বইঃ আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে
লেখকঃ শাহাদুজ্জামান
ধরণঃ ডকুফিকশন
প্রকাশকঃ ঐতিহ্য
মুদ্রিত মূল্যঃ১৪০ টাকা
ফিদেল ক্যাস্ট্রো পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম, একইসঙ্গে মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রেরণা। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা কিউবার জনগণকে তিনি এনে দিয়েছেন মুক্তি।
ক্যাস্ট্রো ভাবনায় বিভোর বাংলাদেশের এক যুবক একদিন নিজেকে আবিষ্কার করে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পড়ার ঘরে।ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে আলাপ শুরু করে সে।
আলাপে উঠে আসে বছরের পর বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতে শোষিত কিউবানদের অবস্থা। কীভাবে ক্যাস্ট্রো সেই শোষণ থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখলেন,অন্যদের দেখালেন এবং তা বাস্তবে ঘটালেন।মাত্র ৩২ বছর বয়সী ক্যাস্ট্রো তার তরুণ সঙ্গীদের নিয়ে পরমাক্রমশালী আমেরিকার নাকের ডগায় ঘটিয়ে ফেলেছিলেন এক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। বিপ্লব সহজ কোনো পথ নয়।মেক্সিকো থেকে মাত্র ৮০ জন গেরিলা জাহাজে চেপে যে বিপ্লবের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন,আমেরিকার মদদপুষ্ট ব্যাতিস্তা সরকারের প্রথম আঘাতেই তার মধ্যে মাত্র ২২ জন টিকে যান।
বারবার ব্যর্থতা সত্বেও গেরিলারা মুক্তির স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন নি।টানা দুই বছর যুদ্ধ করে মাতৃভূমিকে মুক্ত করেছেন।কিন্তু চারপাশে পুঁজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদের রাজত্ব,সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন,অর্থনৈতিক বয়কট সবকিছু মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হবে কিউবাকে।অন্যদিকে মাত্র ৯০ মাইল দূরেই শক্তিশালী আমেরিকায় শুরু হয় বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করার প্রস্তুতি,চলে বিপ্লব বিরোধী প্রচারণা। বারবার আক্রমণ চলে কিউবায়।কিন্তু কিউবার জনগণ ভালোবেসে পাশে থেকেছেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো,চে গুয়েভারা, রাউলদের।ফলে কোনো শক্তির কাছেই মাথা নত করতে হয়নি কিউবাকে। শত বছর ধরে নিপীড়িত,দরিদ্র কিউবা পরবর্তীতে সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী দেশকে যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করেছে।পাশাপাশি কিউবানরা নিজেরা হয়েছে শতভাগ শিক্ষিত,স্বাবলম্বী গর্বিত এক জাতি।
যুবকের সাথে আলোচনায় ক্যাস্ট্রো স্মরণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক শেখ মুজিবকে।যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সহায়তা করতে এদেশের সাথে পাটচুক্তি করেছিলেন ক্যাস্ট্রো।এতে রেগে গিয়ে দুর্ভিক্ষের সময়েও এদেশ থেকে ত্রাণ ফেরত নিয়ে গেছিল আমেরিকা।আলাপে উঠে আসে বিপ্লবী তরুণদের আরেক প্রেরণা চে গুয়েভারার কথাও।
বিপ্লব সম্পাদন এবং বিপ্লব পরবর্তী সময়ে টিকে থাকার ও জনগণের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের এক দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে ক্যাস্ট্রোর আলোচনায় যদিও ক্যাস্ট্রো মনে করেন প্রতিটা দেশের বিপ্লবের পথে স্বকীয়তা থাকবেই।
‘ক্রাচের কর্ণেল’ খ্যাত লেখক শাহাদুজ্জামান বাংলাদেশি যুবক এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মধ্যে কাল্পনিক আলাপের মাধ্যমে কিউবার বিপ্লব ও বিপ্লব পরবর্তী ইতিহাস তুলে এনেছেন।ডকুফিকশন ধারার এই লেখার প্রতিটা তথ্য ইতিহাসসম্মত ও প্রামানিক।
আলাপের শেষদিকে যুবক ক্যাস্ট্রোকে প্রশ্ন করে,’এই যে আপনি একজন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন,ইতিহাসে অমরত্ব পেয়েছেন।এসব ভাবতে আপনার কেমন লাগে?’
প্রশ্নের জবাবে ক্যাস্ট্রো বলছেন,’ ঐ যে জানালার বাইরে রাতের আকাশের দিকে তাকাও।দেখতে পাচ্ছ নক্ষত্রগুলো জ্বলছে মিটিমিটি করে? জান তো,ওরাও মানুষের মত বাঁচে আবার মরে যায়। ঐ নক্ষত্রটা একদিন নিভে যাবে,সূর্যও একদিন আর আলো দিবে না,পৃথিবী নামের গ্রহটাও অদৃশ্য হয়ে যাবে।নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পৃথিবীর ইতিহাস।তখন কে থাকবে ফিদেলের খ্যাতি দেখার জন্য?তাই আমার ভবিষ্যত নিয়ে আমি এতটুকুও চিন্তিত নই,বরং মনুষ্যত্বের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত।’
শাহাদুজ্জামানের লেখার জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে পাঠকও আধো ঘুমে বিপ্লবী ক্যাস্ট্রোর সাথে কল্পনার আলাপে এতটাই মশগুল হয়ে পড়েন যে ৭০ পৃষ্ঠার বইটা কখন শেষ হয়ে যায়,টেরই পাওয়া যায় না।


