বারবার ধুলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে রক্তের দাগ উঠবে না

 

বাঙালির বহু পুরনো প্রবাদ এটা। ব্রিটেনের অবস্থা এখন ঠিক এইরকম। প্রতিদিন এখানে মৃত্যুর সংখ্যা নিজের রেকর্ড ভাঙছে, আর ব্রিটিশ মিডিয়া ব্যস্ত লকডাউনে থাকা ভারতের ‘দুর্বিষহ’ অবস্থা তুলে ধরতে। শেষমেশ যখন একদিনে মৃত্যুর হারে ইতালিকে ছাপিয়ে গেল, তখন ব্রিটিশ মিডিয়ার প্রচারে করোনা আক্রান্ত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সুস্থ হয়ে ওঠা কিংবা সরকারি উদ্যোগে ৩ হাজার পিপিই তৈরি করার গল্প। কিন্তু বাস্তবটা হল কোভিড-১৯ এখানে মানুষকে শেষ করে দিচ্ছে নির্বিচারে। প্রাণহানি তো বটেই, ভেঙে পড়ছে অর্থনৈতিক কাঠামো, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
শুক্রবার থেকে শনিবারের মধ্যে ব্রিটেনে করোনার বলি হয়েছেন ১ হাজার মানুষ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে। বলা হয়, ব্রিটেনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনুন্নত দেশগুলো তো বটেই, অনেক উন্নত পশ্চিমী দেশের থেকে অনেক ভালো। কিন্তু তার সঙ্গে এই পরিসংখ্যান কি আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ! উত্তর হল, একদমই নয়। বিশেষ করে যে চিকিৎসকরা এই মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করছেন, সুরক্ষিত নন তাঁরাই। পর্যাপ্ত পিপিই না থাকায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। ব্রিটেনে এখনও পর্যন্ত করোনার বলি ১০ চিকিৎসক রয়েছেন তিনজন নার্স, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন স্বাস্থ্য সহায়ক। অদ্ভূতভাবে তাঁরা প্রত্যেকেই বিএএমই গোষ্ঠীভুক্ত।
বিএএমই-এর পুরো অর্থ ব্ল্যাক এশিয়ান মাইনোরিটি এথনিক। গোদা বাংলায় এশিয়া তথা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতি পুনর্গঠনের জন্য ব্রিটেনে এই সম্প্রদায়কে নিয়ে আসা হয়েছিল। ব্রিটেনের সংবাদপত্রগুলির দাবি, মারণ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিএএমই গোষ্ঠীরই সবচেয়ে বেশি। হতে পারে। কিন্তু সেগুলির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথম বিষয় হল, দারিদ্র। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে পাক বংশোদ্ভূত এবং বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে গরিব। একটা ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাঁদের। ভারতীয়দের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে একটু সচ্ছল। তাঁরা নিজেদের বর্ধিষ্ণু পরিবার নিয়ে এখানে অনেকেই থাকেন, যার মধ্যে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। এবং এদের মধ্যে হাই ব্লাড প্রেসার আর ডায়াবেটিসের শঙ্কাটাও বেশি।
আইসিএনএআরসির তথ্য বলছে, ৭৪ শতাংশ সাদা চামড়ার লোক বসবাস করেন এমন সব এলাকায় তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অথচ এশীয়দের ক্ষেত্রে এই হার ১৩ শতাংশ যেখানে ১৩ শতাংশ এশীয় লোকরা বসবাস করেন । ভুলে গেলে চলবে না, এনএইচএস বা জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্ত রয়েছেন এই সম্প্রদায়েরই ৪৪ শতাংশ মানুষ। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে তাঁদেরই ১৫ জনের মৃত্যুকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলেই মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ মেডিক্যাল আসোসিয়েশনের প্রধান ডাঃ চাঁদ নাগপাল।
দুর্ভাগ্যজনকই বটে। আমার এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত বন্ধু। বয়স ৫০-এর কোঠায়। করোনায় আক্রান্ত। এক সপ্তাহের চিকিৎসায় সুস্থও হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। এমন সময় হঠাৎই তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ভাবতে পারেন, তাকে যাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য আয়ম্বুলেন্স পাঠানো হয়, সে জন্য ১২ ঘণ্টা ধরে ফোনে দর কষাকষি করতে হল! বর্তমানে সে ভেন্টিলেশনে। জানি না আর দেখা হবে কি না…।
আর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। দায়িত্বজ্ঞানহীনতার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিজের অহংকার বজায় রাখতে ইইউ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর থেকে পিপিই কিনতে বা ভেন্টিলেটর নিতে আপত্তি রয়েছে বরিস জনসনের প্রশাসনের। অথচ, সেই ইগোর লড়াইয়ের মাশুল দিতে হচ্ছে দেশের চিকিৎসকদের। প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই করোনা আক্রান্তদের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করতে হচ্ছে। এইরকমই এক চিকিৎসক আমার বন্ধু। নিরক্ষীয় অঞ্চলে যে ধরনের রোগ-ভোগ হয়, সেসবের বিশেষজ্ঞ। ভারত, নেপালের উজ্জ্বল কেরিয়ার ছেড়ে দু’বছর আগে এখানে চলে আসেন। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই করোনা মোকাবিলায় এনএইচএসের সঙ্গে একযোগে লড়াই করছেন। তার আগেই অবশ্য সন্তানসম্ভনা স্ত্রীকে দেশে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলেন। যখনই ফোনে কথা হতো, বলতেন, ‘আরে চিকিৎসা করাই তো আমাদের কাজ। তাহলে আমাদের নিয়ে এত মাতামাতি কেন!’ বর্তমানে তিনি সেলফ আইসোলেশনে। স্বাদ চেনা ও গন্ধ চেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
বিএএমই গোষ্ঠীর প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য সরকারের প্রতি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, ব্রিটিশ মেডিক্যাল আসোসিয়েশনের প্রধান। লিভারপুলের এমপি পৌলা বারকারের মতে, ‘সবার জীবনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমাদের সমাজ গঠনে এই সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য। তাই অন্তত চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি যাতে বৈষম্য না হয়, সেটা দেখা তো সরকারের অন্যতম কর্তব্য!’
আসলে এই গোটা পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে একটা সিদ্ধান্তে। নির্দিষ্ট করে বললে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ভুল সিদ্ধান্তে। করোনা সঙ্কট গভীর বুঝে ৯ মার্চ লকডাউন ঘোষণা করেছিল ইতালি। তারপরও সেখানে মৃত্যুমিছিল থামানো যাচ্ছে না। অথচ ব্রিটেন লকডাউন ঘোষণা করার জন্য ২৩ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করল। আর এই ১৪ দিনে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার দায় বইতে হচ্ছে ব্রিটেনবাসীকে। তাই হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে প্রতিবার ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুলে করোনা দূরে থাকতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে এই রক্তের দাগ যাবে না।

রূপাঞ্জনা দত্ত, যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.