বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেছেন, আলোচনার এক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়েও আলাপ চলছে, চীন নাকি তা সমাধান করে দেবে, শোনা যাচ্ছে। তাই কিছু ঘটনা আলোচনা অবশ্যই করা দরকার, শুধু প্রথমেই বলে রাখা দরকার, চীন যাকিছু করে তা’ নিজের স্বার্থেই করে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের দুবার যুদ্ধ (১৯৪৮, ২৯৬৫) হলেও ১৯৭১ রের যুদ্ধ বাংলাদেশ ইস্যুতে হয়েছে, এটা আমরা বাঙালিরা জানলেও, চীন কিন্তু তিনটি যুদ্ধেই এক বিশেষ ভুমিকায় ছিলো। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে চীন কাশ্মীরের আকসাই-চিন অংশটির নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আর তার পরের বছর পাকিস্তান – কাশ্মীরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনের হাতে ছেড়ে দেয়। সেই থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন – এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালে, এর পর আরেকটি যুদ্ধবিরতি চু্ক্তি হয় । এর পর ১৯৭১-এর তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান- বাংলাদেশ যুদ্ধ এবং এখানেও চীনের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। চীনের নাম ছিলো “রিপাবলিক চায়না” এবং এই নামেই জাতীসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ছিলো কিন্তু চিয়াং কায়শাকের নেতৃত্বে তাইওয়ান বা ফরমোজা বা ‘রিপাব্লিক চায়না’ আলাদা হলে চীন তার নাম “পিপুলস রিপাবলিক চায়না” নামটি নিয়ে জাতিসংঘে বসতে চাইলে ১৯৭১ সালে প্রথম নাম পরিবর্তনের আবেদন করলে, পাকিস্থান তা প্রথমে সমর্থন করে সেই কারনেই পাকিস্তানের প্রতি চীনের শুভো দৃষ্টি ছলো আর সেই জন্যেই ১৯৭১ রে চীন পাকিস্তান কে সমর্থন দিয়েছিলো, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এবার চীন বাংলাদেশের সাথে ভালো সম্পর্কের কারন হলো, বাংলাদেশ চীনের ভালো ব্যবসায়ীক পার্টনার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ঋণ চীনের কাছে আছে, প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন চীন সফরে যাচ্ছেন, শোনা যাচ্ছে আরো ঋণ করবেন তিনি চীনের কাছে। এব্যপারে পরে বিস্তারিত লেখা যাবে , শুধু এইটুকু জানিয়েরাখি যে, চীন ব্যবসার জন্যে সব কিছুই করতে পারে, শুনেছেন হয়তো শ্রীলঙ্কার একটি সমুদ্রবন্দর চীনের তৈরি ১০ বিলিয়ন ডলারে, শ্রীলঙ্কা ঋণের তিনটি কিস্তি ঠিক সময়মতো ফিরে না দেওয়ায় বন্দরটির ৯৯ বছরের মালিক এখন চীন। গভীর সমুদ্র বন্দরের উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি করেছে শ্রীলংকা সরকার। চীনা সামরিক বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় হাম্বানটোটার বন্দরটি ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে কয়েক মাস বিলম্বের পর চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এদিকে বন্দরটি চীনের হাতে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন রয়েছে ভারত। তাই বাংলাদেশ চীনের কাছে ঋনে জর্জরিত হলে চীন তার বিকল্প ঠিক করেই রেখেছে। এর পরেও বলবেন এগুলো সত্যি নয়? তাঞ্জানিয়ার কথা মনে নাই? বক্সাইড এর খনিজ সম্পদে ভর্পুর তাঞ্জানিয়া চীনের সাথে চুক্তি করেছিলো দেশের অবকাঠামো তৈরির জন্যে, এখন চীন এলুমিনিয়াম তৈরির খনিজসম্পদ অক্সাইড তাঞ্জানিয়া থেকে চীনে নিয়ে এসে চীনকে শীল্পে সম্মৃদ্ধ করেছে, তাঞ্জানিয়া আগের মতোই গরীব আছে, শুধু প্রসস্থ রাস্তা হয়েছে, যেখানে বক্সাইড বোঝাই লরি চলে, চীনে পৌছানোর জন্যে।
তাই চীনের সাথে আরো গাড়ো বন্ধুত্ব করতে বাংলাদেশকে আরো গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে, চীন যদি রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করারা জন্যে বাংলাদেশের সেন্টিমেন্টকে তাদের স্বার্থে ব্যবসায়ীক দৃষ্টিতে দেখে আরো ঋনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সে ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো সতর্কতার সাথে চীনের প্রস্তাব গুলো পরিক্ষা করে দেখতে হবে।
মোনাজ হক , বার্লিন
সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

