করা উচিত ?
মহামারীর মত দুর্যোগগুলো একদিকে যেমন মানুষের জন্য নিদারুন দুঃখ-কষ্ট বয়ে নিয়ে এসেছে তেমনি আবার নতুন শক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। বাজেট পরিকল্পনায় সমাধানের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরকল্পনা দু’টাই থাকতে হবে ।
• স্বাস্থ্য না অর্থনীতি – কোনটা বেশী অগ্রাধিকার প্রাপ্য? দু’টাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বল্প মেয়াদে খাদ্য উৎপাদন / আমদানি , কৃষি উপকরন সরঞ্জাম , জরুরি ঔষধ-সরঞ্জাম , গার্মেন্টস কাঁচামাল ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের আশু পরিকল্পনা থাকা দরকার।
• স্বাস্থ্য বিভাগে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বা প্রশিক্ষিত পেশাদারকে – যারা এত দিন অবহেলিত ও অস্বীকৃত ছিলেন তাদের – প্রয়োজন মোতাবেক নয়া নয়া কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। উনাদের কেমন গুরুত্ব ও প্রয়োজন করোনা কালে হাড়ে হাড়ে বুঝা গেল। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এ বায়োটেকনোলোজি ও জেনোম তেকনু’র শিক্ষা / প্রশিক্ষনে প্রসার করা অতি জরুরী । স্বাস্থ্য এ জন্য অতিকায় বিনিয়োগ দরকার ।
• মহামারীতে মৌলিক বিষয় হচ্ছে –নিম্ন স্তরের মানুষদের কর্ম-সংস্থনের মাধ্যমে সাহায্য সহযোগিতা দেওয়া। যাতে করে অনাহারে বিনা চিকিৎসায় কোন মানুষ মারা না যায়, এবং আয় রোজগার করে বাঁচতে পারে ।
• লকডাউনের পর অনেক মানুষই শহর ছেড়ে শেষ আশ্রয় স্থল পৈতৃক-বাড়ী ফিরে গ্রামীন অর্থনীতিতে কম বেশী যুক্ত হয়েছেন । কৃষি তথা গ্রামীন অর্থনৈতিক কাজকর্মে নিয়োজিত হয়েছেন উপার্জন নিশ্চিত করার জন্য , মহামারী হতে নিরাপদ থাকার জন্য। এ অবস্থায় এ গন-প্রবনতাকে স্বীকার করে সরকার সেই সকল মানুষদের স্বল্প সুদে ঋন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির , কারিগরি দক্ষতা , তথ্য নেটওয়ার্ক সাপোর্ট, মধ্য-স্বত্ত ভোগী মুক্ত বিপনন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার স্থাপনে সহায়তা করতে হবে ; -যাতে কর্মহীন হয়ে আবার শহরমুখী না হয় । বাজেট এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন ছিল ।
• কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও পন্য উৎপাদন পদ্ধতিতে বৈচিত্র আনতে হবে । বছর বছর কৃষি জমি নানা আগ্রাসনে কমে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় , ভূমির মৃত্তিকার পাশাপাশি জল ও বায়ুকে প্রধান অবলম্বন করে আকাশমুখী স্থায়ী কাঠামোয় খোলা আকাশের নিচে ও গ্রীন হাউসে বিভিন্ন মাছ, হাস মুরগী পাখী সবজি ফলের ফার্ম গড়ে তুলা যায়। গ্রামে গঞ্জে কৃষি ক্ষেত্র ও সর্ব মৌসুমের জন্য জলাধার ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নে শ্রমঘন-কর্মসূচী চালু করা । ফলে , গ্রামে কর্ম-সংস্থান ও গ্রামের মানুষের মাথা পিছু আয় বাড়বে । ….. খেয়াল রাখতে হবে যে , মহামারীতে অধুনিক শিল্প কারখানা ও সেবা খাত যখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল , তখন গ্রামীন কৃষিই মানবসভ্যতার সঞ্জীবনী শক্তি সরবরাহ করে চলেছে ।
• গ্রাম খামার, গ্রাম্য যানবাহন ও কৃষি যন্ত্র মেরামত কারখানা , পশু প্রজনন / চিকিৎসায় কেন্দ্র উন্নয়ন , মৌসুমী কৃষি পন্য ও বীজ সংরক্ষণাগার তথা গুদাম , ই-তথ্য কেন্দ্র , কৃষি কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্র স্থাপনে কম সুদে ঋন দিয়ে প্রশিক্ষিত উদ্যোগতা উৎসাহ দিতে হবে। নারীদের স্বাস্থ্য ও কৃষি শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনেও উদ্যোগ নিতে হবে। কেন না প্রতিটি পরিবারে নারীগন সচেতন ও আধুনিক প্রশিক্ষন পেলে উৎপাদনশীলতা ও জন স্বাস্থ্য অনেকটা উন্নত হবে । এন জি ও-দেরও বিবেচনায় আনা যায় এ সব বিষয়ে ।
• চীন-ভারত হতে আমদানী পণ্য / কাঁচামালের বিকল্প সরবরাহ -বাজার সন্ধান করা দরকার অবিলম্বে । বিশেষ করে ঔষধ ও চিকিৎসা খাতে অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল আমদানির, এবং সে সব কাঁচামাল দেশে উৎপাদনেরও জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।
• করোনা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের জন্য আপাতত সরকার / আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থানে সহায়তা (ঋন) স্কিম শুরু করতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্ষার জন্য স্বল্প-সময়ের জন্য একটি বিশেষ আর্থিক স্কিম চালু করতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বিতরন ব্যবস্থা আরও দূষণ মুক্ত করতে হবে । সাময়িক প্রণোদনা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধান নয় । এ খাতের অনেক টাকা-পয়সা ত্রুটিপূর্ণ পাইপ দিয়ে ভুল গন্তব্যে অংশত জমা হচ্ছে । তা সেনা বাহিনীর হাতে দায়িত্ব দিলে ঠিক আছে।
• শহর –যেখানে তীব্র ঘন বসতি- আপাত পরে, বরং আগে গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে চালু করা , সবার আগে। কৃষিতে , গ্রাম্য হাটে, গঞ্জের বাজারে , মফস্বলে ।
• আপাতত মহা-বৃহৎ প্রকল্প সরকারী বিনিয়োগ ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে । চীনের সাথে কৃষি ও শিল্প কাঁচামাল ও পন্য আমদানীতে , বিশেষত অতি সম্প্রতি ৯৭% বিনা শুল্কে রপ্তানীর বান্দেলের আওতায় বানিজ্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা জোরদার করতে হবে। মেগা-প্রোজেক্ট লোভে চীনের সুপ্ত লাল-সাম্রাজ্যবাদী লালসার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। ভারতের সাথে আমদানী-রপ্তানী বানিজ্যে সাধারণত ঐতিহাসিকভাবেই জাতির জন্য (সিন্ডিকেটদের নয়) অলাভজনক , বিশ্বাসহীন ।
ইতিমধ্যেই উত্তর-দক্ষিনের বিভিন্ন দেশে করোনা-উত্তর অর্থনীতি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে এনে কিভাবে আরও উন্নতি করবে ,সে সব উপায় বের করার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গন-বুদ্ধিজীবীদের ( অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী , আইনবিদ , দর্শন- নীতিবিদ , রাষ্ট্র ও সমাজ বিজ্ঞানী , পরিবেশ বিজ্ঞানী , মেধাবী/সৎ সাংসদ প্রমুখ ) প্যানাল গঠন করে ইতিমধ্যেই মডেলিং-এর কাজ শুরু হয়েছে । # (২৭জুন২০২০
কাদের চৌধুরী, কানাডা প্রবাসী লেখক ।

