সেফুদা , সীমা-পরিসীমা এবং মানুষ বোম

কথায় বলে বন্দুকের গুলি আর মুখের বুলি বেড় হয়ে গেলে ফেরত আসে না। সেফুদা এখন সবার পরিচিত মুখ। এই সেফুদা কে নিয়ে আমার লেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। কেন নেই ? তবুও লিখবো শেষের দিকে।

বলছিলাম সীমা পরিসীমার কথা। একটি দেশের ভূখণ্ড থেকে সমাজের/পরিবারের বাড়ি ঘরেরও একটি সীমা থাকে। সীমা থাকে বড়/ছোটো কিংবা আদব/কায়দায়, সত্যি বলতে সব কিছুতেই সীমা থাকে। তবে আমাদের দেশে মানুষরা বানিয়ে বা মিথ্যা কথা বলার মাঝে , যা কিনা ভিন্নভাষায় চাপাবাজী করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করতে  দুঃখজনক ভাবে একটু বেশিই ভালোবাসে! তখনই কেবলমাত্র সেই সীমা পেরিয়ে গেলেই পরিসীমার প্রশ্ন চলে আসে । এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয় , সীমা অতিক্রম বা সীমা লঙ্ঘন করা সমীচীন মোটেও নয়। ধর্মের ক্ষেত্র থেকে বলতে গেলেও,  যতটুকু জানি সব ধর্মেই সীমা অতিক্রম করা বারণ আছে। ইসলাম ধর্মে তো সীমা অতিক্রমকারিকে স্বয়ং বিধাতাও পছন্দ করেন না বলে উল্লেখ আছে।  যাক, সেই ইসলামিক ব্যাখ্যা ইসলামিক চিন্তাবীদগণ দিলেই ভালো। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে এই সীমা নিয়ে । আরো সহজভাবে বললে বলতে হয়,  কিছু অকথন বা অতিকথন, সেই গুলি বা বুলির মতন, যা কিনা জনমানুষের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি করে।  আরো বেশি হাস্যরসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যখন কোনো উচ্চতর চেয়ারে বসে সেই অতীকথন গুলো বলা হয়। শত উদহারণ দেওয়া যাবে, আজকে সাম্প্রতিক দুতিনটি অতিকথনের কথা না বললেই নয়। কাউকে হাসানোর ইচ্ছা বা আঁকুতি আমার নেই, কেননা আমি সব সময় বিশ্বাস করি বা বিশ্বাস রাখতে চাই আমাদের দেশের জনগণ ভীষণ সচেতন, সেটা সকল ক্ষেত্রেই ।

 

দেখার চেষ্টা করি সেই অতিকথন গুলো :

১ )  ওয়াসা – গত দুদিন পূর্বেই ওয়্সার প্রধান জনাব তাসকিম সাহেবের একটি কথা নিয়ে বা অতিকথন নিয়ে  দেশে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। ভদ্রলোক টিভির পর্দায় (৭১ টিভি) স্পষ্ট করেই জোর গলায় বললেন , ” ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ” ! আবার বললেন তিনি নিজে টেপের ( পানির কলের) পানি সরাসরি পান করেন। অবশ্য একটু পরেই কথা ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বললেন!  বারবার বললেন , ওয়াসার সুপেয় পানি বাড়ির চৌবাচ্চা ( ট্যান্কি)  এ গিয়ে পৌঁছানোর পরেই সেটা আর সুপেয় থাকে না কারণ হিসেবে যুক্তি হলো বাসা বাড়িতে পানির ট্যান্কি নোংরা ময়লা ইত্যাদি ।  ওনার এই অতিকথনে জনমানুষ কতটুকুন হেসেছেন, তা বেশ সহজ অনুমেয় বিষয় নিশ্চয়ই । আজকের পত্রিকায় দেখলাম কিছু মানুষ ওয়াসার প্রধান কে ওয়াসার সুপেয় পানি দিয়ে সরবত পান করাতে গিয়েও পান করাতে পারেন নি! এত বড় চেয়ারের দায়িত্ববান মানুষের বাঁকি দায়িত্বের কথা ( যেমন ডিস্ট্রিবিউশনের কথা )   আর বেশি কিছু না বলাই ভালো। তাতে না আবার আরো বেশি হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। শুধু বলি ওয়াসার আরেক দায়িত্ববান লোক আবার আজকে প্রধানের কথাকে সার্পোট করতে গিয়ে আরো ল্যাজেগোবরে অবস্থা, সাথে বললেন ঢাকা শহরে শত বছরের পুরানো পানির পাইপ দিয়ে পানি ডিস্ট্রিবিউশন করা হয়। এবার হাসবেন না কাঁদবেন ? আপনার নিজের ইচ্ছা।

২ ) বাংলাদেশের একজন মন্ত্রীকে দেশ বিদেশের মন্ত্রীরা বারবার নক করে পরামর্শ চেয়ে বিরক্ত করছে ! !  সেই মন্ত্রীজন আবার একজন সাবেক জাসদী বর্তমান সরকারের টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রী  জনাব মোস্তাফা জব্বার । এই কথাকে কি বলবেন ? অতিকথন/ অকথন/ অযাচিত কথন ? এই বুলি বলে উনি কি শ্রাদ্ধ করতে চান? স্বয়ং বিধাতাও মনে হয় ভেবে পান না। আমি কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি! যা ভাবার বা বলার আপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

৩ ) বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন নিয়ে কিছু বলতেই, সবার কি প্রতিক্রিয়া হয় জানিনা, তবে আমার ভীষণ কাতুকুতু পায়। এই কমিশনে একজন বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় মানের সচিব আছেন! আজকেই ওনার ভাষ্য, ” আপনারা ভোটার হোন। ভোটার হলেই যে ভোট দিতে হবে, এমন নয় ! পছন্দ হলে ভোট দেবেন , না হলে দেবেন না। ভোটার আইডি কার্ড কাজে লাগবে – নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ “। শুধু এই কথায় থামেন নি ! আরো বলেছেন সরকারের কাছে প্রত্যাশা পূরণ হলে জনগণের ভোট দেওয়ার ইচ্ছা কমে যায়! আমার তো কাতুকুতু লাগছেই , সাথে কথার বাহারে বেকুব হয়ে যাচ্ছি। জানিনা আপনাদের কেমন প্রতিক্রিয়া হবে?

৪ ) এবার বলি এক কমরেড সাহেবে দুঃক্ষের কথায়। এই কমরেড সাহেব গত টার্মে আ লীগের বিমান মন্ত্রী ছিলেন। ওনার ভাষ্য, “এই রাষ্ট্র একেবারেই লুটেরা আর পুঁজিবাদীদের – মেনন “। আমি বলছি না এখানে অতিকথন বা অকথন আছে, তবে অকর্ম তো আছেই বটে। এই কমরেড সাহেবেরা নিজের প্রয়োজনে  মেহনতি মানুষদের দুরে ঠেলে দিতে কার্পণ্য করেন না। ইনারাই লেজুরবৃত্তি করে ক্ষমতায় আবার ইনারাই রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী বলেন ! অথচ এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা কমরেড গণ এখন মন্ত্রীত্ব না পেয়ে কত রকমভাবে রাষ্ট্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন । ওনারা বেমালুম ভুলে বসে আছেন এই রাষ্ট্র বরাবরই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র । ওনার এই কথায় হয়তো কারো দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে। আমার ফিলিংস্  অনেকটা স্থির হয়ে গেছে।

৫ ) এখন আসি সেই সেফুদার কান্ডে। এই লোক দীর্ঘদিনের অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের প্রবাসী । আমি নিজেও অষ্ট্রিয়ার প্রবাসী তবে রাজধানী শহর ভিয়েনা থেকে প্রায় দুশত কিলোমিটার দূরে লিন্জ শহরে। ভিয়েনা আমার প্রিয় শহর গুলোর একটি, প্রায়শই যাতায়াত হয়, পুরনো ভিয়েনাবাসি অনেক বন্ধু আছে, তবে এই সেফুদার কখনো দেখা মেলেনি। কিছুদিন আগে ভিয়েনার এক বন্ধুকে ফোনে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই সেফুদা কে? সে বলেছিলো, এই লোক পেনশনে আছে , সম্ভবত একটি ওল্ডহোমে বসবাস করে । হঠাত্ বন্ধুটির সাথে কখনো রাস্তায় দেখা হলে বেশ ভদ্রলোকের মত সান্তভাবে কথা বলে বা সালাম বিনিময় হয়, বেশ এইটুকুই। সেফুদা কেন পরিচিত মুখ বা ফেসবুক ভাইরাল সেটা একটু পরখ করতে কোনো একদিন তার ভিডিও গুলো দেখলাম। দুটো দেখার পরে আর দেখার রুচি পাইনি কেননা কথায় অনেক ক্ষেত্রে যুক্তি থাকলেও  ভাষা প্রয়োগ ভীষণ  বিরক্তিকর । সেই কারণেই বলেছি, এই লোকের সমন্ধে লেখার ইচ্ছা নেই। সাম্প্রতিককালে এই লোক কোরআন হাতে বেশ আপত্তিকর ভিডিও নাকি আপলোড করেছে! আমার দেখা হয়নি এবং ইচ্ছাও নেই। বেশ সেই থেকেই আমার মেসেন্জারে অনেকগুলো মেসেজ হাজির! এই লোকের সমন্ধে সার্বিক জানতে। কেউ কেউ তো এমন করে লেখে, একে কেন ফাঁসি দেওয়া হয় না? অষ্ট্রিয়ার আইন কানুন না জানা থাকুক সেটা ঠিক আছে, তবে তাদের আবেগি প্রশ্ন বা মেসেজ গুলোও বেশ বিরক্তিকর। আমি সেই সকল মেসেজ  সাথে সাথেই ডিলিট করে দেই, অনেককে অনুরোধ করে বলি আমাকে এ ব্যাপারে না জিজ্ঞাসা করতে, তারপরেও প্রশ্ন আসে! তাদের ভাবটা এমন আমরা প্রবাসীরা প্রতিবাদে ঝড় তুলি না কেন ? মনে সচ্ছে এই সেফুদার ফাঁসি হলেই সমগ্র বিশ্বে ইসলাম শতভাগ কায়েম হয়ে শান্তির নহর বইবে! যতটুকু জানলাম এই লোকের বিরুদ্ধে একটি ইসলামি অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে বা পুলিশি রির্পোট হয়েছে। শুধু এটুকু বলি এই অষ্ট্রিয়ায় সেফুদা কে নিয়ে কারো মাঝে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নেই, না থাকারই কথা। কেননা পাগলে কিনা বলে । আমি ব্যক্তিগতভাবে  নিজের বা ভিন্ন ধর্মকে কটাক্ষ করা বা আঘাত করাকে ঘৃণা করি এবং কেউ করলে তাকে প্রত্যাখ্যান করি ,বেশ এটুকুই। প্রত্যেকের বিশ্বাস কে সম্মান করাই শ্রেয়, এমনকি একজন নাস্তিকের বিশ্বাস কেউ সম্মান করা শ্রেয় বলে মনে করি কেননা নাস্তিকতাও একটা বিশ্বাস । সুতরাং সেফুদার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে এখানেই সমাপ্তি ।

লেখার শেষে শ্রীলঙ্কার ঘটে যাওয়া বিষয়ে একটি ভিন্ন  দিক বলেই শেষ করবো। শ্রীলঙ্কায় কি ঘটে গেলো বা আরো ঘটতে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে! শ্রীলঙ্কার ঘটনা প্রতিনিয়ত পত্রিকার প্রথম শিরোনাম । ঘটনা সবার জানা। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা একেবারেই ভিন্ন বিষয় । লক্ষ্যণীয় যে, মানুষ যখন নিজে বোমা হয়ে যায়, সেই বোমা অ্যাটোম বোমার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে যায় । কেননা এই অ্যাটোম বোমা তো মানুষেরই তৈরি , আবার এটার নিয়ন্ত্রণ (দেখভাল) বা নার্সিং সবই তো মানুষের হাত দিয়েই হয়। তাহলে ভাববার বিষয় , যে মানুষেরা নিজেকে বিলিন করে দিয়ে হলেও অন্য হাজারো জনকে বিলিন করে দেয় ! সেই মানুষেরা যদি কালভেদে সেই অ্যাটোম বোমার নিকট পৌঁছাতে পারে , মানে কলাকৌশলে সেই সব অ্যাটোম বোমার দেখভালের দায়িত্বে চলে আসে, তাহলে ভাবতেও  শিহরিত হই। লক্ষ্যণীয় শ্রীলঙ্কার এই মর্মান্তিক ঘটনা এখানেও সীমা বা পরিসীমা জড়িয়ে যায় । সুতরাং ঘুরেফিরে সেই পুরনো বাক্যে, সীমা অতিক্রম করা থেকে সর্বক্ষেত্রেই বিরত থাকা শ্রেয়।

20190210_195317

বুলবুল তালুকদার

সহকারী সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.