সিরাজুল আলম খান : স্বাধীনতার খলনায়ক না কি দলনায়ক?

সিরাজুল আলম খান:
স্বাধীনতার খলনায়ক না কি দলনায়ক?
-শামসুদ্দিন পেয়ারা
বাঙলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক সিরাজুল আলম খান দীর্ঘদিন ধরে রোগশয্যায়। বছর চারেকের বেশি হলো তিনি চলনশক্তিহীন। কারো সাহায্য ছাড়া খাবার টেবিলে বা ওয়াশরুমেও যেতে পারেন না। জীবনের রীতি অনুযায়ী তাঁর চলে যাবার সময় সমাগতপ্রায়। এটা কোনও আফসোসের বিষয় না। তাজউদ্দিন সাহেব, মনি ভাই, রাজ্জাক ভাই, আরেফ ভাই, শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী চলে গেছেন। অন্যরাও যাবেন। সিরাজুল আলম খান‌কেও যেতে হবে। কুল্লু নাফসিন যায়েকাতুল মাউত। সব জীবিতসত্ত্বাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
তবে সিরাজুল আলম খানের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। যে রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরেই তাঁর স্থান সে রাষ্ট্র তাঁকে কখনো তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দেয়নি। রাষ্ট্র তো সম্মান দেয় না, সম্মান দেয় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকার। এ দেশের কোনও সরকার‌ই স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে তোলা ও তাকে সাফল্যের সিংহদ্বারে পৌঁছে দেয়ার কঠিন সংগ্রামে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি দেয়নি। তবে তাঁরা তাঁকে সমীহ করেছেন।
প্রচারবিমুখ সিরাজুল আলম খান ইচ্ছা করেই কখনো পাদপ্রদীপের আলোয় এসে দাঁড়াননি। অন্যদেরকে মঞ্চে তুলে দিয়েছেন। সামনে ঠেলে দিয়েছেন। স্ক্রিপ্ট রচনা করেছেন। দিনের পর দিন রাতের পর রাত অমানুষিক পরিশ্রম করে তাদের মুখে কথা তুলে দিয়েছেন। কি করে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে তা শিখিয়েছেন। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রম্প্ট করেছেন। বরাভয় দিয়েছেন। এক একটি কুপিবাতিকে এক একটি মশালে পরিণত করেছেন। কদলিকাণ্ডকে রূপ দিয়েছেন কুশীলবে। ছাত্র-শ্রমিক-যুব সমাজকে আজান দিয়ে ঘুম থেকে তুলেছেন। তাদের চিন্তায় ঢুকিয়েছেন বিপ্লব, মুখে তুলে দিয়েছেন ‘জয় বাঙলা’, হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন লাল সবুজ পতাকা। বলেছেন, আমার সাথে আসো। আমরা যুদ্ধ করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করবো। আমাদের সামনে আছে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব, পেছনে আছে জনগণের সমর্থন। জয় ছাড়া আমাদের কোনও বিকল্প নেই।
স্বাধীনতার এই মহাপুরুষকে সম্মান বা স্বীকৃতি দেয়া তো দূরের কথা রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বিষাক্ত শব্দ-ছোবলে রাজনীতির এই নটেশ্বরকে বিভিন্ন সময়ে নানা বিষে জর্জরিত করেছেন। কেন করেছেন তা তিনিই জানেন। সিরাজুল আলম খানের নাম‌ শুনলেই তিনি বিষধর ফনীনির ন্যায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সে কি কেবল বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি সিরাজুল আলম খানের নাম‌ উচ্চারিত হয় বলেই?
যদি সেটাই হয়ে থাকে তা হলে তা কি তিনি কখনোই বন্ধ করতে পারবেন? ১৯০ বছর ধরে মহাপরাক্রমশালী ইংরেজ শাসকরা অবিরাম মিথ্যা প্রচার ও বানোয়াট কাহিনী ফেঁদেও কি ইতিহাস থেকে সিরাজউদ্দৌলাকে নির্বাসন দিতে পেরেছিল? ক্লাইভ থেকে মাউন্টব্যাটেন সবাই চেষ্টা করেছে। পারে তো নাই-ই, বরং সময়ের সাথে সাথে বাঙলার শেষ স্বাধীন নবাব পলাশির ছোট্ট প্রান্তর থেকে উঠে এসে বিশাল ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন জাতি-বর্ণ-ধর্ম-ভাষা-আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সারা ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক। সকল ভারতবাসীর হৃদয়ের মানুষ।
সিরাজুল আলম খানকে শেখ হাসিনা ব্যতীত দ্বিতীয় কেউ কখনো খলনায়ক বলেননি। যারা সিরাজুল আলম খানকে চেনেন তাদের কেউ কখনো তাঁর সম্পর্কে কোনো কটুক্তি করেননি। সব সময় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন। যারা তাঁকে খলনায়ক বলেন তারা তাঁকে সম্ভবত কখনো দেখেন‌ওনি, কথাবার্তা বলা বা তাঁর সাথে রাজনীতি করা তো দূরের কথা। তাঁর সাথে রাজনীতি করার যোগ্যতাও তাদের ছিলো না। উত্তরাধিকার-ভিত্তিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যাকে ‘গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র’ বা ‘Electoral Monarchy’ নামে অভিহিত করা যায়, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা এটাই। এর সাথে ‘মধ্যরাতের ভোটচুরি’র মতো রাজনৈতিক দূর্বৃত্তপনা যুক্ত হলে তো আর কোনও কথাই নাই। সোনার উপর যেন সোহাগা ঘসে দেয়া হয়।
এইসব রাজনৈতিক ব্যক্তি নানা কারণে হয়তো পরিবারের মুরুব্বিদের কাছ থেকে মানুষ সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হবার শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। এটা আমাদের জাতির জন্য একটা দারুন লজ্জাকর ব্যাপার। আমাদের রাজনীতিবিদরা একাডেমিক ও পারিবারিক – উভয় ধরণের শিক্ষা থেকেই বঞ্চিত। বিএনপি-জামাতিরা (জনগণের ৩৬%) বঙ্গবন্ধুকেও তো খলনায়ক বলে থাকেন। তাতে কি তিনি খলনায়ক হয়ে গেছেন? তাঁর জাতির পিতৃত্ব বা বাঙলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতৃত্ব কি কণা পরিমাণ ক্ষুন্ন হয়েছে? হয়নি।
কেবলমাত্র ক্ষমতায় আসা ও টিকে থাকার জন্য বাপ-মা-ভাইদের খুনিদের যারা বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন তাদের নিয়ে আলোচনা করাটা বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানি করা বলে আমি মনে করি। আল্লাহ শেখ হাসিনাকে সৎ ও সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.